হবিগঞ্জে ডিলারের কাছে সার নেই, টাকা ঢাললেই মিলছে

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
হবিগঞ্জ

প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৬, ০৯: ২৯
ডিলারের কাছ থেকে সার কিনে ফিরছেন এক কৃষক। স্ট্রিম ছবি
ডিলারের কাছ থেকে সার কিনে ফিরছেন এক কৃষক। স্ট্রিম ছবি

হবিগঞ্জে আমন মৌসুমে সারের চাহিদা ১৯ হাজার ৯৪০ টন। সরকার এরইমধ্যে সরবরাহ করেছে ১৮ হাজার ৩৬১ টন। অথচ ডিলারদের কাছ থেকে সার পাচ্ছেন না কৃষকেরা। তাদের অভিযোগ, নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তায় ১০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দিলে ঠিকই সার দেওয়া হচ্ছে।

হবিগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার অন্তত ৩০ কৃষকের সঙ্গে আলাপে এই চিত্র পেয়েছে স্ট্রিম। কৃষকেরা জানান, সরকার নির্ধারিত প্রতি বস্তা ইউরিয়া ১ হাজার ৩৫০, ডিএপি ১ হাজার ৫০, এমওপি ১ হাজার ও টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা। তবে ডিলারেরা প্রকাশ্যে ইউরিয়া ১ হাজার ৫০০, ডিএপি ও টিএসপি ১ হাজার ৪৫০ এবং এমওপিতে ১ হাজার ১০০ টাকা নিচ্ছেন।

তাদের অভিযোগ, সারের সরবরাহ ঠিক থাকলেও, ডিলাররা পকেট ভারীর জন্য কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। এজন্য তারা কৌশল করছেন। ডিলারদের নির্দিষ্ট এলাকায় সার সরবরাহ করছেন না। ফলে কৃষকেরা অন্য এলাকার ডিলারের কাছ থেকে সার নিতে বাধ্য হচ্ছেন। যে ডিলারের কাছে যাচ্ছেন, তিনি সংকট বললে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকছে না। সব ডিলার একই অপকৌশলে মুনাফা লুটছেন।

হবিগঞ্জের ৯ উপজেলায় বিসিআইসি ও বিএডিসির ইউনিয়নভিত্তিক সারের ডিলার ১৫৭ জন; খুচরা বিক্রেতা ৭৬৫। চলতি বছর ৯২ হাজার ৫ হেক্টরে আমন আবাদের জন্য সারের চাহিদা ১৯ হাজার ৯৪০ টন। এর মধ্যে ১৮ হাজার ৩৬১ টন বিভিন্ন গুদামে রয়েছে।

বানিয়াচংয়ের খাগাউড়া ইউনিয়নের কৃষক আওলাদ আলীর আক্ষেপ, ‘কয়দিন অইছে বোরো খেত বন্যায় নিছে। অহন আমন আবাদের সার পাই না। একটা না একটা কুফা লাইগ্যা থাকে।’ এই কৃষক জানান, ২৫ বিঘা জমিতে তিনি আমনের চারা রোপণ করেছেন। ৮ বস্তা ইউরিয়া সার প্রয়োজন। গত দুদিন ধরে একাধিক ডিলারের কাছে ঘুরেও তিনি সার পাননি। শেষে এক ডিলারের কাছ থেকে বস্তায় ৩০০ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনেছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, হবিগঞ্জের ৯ উপজেলায় বিসিআইসি ও বিএডিসির ইউনিয়নভিত্তিক সারের ডিলার ১৫৭ জন; খুচরা বিক্রেতা ৭৬৫। চলতি বছর ৯২ হাজার ৫ হেক্টরে আমন আবাদের জন্য সারের চাহিদা ১৯ হাজার ৯৪০ টন। এর মধ্যে ১৮ হাজার ৩৬১ টন বিভিন্ন গুদামে রয়েছে। বাকি এক হাজার টনকে সংকট বলার সুযোগ নেই।

অধিদপ্তরের হিসাবে, ৮ হাজার ২০০ টন ইউরিয়া সারের চাহিদার মধ্যে ৭ হাজার ৬৪২, ১ হাজার ৮৫০ টিএসপির বিপরীতে ২ হাজার ৬২৯, ৫ হাজার ৫০০ ডিএপির বিপরীতে ৫ হাজার ৪১ এবং এমওপি ৩ হাজার ৩০০ টন মজুত রয়েছে। ডিলারদের নিয়মিত সেখান থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে।

স্থানীয় সাদতপুর বাজারে সার বিক্রি করার কথা বিসিআইসির ডিলার তানজীল ট্রেডার্সের। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তানজীলের দোকান নির্দিষ্ট এলাকা থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে হবিগঞ্জ সদরের আলমপুরে। বাড়তি পরিবহন খরচ ও যাতায়াতের ভোগান্তির কারণে তাঁর এলাকার কৃষকেরা সেখান থেকে সার কিনতে পারছেন না। তারা অন্য ডিলারের কাছ থেকে বাড়তি দামে কিনছেন।

ডিলারেরা জানান, সরকার প্রতি বস্তা সারে ১০০ টাকা লাভ দেয়। গুদাম থেকে সার নিতে শ্রমিক খরচের বাইরে বস্তাপ্রতি ১৫ টাকা দিতে হয়। দোকান পর্যন্ত সার পরিবহনে লাগে ৪০ টাকা। সঙ্গে দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতনসহ অন্যান্য খরচে ১০০ টাকা লাভের পুরোটা চলে যায়।

ডিলারদের দাবি, সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করে যে লাভ থাকে, তা দিয়ে দোকান ভাড়া ও কর্মচারীর খরচ পর্যন্ত ওঠে না। এজন্য তাঁরা বেশি দামে বিক্রি করছেন।

নাম প্রকাশ না করে এক ডিলার জানান, সরকার প্রতি বস্তা সারে তাদের ১০০ টাকা লাভ দেয়। তবে গুদাম থেকে ভালো মানের সার নিতে শ্রমিক খরচের বাইরে বস্তাপ্রতি আরও ১৫ টাকা দিতে হয়। দোকান পর্যন্ত সার পরিবহনে খরচ হয় প্রায় ৪০ টাকা। এর সঙ্গে দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতনসহ অন্যান্য খরচ রয়েছে। ফলে সরকার নির্ধারিত ১০০ টাকা লাভের পুরোটা এসব খাতেই চলে যায়। এই কারণে বাড়তি দামে বিক্রি করেন বলে জানান তিনি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক দ্বীপ কুমার পাল বলেন, জেলায় সারের কোনো সংকট নেই। নির্ধারিত এলাকায় ডিলারেরা ঠিকমতো সার বিক্রি করছেন কিনা, তা নিশ্চিত করতে তদারকি বাড়ানো হবে। বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেলে, তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

হবিগঞ্জে ডিলারের কাছে সার নেই, টাকা ঢাললেই মিলছে