ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন

যুদ্ধে হিলিয়ামে টান, সংকটে এআই চিপ ও চিকিৎসা খাত

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

কাতারএনার্জির এলএনজি প্ল্যান্ট, রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি। ছবি: রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে কেবল জ্বালানি তেলের বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই; এবার তা আঘাত হেনেছে ‘হিলিয়াম’ গ্যাসের বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) চিপ তৈরি ও এমআরআই স্ক্যানার সচল রাখার অপরিহার্য এই গ্যাসের সংকট প্রযুক্তি ও চিকিৎসা খাতে সমস্যা সৃষ্টি করছে।

বিশ্বের মোট হিলিয়াম চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ করে কাতার। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাতার থেকে প্রাকৃতিক গ্যাসের উপজাত হিসেবে উৎপাদিত এই হিলিয়াম রপ্তানি পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে।

হিলিয়াম গ্যাস কার্যকরভাবে তাপ শোষণ করতে পারে, যা সেমিকন্ডাক্টর বা কম্পিউটার চিপ তৈরির সময় সিলিকন ওয়েফারকে ঠান্ডা রাখতে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া এমআরআই মেশিনের সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেট ঠান্ডা রাখা, ফাইবার অপটিকস উৎপাদন এবং নাসার রকেট ফুয়েল ট্যাংকের সুরক্ষায় হিলিয়াম আবশ্যক।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট ‘ব্ল্যাক সোয়ান’ ইভেন্ট বা অভাবনীয় দুর্যোগের মতো। সরবরাহ কমে যাওয়ায় ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে হিলিয়ামের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে। দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাইওয়ানের মতো চিপ উৎপাদনকারী দেশগুলো এখন বিকল্প হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারস্থ হচ্ছে।

চলতি মাসের শুরুতে ইরানের হামলায় কাতারের ‘রাস লাফান’ এলএনজি প্ল্যান্ট ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কাতার সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই হামলার ফলে তাদের বার্ষিক হিলিয়াম রপ্তানি সক্ষমতা ১৪ শতাংশ কমে গেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত প্ল্যান্ট পুনরায় পূর্ণ ক্ষমতায় ফেরাতে অন্তত পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘এয়ারগ্যাস’ ইতিমধ্যে তাদের গ্রাহকদের জন্য সরবরাহ রেশনিং করার ঘোষণা দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে চুক্তিবদ্ধ মূল্যের চেয়ে প্রতি ১০০ ঘনফুটে ১৩.৫০ ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত সারচার্জ আরোপ করা হচ্ছে। ব্রাজিল থেকে ভারত—সব দেশের আমদানিকারকরাই এখন সরবরাহকারীদের কাছ থেকে ‘ফোর্স মেজেওর’ বা অনিবার্য পরিস্থিতিজনিত চুক্তিভঙ্গের নোটিশ পাচ্ছে।

হিলিয়াম পরিবহনের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হলো এর ‘শেলফ লাইফ’ বা স্থায়িত্ব। তরল হিলিয়াম প্রতিনিয়ত তাপ শোষণ করে গ্যাসে রূপান্তরিত হতে থাকে এবং এর কনটেইনারে চাপ বাড়তে থাকে। একটি নির্দিষ্ট সময়ের (সাধারণত ৩৫ থেকে ৪৮ দিন) মধ্যে ব্যবহার বা স্থানান্তর না করলে গ্যাস উড়ে যায়—যাকে পরিভাষায় ‘বয়েল-অফ’ বলা হয়। বর্তমানে প্রায় কয়েকশ হিলিয়াম কনটেইনার মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বন্দরে আটকে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ আনিশ কাপাডিয়া বলেন, ‘এই সংকটের প্রথম শিকার হবে উৎসবের বেলুন; সেখানে সরবরাহ কমিয়ে হয়তো শিশুদের মন খারাপ করা ঠেকানো যাবে। কিন্তু যখন বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ রাতারাতি বাজার থেকে হাওয়া হয়ে যায়, তখন এর বিধ্বংসী প্রভাব চিপ মেকার এবং চিকিৎসা খাতের ওপর পড়তে বাধ্য।’

সম্পর্কিত