রোহিঙ্গা সংকট/৯ বছরেও ফেরার পথ খোলেনি, প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
কক্সবাজার

প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১২: ৩৮
রোহিঙ্গা ক্যাম্প। ছবি: সংগৃহীত
রোহিঙ্গা ক্যাম্প। ছবি: সংগৃহীত

৯ বছর আগে প্রাণ বাঁচাতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন ছৈয়দুল আলম। তখন তাঁর ধারণা ছিল, পরিস্থিতি শান্ত হলে অল্প সময়ের মধ্যেই পরিবার নিয়ে নিজের গ্রামে ফিরে যেতে পারবেন। কিন্তু ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর শুরু হওয়া সেই নির্বাসন এখন পেরিয়েছে ৯ বছর।

উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা নেতা ছৈয়দুল আলম বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম কয়েক মাসের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। তারপর দেশে ফিরে যাব। কিন্তু ৯ বছর কেটে গেলেও আমরা ফিরতে পারিনি। মাঝেমধ্যে প্রত্যাবাসনের নানা আশ্বাস এসেছে, উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; কিন্তু ফেরার পথ খোলেনি। তারপরও আমরা আশায় আছি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় যেন নিরাপদে নিজেদের মাতৃভূমিতে ফিরতে পারি।’

ছৈয়দুল আলমের মতো বাংলাদেশের বিভিন্ন শরণার্থীশিবিরে থাকা লাখো রোহিঙ্গারও একই অপেক্ষা। ২০১৭ সালের সহিংসতার পর কয়েক মাসের মধ্যে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসে। বাংলাদেশ সরকার ও ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ যৌথ হিসাব অনুযায়ী, গত ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত ও শনাক্ত রোহিঙ্গা ১২ লাখ ১৭১ জন। এর মধ্যে কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে ১১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৫২ এবং নোয়াখালীর ভাসানচরে ৩৩ হাজার ৮১৯ জন বসবাস করছেন।

‘আমরা অধিকার নিয়ে ফিরতে চাই’

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনে সহিংসতা শুরুর পর মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের মুখে ব্যাপকসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহল ওই অভিযানে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও আন্তর্জাতিক অপরাধের অভিযোগ তুলেছিল। সেই ঘটনার ৯ বছর পরও বাংলাদেশ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।

রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতা মাওলানা সৈয়দ উল্লাহ বলেন, নাগরিকত্ব, জাতিগত পরিচয়, নিরাপত্তা এবং নিজেদের জায়গা-জমির অধিকার নিশ্চিত না হলে রোহিঙ্গাদের পক্ষে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া নিরাপদ হবে না।

তিনি বলেন, ‘আমরা রোহিঙ্গা, আমরা বাঙালি নই। আমরা মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে নিজেদের অধিকার চাই। শুধু ফিরে গেলেই হবে না, সেখানে নিরাপদে বসবাসের নিশ্চয়তাও থাকতে হবে।’

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে জাতিসংঘও দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই। একই সঙ্গে মিয়ানমারে নিরাপত্তা, আইনি মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টিকে প্রত্যাবাসনের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

১৫ নম্বর ক্যাম্পের কমিউনিটি নেতা জুলফিকার হায়দার বলেন, ‘আমরা অন্য দেশে স্থায়ীভাবে থাকতে চাই না। মিয়ানমার আমাদের দেশ। আমরা আমাদের অধিকার নিয়ে সেখানে ফিরতে চাই।’

ফেরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন ১৩ নম্বর ক্যাম্পের কমিউনিটি নেতা মোহাম্মদ আলীও। তিনি বলেন, ‘আমরা সব সময় দেশে ফিরতে চাই। কিন্তু রাখাইনে এখনো সংঘাত চলছে। এই পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া কীভাবে ফিরে যাব?’

কুতুপালং ক্যাম্পের বাসিন্দা আলমাস খাতুন বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ার জন্য তিনি কৃতজ্ঞ। তবে তাঁর প্রত্যাশা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এমন পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে, যাতে রোহিঙ্গারা নিরাপদে নিজেদের দেশে ফিরতে পারেন।

মিয়ানমারের নতুন যাচাই, তবু অনিশ্চিত প্রত্যাবাসন

সম্প্রতি মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকার মধ্যে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনকে যাচাই করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে চিহ্নিত করার কথা জানিয়েছে মিয়ানমার।

একই বিবৃতিতে ৪ হাজার ২৪১ জনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা যায়নি বলে দাবি করেছে দেশটি। মিয়ানমার বলেছে, রাখাইনে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে যাচাইকৃত ব্যক্তিদের ফেরত নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে।

তবে এই যাচাইপ্রক্রিয়া সত্ত্বেও প্রত্যাবাসন কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই।

আরও বড় বাধা রাখাইনের বর্তমান পরিস্থিতি। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে রাজ্যটির বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরিস্থিতি বদলেছে। আরাকান আর্মি রাখাইনের বড় অংশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলেও পুরো রাজ্যে সংঘাতের অবসান হয়নি। বিভিন্ন মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থাও সেখানে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জুবায়ের বলেন, ‘মিয়ানমার আমাদের বাঙালি হিসেবে আখ্যায়িত করে। কিন্তু আমাদের নিজস্ব জাতিগত পরিচয় আছে। আমরা রোহিঙ্গা। বাংলাদেশে আমরা আশ্রয় নিয়েছি, কিন্তু আমাদের মাতৃভূমি মিয়ানমার।’

তিনি বলেন, শুধু বাংলাদেশের উদ্যোগে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের ওপর কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ ও রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন।

‘৯ বছরেও কোনো প্রত্যাবাসন হয়নি’

২০১৭ সালের পর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে কয়েক দফা প্রত্যাবাসন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও অধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে কোনো উদ্যোগই বাস্তবায়িত হয়নি।

কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কার্যালয়ের কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ বরাবরই প্রস্তুত। তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অনুকূল না হওয়ায় তা শুরু করা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ মিয়ানমারে। তাই টেকসই সমাধানের জন্য মিয়ানমারেই এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে, যাতে রোহিঙ্গারা নিরাপদে ও স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে পারেন।’

২৫ আগস্টকে রোহিঙ্গারা গণহত্যা স্মরণ দিবস হিসেবে পালন করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণহত্যা দিবস পালনের মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়াগুলো এগিয়ে নেওয়ার দাবিও রয়েছে তাদের।

স্থানীয়দের ওপর চাপের অভিযোগ

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন যত দীর্ঘ হচ্ছে, কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগও বাড়ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের কয়েকজন প্রতিনিধি বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের কারণে পরিবেশ, শ্রমবাজার, জননিরাপত্তা ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতির কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে নানা ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশ মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে স্থানীয় জনগণের ওপরও প্রভাব পড়ছে।

উখিয়ার সুশাসনের জন্য নাগরিকের সভাপতি অধ্যাপক মাসুদ বলেন, ক্যাম্প স্থাপনের সময় পাহাড় ও বনভূমির ওপর ব্যাপক চাপ পড়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে বিপুলসংখ্যক মানুষের অবস্থানের ফলে পরিবেশ ও স্থানীয় অবকাঠামোর ওপরও প্রভাব পড়ছে।

এছাড়া সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের কক্সবাজার জেলা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক অজিত দাশ বলেন, ‘আমরা একটি আন্তর্জাতিক সংকটের মধ্যে পড়ে গেছি। শুরুতে বলা হয়েছিল, রোহিঙ্গারা দ্রুত ফিরে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ৯ বছরেও প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি। আবার তাদের জন্য পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক সহায়তার কথাও বলা হয়েছিল। এখন দেখা যাচ্ছে, মানবিক সহায়তায়ও সংকট তৈরি হচ্ছে।’

অজিত দাশ বলেন, ‘এই সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য আরও বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে।’

কক্সবাজার রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, সরকারি হিসাবের বাইরে কক্সবাজার ও আশপাশের এলাকায় আরও বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন বলে তাঁর সংগঠনের ধারণা। তিনি দাবি করেন, ক্যাম্পের বাইরে অবস্থান, ভুয়া পরিচয়পত্র সংগ্রহ এবং বিভিন্ন অপরাধে রোহিঙ্গাদের জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব দাবির পক্ষে নির্দিষ্ট ও স্বাধীন কোনো পরিসংখ্যান তিনি উল্লেখ করেননি।

মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত তাদের বিষয়ে রাষ্ট্রকে কার্যকর নজরদারি রাখতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর চাপ বাড়িয়ে দ্রুত প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।’

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাঁর সংগঠন দ্রুত, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের দাবিতে কর্মসূচি পালন করছে।

কমছে আন্তর্জাতিক সহায়তা

দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ অর্থসংকট। ২০২৬ সালের জন্য জাতিসংঘ ও তাদের সহযোগী সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং কক্সবাজার ও ভাসানচরের আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ৭১ কোটি ৫ লাখ ডলারের আবেদন জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার ঘাটতি দেখা দিলে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষাসহ বিভিন্ন জরুরি সেবার ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রোহিঙ্গা বিষয়ক বিশ্লেষক সুজা উদ্দিন বলেন, ২০১৭ সালের সহিংসতার ঘটনায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান এখনো আসেনি।

সুজা উদ্দিন আরও বলেন, ‘এই সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়। এটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংকট। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের অধিকার, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অবস্থানের সমাধান ছাড়া এর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।’

মিয়ানমার কয়েক লাখ মানুষকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাই করার কথা বললেও বাস্তব প্রত্যাবাসনের পথ এখনো অনিশ্চিত। রাখাইনে চলমান সংঘাত, নিরাপত্তাহীনতা, নাগরিকত্ব ও জাতিগত পরিচয়ের প্রশ্ন এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অচলাবস্থা—সব মিলিয়ে রোহিঙ্গাদের ফেরার অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হচ্ছে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত