ইরানের হাতে বিধ্বসী ক্ষেপণাস্ত্র, যুক্তরাষ্ট্রের সন্দেহে উত্তর কোরিয়া

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ২২: ৩৩
এআই জেনারেটেড ছবি

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে ইরানকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। তেহরানকে দমনে নিজেদের বিভিন্ন কৌশল বা নিষেধাজ্ঞা আশানুরূপ ফল না পাওয়ায় এখন অন্য দেশগুলোর ওপর দায় চাপানোর প্রবণতা ওয়াশিংটনের নীতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই যুদ্ধের শুরু থেকেই রাশিয়া ও চীন ইরানকে সহায়তা করছে বলে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে আসলেও সংশ্লিষ্ট দেশগুলো তা বরাবরই অস্বীকার করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে দ্রুত কাবু করতে না পারার ব্যর্থতা ঢাকতে ট্রাম্প প্রশাসন ও মার্কিন বিশেষজ্ঞরা এখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নতুন ‘ন্যারেটিভ’ বা বয়ান দাঁড় করাচ্ছেন। সেই তালিকায় নতুন যুক্ত হয়েছে উত্তর কোরিয়ার নাম।

উত্তর কোরিয়া সংযোগ: মার্কিন বিশেষজ্ঞের দাবি

সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্টের ‘ঘনিষ্ঠ’ সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ ব্রুস বেকটোল দাবি করেছেন, ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বড় অংশই উত্তর কোরিয়া থেকে ইরান সংগ্রহ করেছে। তাঁর মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার মূলত উত্তর কোরিয়ার প্রযুক্তিনির্ভর। তবে তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের প্রতিরক্ষা শিল্প সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ এবং এটি সার্বভৌম সক্ষমতার প্রতীক।

দিয়েগো গার্সিয়া এবং পাল্লা নিয়ে বিতর্ক

অধ্যাপক বেকটোল দাবি করেছেন, গত শুক্রবার ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে মার্কিন-ব্রিটিশ যৌথ ঘাঁটিতে ইরান দুটি ‘মুসুদান’ মডেলের ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ইরান ২০০৫ সালে উত্তর কোরিয়ার কাছ থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কিনেছিল।

ভৌগোলিক দূরত্ব বিবেচনায় দিয়েগো গার্সিয়া ইরান থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। গত মাসে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছিলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ সীমা ২ হাজার কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। মার্কিন বিশেষজ্ঞরা এখন এই দূরত্বকে পুঁজি করে বিশ্ববাসীর সামনে ইরানকে ‘তথ্য গোপনকারী’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন। তবে স্বাধীন সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের ময়দানে একেক পক্ষ অন্য পক্ষকে চাপে রাখতে এবং আন্তর্জাতিক জনমত নিজেদের পক্ষে নিতে প্রায়ই এ ধরনের পাল্টাপাল্টি তথ্যের লড়াই বা ‘ইনফরমেশন ওয়ার’ চালিয়ে থাকে।

প্রযুক্তির বিনিময় নাকি দেশীয় উদ্ভাবন?

ফক্স নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ‘কিয়াম’ ও ‘শাহাব-৩’ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো উত্তর কোরিয়ার ‘নো ডং’ সিস্টেমের অনুকরণে তৈরি। দাবি করা হচ্ছে, নব্বইয়ের দশকে উত্তর কোরিয়া ইরানকে প্রযুক্তি সরবরাহ করেছিল এবং বর্তমানে ইরানের বিশেষ কারখানায় ‘ইমাদ’ ও ‘গদর’ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি হচ্ছে।

যদিও পশ্চিমা বিশ্ব একে ‘নকল’ বা ‘প্রযুক্তি চুরি’ হিসেবে দেখছে, ইরান একে দেখছে তাদের ওপর আরোপিত কয়েক দশকের পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে সফল প্রতিরোধ হিসেবে। তেহরানের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, তাদের সামরিক সক্ষমতা কেবলই আত্মরক্ষামূলক এবং বহিঃশক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়।

তেল সমরাস্ত্রের ভূ-রাজনীতি

মার্কিন বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর কোরিয়া প্রযুক্তির বিনিময়ে ইরানের কাছ থেকে তেল ও নগদ অর্থ পাচ্ছে। এই অভিযোগের মাধ্যমে মূলত ইরান ও উত্তর কোরিয়া—উভয় দেশের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশলগত ক্ষেত্র তৈরি করছে ওয়াশিংটন।

এদিকে ইসরায়েলের ‘আলমা রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন সেন্টার’-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের হাতে ১,০০০ থেকে ৩,০০০ কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল মজুত রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে দাবি করা হচ্ছে, ইরান এখন দূরপাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

তবে অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি সামরিক অভিযানের বৈধতা খুঁজতেই ইরানকে এক বিশাল ‘হুমকি’ হিসেবে চিত্রায়িত করার এই প্রচেষ্টা মার্কিন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের পুরনো কৌশল হতে পারে। যেখানে এক দেশের সামরিক সক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেখিয়ে অন্য দেশের হামলার পথ প্রশস্ত করা হয়।

সম্পর্কিত