মাইদুল ইসলাম

সরকারি পরিদর্শক খোলা চোখে নিরাপত্তা ত্রুটি পান। এরপর সংশোধনে একাধিক নোটিশ দেন। তাতে গা করেননি মালিকপক্ষ। পরে জুলাইয়ে শ্রম আদালতে মামলা করেন। মামলার এক মাসের মাথায় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে প্রাণ হারালেন ৯ শ্রমিক।
গত ১৪ আগস্ট সকাল ৯টার দিকে মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনার পরদিন রাতে কারখানার কার্যক্রম এক সপ্তাহের জন্য স্থগিত করে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ)। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব পরিদর্শনের পরে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে প্রশ্ন উঠেছে, গ্রিন ইয়ার্ড (সবুজ কারখানা) তকমা লাগানো এমন মৃত্যুফাঁদে কত শ্রমিকের প্রাণ গেলে টনক নড়বে প্রশাসনের?
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) এবং বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি ধারাবাহিক ‘কাঠামোগত’ অবহেলার ফল। কারণ, দুর্ঘটনা ঘটে, তদন্ত কমিটি হয়, কিছুদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকে, এরপর খুলে যায় কারখানা। আবার মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে পুরোদমে কাজে নামেন শ্রমিকেরা।
বিএসবিআরএর তথ্যে, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত জাহাজভাঙা কারখানা ৮৪টি, যার মধ্যে গ্রিন ইয়ার্ড ২৩। শ্রমিকদের নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা ও বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করলে এই স্বীকৃতি মেলে। ৯ শ্রমিকের প্রাণ কেড়ে নেওয়া ফেরদৌস স্টিল গ্রিন ইয়ার্ডের তালিকাভুক্ত।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) পরিদর্শকেরা গত ৯ ফেব্রুয়ারি ফেরদৌস স্টিল পরিদর্শনে শ্রমিকদের নিরাপত্তায় বড় ধরনের ঘাটতি পেয়েছিলেন। অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের শ্রম পরিদর্শক ও মামলার বাদী শাহেদ পারভেজ জানান, নিরাপত্তাসামগ্রী এবং নিরাপদ কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে শ্রমিকদের যথেষ্ট সচেতন করা হতো না। ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলেও, প্রতিষ্ঠানটি দেয়নি।
একাধিক নোটিশের জবাব না দেওয়ায় গত ১৫ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার ফেরদৌস ওয়াহিদ ও ব্যবস্থাপককে আসামি করে মামলা হয়। তবে কোনো ধরনের ঝুঁকি মূল্যায়ন ও পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই ‘এমটি রাসি’ নামে ৩০ হাজার ৭৭০ টন ওজনের এলএনজি পরিবহনকারী স্ক্র্যাপ জাহাজটি কাটতে পাঠানো হয় শ্রমিকদের। জাহাজের ব্যালাস্ট এলাকায় জমে থাকা হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসে দমবন্ধ হয়ে ৯ জন মারা যান।
অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান বলেন, গত ২ ফেব্রুয়ারি পরিদর্শনের পর ফেরদৌস স্টিলকে প্রথম নোটিশ দেওয়া হয়। একাধিকবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও কারখানা কর্তৃপক্ষ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেনি। এই কারণেই আমরা মামলা করি। তিনি বলেন, গ্যাস নির্গমনের আসল কারণ এবং ইয়ার্ডে শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কিনা, তা এখন গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন বেলা বিবৃতিতে সীতাকুণ্ড ট্র্যাজেডিকে ‘মর্মান্তিক’ উল্লেখ করে নিন্দা জানিয়েছে। তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে– ফেরদৌস স্টিলের মতো কারখানাগুলো হংকং কনভেনশন স্বীকৃত ‘গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড’ হিসেবে দাবি করে। তাহলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলার দাবিদার এসব কারখানায় শ্রমিকদের নিরাপত্তা কেন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না?
চলতি বছর এমন দুর্ঘটনা আরও ঘটেছে। গত ২৫ জানুয়ারি জনতা স্টিলের একটি গ্রিন ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন শ্রমিকেরা। ১০ ফেব্রুয়ারি এই ফেরদৌস স্টিলেই গ্যাস টিউব ফেটে এক শ্রমিক দগ্ধ হন। এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এসএন করপোরেশনের ইউনিট-২ ইয়ার্ডে বিস্ফোরণে ৭ শ্রমিকের মৃত্যু হয়।
বেলার ভাষ্যে, হংকং কনভেনশনের সনদের দোহাই দিয়ে মালিকপক্ষ ছাড়পত্রের ক্ষেত্রে এই শিল্পকে ‘লাল’ থেকে ‘কমলা’ শ্রেণিতে নামিয়ে আনার দাবি করলেও, বাস্তবে পেশাগত স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তার বিন্দুমাত্র উন্নতি হয়নি।
এ ব্যাপারে জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত বলেন, ‘গ্রিন ইয়ার্ড সনদ মালিকপক্ষকে কোনোভাবে শ্রমিকের নিরাপত্তার দায় থেকে মুক্তি দেয় না। শুধু কাগজে-কলমে গ্রিন সনদ শ্রমিকের নিরাপত্তায় যথেষ্ট নয়। যে ইয়ার্ডকে গ্রিন বলা হচ্ছে, সেখানে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু প্রমাণ করল– বাস্তবে নিরাপত্তাব্যবস্থায় গুরুতর ঘাটতি ছিল। এই সনদ মালিকদের অবহেলার দায়মুক্তির হাতিয়ার হতে পারে না।’
এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্মের তথ্যে, ১৯৮০ সালের পর থেকে বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙার ইয়ার্ডগুলোতে এক হাজারের বেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। বিলসের হিসাবে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে প্রাণ গেছে ১৩৭ জনের। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ২৮টি দুর্ঘটনায় তিনজন নিহত ও ২৫ জন আহত হন। সর্বশেষ ৯ শ্রমিকের মৃত্যু যোগ করলে গত এক দশকে প্রাণহানি দাঁড়ায় অন্তত ১৪৯।
বিলসের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভারী বস্তু পড়া, ক্রেন ছিঁড়ে যাওয়া, আগুন, বিষাক্ত গ্যাসের মতো সাধারণ কারণে বারবার প্রাণহানি ঘটছে। অনিরাপদ পদ্ধতি, সুরক্ষাসামগ্রীর ঘাটতি ও দুর্বল তদারকি এর মূল কারণ।
১৪ আগস্ট এলএনজি ট্যাংকের তলার অংশ খোলার পর প্রথমে দুজন শ্রমিক জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। তাদের বাঁচাতে আরও দুজন, এরপর কাটিং ফোরম্যান, এমনকি মাস্ক পরা এক নিরাপত্তা কর্মকর্তাও অচেতন হয়ে পড়েন। এভাবে একে একে ঝরে ৯ প্রাণ।
শ্রমিকদের অভিযোগ, গ্যাসে আক্রান্ত হওয়ার পর জরুরি চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা কারখানায় ছিল না। ছিল না অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক বা পর্যাপ্ত অক্সিজেন সিলিন্ডার। সময়মতো অক্সিজেন পেলে হয়তো কারও প্রাণ বাঁচানো যেত। অথচ কারখানার ব্যবস্থাপক ইউসুফ আলীর দাবি, কারখানায় প্রয়োজনীয় সব নিরাপত্তাসামগ্রী ছিল।
যে ইয়ার্ডকে গ্রিন বলা হচ্ছে, সেখানে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু প্রমাণ করল– বাস্তবে নিরাপত্তাব্যবস্থায় গুরুতর ঘাটতি ছিল। এই সনদ মালিকদের অবহেলার দায়মুক্তির হাতিয়ার হতে পারে না। তপন দত্ত, আহ্বায়ক, জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরাম
১৫ আগস্ট ওই জাহাজ পরিদর্শন করে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের উপস্থিতি পেয়েছেন বিস্ফোরক পরিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তারা জানান, দুর্ঘটনার চার ঘণ্টা পরেও জাহাজের ভেতরে ১০.৮ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি ছিল। কর্মকর্তাদের ধারণা, দুর্ঘটনার মুহূর্তে জাহাজে অত্যন্ত বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের পরিমাণ ১০০ পিপিএমের বেশি ছিল। সম্ভবত এই কারণেই গ্যাসের সংস্পর্শে আসার এক থেকে তিন মিনিটের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে।
জাহাজভাঙা শিল্পের বিশেষজ্ঞরা এই গ্যাস নির্গমনের ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। কারণ হিসেবে বলছেন, ব্যালাস্ট ট্যাংক মূলত জাহাজের ভেতরে থাকা একটি বড় কক্ষ, যেখানে শুধু সমুদ্রের পানি রাখা হয়। জাহাজের ওজন ও ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করতে এই ট্যাংকে পানি ঢোকানো বা বের করা হয়। এখানে এলএনজি বা অন্য কোনো বাণিজ্যিক পণ্য বহনের কথা নয়। এই হিসাবে বাংলাদেশের জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাত শিল্পে ব্যালাস্ট ট্যাংকের ভেতরে গ্যাস জমে শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা ‘নজিরবিহীন’।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সাধারণত কোনো জাহাজ কাটার জন্য আনার পর শ্রমিকদের ব্যালাস্ট ট্যাংকের সব ঢাকনা খুলে দিতে বলা হয়। এতে আবদ্ধ গ্যাস স্বাভাবিকভাবে বের হয়ে যায়। ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের দাবি, আগের তিনটি ট্যাংক কাটার সময় তারা এই পদ্ধতি মেনেছে এবং দুর্ঘটনা ঘটেনি। তাহলে হঠাৎ এই নির্দিষ্ট ট্যাংকে কী হয়েছিল?’
এর সম্ভাব্য বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে এই প্রকৌশলী জানান, হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস অত্যন্ত বিষাক্ত, যা অক্সিজেনের স্বল্পতা রয়েছে– এমন পরিবেশে জৈব পদার্থের পচনের ফলে তৈরি হয়। ট্যাংকের ভেতরে কাদা, পলি বা পচনশীল অন্য কোনো স্লাজ দীর্ঘ সময় জমে থাকলেও, এমন গ্যাস তৈরি হতে পারে।
তবে মাহবুবুর রহমান চাঞ্চল্যকর সন্দেহের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘এলএনজি বা রাসায়নিকবাহী ট্যাংকার পরিষ্কারের সময় বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি বর্জ্য ও দূষিত পানি আলাদাভাবে ব্যবস্থাপনা করার কথা। সন্দেহ হচ্ছে, ট্যাংক পরিষ্কারে ব্যবহৃত কোনো রাসায়নিক বা পরিষ্কারের সময় তৈরি স্লাজ ভুলবশত বা অবহেলাবশত এই ব্যালাস্ট ট্যাংকে ফেলা হয়েছিল। তদন্তকারীদের উচিত, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা।’
দুর্ঘটনার পর যথারীতি তদন্ত কমিটি গঠন এবং ৭ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেছে সরকার। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারো শুধু তদন্ত কমিটি করেই দায় সারা হবে। অন্যান্য দুর্ঘটনার মতো পদক্ষেপ আলোর মুখ দেখবে না।
বেলার বিবৃতিতে বলা হয়, আদালতের সুস্পষ্ট রায়, পরিবেশ আইন থাকা সত্ত্বেও তা মানা হচ্ছে না। প্রতিবার শ্রমিকের মৃত্যু হলে একটি তদন্ত কমিটি হয়, কিছুদিন পর সব ধামাচাপা পড়ে। ৯ শ্রমিকের মৃত্যু কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা নয়, এটি ‘কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’। তদন্ত কমিটিকে শুধু কারণ খুঁজলে হবে না, সরাসরি মালিকপক্ষের অবহেলা চিহ্নিত করতে হবে। যাদের সুস্পষ্ট গাফিলতিতে এই প্রাণহানি, তাদের বিরুদ্ধে হত্যা বা কাঠামোগত অবহেলার মামলা করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার সংবাদদাতা)

সরকারি পরিদর্শক খোলা চোখে নিরাপত্তা ত্রুটি পান। এরপর সংশোধনে একাধিক নোটিশ দেন। তাতে গা করেননি মালিকপক্ষ। পরে জুলাইয়ে শ্রম আদালতে মামলা করেন। মামলার এক মাসের মাথায় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে প্রাণ হারালেন ৯ শ্রমিক।
গত ১৪ আগস্ট সকাল ৯টার দিকে মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনার পরদিন রাতে কারখানার কার্যক্রম এক সপ্তাহের জন্য স্থগিত করে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ)। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব পরিদর্শনের পরে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে প্রশ্ন উঠেছে, গ্রিন ইয়ার্ড (সবুজ কারখানা) তকমা লাগানো এমন মৃত্যুফাঁদে কত শ্রমিকের প্রাণ গেলে টনক নড়বে প্রশাসনের?
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) এবং বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি ধারাবাহিক ‘কাঠামোগত’ অবহেলার ফল। কারণ, দুর্ঘটনা ঘটে, তদন্ত কমিটি হয়, কিছুদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকে, এরপর খুলে যায় কারখানা। আবার মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে পুরোদমে কাজে নামেন শ্রমিকেরা।
বিএসবিআরএর তথ্যে, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত জাহাজভাঙা কারখানা ৮৪টি, যার মধ্যে গ্রিন ইয়ার্ড ২৩। শ্রমিকদের নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা ও বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করলে এই স্বীকৃতি মেলে। ৯ শ্রমিকের প্রাণ কেড়ে নেওয়া ফেরদৌস স্টিল গ্রিন ইয়ার্ডের তালিকাভুক্ত।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) পরিদর্শকেরা গত ৯ ফেব্রুয়ারি ফেরদৌস স্টিল পরিদর্শনে শ্রমিকদের নিরাপত্তায় বড় ধরনের ঘাটতি পেয়েছিলেন। অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের শ্রম পরিদর্শক ও মামলার বাদী শাহেদ পারভেজ জানান, নিরাপত্তাসামগ্রী এবং নিরাপদ কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে শ্রমিকদের যথেষ্ট সচেতন করা হতো না। ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলেও, প্রতিষ্ঠানটি দেয়নি।
একাধিক নোটিশের জবাব না দেওয়ায় গত ১৫ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার ফেরদৌস ওয়াহিদ ও ব্যবস্থাপককে আসামি করে মামলা হয়। তবে কোনো ধরনের ঝুঁকি মূল্যায়ন ও পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই ‘এমটি রাসি’ নামে ৩০ হাজার ৭৭০ টন ওজনের এলএনজি পরিবহনকারী স্ক্র্যাপ জাহাজটি কাটতে পাঠানো হয় শ্রমিকদের। জাহাজের ব্যালাস্ট এলাকায় জমে থাকা হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসে দমবন্ধ হয়ে ৯ জন মারা যান।
অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান বলেন, গত ২ ফেব্রুয়ারি পরিদর্শনের পর ফেরদৌস স্টিলকে প্রথম নোটিশ দেওয়া হয়। একাধিকবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও কারখানা কর্তৃপক্ষ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেনি। এই কারণেই আমরা মামলা করি। তিনি বলেন, গ্যাস নির্গমনের আসল কারণ এবং ইয়ার্ডে শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কিনা, তা এখন গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন বেলা বিবৃতিতে সীতাকুণ্ড ট্র্যাজেডিকে ‘মর্মান্তিক’ উল্লেখ করে নিন্দা জানিয়েছে। তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে– ফেরদৌস স্টিলের মতো কারখানাগুলো হংকং কনভেনশন স্বীকৃত ‘গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড’ হিসেবে দাবি করে। তাহলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলার দাবিদার এসব কারখানায় শ্রমিকদের নিরাপত্তা কেন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না?
চলতি বছর এমন দুর্ঘটনা আরও ঘটেছে। গত ২৫ জানুয়ারি জনতা স্টিলের একটি গ্রিন ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন শ্রমিকেরা। ১০ ফেব্রুয়ারি এই ফেরদৌস স্টিলেই গ্যাস টিউব ফেটে এক শ্রমিক দগ্ধ হন। এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এসএন করপোরেশনের ইউনিট-২ ইয়ার্ডে বিস্ফোরণে ৭ শ্রমিকের মৃত্যু হয়।
বেলার ভাষ্যে, হংকং কনভেনশনের সনদের দোহাই দিয়ে মালিকপক্ষ ছাড়পত্রের ক্ষেত্রে এই শিল্পকে ‘লাল’ থেকে ‘কমলা’ শ্রেণিতে নামিয়ে আনার দাবি করলেও, বাস্তবে পেশাগত স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তার বিন্দুমাত্র উন্নতি হয়নি।
এ ব্যাপারে জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত বলেন, ‘গ্রিন ইয়ার্ড সনদ মালিকপক্ষকে কোনোভাবে শ্রমিকের নিরাপত্তার দায় থেকে মুক্তি দেয় না। শুধু কাগজে-কলমে গ্রিন সনদ শ্রমিকের নিরাপত্তায় যথেষ্ট নয়। যে ইয়ার্ডকে গ্রিন বলা হচ্ছে, সেখানে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু প্রমাণ করল– বাস্তবে নিরাপত্তাব্যবস্থায় গুরুতর ঘাটতি ছিল। এই সনদ মালিকদের অবহেলার দায়মুক্তির হাতিয়ার হতে পারে না।’
এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্মের তথ্যে, ১৯৮০ সালের পর থেকে বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙার ইয়ার্ডগুলোতে এক হাজারের বেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। বিলসের হিসাবে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে প্রাণ গেছে ১৩৭ জনের। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ২৮টি দুর্ঘটনায় তিনজন নিহত ও ২৫ জন আহত হন। সর্বশেষ ৯ শ্রমিকের মৃত্যু যোগ করলে গত এক দশকে প্রাণহানি দাঁড়ায় অন্তত ১৪৯।
বিলসের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভারী বস্তু পড়া, ক্রেন ছিঁড়ে যাওয়া, আগুন, বিষাক্ত গ্যাসের মতো সাধারণ কারণে বারবার প্রাণহানি ঘটছে। অনিরাপদ পদ্ধতি, সুরক্ষাসামগ্রীর ঘাটতি ও দুর্বল তদারকি এর মূল কারণ।
১৪ আগস্ট এলএনজি ট্যাংকের তলার অংশ খোলার পর প্রথমে দুজন শ্রমিক জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। তাদের বাঁচাতে আরও দুজন, এরপর কাটিং ফোরম্যান, এমনকি মাস্ক পরা এক নিরাপত্তা কর্মকর্তাও অচেতন হয়ে পড়েন। এভাবে একে একে ঝরে ৯ প্রাণ।
শ্রমিকদের অভিযোগ, গ্যাসে আক্রান্ত হওয়ার পর জরুরি চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা কারখানায় ছিল না। ছিল না অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক বা পর্যাপ্ত অক্সিজেন সিলিন্ডার। সময়মতো অক্সিজেন পেলে হয়তো কারও প্রাণ বাঁচানো যেত। অথচ কারখানার ব্যবস্থাপক ইউসুফ আলীর দাবি, কারখানায় প্রয়োজনীয় সব নিরাপত্তাসামগ্রী ছিল।
যে ইয়ার্ডকে গ্রিন বলা হচ্ছে, সেখানে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু প্রমাণ করল– বাস্তবে নিরাপত্তাব্যবস্থায় গুরুতর ঘাটতি ছিল। এই সনদ মালিকদের অবহেলার দায়মুক্তির হাতিয়ার হতে পারে না। তপন দত্ত, আহ্বায়ক, জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরাম
১৫ আগস্ট ওই জাহাজ পরিদর্শন করে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের উপস্থিতি পেয়েছেন বিস্ফোরক পরিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তারা জানান, দুর্ঘটনার চার ঘণ্টা পরেও জাহাজের ভেতরে ১০.৮ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি ছিল। কর্মকর্তাদের ধারণা, দুর্ঘটনার মুহূর্তে জাহাজে অত্যন্ত বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের পরিমাণ ১০০ পিপিএমের বেশি ছিল। সম্ভবত এই কারণেই গ্যাসের সংস্পর্শে আসার এক থেকে তিন মিনিটের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে।
জাহাজভাঙা শিল্পের বিশেষজ্ঞরা এই গ্যাস নির্গমনের ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। কারণ হিসেবে বলছেন, ব্যালাস্ট ট্যাংক মূলত জাহাজের ভেতরে থাকা একটি বড় কক্ষ, যেখানে শুধু সমুদ্রের পানি রাখা হয়। জাহাজের ওজন ও ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করতে এই ট্যাংকে পানি ঢোকানো বা বের করা হয়। এখানে এলএনজি বা অন্য কোনো বাণিজ্যিক পণ্য বহনের কথা নয়। এই হিসাবে বাংলাদেশের জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাত শিল্পে ব্যালাস্ট ট্যাংকের ভেতরে গ্যাস জমে শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা ‘নজিরবিহীন’।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সাধারণত কোনো জাহাজ কাটার জন্য আনার পর শ্রমিকদের ব্যালাস্ট ট্যাংকের সব ঢাকনা খুলে দিতে বলা হয়। এতে আবদ্ধ গ্যাস স্বাভাবিকভাবে বের হয়ে যায়। ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের দাবি, আগের তিনটি ট্যাংক কাটার সময় তারা এই পদ্ধতি মেনেছে এবং দুর্ঘটনা ঘটেনি। তাহলে হঠাৎ এই নির্দিষ্ট ট্যাংকে কী হয়েছিল?’
এর সম্ভাব্য বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে এই প্রকৌশলী জানান, হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস অত্যন্ত বিষাক্ত, যা অক্সিজেনের স্বল্পতা রয়েছে– এমন পরিবেশে জৈব পদার্থের পচনের ফলে তৈরি হয়। ট্যাংকের ভেতরে কাদা, পলি বা পচনশীল অন্য কোনো স্লাজ দীর্ঘ সময় জমে থাকলেও, এমন গ্যাস তৈরি হতে পারে।
তবে মাহবুবুর রহমান চাঞ্চল্যকর সন্দেহের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘এলএনজি বা রাসায়নিকবাহী ট্যাংকার পরিষ্কারের সময় বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি বর্জ্য ও দূষিত পানি আলাদাভাবে ব্যবস্থাপনা করার কথা। সন্দেহ হচ্ছে, ট্যাংক পরিষ্কারে ব্যবহৃত কোনো রাসায়নিক বা পরিষ্কারের সময় তৈরি স্লাজ ভুলবশত বা অবহেলাবশত এই ব্যালাস্ট ট্যাংকে ফেলা হয়েছিল। তদন্তকারীদের উচিত, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা।’
দুর্ঘটনার পর যথারীতি তদন্ত কমিটি গঠন এবং ৭ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেছে সরকার। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারো শুধু তদন্ত কমিটি করেই দায় সারা হবে। অন্যান্য দুর্ঘটনার মতো পদক্ষেপ আলোর মুখ দেখবে না।
বেলার বিবৃতিতে বলা হয়, আদালতের সুস্পষ্ট রায়, পরিবেশ আইন থাকা সত্ত্বেও তা মানা হচ্ছে না। প্রতিবার শ্রমিকের মৃত্যু হলে একটি তদন্ত কমিটি হয়, কিছুদিন পর সব ধামাচাপা পড়ে। ৯ শ্রমিকের মৃত্যু কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা নয়, এটি ‘কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’। তদন্ত কমিটিকে শুধু কারণ খুঁজলে হবে না, সরাসরি মালিকপক্ষের অবহেলা চিহ্নিত করতে হবে। যাদের সুস্পষ্ট গাফিলতিতে এই প্রাণহানি, তাদের বিরুদ্ধে হত্যা বা কাঠামোগত অবহেলার মামলা করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার সংবাদদাতা)
.png)

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে একটি গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানের যাওয়ার পথে দুর্বৃত্তদের এলোপাতাড়ি গুলিতে পাঁচজন আহত হয়েছেন। গতকাল সোমবার রাত ১১টার দিকে উপজেলার আলাইয়াপুর ইউনিয়নের মৌশাকপুর গ্রামের গাজীটোলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। তাদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
৩৫ মিনিট আগে
বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন এই সরকার গত ছয় মাসে ফ্যামিলি কার্ডের মতো বেশ কিছু সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নিয়েছে। অধ্যাপক ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ ছয় মাসের সঙ্গে বিএনপি সরকারের শুরুর ছয় মাসের তুলনা টানলে দেখা যায়, নির্বাচিত সরকার আসার পর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ
৩৭ মিনিট আগে
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং ট্রাফিক শৃঙ্খলা জোরদারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ‘অটো-ফাইন সিস্টেম’ চালু হয়েছে। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দুপুরে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের মেঘনাঘাট এলাকায় এই ব্যবস্থা উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
৪০ মিনিট আগে
দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাদ পড়া ১৬ লাখ শিশুকে হামের টিকার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মজুত থাকা টিকাতেই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। গত রোববার (১৬ আগস্ট) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে টিকাবিষয়ক আন্তসংস্থা সমন্বয় কমিটির (আইসিসি) সভায় এসব সিদ্ধান্ত হয়। সভায় সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই), বিশ্ব