গাদ্দাফি পতনের ১৫ বছর, লিবিয়ার ঐক্য কতদূর

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৬, ১২: ৫৪
গাদ্দাফি পতনের ১৫ বছর পর ঐক্যের পরীক্ষায় লিবিয়া। স্ট্রিম গ্রাফিক
গাদ্দাফি পতনের ১৫ বছর পর ঐক্যের পরীক্ষায় লিবিয়া। স্ট্রিম গ্রাফিক

টানা ৪২ বছর লিবিয়ায় শাসনক্ষমতায় ছিলেন মুয়াম্মার গাদ্দাফি। ২০১১ সালে আরব বসন্তে পতন হয় তাঁর। ১৫ বছর পরে লিবিয়া এখন বলতে গেলে দুই ভাগে বিভক্ত। বলা ভালো, দুই সরকার লিবিয়া শাসন করছে। দেশটির পশ্চিমে ত্রিপোলিভিত্তিক সরকার এবং পূর্বে বেনগাজিভিত্তিক সরকার। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি লিবিয়াকে কার্যত অচল করে রেখেছে। তবে সম্প্রতি কিছুটা আশার আলো জাগছে।

চলতি বছরের এপ্রিলে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো লিবিয়ার রাজনীতির প্রধান দুই প্রতিপক্ষ ১৯০ বিলিয়ন দিনার (প্রায় ৩ লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা) বাজেট ভাগ করে দেশ পরিচালনায় একমত হয়। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত এই বাজেট বিভক্ত লিবিয়াকে এক কাতারে আনতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। যদিও ঐক্যের উদাহরণ খুব একটা নেই।

গাদ্দাফির পতনের পর সৃষ্ট শূন্যতায় গড়ে উঠেছিল একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ, বারবার দেখা দিয়েছে সংঘাত এবং বিলম্বিত হয়েছে নির্বাচন। তবে এখন দেশটির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষগুলো একসঙ্গে কাজ করার পথ খুঁজছে।

২০১১ সাল থেকে বারবার ব্যাহত হয়েছে তেলের উৎপাদন। বিভিন্ন উপদল তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির জন্য দেশের বন্দর ও তেলক্ষেত্রগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়।

২০১৭ সালে লিবিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, পরপর তিন বছর তেলের অবকাঠামো বন্ধ থাকার কারণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১৬০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতি হয়েছে।

২০২০ সালে খলিফা হাফতারের তেলক্ষেত্র ও টার্মিনাল অবরুদ্ধ করার পদক্ষেপে দেশটির আর্থিক ক্ষতি আরও প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার যোগ করে। ২০২২ এবং ২০২৪ সালেও নতুন করে তেলক্ষেত্র বন্ধের ঘটনা ঘটে। তবে এই ধরনের আত্মঘাতী অর্থনৈতিক যুদ্ধ পরিচালনার প্রবণতা সম্প্রতি অনেকটাই কমে এসেছে।

আবুধাবিতে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনীতিক ও সামরিক কমান্ডারদের মধ্যে হওয়া সমঝোতায় ‘আর্কেনু’ নামের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রথম লিবিয়ার অপরিশোধিত তেল রপ্তানির সুযোগ পায়।

যদিও পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের তদন্তকারীরা এই চুক্তির মালিকানা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং চলতি বছর সমঝোতাটি বাতিল করা হয়। তবুও এই ঘটনা স্পষ্ট করেছে—দুই শিবিরই যৌথ স্বার্থ বিবেচনায় তেলের উৎপাদন ও সরবরাহ সচল রাখতে পারে। আর এই অর্থনৈতিক বোঝাপড়া শেষ পর্যন্ত স্থায়ী রাজনৈতিক চুক্তির পথও সুগম করতে পারে।

২০১১ সালের আগস্টে সশস্ত্র অভ্যুত্থানে গাদ্দাফি সরকারের পতন হয়। এরপর থেকে লিবিয়া প্রায় ধারাবাহিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ‘ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিল’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল জাতীয় নির্বাচনের আগ পর্যন্ত দেশ শাসন করবে।

দীর্ঘ ৪৮ বছর পর ২০১২ সালের জুলাইয়ের জাতীয় নির্বাচনে প্রায় ১৭ লাখ ৬০ হাজার মানুষ ভোট দেন। ভোটে বিজয়ীদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়। এর কিছুদিন পরই কাউন্সিল বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। তবে লিবিয়ায় শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরে ২০১২ সালের ওই নির্বাচনই ছিল প্রথম এবং শেষ নির্বাচন।

২০১৪ সালের মে মাসে গাদ্দাফি আমলের সাবেক জেনারেল খলিফা হাফতার বেনগাজির সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে তথাকথিত 'সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’ শুরু করেন। অন্যদিকে হাফতারের অনুগত বাহিনী ত্রিপোলির পার্লামেন্টে হামলা চালায়। টালমাটাল পরিস্থিতিতেই ২০১৪ সালের জুনে নির্বাচন হয়। ভোটার উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে ২০১২ সালের সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীরা এই নির্বাচনের ফলাফল মানতে অস্বীকৃতি জানান।

দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব নিরসনে ২০১৫ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে ‘গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল অ্যাকর্ড (জিএনএ)’ গঠিত হয়। জিএনএ-কে জাতিসংঘ লিবিয়ার একমাত্র কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

কিন্তু এতে সংঘাত থামেনি। ২০১৯ সালে হাফতারের অনুগত বাহিনী জিএনএ-র নিয়ন্ত্রণে থাকা ত্রিপোলিতে সামরিক অভিযান চালায়।

এরপর ২০২১ সালে জাতীয় সংহতি স্থাপনে জাতিসংঘের উদ্যোগে গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল ইউনিটি (জিএনইউ) গঠন করে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবদুল হামিদ দবেইবাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। শর্ত ছিল তিনি প্রধানমন্ত্রী পদে লড়তে পারবেন না। তাঁকে বসানো হয়েছিল ওই বছরের ডিসেম্বর নাগাদ নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের আশায়। কিন্তু ভোটের মাত্র দুই দিন আগে দেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচন বাতিল করে দেন। শর্ত ভঙ্গ করে দবেইবা নিজেই প্রধানমন্ত্রী পদে লড়তে চান এবং নির্বাচন বাতিল হলেও পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে লিবিয়ায় অচলাবস্থা আরও প্রকট হয়।

যদিও দেশটির সব প্রধান রাজনৈতিক দলই প্রকাশ্যে নির্বাচনকে সমর্থন করে। কিন্তু মূল বিরোধ দেখা যায়, কোন কোন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্য হবেন, ভোটগ্রহণের প্রক্রিয়া কেমন হবে এবং পরবর্তী সরকারের ক্ষমতা কতটুকু থাকবে এসব নিয়ে।

তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

গাদ্দাফি পতনের ১৫ বছর, লিবিয়ার ঐক্য কতদূর