সিএনএনের বিশ্লেষণ

উপসাগরীয় মিত্রদের ঝুঁকিতে রেখেই পালাচ্ছেন ট্রাম্প

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ২৩: ৩৩
প্রতীকী ছবি

জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে গতকাল ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ও ড্রোন হামলার সক্ষমতা নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে বিস্ময়কর সামরিক সাফল্য লাভ করেছে। ট্রাম্পের বক্তব্য শেষ হওয়ার পরপরই ইসরায়েলে নতুন করে হামলা চালিয়েছে ইরান।

ট্রাম্পের এই তড়িঘড়ি যুদ্ধ শেষ করার ঘোষণা এবং এই অঞ্চল থেকে বিদায় নেওয়ার ইঙ্গিত যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের উপসাগরীয় মিত্রদের অনিশ্চয়তা ও একাকীত্বের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

ইরানের মুহূর্মুহু হামলার মুখে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপদ স্বর্গ নামে পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজেদের নিরাপদ অঞ্চলের ভাবমূর্তি হারিয়েছে। এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত দেশটির ওপর প্রায় ৫০০ ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২ হাজারেরও বেশি ড্রোন হামলা হয়েছে। ট্রাম্পের ভাষণের মাত্র কয়েক মিনিট আগে আমিরাতের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আবারও ইরানের ছোড়া একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোকাবিলা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিধ্বংসী হামলার পরও ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনো ইসরায়েল ও তার প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর ওপর কার্যকর আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে। এই বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে ট্রাম্পের দাবি—যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ‘সামরিক লক্ষ্য’ অর্জনের পথে এবং আগামী দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে এই যুদ্ধ শেষ হতে পারে। কিন্তু এই ঘোষণায় তেলের বাজারে অস্থিরতার কারণে প্রতিদিন কোটি কোটি ডলার লোকসান গোনা দেশগুলোর জন্য কোনো স্বস্তির বার্তা নেই।

উপসাগরীয় দেশগুলোর দ্বিধা ও উদ্বেগ

ট্রাম্পের প্রস্থান পরিকল্পনা ইঙ্গিত করছে, যুদ্ধ শেষে ইরান তার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়েই টিকে থাকবে, যা যেকোনো সময় এই অঞ্চলের ভঙ্গুর জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত হানতে পারে।

এ বিষয়ে উপসাগরীয় মিত্রদের মধ্যে স্পষ্ট বিভক্তি দেখা দিয়েছে। ইরানের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরবের কর্মকর্তারা ওয়াশিংটনকে চাপ দিচ্ছেন যাতে মার্কিন বাহিনী বিদায় নেওয়ার আগে ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত মনে করছে, ইরানের বর্তমান সামরিক শক্তি অক্ষত রেখে এই অঞ্চলে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা প্রায় অসম্ভব।

তবে কাতারের অবস্থান ভিন্ন। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক গ্যাস মজুতের মালিক এই দেশটি অনেক বেশি নমনীয় অবস্থান নিয়েছে। দোহা চায় অবিলম্বে সংঘাত কমিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরে যেতে। মার্কিন মিত্রদের এই বিপরীতমুখী চাওয়ার কোনোটিই পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কৌশলগত জয় কি ইরানের?

ট্রাম্প তাঁর ভাষণে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত ও সুরক্ষিত করার দায়িত্ব অন্যান্য দেশের ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে। ট্রাম্পের এই কথা প্রমাণ করে, যুদ্ধের পর কৌশলগত এই জলপথ ইরানের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে।

যুদ্ধশেষে হরমুজ প্রণালি ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকলে, নিঃসন্দেহে এটি দেশটির জন্য কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক বিজয়। ট্রাম্প বর্তমান ইরানি শাসনকে ‘কম কট্টরপন্থী’ ও ‘অনেক বেশি যুক্তিসংগত’ বলে অভিহিত করলেও ইরান ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর টোল আরোপের পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। এই পরিকল্পনা কার্যকর হলে ইরান প্রতি ট্যাঙ্কার থেকে কয়েক মিলিয়ন ডলার আয় করবে। এই পরিমাণ অর্থের সম্ভাবনা যুদ্ধের আগেও ইরানের ছিল না।

ট্রাম্পের ‘আর্ট অফ দ্য এক্সিট’

রাজনৈতিকভাবেও ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমানে চাপে রয়েছেন। নিজ দেশে তাঁর জনপ্রিয়তা নিম্নমুখী এবং বিশ্ব পুঁজিবাজারে ইরান যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবে বিনিয়োগকারীরা ক্ষুব্ধ। এমন পরিস্থিতিতে কোনো সুস্পষ্ট ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ বা প্রস্থান পরিকল্পনা ছাড়াই ট্রাম্প এমন পথ খুঁজছেন যা তাঁর সম্মান রক্ষা করবে।

ভাষণে ট্রাম্প ইরানকে ‘বোমা মেরে প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেওয়ার’ হুঁশিয়ারি দিলেও বাস্তবতা হলো—মাত্র কয়েক সপ্তাহের হামলা ইরানের মতো দেশের উৎপাদন সক্ষমতা ও অস্ত্রের মজুত পুরোপুরি নিঃশেষ করতে পারে না। ট্রাম্প তাঁর এই ‘ইরানি অভিযান’ শেষ করার মাধ্যমে এমন আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলা রেখে যাচ্ছেন, যা পরিষ্কার করার দায়িত্ব হয়তো আর কারও নয়, বরং তাঁর উপসাগরীয় মিত্রদেরই নিতে হবে।

সম্পর্কিত