রূপপুরের বিদ্যুৎ পেতে অপেক্ষা বাড়ছেই

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩: ১২
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ছবি: সংগৃহীত
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ছবি: সংগৃহীত

পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ আবার আটকে গেছে। সব প্রস্তুতি থাকলেও, সেফটি ভালভের ত্রুটির কারণে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে উৎপাদন শুরুর সময়সীমা। ত্রুটি মেরামত করে প্রথম ইউনিট থেকে কবে নাগাদ গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হবে, তা জানাতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। ফলে চলতি বছর বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গত ২ সেপ্টেম্বর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে জাতীয় লোড পরিচালনা কেন্দ্রের (এনএলডিসি) সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনে চুক্তি হয়। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান জিই ভার্নোভার মধ্যে এই চুক্তি হয়।

চুক্তির আওতায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের আটটি সঞ্চালন লাইন এবং দুটি উপকেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এনএলডিসির কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। তবে চুক্তির পরদিনই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সেফটি ভালভে ত্রুটি ধরা পড়ে।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, রূপপুরের প্রথম ইউনিটের দুটি সেফটি ভালভের সমস্যার কারণে পরবর্তী ধাপের পরীক্ষা শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, গত ২৮ এপ্রিল রূপপুরের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষা শুরু হয়। তখন লক্ষ্য ছিল চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত করা। বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা চালিয়ে ‘বি’ স্টেজ সম্পন্ন হলেও, দুটি সেফটি ভালভের সমস্যার কারণে ‘সি’ স্টেজে যাওয়া যায়নি।

রূপপুরের প্রথম ইউনিট ২০২২ সালের ডিসেম্বর এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৩ সালের অক্টোবরে চালু হওয়ার কথা ছিল। করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে কয়েক দফা সময় পেছানো হয়।

আমদানিসহ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। জ্বালানি সংকটে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। ফলে প্রতিদিনই লোডশেডিং হচ্ছে। কখনো কখনো তা সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

এর মধ্যে শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) পিক আওয়ারে (রাত ৯টা) সারা দেশে ২ হাজার ২৫৮ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। সবচেয়ে বেশি হয়েছে ঢাকা জোনে, ৭৫৯ মেগাওয়াট। এই জোনে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৬ হাজার ১৮২ মেগাওয়াট। সবচেয়ে কম লোডশেডিং হয়েছে বরিশাল জোনে, ১০৬ মেগাওয়াট।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট চালু হলে, জাতীয় গ্রিডে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হতো, যা চলমান সংকট কাটাতে ভূমিকা রাখত।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র সূত্র জানায়, সেফটি ভালভ দুটি কেন কাজ করছে না, তা নির্ধারণ করতে রাশিয়া থেকে একটি বিশেষজ্ঞ দল আসার কথা রয়েছে। প্রকল্পের ডিজাইনারের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভালভ দুটি পুরোপুরি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, এক্ষেত্রে দুটি বিকল্প রয়েছে– দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য বরাদ্দ ভালভ এনে প্রথম ইউনিটে বসানো অথবা রুশ ভেন্ডরকে দ্রুত নতুন ভালভ তৈরি করে দেওয়ার অনুরোধ। দ্রুত যেটি করা সম্ভব হবে, সরকার সেটিই বেছে নেবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রিঅ্যাক্টরের নিরাপত্তার জন্য সেফটি ভালভ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুলিং ব্যবস্থায় অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হলে, এটি খুলে অতিরিক্ত চাপ বের করে দেয়। তবে ভালভের সমস্যা সমাধানের পরও প্রথম ইউনিট থেকে গ্রিডে বিদ্যুৎ দিতে আরও কয়েক ধাপের পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। ভালভ কার্যকর হওয়ার পর রিঅ্যাক্টরে ফিশন বিক্রিয়া শুরু হবে। এরপর পরীক্ষামূলক উৎপাদন ও গ্রিডে সরবরাহ শুরু করতে অন্তত আট থেকে ১০ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে মনে জানান তারা।

প্রথম ইউনিটের চুল্লিপাত্রে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ করানোর কাজ গত ১২ মে শেষ হয়। এরপর জুনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, আগস্টের শেষদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে। তিনি ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন।

রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট চালু হলে, জাতীয় গ্রিডে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হতো, যা চলমান সংকট কাটাতে ভূমিকা রাখত।

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পরমাণু শক্তি কমিশন। কমিশনের অধীনে পরিচালনার কাজটি করছে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)। পাবনার রূপপুরে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট।

উৎপাদন শুরু হলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় ৩৩তম হবে বাংলাদেশ। এখান থেকে ২৪ ঘণ্টা সমান হারে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। প্রতি দেড় বছর পর নতুন জ্বালানি দিতে হবে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত