রাজশাহীতে সারের জন্য হাহাকার, মিলছে না বেশি দামেও

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
রাজশাহী

সার কিনেছেন এক কৃষক। ছবি: স্ট্রিম
সার কিনেছেন এক কৃষক। ছবি: স্ট্রিম

রাজশাহীতে সার পেতে ভোগান্তিতে পড়েছেন কৃষকেরা। এক ডিলার থেকে অন্য ডিলারের দোকান ঘুরেও মিলছে না চাহিদামতো সার। পাওয়া গেলেও সরকারি দামের চেয়ে বস্তায় বেশি নেওয়া হচ্ছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত।

কৃষকদের অভিযোগ, অনেক দিন ঘরেই রাজশাহীতে সারের জোগানে ঘাটতি রয়েছে। এর মধ্যে দাম বাড়াতে কিছু অসাধু ডিলার সার মজুত করেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মজুত সার জব্দও হয়েছে। সবমিলিয়ে সংকট বেড়েছে।

পরিস্থিতি দেখতে মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকালে গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের বিসিআইসি ডিলার নজরুল ইসলামের দোকানে দেখা যায়, কৃষকের দীর্ঘ সারি। তাদের কেউ কেউ দুই ঘণ্টার বেশি অপেক্ষায় ছিলেন।

গোদাগাড়ীর কাজীহাটা গ্রামের কৃষক বাবলু জানান, নিজের এলাকার ডিলারের কাছে সার না পেয়ে দেওপাড়ায় এসেছিলেন ইউরিয়া নিতে। মাত্র ২০ কেজি দেওয়ার কথা শুনে ফিরে যাচ্ছেন।

গোদাগাড়ীর কদমশহর গ্রামের কৃষক আকবর আলী ২ বস্তা ইউরিয়া পেলেও প্রয়োজনীয় ডিএপি সার পাননি। তিনি বলেন, নিজের টাকা দিয়ে সার কিনবেন, অথচ সারই পাচ্ছি না। এ অবস্থা চললে মাঠে আবাদ হবে না।

জানতে চাইলে ডিলার নজরুল ইসলাম বলেন, কৃষকেরা অনেক সময় বেশি পরিমাণ সার চান। যাচাই করে যতটুকু প্রয়োজন, সেই অনুযায়ী দেওয়া হচ্ছে। তার কাছে থাকা ২০ টন ডিএপি শেষ হয়ে গেছে বলেও জানান।

দেওপাড়া থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে পালপুর গ্রামের বিএডিসি ডিলার আব্দুর রহিম দাবি করেন, তার দোকানে ১৮ টন ডিএপি, ১০ টন টিএসপি ও ১০ টন এমওপি সার শেষ হয়ে গেছে।

তবে ওই সময় গুদামের ভেতর প্রায় ১০০ বস্তা এমওপি সার দেখতে পাওয়া যায়। পরে আব্দুর রহিম দাবি করেন, অন্য এক বিএডিসি ডিলারের কাছ থেকে তিনি এসব সার কিনে রেখেছেন।

গুদামে সার পাওয়ার পর ওই এলাকার কৃষকরা অভিযোগ করেন, এভাবেই সার মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। পরে বিষয়টি কৃষি বিভাগকে জানালে অভিযান চালিয়ে ওই ডিলারকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলায়ও দেখা গেছে একই চিত্র। এই উপজেলায় টিএসপির সংকট সবচেয়ে বেশি।

ভায়ালক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের ডিলার আকাশ এন্টারপ্রাইজে গিয়ে দেখা যায়, টিএসপির জন্য কৃষকদের ভিড়। বাঁকড়া গ্রামের কৃষক শফিকুল ইসলাম এক বস্তা টিএসপি চাইলেও শেষ পর্যন্ত পান অর্ধেক। ফরিদপুর গ্রামের সাইফুল ইসলাম দুই বস্তা টিএসপি চাইলে দেওয়া হয় মাত্র ১৫ কেজি।

ডিলারের এক কর্মচারী জানান, চাহিদা অনুযায়ী একজনকে দিলে অন্য কৃষক খালি হাতে ফিরে যাবেন। তাই অল্প অল্প করে দেওয়া হচ্ছে।

চারঘাটের কৃষকদের অভিযোগ, কোনো কোনো ডিলারের সার রাতারাতি শেষ হয়ে যাচ্ছে। কোথায় সেই সার বিক্রি হচ্ছে, তারও কোনো হিসাব নেই।

এদিকে সংকটের সুযোগে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে অধিকাংশ সার। গোদাগাড়ীর রাজাবাড়ীহাটের শহিদুল ট্রেডার্স থেকে গত সোমবার ৫০ কেজির এক বস্তা ডিএপি কেনেন মুলকিডাইং গ্রামের কৃষক মমিন। তিনি জানান, সরকারি মূল্য ১ হাজার ৫০ টাকা হলেও তাকে দিতে হয়েছে ১ হাজার ৭৫০ টাকা। একইভাবে ইউরিয়া ১ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়েছে, যার সরকারি মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির মালিক সাইদুর রহমান বেশি দরে সার বিক্রির কথা স্বীকার করেন। পাশের সাদ এন্টারপ্রাইজের কর্মচারী কবির হোসেনও বেশি দামে ডিএপি বিক্রির কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, তাঁদের ডিএপির মান কিছুটা খারাপ হওয়ায় প্রতি বস্তা ১ হাজার ৬০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, চাহিদার তুলনায় সরকারি বরাদ্দ কম হওয়ায় সংকট দেখিয়ে দাম বাড়ানো হচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, চলতি আগস্টে জেলায় ইউরিয়ার বরাদ্দ রয়েছে ৭ হাজার ৫৭৪ টন। এর মধ্যে পাওয়া গেছে ৪ হাজার ৭২৪ টন। ডিএপির ২ হাজার ৬৪৭ টনের বিপরীতে পাওয়া গেছে ২ হাজার ১৮২ টন। ১ হাজার ৫১১ টনের বিপরীতে টিএসপি মিলেছে ১ হাজার ২৪০ টন। আর এমওপির ১ হাজার ৭৬০ টনের বিপরীতে পাওয়া গেছে ১ হাজার ৪৯৬ টন।

কৃষি বিভাগের হিসাবে, জেলার মোট আবাদি জমি ১ লাখ ৮৫ হাজার ২৬২ হেক্টর। চলতি মৌসুমে আমন আবাদ হয়েছে ৮৩ হাজার ৬০০ হেক্টর। আমনে বিঘাপ্রতি আদর্শ ডিএপি ব্যবহারের পরিমাণ প্রায় ১০ কেজি হলেও বরাদ্দ হয়েছে অনেক কম।

এর সঙ্গে জেলায় প্রায় ১৭ হাজার ৭৭৪ হেক্টর পুকুর রয়েছে। এসব জলাশয়ে মাছ চাষে ব্যবহৃত সারের জন্য আলাদা বরাদ্দ নেই। ফলে মাঠ ফসলের জন্য বরাদ্দ আরও চাপের মুখে পড়ছে।

কৃষি বিভাগ বলছে, টিএসপির পরিবর্তে ডিএপি ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। এতে টিএসপি শতভাগ এবং ইউরিয়া প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে। তবে যে ডিএপি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, অনেক এলাকাতেই সেই সার পাওয়া যাচ্ছে না।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কিছুটা কম পাওয়া যায়। তা ছাড়া পুকুরে ব্যবহৃত সারের আলাদা বরাদ্দ নেই।

তবে বেশি দামে সার বিক্রি বা অবৈধ মজুদের অভিযোগ পাওয়া গেলে অভিযান চালানো হচ্ছে বলে জানান তিনি।

রাজশাহী জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, রাজশাহীতে পর্যাপ্ত সার রয়েছে। চাহিদার তুলনায় কম বরাদ্দের বিষয়টি জানা নেই। কোথাও বেশি দামে সার বিক্রি বা পাচারের অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মাঠে কোথায় সার পাওয়া যাচ্ছে না, তা জানালে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

রাজশাহীতে সারের জন্য হাহাকার, মিলছে না বেশি দামেও