সিএনএনের বিশ্লেষণ

ট্রাম্পকে চটানোই নেতানিয়াহুর সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২৬, ১৭: ৫৩
স্ট্রিম গ্রাফিক

জটিল বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সাধারণত সময়ক্ষেপণ বা সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রাখতে পছন্দ করেন। সিদ্ধান্ত নিলেও তাতে থাকে কিছুটা অস্পষ্টতা। সঙ্গে দরকার পড়লে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সুযোগ রেখে দেন। তবে এবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তির রোডম্যাপের ক্ষেত্রে অন্য পথে হাঁটলেন নেতানিয়াহু।

রোববার ইসরায়েলি মন্ত্রিসভার সাপ্তাহিক বৈঠকে নেতানিয়াহু বলেন, ‘ইসরায়েল ১৫ দফার এই দলিল মানবে না।’ পরিস্কার বললন, ‘যত দিন আমি প্রধানমন্ত্রী আছি, তত দিন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হবে না।’

নেতানিয়াহুর এমন স্পষ্ট অবস্থান এবং প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানে ট্রাম্প হয়তো ক্ষুব্ধ হবেন। একদিকে ইরান যুদ্ধ। অন্যদিকে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন। এমন টালমাটাল পরিস্থিতিতে কোনো না কোনো এক ধরনের সফলতা ট্রাম্পের লাগবেই।

১০ দিন আগে ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ হামাসকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করার বিষয়ে চুক্তিতে পৌঁছায়। বোর্ডের শীর্ষ দূত নিকোলে ম্লাদেনভ এক্সে জানান, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হামাসকে অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে। এর মানে হলো, হামাস ধাপে ধাপে অস্ত্র জমা দেবে। একই সঙ্গে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) গাজা থেকে পর্যায়ক্রমে সরে যাবে।

নেতানিয়াহুকে এমন কোনো উদ্যোগে রাজি করানোর আশা থাকলেও এখন তা একেবারেই অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে।

মন্ত্রিসভার বৈঠকে নেতানিয়াহু বলেন, ‘হামাস নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত আইডিএফ সেনা প্রত্যাহার করবে না। আর হামাসকে নিরস্ত্র করা বলতে ভারী অস্ত্র, হালকা অস্ত্র—সব ধরনের অস্ত্রের কথা বোঝাচ্ছি। সত্যিকারের অস্ত্র সমর্পণের কথা বলছি। কাল্পনিক বা লোকদেখানো অস্ত্র সমর্পণ নয়।’

রোববার বিকেল পর্যন্ত নেতানিয়াহুর এমন মন্তব্যের বিষয়ে ট্রাম্প কোনো মন্তব্য করেননি। শুধু তাঁর সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের গাজা পরিকল্পনাকে সমর্থন জানানো উদ্ধৃতি পোস্ট করেছেন।

এই পরিকল্পনা নিয়ে ইসরায়েল এবং হামাস—দুই পক্ষেরই স্বার্থ রয়েছে। চুক্তি ব্যর্থ হলে যেন অপর পক্ষের ঘাড়ে দোষ চাপানো যায়।

নেতানিয়াহুর মন্তব্যের বিষয়ে হামাসের প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ শান্ত আর হিসেবি। হামাস জানিয়েছে, তারা রোডম্যাপের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পাশাপাশি তারা আশা প্রকাশ করেছে, নেতানিয়াহুকে এটি মেনে চলতে ‘বোর্ড অব পিস’ চাপ প্রয়োগ করবে।

আস্থার অভাব, অস্ত্র সমর্পণের বাস্তবতা কিংবা সেনা প্রত্যাহারে সদিচ্ছা—এসব বিষয় যেমনই হোক না কেন, প্রশ্ন হলো: নেতানিয়াহু কেন ট্রাম্পকে চটানোর ঝুঁকি নিতে চাইছেন?

নেতানিয়াহুর সমর্থকেরা তাঁকে ‘মাস্টার স্ট্র্যাটেজিস্ট’ ভাবেন। তিনি তো চাইলে ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনা নিয়ে আরও কৌশলে কাজ কিংবা কথা বলতে পারতেন।

মূল কারণ হয়তো এতটাও জটিল কিছু নয়। চলতি বছরের অক্টোবরে ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচন হতে ১২ সপ্তাহেরও কম সময় বাকি। জনমত জরিপগুলো বলছে যে নেতানিয়াহু বেশ বিপদেই আছেন। তাই ভোটারদের কাছে তাঁর স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বার্তা পৌঁছানোর জন্যই এটি উপযুক্ত সময়।

ইসরায়েলের সব প্রধানমন্ত্রীকেই একাধিক দল নিয়ে জোট সরকার গঠন করতে হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, নেতানিয়াহু নির্বাচনের পরে জোট গঠনের চেয়ে আগেই জোট গুছিয়ে নিতে বেশি পটু।

ক্ষমতায় টিকে থাকতে কট্টর ডানপন্থী মিত্রদের অবশ্যই পাশে চাইবেন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থী দল এবং নেতারা ট্রাম্পের এই রোডম্যাপের প্রকাশ্যে সমালোচনা করে আসছেন। তাঁদের দাবি, এতে আদতে লাভ হবে হামাসেরই।

কিছুদিন আগে গাজায় একটি ছোট পাইলট প্রকল্পে নিরাপত্তা তদারকি করতে ‘আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী’ মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ইসরায়েলি মন্ত্রিসভা। তবে ডানপন্থীরা সেই সিদ্ধান্তও বাতিল করার দাবি জানাচ্ছিল।

রোববার ইসরায়েলের আর্মি রেডিও’র খবরে বলা হয় যে নেতানিয়াহু চুপিসারে ওই পাইলট এলাকায় পুনর্গঠন কাজ শুরু করার অনুমোদন দিয়েছিলেন। ডানপন্থীদের চোখে এটি তাঁর দুর্বলতা হিসেবেই দেখা হচ্ছিল।

মিত্রদের এমন অবস্থানে নেতানিয়াহু পড়েছেন উভয় সংকটে। প্রস্তাবের বিপক্ষে গেলে ট্রাম্প চটতে পারেন। অন্যদিকে প্রস্তাবের পক্ষে গেলে আসন্ন নির্বাচনে উগ্র ডানপন্থী নেতাদের সমর্থন হারাতে পারেন।

এই পুরো বিষয়টিকে কেবল কট্টর ডানপন্থীদের খুশি করার চেষ্টা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। ইসরায়েলি ভোটারদের বড় অংশই এখনো ট্রাম্পের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব রাখে। তবে গাজায় ইসরায়েলের ইচ্ছামতো কাজ করার স্বাধীনতায় লাগাম টানা উচিত বলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাবনাকে তারা চরম ভুল মনে করে।

গাদি আইজেনকোট, নাফতালি বেনেট কিংবা ইসরায়েলের সম্ভাব্য অন্যান্য প্রধানমন্ত্রীরা যদি মনে করেন যে শান্তি পরিকল্পনার পক্ষে কথা বলে অনেক ভোট পাওয়া যাবে, তবে তা হবে আশ্চর্যের বিষয়।

স্পষ্টতই নির্বাচনে মিত্রদের পাশে না পাওয়া এবং ভোটারদের সমর্থন হারানোর ঝুঁকির চাইতে  ট্রাম্পকে চটানোই নেতানিয়াহুর জন্য কম বিপজ্জনক।

সিএনএনের সাংবাদিক অ্যান্ড্রু কেরির বিশ্লেষণ

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত