আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষণ

ইরানের বিদ্যুৎ-পানি স্থাপনায় হামলা বুমেরাং হতে পারে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

স্ট্রিম গ্রাফিক

সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, ইরানের পানি শোধনাগার (ডিস্যালিনেশন) প্ল্যান্টগুলোতে হামলা চালানো হবে। এর আগে তিনি ইরানের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় বোমাবর্ষণেরও হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যদি সত্যিই এই হামলা চালায়, তবে ইরানের সামরিক সক্ষমতার খুব একটা ক্ষতি হবে না; উল্টো তাদের গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো ও সাধারণ মানুষ চরম বিপদে পড়বে। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কোনো লক্ষ্যই এখন পর্যন্ত পুরোপুরি পূরণ হয়নি। এখন ইরানের জ্বালানি ও পানিসংশ্লিষ্ট অবকাঠামোয় হামলা চালালে সেই ব্যর্থতা আরও বাড়বে বই কমবে না।

বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলা সামরিক সক্ষমতা কমাবে না

বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ধ্বংস হলে পানি সরবরাহ এবং শোধনাগারগুলোও অচল হয়ে যাবে। কিন্তু শাসকগোষ্ঠীর সামরিক বাহিনীর ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়বে খুব সামান্যই। গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত কিছু অস্ত্র কারখানা আলাদাভাবেই ধ্বংস করা যায়। এর জন্য পুরো দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ধ্বংস করার প্রয়োজন নেই। সাধারণ সামরিক বাহিনীর মতো ইরানি সেনাবাহিনীও মূলত মাঝারি পরিশোধিত জ্বালানি ব্যবহার করে, বিশেষ করে ডিজেল এবং জেট ফুয়েল। তবে সাম্প্রতিক হামলায় ইরানের বিমানবাহিনী বড় ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাদের জেট ফুয়েলের ব্যবহার অনেক কমে গেছে। ডিজেল মাসের পর মাস মজুত করে রাখা যায়। তাছাড়া ইরানের মোট ডিজেল ব্যবহারের খুব ছোট একটি অংশ সামরিক বাহিনী ব্যবহার করে।

জ্বালানি ও পানিতে হামলার চরম ঝুঁকি

ইরানের প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষ বেঁচে থাকার জন্য বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। ঘরবাড়ি ঠান্ডা রাখা থেকে শুরু করে হাসপাতালের কার্যক্রম—সবকিছুর জন্যই বিদ্যুৎ প্রয়োজন। ভূগর্ভস্থ পানির পাম্প চালানোর জন্যও বিদ্যুৎ লাগে। এই পানি স্যানিটেশন, খাবার তৈরি এবং পানের জন্য ব্যবহৃত হয়। তাই পানিসংশ্লিষ্ট অবকাঠামোয় হামলা হলে ইরানে তাৎক্ষণিকভাবে রোগবালাই, ক্ষুধা এবং তৃষ্ণার এক ভয়াবহ সংকট দেখা দেবে। শিশু ও নবজাতকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইরাকে ব্ল্যাকআউট বা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এর ফলে টাইফয়েড, কলেরা, গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস এবং ম্যালেরিয়ার মতো মহামারি ছড়িয়ে পড়েছিল। কিছু হিসাব মতে, যুদ্ধের স্বাস্থ্যগত প্রভাবে প্রায় ১ লাখ ইরাকি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছিল। তখন শিশুমৃত্যুর হার তিন গুণেরও বেশি বেড়ে গিয়েছিল।

তবে জীবনধারণের জন্য জরুরি উপাদানের অবকাঠামোতে হামলা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বুমেরাং হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বারবার বলে আসছে, তারা ইরানের সরকার পতন চায়। কিন্তু পানি অবকাঠামো ধ্বংস করলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কিছু ইরানির যেটুকু সহানুভূতি আছে, তা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে। অনেক ইরানি নাগরিক যারা সাহসের সঙ্গে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন, তারাও যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের মিত্রের বদলে বড় হুমকি হিসেবে দেখা শুরু করবেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র হয়তো তাদের উপসাগরীয় মিত্রদের সমর্থনও হারাতে পারে। শুধু ইরান নয়, পুরো অঞ্চলই পানি ও বিদ্যুতের এই নির্ভরতার কাছে দুর্বল। পানি শোধনাগারগুলো চালাতে প্রচুর জ্বালানি লাগে, বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেল। সৌদি আরব প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ ব্যারেল তেল শুধু পানি শোধনের কাজেই ব্যবহার করে। এই প্রক্রিয়ায় প্রচুর জ্বালানি লাগে বলে গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) প্রায় তিন-চতুর্থাংশ শোধনাগার জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ সেখানে পানি এবং বিদ্যুৎ একই সঙ্গে উৎপাদিত হয়। ঠিক যেভাবে ইরানের প্রাকৃতিক গ্যাস বা শোধনাগারগুলোতে হামলা হলে দেশটির পানি সরবরাহ ব্যাহত হবে, তেমনি উপসাগরীয় দেশগুলোর বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় কোনো আঘাত এলে সেখানেও পানি সংকট তৈরি হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি ইরানের অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তবে জবাবে দেশটি উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর অবকাঠামোতে হামলা চালাবে। যুক্তরাষ্ট্র আগে হামলা করেছে বিধায় নৈতিক অবস্থানেও ইরান এক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবে। এছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলের ৫৬টি প্ল্যান্ট সেখানকার ৯০ শতাংশের বেশি বিশুদ্ধ পানির জোগান দেয়। তাই ইরানের পাল্টা হামলা পুরো অঞ্চলে এক চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

তাৎক্ষণিক প্রভাব ও সংকটের শঙ্কা

যদি বড় বা মেগা আকারের একাধিক পানি শোধনাগার হামলার শিকার হয়, তবে ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই এর প্রভাব টের পাওয়া যাবে। জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা একেক রকম। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পানির মজুত ১৬ থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত চলতে পারে। সৌদি আরবের পানির মজুত ততটা উন্নত নয় এবং তা অঞ্চলভেদে ভিন্ন; তাদের মজুত সর্বোচ্চ দুই সপ্তাহ পর্যন্ত টিকতে পারে। কাতার, কুয়েত এবং বাহরাইনের কাছে এক সপ্তাহেরও কম সময়ের জন্য পানি মজুত আছে।

যদি ধরে নেওয়া হয় যে নিজের বিদ্যুৎ ও পানি অবকাঠামোয় হামলার পর ইরান দ্রুত উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর পাল্টা হামলা চালাবে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে কোটি কোটি মানুষ চরম পানিশূন্যতা ও বিদ্যুৎহীনতার কারণে মৃত্যুঝুঁকিতে পড়বে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর। তবে জ্বালানি বা পানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে ইসরায়েল এবং ইরাকও রেহাই পাবে না। ইরান ইতিমধ্যেই ইসরায়েলের পারমাণবিক স্থাপনার কাছাকাছি শহর দিমোনা ও আরাদে হামলা চালিয়েছে। খবরে বলা হয়েছে, এতে শত শত বেসামরিক মানুষ আহত হয়েছেন। ইসরায়েলের পানি শোধনাগারে আঘাত এলে তারা তাদের পানযোগ্য পানির ৮০ শতাংশ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। ইরানে হামলার পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে ইরাকেও। ইরান তাদের প্রতিবেশীকে প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুতের চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ করে। দক্ষিণ ইরাকের বসরা প্রদেশে পানি শোধনাগারের প্রায় ৭২ শতাংশই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। তাই সেখানে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে পানি সংকট অনিবার্য।

ইরানের বিদ্যুৎ, পানি এবং জ্বালানি অবকাঠামোয় আঘাত হানলে সামরিক অভিযানের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জিত হবে না। এতে ইরানি সামরিক বাহিনীর কেবল সামান্যই ক্ষতি হবে। উল্টো এর ফলে ইরানের সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হবে। এ ধরনের হামলা পুরো অঞ্চলকে ভয়াবহ পানি সংকটের দিকে ঠেলে দেবে। একই সঙ্গে বিশ্ব এমন এক ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের মুখে পড়বে, যা গত কয়েক দশকেও কেউ দেখেনি। যুদ্ধ শেষ করার বদলে ইরানের বেসামরিক জ্বালানি ও পানি অবকাঠামো ধ্বংস করা সংঘাতকে আরও প্রলম্বিত এবং ভয়াবহ রূপ দেবে।

সম্পর্কিত