
ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে ইরান-সমর্থিত হুতিরা। কৌশলগত বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে একের পর এক এলাকা ও দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে তারা। এর মধ্যেই সৌদি আরবে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে গোষ্ঠীটি। এতে হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বাব আল-মান্দেব নিয়েও বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সোমবার দক্ষিণ সৌদির খামিস মুশাইত এলাকায় একটি সামরিক বিমানঘাঁটিতে হামলার দাবি করেছে হুতিরা। সশস্ত্র গোষ্ঠীটির দাবি, ডজনখানেক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে ওই ঘাঁটিতে বিমানের হ্যাঙ্গার, রাডার ব্যবস্থা, রানওয়ে ও গোলাবারুদের গুদাম লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে তারা। সৌদি কর্তৃপক্ষ খামিস মুশাইতসহ দক্ষিণাঞ্চলের চারটি শহরে জরুরি সতর্কতা জারি করেছে।
হুতিরা জানিয়েছে, গত পাঁচ দিনে সৌদি আরব ইয়েমেনে ৩৫০টি বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার জবাবেই সৌদিতে আঘাত করেছে তারা। সৌদি আরব শত্রুতা অব্যাহত রাখলে ‘নিরাপদ থাকবে না’ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে হুতি বিদ্রোহীরা। এর আগে গত সপ্তাহে হুতিদের হামলায় সৌদির দক্ষিণাঞ্চলে ৭০ জনের বেশি আহত হওয়ার কথা জানিয়েছিল রিয়াদ।

তবে ইয়েমেনে হুতিদের অগ্রযাত্রা পুরোপুরি একতরফা নয়। সোমবার তাইজে এলাকায় হুতিদের আক্রমণ প্রতিহত করে পশ্চিমাঞ্চলে সরকারি বাহিনী কিছুটা অগ্রসর হয়েছে বলে জানিয়েছে আলজাজিরা। এর আগে হুতিরা সরকারি বাহিনীর অবস্থানের দিকে এগোচ্ছিল। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই শহরকে ঘিরে লড়াই আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে হুতিদের সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে লোহিতসাগর উপকূলে। গত কয়েক দিনে মোকা বন্দর ও বাব আল-মান্দেবের কাছে পেরিম বা মায়ুন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তারা। সর্বশেষ দক্ষিণ লোহিত সাগরের আরও কয়েকটি দ্বীপ বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির যোদ্ধারা দখল করে নিয়েছে বলে জানিয়েছে আলজাজিরা। এতে বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে গণমাধ্যমটি।
বাব আল মান্দেব প্রণালিতে হুতি বিদ্রোহীদের এই অগ্রযাত্রায় চাপে পড়েছে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র। বাব আল মান্দেবের গুরুত্ব নিয়ে সামরিক বিশ্লেষক এলাইজা ম্যাগনিয়ের আলজাজিরাকে বলেন, ‘ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি অবরোধে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় বাব আল-মান্দেব দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৮১ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হচ্ছিল। হুতিদের হুমকিতে এই পথে তেল সরবরাহ ব্যাহত হলে পুরো বিশ্বে এর প্রভাব পড়বে।’ তাঁর মতে, হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব— দুটি পথের সংকটকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
এরই মধ্যে সৌদি আরবের তেল পরিবহনের বিকল্প পথও চাপের মুখে পড়েছে। চলতি সপ্তাহে দেশটির ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন হামলার শিকার হয়। হরমুজ প্রণালিতে ইরানি হামলা এড়িয়ে সৌদির তেল লোহিত সাগরে নেওয়ার এই পাইপলাইন এখন কয়েকসপ্তাহ আংশিকভাবে বন্ধ থাকতে পারে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দুই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর একই সময়ে চাপ তৈরি হয়েছে।

হরমুজের পর বাব আল মান্দেব প্রণালিতে সৃষ্টি হওয়া শঙ্কার প্রভাব পড়েছে তেলের বাজারেও। সোমবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১০৭ ডলার ছাড়িয়েছে। হরমুজে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সৌদি পাইপলাইন বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক তেলের সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, হুতিদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করছে ওয়াশিংটন। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। সৌদি আরব হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন সামরিক সহায়তা চাইলেও, ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়ার বদলে গোয়েন্দা ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা দিচ্ছে।
তবে ওয়াশিংটনের এই অবস্থান কত দিন থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা স্কট উহলিঙ্গারের মতে, লোহিত সাগরে হুতিদের অগ্রগতি ও সৌদি জাহাজ চলাচলের ওপর হুমকি বাড়তে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে সামরিক হস্তক্ষেপ করতে হতে পারে। একই সঙ্গে ইয়েমেন-বিষয়ক বিশ্লেষক হিশাম আল-ওমেইসি সতর্ক করেছেন, কোনো পক্ষই পিছু না হটায় যে কোনো সংঘাত আরও রক্তক্ষয়ী হতে পারে।
এর মধ্যেই থমকে গেছে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর কূটনৈতিক উদ্যোগ। সোমবার ওমানে হরমুজ প্রণালি নিয়ে বৈঠকে বসার কথা ছিল দুপক্ষের। তবে শেষ সময়ে এসে বৈঠকটি স্থগিত করেছে ওমান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘ঐকমত্যের স্বার্থে’ বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে। ইরান অবশ্য জানিয়েছে, ইয়েমেনের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণেই পিছিয়েছে বৈঠকটি।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও হুতিদের হামলা নিয়েই তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
একদিকে বাব আল-মান্দেবের কাছে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে হুতি বিদ্রোহীরা। অন্যদিকে থমকে গেছে হরমুজ ঘিরে কূটনৈতিক উদ্যোগ। এতে মধ্যপ্রাচ্যের দুই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথেই বাড়তে থাকা অস্থিরতার সরাসরি চাপ পড়ছে জ্বালানি তেল সরবরাহ ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে।
.png)

-7c29dd-256x144.webp)


-2ba28e.jpeg)

