কোন পথে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি?
লেখা:রায়হান তাহরাত লিয়ন

বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস বলতে সাধারণত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কথাই প্রথমে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্র সংসদ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গত এক দশকের ঘটনাপ্রবাহ এই পরিচিত ছবিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে একটি দৃশ্যমান শক্তি হিসেবে সামনে এসেছে।
২০১৫ সালের ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন, ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ও কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান—এই ধারাবাহিকতায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ শুধু সংখ্যাগত উপস্থিতির বিষয় ছিল না। বরং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আন্দোলনের বিস্তার ও জনসম্পৃক্ততার ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা লক্ষ্যযোগ্য হয়ে উঠেছে।
সেই সঙ্গে এই বাস্তবতা একটি প্রশ্নকে সামনে এনেছে—যে শিক্ষার্থীরা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান জানানোর সক্ষমতা ও সাহস দেখিয়েছেন, তাদের নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা কেন থাকবে না?
যে আন্দোলন বদলে দিয়েছিল ধারণা
২০১৫ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন ছিল একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে শুরুতে ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রস্তাব করা হয়। শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকারের ওপর অন্যায্য এই ভ্যাট প্রত্যাহারের লক্ষ্যে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ শুরু করে। ‘উচ্চশিক্ষার ওপর ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার’-এর দাবিতে শুরুতে বিভিন্ন ক্যাম্পাসভিত্তিক প্রতিবাদ থাকলেও পরে সচিবালয়, জাতীয় সংসদ ভবন ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচিও সে সময় শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে আসে। এক পর্যায়ে তৎকালীন সরকার বাজেট পাশের অধিবেশনে ১০ শতাংশের বদলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি-র ওপর ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করেন।
৯ সেপ্টেম্বর ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হন। এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা সর্বাত্মক আন্দোলনে নামলে দ্রুত আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। পরদিন বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করলে ঢাকার যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ড্যাফোডিল, স্টেট, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল, ইস্ট ওয়েস্ট, নর্থ সাউথ, ব্র্যাক, ইন্ডিপেনডেন্ট, অতীশ দীপঙ্করসহ বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অবস্থান নেন। আন্দোলনের প্রভাব ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, সিলেট ও রাজশাহীতেও পৌঁছায়। শেষ পর্যন্ত ১৪ সেপ্টেম্বর সরকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ওপর আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়।
এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের যে প্রচলিত ধারণা—বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শুধু আত্মকেন্দ্রিক, জাতীয় ইস্যুতে তাদের আগ্রহ কম; তা ভেঙে যায়। যা পরবর্তী বিভিন্ন আন্দোলনে শক্তির সঞ্চার করে।
প্রেক্ষাপটে ২০১৮: বিস্তৃত দাবিতে রাজপথে একাত্মতা
২০১৮ সালে ঢাকায় বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। এর জেরে সড়ক নিরাপত্তা, আইনের প্রয়োগ ও জবাবদিহির প্রশ্ন তুলে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামে। যা সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেই সময় ধানমন্ডিসহ বেশকিছু জায়গায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একাত্মতা প্রকাশ করে মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেন। একই বছর কোটা সংস্কার আন্দোলনেও একাত্মতা জানিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ দেখা যায়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। ২০১৫ সালের আন্দোলন, যে আন্দোলন ছিল মূলত শিক্ষার ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি দাবি। ২০১৮ সালে সেই পরিসর বিস্তৃত হয়ে নাগরিক নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও সরকারি নীতির প্রশ্নে পৌঁছে যায়। অর্থাৎ বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন কেন্দ্রীয় দৃশ্যপটে
২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলন এই ধারাবাহিকতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন প্রথম দিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছিল। জুলাইয়ের মাঝামাঝি পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়। আন্দোলনে হামলা, প্রাণহানি ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হন। এই পর্যায়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে দৃশ্যমান হয়।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে, প্রগতি সরণিসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ইউল্যাব, নর্থ সাউথ, ব্র্যাক, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরাসহ ঢাকায় অবস্থিত অন্যান্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে, গণ বিশ্ববিদ্যালয়, ড্যাফোডিল, সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সাভার-আশুলিয়ায় অবস্থান নেন। ১৮ জুলাইয়ের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বড় উপস্থিতির মধ্য দিয়ে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
এখানে সতর্ক থাকা প্রয়োজন যে, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের সাফল্যকে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়, সংগঠন বা শ্রেণির কৃতিত্ব হিসেবে দেখলে ইতিহাসের জটিলতাকে সরল করা হবে। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ মিলেই আন্দোলনটি বৃহত্তর সামাজিক রূপ নেয়।
তবুও কেন পিছিয়ে থাকা?
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি, ক্রেডিট ফি, পরিবহন, ক্যাম্পাস সুবিধা, লাইব্রেরি, ল্যাব, ইন্টার্নশিপ, ক্যারিয়ার সেবা, ক্লাব কার্যক্রম—ইত্যাদি শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে অনেক সমস্যা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের থেকে আলাদা। একজন শিক্ষার্থীকে দক্ষ নাগরিক হতে অ্যাকাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি মত প্রকাশ, বিতর্ক, নেতৃত্ব, সমঝোতা এবং জবাবদিহির সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। আর এই জায়গাতে রাষ্ট্র ও বৈশ্বিক বিভিন্ন কাঠামোর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার মাধ্যম হলো ছাত্র সংসদ।
বাংলাদেশে বিদ্যমান প্রত্যেকটি ছাত্র সংসদের আলাদা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা কমিটি কিংবা জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের একাধিক অরাজতৈনিক সংগঠন থাকলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ অনুপস্থিত। প্রশাসন সংগঠন করা থেকে কাউকে বিরত রাখতে না পারলেও প্রতিনিধি না থাকার কারণে সংকট সমাধানে কোনো আলোচনা হয় না।
শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত একটি প্রতিনিধিত্বশীল কাঠামো থাকলে চাইলেই তাদের ওপর যেকোনো কিছু চাপিয়ে দেয়া যেতো না। শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে বসে সংকট সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারতেন। ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠা হলে দলীয় ছাত্রসংগঠন ও অরাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে এক কাতারে এনে সংকট সমাধান করা সম্ভব হতো।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি গণতন্ত্রের
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গত এক দশকে নিজেদের সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের ইতিহাসকে শুধু আন্দোলনের তালিকা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর মধ্যে একটি প্রজন্মের রাজনৈতিক ও নাগরিক পরিপক্বতার পরিবর্তনও রয়েছে। তাই এখন তাদের কাছে শুধু একটি প্রশ্ন করা যথেষ্ট নয়—‘তোমরা দেশের জন্য কী করবে?’ আরেকটি প্রশ্নও করতে হবে—‘তোমরা কি কথা বলার, নিজেদের গড়ে তোলার যথেষ্ট সুযোগ পাচ্ছো?’
বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর যদি শুধু সংকটের সময়ে রাজপথে শোনা যায়, কিন্তু স্বাভাবিক সময়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কোনো প্রতিনিধিত্ব না থাকে, তাহলে আমাদের গণতান্ত্রিক শিক্ষাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে তার শিক্ষার্থীদের নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে তাদের মতামত, অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দিতে হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ সেই সুযোগের একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশের সামাজিক বাস্তবতার বাইরে নয়। তারা এই দেশের নাগরিক। তাদের আছে মতামত, প্রশ্ন, ক্ষোভ, প্রত্যাশা এবং নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা। তাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদকে রাজনৈতিক সংঘাতের শঙ্কা হিসেবে নয়, গণতান্ত্রিক নাগরিক তৈরির প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ হিসেবে দেখা জরুরি।
- লেখক: সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, ঢাকা মহানগর।
.png)

-7c29dd-256x144.webp)






