বরিশালে গরুর চামড়ার দামে ধস, নেই ছাগলের

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
বরিশাল

প্রকাশ : ২৯ মে ২০২৬, ২০: ৪৭
বরিশালের বালুরঘাট এলাকায় চামড়া প্রক্রিয়াজাত করছেন কয়েকজন শ্রমিক। স্ট্রিম ছবি

বরিশালে কোরবানির পশুর চামড়ার দামে বড় ধস নেমেছে। প্রতিটি গরুর চামড়া গত বছরের তুলনায় অন্তত ২০০ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতা না থাকায় ছাগলের চামড়া প্রায় মূল্যহীন হয়ে পড়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা ফ্রি বা বিনামূল্যে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

বরিশাল নগরের একটি মাদ্রাসার শিক্ষক মিজানুর রহমান খসরু ঈদের দিন বিকেলে ৩৯টি বড় গরুর চামড়া নিয়ে এসেছিলেন ফলপট্টির অস্থায়ী বাজারে। কিন্তু তাঁকে দুপুরের চেয়েও কম দাম বলা হয়। তিনি বলেন, 'দুপুরের দিকে ছোট-বড় মিলিয়ে গড়ে ৪০০ টাকায় বিক্রি করেছি। পরে আরও চামড়া নিয়ে এলাম, এখন আরও কম দাম বলছে। এত কম দামে বিক্রি করে মাদ্রাসার কোনো উপকার হবে না।' পরে ৩০০ টাকা দরে চামড়া বিক্রি করেন তিনি।

চামড়া ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, বরিশালে এবার ৫০ হাজার পিস গরুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। দুই দিনে সংগ্রহ হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার পিস। বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে সংশয় রয়েছে। কোরবানির গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম গত বছরের চেয়ে এবার ২ টাকা বাড়িয়ে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা করেছে সরকার। এই হিসাব ট্যানারি পর্যায়ে হলেও মাঠপর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে পিস হিসেবে। বরিশালে গত বছরের চেয়ে প্রতিটি চামড়া ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কম দামে বিক্রি হচ্ছে।

বরিশালে নদীর ঘাটে চামড়া পরিষ্কার করছেন কয়েকজন শ্রমিক। স্ট্রিম ছবি
বরিশালে নদীর ঘাটে চামড়া পরিষ্কার করছেন কয়েকজন শ্রমিক। স্ট্রিম ছবি

নগরের বাজারে বড় গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায়, মাঝারি চামড়া ৩০০ টাকায় এবং ছোট চামড়া ২০০ টাকার মধ্যে। গত বছর একই ধরনের চামড়া ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছিল বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। এছাড়া ছাগলের চামড়া কেনায় ব্যবসায়ী না পাওয়ায় তা গরুর চামড়ার সঙ্গে ফ্রি দেওয়া হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা কেবল বড় চামড়াগুলো নিচ্ছেন, ছোটগুলো ফেলে দেওয়া বা মাটিচাপা দেওয়া হচ্ছে। রহমানিয়া মাহমুদিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক মিরাজুল ইসলাম সবুজ বলেন, গত বছরের তুলনায় প্রতিটি গরুর চামড়ায় অন্তত ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কম পেয়েছেন। ছাগলের চামড়ার তো কোনো দামই নেই।

বিপাকে মাদ্রাসাগুলো

কোরবানির পশুর চামড়া অনেক বছর ধরে কওমি ও এতিমখানাভিত্তিক মাদ্রাসাগুলোর অন্যতম অর্থনৈতিক উৎস। কয়েক বছর ধরে দাম পড়ে যাওয়ায় সেই ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) এর তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগে ১ হাজার ১৬০টির মতো কওমি মাদ্রাসা রয়েছে। এছাড়া আলিয়া মাদ্রাসার সংখ্যা প্রায় দুই শ। কওমি মাদ্রাসা ঐক্য পরিষদ বরিশাল জেলা শাখার সভাপতি তৌফিকুল ইসলাম বলেন, জেলায় মাদ্রাসার সংখ্যা ২২১টি। চামড়ার দাম কমে যাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব পড়বে। আমানতগঞ্জ এলাকার একটি মাদ্রাসার পরিচালক শহীদুর রহমান পিন্টু বলেন, 'একসময় কোরবানির চামড়া বিক্রির টাকায় মাদ্রাসার বার্ষিক খরচের বড় একটি অংশ উঠে আসত। এখন মাস পার করাই কঠিন।'

ট্যানারিতে বকেয়ার প্রভাব বাজারে

বরিশাল নগরের কীর্তনখোলা নদীতীরের ফলপট্টি ও পোর্ট রোড এলাকায় প্রতি বছর কোরবানির পশুর চামড়ার হাট বসে। চামড়া সংগ্রহের পর সেগুলো বালুরঘাট এলাকায় নিয়ে নদীতে রক্ত ধুয়ে ট্রলারে রসুলপুরে পাঠানো হচ্ছে। সেখানে শ্রমিকেরা লবণ দিয়ে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করছেন। চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে আগের পাওনা টাকা না পাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী চামড়া কিনতে পারছেন না। সেই সঙ্গে মোকামে কম দামে চামড়া বিক্রি ও ছাগলের চামড়ার প্রায় মূল্যহীন হয়ে পড়ার প্রভাব পড়েছে ব্যবসায়।

বরিশালে সংরক্ষণের জন্য চামড়া পরিষ্কার করছেন এক শ্রমিক। স্ট্রিম ছবি
বরিশালে সংরক্ষণের জন্য চামড়া পরিষ্কার করছেন এক শ্রমিক। স্ট্রিম ছবি

ইতিমধ্যে নগরের ১৮ জন ব্যবসায়ীর মধ্যে ১৬ জনই ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। বর্তমানে টিকে আছেন মাত্র দুজন ব্যবসায়ী। ওই দুই পাইকারি ব্যবসায়ী বলেন, সংগৃহীত কাঁচা চামড়া লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করে ২০ থেকে ২৫ দিন পর ঢাকায় পাঠানো হবে। একটি চামড়া সংরক্ষণে এখন অন্তত ৩০০ টাকা খরচ হয়। লবণ ও পরিবহন খরচও বেড়েছে। পোর্ট রোড এলাকার ব্যবসায়ী মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, গত বছরের টাকার ২০ থেকে ২৫ শতাংশ এখনো পাইনি। ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই সাতটি চামড়া এলে একটি রাখি, বাকি ছয়টি ছেড়ে দিই।

সুযোগ নিচ্ছেন বড় ব্যবসায়ীরা

খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি বাজারে কার্যত কয়েকজন বড় ক্রেতাই দাম নিয়ন্ত্রণ করেন। বিকল্প কম থাকায় বাধ্য হয়ে কম দামে চামড়া ছাড়তে হচ্ছে। ব্যবসায়ী পলাশ আহসান জানান, চামড়া ফেলে রাখার জিনিস নয়। কয়েক ঘণ্টা দেরি হলেই গরমে নষ্ট হতে শুরু করে। এই ভয় দেখিয়ে কম দামে কিনে নেওয়া হচ্ছে। সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজের অধ্যক্ষ ড. আখতারুজ্জামান খান বলেন, খুচরা বিক্রেতা ও মাদ্রাসাগুলোর চামড়া সংরক্ষণের সক্ষমতা নেই। এই সুযোগটি নিচ্ছে একটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ীচক্র।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বরিশালে গত বছর ১ লাখ ২৬ হাজার গরু কোরবানি হয়েছিল। চলতি বছর ১ লাখ ২৯ হাজার গরুর সরবরাহ ছিল। কতটি কোরবানি হয়েছে, তা কয়েক দিনের মধ্যে জানা যাবে। চামড়ার দাম নির্ধারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করে। তারাই মূল্য নির্ধারণ করে।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত