-2ba28e.jpeg)
হাম নিয়ন্ত্রণে রেকর্ডসংখ্যক শিশুকে টিকা দিয়েছে বাংলাদেশ। এরপরও হাম ও হাম উপসর্গে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত হাম ও হাম উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩০ জনে। এর মধ্যে পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হয়ে মারা গেছে ১০০ জন, বাকি ৯৩০ জনকে সন্দেহভাজন হাম মৃত্যু হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
অথচ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া জরুরি টিকাদান কর্মসূচিতে এরই মধ্যে প্রায় ২ কোটি শিশুকে হাম-রুবেলা টিকা দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার পরও কেন সংক্রমণ ও মৃত্যু থামছে না— এখন সেটিই হয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন।
এক বিশ্লেষণে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, বাংলাদেশের উদ্ভূত এই পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে কয়েক বছরের টিকাদান ঘাটতি, জরুরি কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ভুল হিসাব এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা।
কয়েক বছরের ঘাটতি তৈরি করেছে ঝুঁকি
বাংলাদেশে হঠাৎ করে হাম পরিস্থিতির অবনতি হয়নি। গত কয়েক বছর ধরে নিয়মিত টিকাদানের আওতা কমে যাওয়ায় ধীরে ধীরে টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা বাড়ছিল।
২০২৩ সালের কাভারেজ ইভ্যালুয়েশন সার্ভে অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রথম ডোজ হাম-রুবেলা টিকার আওতা ৮৮ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ৮৬ শতাংশে নামে। দ্বিতীয় ডোজের আওতা ৮৯ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়ায় ৮০ দশমিক ৭ শতাংশে।
করোনাভাইরাস মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হয়। টিকা নিয়ে ভুল তথ্য ও অভিভাবকদের অনীহার কারণে অনেক শিশু টিকা কর্মসূচির বাইরে থেকে যায়। ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ে সম্পূরক হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির পর, চলতি বছরের আগে আর এমন কর্মসূচি হয়নি।
হামের সংক্রমণ বন্ধ রাখতে প্রায় ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ প্রয়োজন। কিন্তু কয়েক বছর ধরে সেই মাত্রা অর্জিত না হওয়ায় টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা ধীরে ধীরে বেড়েছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে টিকাদান কর্মসূচিতেও বিঘ্ন ঘটে। আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সরকার পরিবর্তনের পর টিকা সংগ্রহে বিলম্ব হয়। এর ফলে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টিকার সংকট তৈরি হয়েছিল।
লক্ষ্যমাত্রাতেই ছিল বড় গরমিল
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে হাম আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করে। মার্চে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে ৪ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে (ডব্লিউএইচও) দেশে হাম প্রাদুর্ভাবের কথা জানায় বাংলাদেশ। ততদিনে ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল।
৫ এপ্রিল ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি টিকাদান শুরু করে সরকার। পরে ২০ এপ্রিল দেশজুড়ে শুরু হয় হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি। তখন ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
কিন্তু, দুই মাস পর ২৮ জুন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কর্মসূচিতে একই বয়সী প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ শিশুকে লক্ষ্যমাত্রায় রাখা হয়। অর্থাৎ একই বয়সসীমায় দুই সরকারি কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রায় প্রায় ৬০ লাখ শিশুর পার্থক্য পাওয়া যায়।
আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই ব্যবধানই জরুরি টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেনও মনে করেন, হাম-রুবেলা টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ব্যবহৃত জনসংখ্যার হিসাব বাস্তবের তুলনায় অনেক কম ছিল।
ফলে এরই মধ্যে প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকা দেওয়া হলেও, টিকা পাওয়ার কথা ছিল— এমন আরও অনেক শিশু টিকাদানের বাইরে থেকে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আরেকটি উদ্বেগ হলো, জাতীয় পর্যায়ের টিকাদানের হারের সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতার পার্থক্য। কোনো এলাকায় জাতীয় গড়ের কাছাকাছি কভারেজ থাকলেও নির্দিষ্ট কোনো সম্প্রদায় বা এলাকায় বিপুলসংখ্যক টিকা না পাওয়া শিশু থাকতে পারে।
মুশতাক হোসেনের মতে, প্রত্যন্ত, ভাসমান ও সহজে পৌঁছানো যায় না— এমন জনগোষ্ঠীর মধ্যেও অন্তত ৯৫ শতাংশ কভারেজ নিশ্চিত করতে হবে।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। ফলে একটি এলাকায় তুলনামূলক কমসংখ্যক টিকা না পাওয়া শিশুও সংক্রমণ ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট। তাই জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের হার বাড়লেও স্থানীয় পর্যায়ের ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ থাকলে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসকরাও এমন চিত্র দেখছেন। হাসপাতালটির জুনিয়র কনসালট্যান্ট শ্রেয়াশ পাল আল জাজিরাকে বলেন, বর্তমানে ভর্তি হওয়া হাম রোগীদের অধিকাংশই টিকা নেয়নি। কেউ কেউ টিকাদান কর্মসূচির সময় অসুস্থ থাকায় টিকা নিতে পারেনি। তবে হাসপাতালে রোগী ভর্তি কমে আসায় টিকাদান কর্মসূচির প্রভাবও দেখা যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
টিকা পাওয়ার বয়সের আগেই মৃত্যু
হাম পরিস্থিতির ভয়াবহতার আরেকটি কারণ উঠে এসেছে ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের মৃত্যুর তথ্য থেকে। গত ২৩ আগস্ট পর্যন্ত হাসপাতালে সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছিল ৩ হাজার ১৬৭ জন। এর মধ্যে ৫৩৭ জনের হাম পরীক্ষায় সংক্রমণ নিশ্চিত হয়। মৃত্যু হয় নিশ্চিত বা সন্দেহভাজন হাম আক্রান্ত ৫৭ জনের।
মৃত ৫৭ জনের মধ্যে ৪৯ জনের বয়স ছিল ১৫ মাসের কম। ৩১ জনের বয়স ছিল নয় মাসের কম। বাংলাদেশে সাধারণত ৯ মাস বয়সে শিশুদের হাম-রুবেলার প্রথম টিকা দেওয়া হয়। মারা যাওয়া শিশুদের ৪৭ জনই হামের কোনো টিকা নেয়নি। ৫০ জনের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া ছিল মৃত্যুর প্রধান জটিলতা।
চিকিৎসক শ্রেয়াশ পাল বলেন, নিয়মিত টিকা পাওয়ার বয়স হওয়ার আগেই আক্রান্ত হওয়া শিশুদের নিয়ে চিকিৎসকদের উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। হাসপাতালটি নয় মাসের কম বয়সে আক্রান্ত শিশু ও তাদের মায়েদের নিয়ে আলাদাভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করছে।
হাসপাতালের এই তথ্য পুরো দেশের চিত্র নয়। কারণ সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালটি মূলত গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা দেয়। তবে এতে হাম ছড়িয়ে পড়লে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের একটি চিত্র পাওয়া যায়।
পরের দফা টিকাদানে খুঁজতে হবে বাদ পড়াদের
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বর্তমানে আরেকদফা টিকাদানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এই কর্মসূচি শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক হালিমুর রশীদ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরবর্তী কর্মসূচির সাফল্য শুধু কত কোটি শিশুকে টিকা দেওয়া হলো— তার ওপর নির্ভর করবে না। বরং কোন এলাকায় কত শিশু টিকা পায়নি, তাদের বয়স কত এবং তারা কোথায় থাকে— এসব তথ্য ধরে স্থানীয় পর্যায়ে টিকাদান পরিকল্পনা করতে হবে।
কোথাও বড় ধরনের টিকা ঘাটতি পাওয়া গেলে পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদেরও টিকার আওতায় আনার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। কোনো কোনো আক্রান্ত এলাকায় ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু-কিশোরদের টিকা দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে বলেও মত দিয়েছেন একজন মহামারি বিশেষজ্ঞ।
.png)

-7c29dd-256x144.webp)




