জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

রেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা, দায় সারতে নিচের সারির কর্মীদের শাস্তি

প্রকাশ : ২৪ মার্চ ২০২৬, ১৭: ২৯
স্ট্রিম গ্রাফিক

দেশে প্রাণঘাতী রেল দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি ও দায় চাপানোর চক্র চললেও পরিবর্তন আসছে না ব্যবস্থাপনায়। সম্প্রতি কুমিল্লার ট্রেনের ধাক্কায় বাসের ১২ যাত্রী নিহত হওয়ায় আবার বিষয়টি আলোচনায়। এসব দুর্ঘটনায় নিম্নপদের কর্মীদের শাস্তি ছাড়া আর দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা দেখা যায় না।

রেলপথের পূর্বাঞ্চলে (ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট-ময়মনসিংহ বিভাগ) গেল আট বছরে বড় ধরনের আটটি দুর্ঘটনায় ৬৮ জনের প্রাণহানি হয়েছে। আহত হন অন্তত ২১৮ জন। প্রতিবারই রেলওয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে। এসব তদন্তে বেশিরভাগ সময় দুর্ঘটনার জন্য লোকোমাস্টার (ট্রেনচালক), সহকারী লোকোমাস্টার, গার্ড ও গেটম্যানদের দায়িত্বে অবহেলাকে দায়ী করা হয়।

২০২৩ সালের ২৩ অক্টোবর ভৈরব রেলস্টেশনের আউটার পয়েন্টে ঢাকাগামী আন্তনগর এগারসিন্দুর এক্সপ্রেসের সঙ্গে একটি মালবাহী ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত হন ১৯ জন। আহত হন অন্তত ৫০ জন। ওই ঘটনায় চালক, সহকারী চালক ও গার্ড সংকেত ভালোভাবে লক্ষ না করায় দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

২০২৩ সালের ১৬ এপ্রিল কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে সোনার বাংলা এক্সপ্রেস পেছন থেকে পণ্যবাহী একটি ট্রেনকে ধাক্কা দেয়। কেউ মারা না গেলেও আহত হন অন্তত ৫০ জন। তদন্তে চালকের সংকেত অমান্য করার বিষয় উঠে আসে।

২০২২ সালের ২৯ জুলাই দুপুরে চট্টগ্রামের মিরসরাই বড়তাকিয়া রেলস্টেশনের কাছে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী মহানগর প্রভাতী ট্রেন পর্যটকবাহী একটি মাইক্রোবাসকে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান ১৩ জন। এ ঘটনায় মাইক্রোবাসের চালক ও গেটম্যানকে দায়ী করে দুটি তদন্ত কমিটি।

২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় মন্দবাগ স্টেশনে সংঘর্ষ হয় চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেস ও ঢাকাগামী তূর্ণা নিশিথার। এতে ১৬ যাত্রী প্রাণ হারান। তদন্ত প্রতিবেদনে তূর্ণা নিশিথার চালক ও গার্ডকে দায়ী করা হয়।

২০১৮ সালের ২ সেপ্টেম্বর ভোরে বারইয়ারহাট রেলক্রসিংয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেন একটি যাত্রীবাহী বাসকে ধাক্কা দিয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে নিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় দুই বাসযাত্রীর। আহত হন আরও ২০ যাত্রী। ট্রেন আসার সময় কোনো প্রতিবন্ধকদণ্ড ফেলা হয়নি—গেটম্যানের অবহেলায় এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানা যায় তদন্তে।

রেলবিশেষজ্ঞ নেই তদন্ত কমিটিতে

কুমিল্লার দুর্ঘটনায় তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আঞ্চলিক ও বিভাগীয়—দুটি এবং জেলা প্রশাসন একটি কমিটি করেছে। তবে এসব কোনো রেল-বিশেষজ্ঞকে রাখা হয়নি।

রেলওয়ের আঞ্চলিক তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট (পূর্ব) মোহাম্মদ সফিকুর রহমানকে। অন্য চার সদস্যও রেলের কর্মকর্তা। আর ৫ সদস্যের বিভাগীয় তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (চট্টগ্রাম) আনিসুর রহমানকে। জেলা প্রশাসনের গঠিত কমিটির নেতৃত্বে আছেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। অন্য সদস্যরা হলেন এডি বিআরটিএ, হাইওয়ে থানা পুলিশের ইনচার্জ, স্টেশন মাস্টার (কুমিল্লা) এবং এডি ফায়ার সার্ভিস।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক বলেন, জেলা প্রশাসক, ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ—যাদের গাফিলতি আছে, তারা যদি কম্পোজিশনে চলে আসেন, তাহলে নিরপেক্ষতা কখনো বজায় থাকবে না। গরিবের ওপর সব দায় চাপিয়ে তারা সুন্দর জীবন কাটিয়ে দেন।

এই তদন্তে কোনো রেল বিশেষজ্ঞ নেই কেন—প্রশ্নে রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া বলেন বলেন, ‘এই প্র্যাকটিস আমরা করি না। কারণ, আমি যখন রেলের তদন্ত কমিটি করি, তখন আমি বাইরে থেকে কাউকে রাখতে পারি না। এটা ওপরের লেভেল থেকে করতে হবে—মন্ত্রণালয় বা অন্য কোনো জায়গা থেকে। আমি রেলের কর্মকর্তা। এটি আমাদের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, ‘সেটা ঠিক আছে। কিন্তু এরই মধ্যে দেখেছেন, যে গেটম্যানরা দায়ী—তাদেরকে আমরা বরখাস্ত করেছি, তাদেরকে আইনের আওতায় আনার কথা বলেছি। এ ছাড়া অন্য কোথাও কোনো রকম গাফিলতি আছে কি না, সেটার জন্য এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দিতে বলেছি।’

দায় সারতে নিচের সারির কর্মীদের শাস্তি

রেল দুর্ঘটনার দায় সারতে কেবল নিচের সারির কর্মীদেরই শাস্তি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন বিশেষজ্ঞরা। কুমিল্লার দুর্ঘটনার পর দায়িত্ব ও কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগে দায়িত্বরত গেটম্যান মেহেদী হাসান ও মো. হেলাল উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, রেলওয়ের দুর্ঘটনাগুলোর একেকটির একেকটি কারণ থাকে। কুমিল্লার বিশ্বরোডে যে লেভেল ক্রসিং রয়েছে, সেখানে দায়িত্বরত গেটম্যানকে স্টেশন থেকে যোগাযোগ করে জানানো হয় যে একটি ট্রেন পাস করবে, যাতে তারা গেট ব্যারিয়ার নামিয়ে দেয় এবং রেললাইনে সড়কযান উঠতে না পারে। কুমিল্লার ঘটনায় আগের দুই স্টেশনে দায়িত্বরত গেটম্যানদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু তাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা যায়নি। পরে যখন তাদের পাওয়া গেছে, ততক্ষণে যানবাহন সেখানে ঢুকে পড়েছিল।

তিনি বলেন, ‘যদিও এটি তদন্তাধীন, তারপরও প্রাথমিকভাবে আমরা এটিকে গেটম্যানের ভুল বলে মনে করছি।’

গেটম্যানদের সুপারভাইজারদের কেন ধরা হচ্ছে না—প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সেই সুপারভাইজারকেও আমরা সাময়িক বরখাস্ত করেছি।’

কেবল গেটম্যানকেই শাস্তি দেওয়া হচ্ছে কেন, আর কেউ দায়ী নয়—প্রশ্নে রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, ‘আমরা দুই ধরনের তদন্ত কমিটি করেছি—একটি বিভাগীয়, আরেকটি জোনাল। সুতরাং এখানে যাদের গাফিলতি আছে, তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে। এর বাইরে প্রয়োজন হলে সেটাও আমরা করব।’

কেন এই দুর্ঘটনা

অধ্যাপক মো. শামসুল হক বলেছেন, ‘মহাসড়কের সঙ্গে রেলের লেভেল ক্রসিং না করে হয় পুরো মহাসড়কটা ওপর দিয়ে চলে যাবে, অথবা রেল ওপর দিয়ে চলে যাবে। পদুয়ার বাজারে আমরা ওভারপাস করেছি। কিন্তু অর্ধেক রাস্তা আবার নিচে রেখে দিয়েছি। উন্নয়নের টাকা ঠিকই খরচ হলো, কিন্তু রেল ওভারপাস মুখে বললেও আসলে রেল ওভারপাস হচ্ছে না। এটি একটি আংশিক ওভারপাস, খিলগাঁওয়ের মতো। রাস্তা নিচেই রয়ে গেছে। মহাখালীতেও একই অবস্থা।’

রেলকে কখনোই সড়কের সঙ্গে জট বাঁধানো যাবে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘রেল একটি দ্রুতগতির পরিবহন। হার্ডব্রেক দেওয়া যায় না। শত বছর আগেই জাপান দেখিয়েছে—রেল স্বতন্ত্র তালে চলবে, কখনো সড়কের সঙ্গে জট বাঁধবে না। কিন্তু আমরা দেখেছি, লাখো কোটি টাকা খরচ করে এমন উন্নয়ন করা হয়েছে, যেখানে রেল-সড়ক জট থেকেই যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন প্রযুক্তির যুগ। একটি ট্রেন আসছে—স্টেশনের আশপাশে যত লেভেল ক্রসিং আছে, মোবাইল ট্র্যাকিং করলেই বোঝা যায় গেটম্যানরা সাইটে আছে কি না। যদি তা না হয়, তাহলে সুপারভাইজারের দায়িত্ব কোথায়? তার ওপরের অপারেশনাল ম্যানেজারের দায়িত্ব কোথায়? কিন্তু তদন্ত কমিটিতে সব সময় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা থাকেন—গেটম্যানদের রাখা হয় না। ফলে তারা বলির পাঁঠা হয়ে যান, আর পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকে।’

ট্রেন দুর্ঘটনার দায় কেবল রেলেরই না, স্থানীয় সরকার ও সড়ক বিভাগেরও বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও নীতিবিশ্লেষক সৈয়দ মাহবুবুল আলম। তিনি বলেন, বাংলাদেশে অনেক রেলগেট আছে যেখানে গেটম্যান নেই। এটা দায়-দায়িত্ব কিন্তু শুধু রেলের নয়। এই দায়-দায়িত্ব স্থানীয় সরকার এবং সড়ক পরিবহন বিভাগেরও। তারা অনেক জায়গায় অনুমোদন ছাড়া রেলগেট তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, ‘এখন এই দায়িত্ব তাদেরও নিতে হবে। রেলের আইন অনুযায়ী, যেখানে সড়ক এবং স্থানীয় সরকার রাস্তা নিয়েছে, সেখানে প্রাথমিকভাবে এটা নিশ্চিত করা দরকার। এখন দেখতে হবে, এত পরিমাণ রেলগেট আছে—এটা রেলের পক্ষে বড় বোঝা। রেলের এত কর্মচারীও নেই।’

অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, জাপানে এক শহরেই ৩ কোটি মানুষ বাস করে। সেখানে রেলে কোনো গেটম্যান রাখতে হয় না। রেলকে তারা সড়কের ওপর নিয়ে গেছে। রাজধানী টোকিওর মধ্য দিয়ে একটি ট্রেন ঘণ্টায় সাড়ে ৩০০ কিলোমিটার গতিতে চলে। সেখানে কোনো লেভেল ক্রসিং নেই—ট্রেন চলে ওপর দিয়ে।

তিনি বলেন, ‘পদ্মা সেতু থেকে নারায়ণগঞ্জের পাগলা পর্যন্ত এলিভেটেড রেল সেকশনে কোনোদিন দুর্ঘটনা হবে না। সেখানে ট্রেন ১০০ কিলোমিটারের নিচে চলে না। কিন্তু নিচে যানবাহন ৩০ কিলোমিটার গতিও পায় না। সস্তা উন্নয়ন করলে দীর্ঘমেয়াদে খরচ বেশি হয়। ওপরে ট্রেন চালালে একটি ট্রেন তিনটির কাজ করতে পারে—কম লোকোমোটিভ লাগে, খরচও কম হয়।’

অধ্যাপক শামসুল হকের সঙ্গে একমত হয়ে রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, ‘ওভারপাস ও আন্ডারপাস নির্মাণ করতে হবে এবং সিগন্যালিং ইন্টারলকিং—অর্থাৎ কম্পিউটারভিত্তিক ইন্টারলকিং—ব্যবস্থা চালু করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নতুন রেললাইনগুলো—পদ্মা রেল লিংক, দোহাজারী-কক্সবাজার—এসব প্রকল্পে আন্ডারপাস রাখা হচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লেভেল ক্রসিংগুলোকে আন্ডারপাসে রূপান্তর করা হচ্ছে, কোথাও কোথাও ওভারপাসও করা হচ্ছে।’

রেল দুর্ঘটনা কমাতে স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে জানতে চাইলে রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী রেলপথ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন—যেখানে সম্ভব সেখানে ওভারপাস ও আন্ডারপাস নির্মাণের জন্য, বিশেষ করে ঢাকা ও আশপাশের বড় এলাকায় সমীক্ষা চালিয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সম্পর্কিত