সন্তোষপুরের বনাঞ্চল রক্ষায় ‘ইকোপার্কে’ নতুন সম্ভাবনা

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
ময়মনসিংহ

প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১৩: ৪৬
ফুলবাড়িয়ার সন্তোষপুরের বনে মানুষের চলাচলের মধ্যে বানরের ঘরকন্যা নজর কাড়ে। স্ট্রিম ছবি
ফুলবাড়িয়ার সন্তোষপুরের বনে মানুষের চলাচলের মধ্যে বানরের ঘরকন্যা নজর কাড়ে। স্ট্রিম ছবি

কাগজে প্রায় ৩ হাজার ৬৫৯ একরে শাল-গজারির প্রাকৃতিক বন। বাস্তবে এখন তা ঠেকেছে মাত্র ৫০ একরে। প্রাকৃতিক বন দখলের মাধ্যমে করা হয়েছে সামাজিক বনায়ন। বনের বড় অংশে রাবার ও আগর বাগান। কোথাও হচ্ছে আনারস, হলুদ, কলা ও লেবুর চাষ। বুনো শূকর, মেছোবাঘ ও হনুমানের নিরাপদ আবাসে এখন শিয়াল-বানর ছাড়া কোনো কিছুর দেখা মেলে না।

ধ্বংসপ্রায় ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার সন্তোষপুরের ৫৬৫.৪৫ একর সংরক্ষিত বনভূমি নিয়ে সরকার ‘সন্তোষপুর ইকোপার্ক’ ঘোষণা করেছে। গত ৩ আগস্ট এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে বৃক্ষ সম্পদ সংরক্ষণ, জনসাধারণের বিনোদন এবং শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ তৈরির কথা বলা হয়েছে।

শাল-গজারির বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক বন জবরদখলে ধ্বংসপ্রায়। স্ট্রিম ছবি
শাল-গজারির বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক বন জবরদখলে ধ্বংসপ্রায়। স্ট্রিম ছবি

বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মো. নূরুল করিম জানান, ইকোপার্কের জন্য একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করে সরকারের কাছে পাঠাবেন তারা। বন খণ্ডিত হওয়া ও আবাসস্থল নষ্ট হওয়া ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় করে ইকোপার্ক বাস্তবায়ন করা হবে।

তবে শুধু পর্যটনকেন্দ্র ধরে উন্নয়ন করলে ইকোপার্কের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পরিবেশবিদরা। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এমএ ফারুক বলেন, সন্তোষপুরের শালবন বাংলাদেশের জন্য বিশেষ ধরনের বনাঞ্চল। ফলে ইকোপার্ক বাস্তবায়নের আগে পরিবেশগত বেসলাইন জরিপ জরুরি। উদ্ভিদ, প্রাণী, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, জলাধারসহ পরিবেশের বর্তমান পরিস্থিতি নির্ধারণ করে, তার ভিত্তিতে ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা করা উচিত।

ফুলবাড়িয়ার সন্তোষপুর বনে বানর দেখতে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যটক আসেন। স্ট্রিম ছবি
ফুলবাড়িয়ার সন্তোষপুর বনে বানর দেখতে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যটক আসেন। স্ট্রিম ছবি

তিনি বলেন, ইকোপার্কে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ এবং সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা রাখতে হবে। অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান গাছ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে। বন সাবাড় করে একের পর এক ভবন, কংক্রিটের রাস্তা বা স্থাপনা ইকোপার্কের পরিবেশ নষ্ট করবে।

বনবিভাগের তথ্যে, প্রায় ১ হাজার ৩৬১ একর জমি রাবার বাগানের জন্য বরাদ্দ। তবে বাস্তবে রাবার বাগান রয়েছে প্রায় ৭০০ একরে। সুফল প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৭০০ একর জমিতে বনজ, ফলজ ও ঔষধি গাছ লাগানো হয়েছে। আর প্রায় ৪০ একরে রয়েছে আগর বাগান। নব্বই দশকের শুরুতে কৃষি বনায়ন এবং ২০০০ সালে সামাজিক বনায়নে স্থানীয়দের অংশীদ্বার করা হয়। সামাজিক বনায়নের বড় অংশে রয়েছে আকাশমনি গাছ। এসব বনায়নের সুবিধাভোগী প্রায় দেড় হাজার মানুষ।

ইকোপার্ক ঘোষণার পর সুবিধাভোগীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বনভূমিতে কৃষিকাজে জড়িতরা উচ্ছেদ আতঙ্কে রয়েছেন। কৃষকেরা জানিয়েছেন, ৪০ বছর মেয়াদে সরকার তাদের অংশীদ্বার করেছে। ওপরের গাছ দেখাশোনা করেন; নিচে ফসল করে সংসার চালান। ইকোপার্কের জন্য জায়গা নিলে তারা কোথায় যাবেন– এমন প্রশ্ন করছেন।

এ ব্যাপারে ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মো. নূরুল করিম বলেন, স্থানীয়দের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। তাদের নিয়েই উন্নয়নমূলক কাজ করা হবে। ভবিষ্যতে উচ্ছেদের প্রয়োজন হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

নব্বই দশকের শুরুতে কৃষি বনায়ন এবং ২০০০ সালে সামাজিক বনায়নে স্থানীয়দের অংশীদ্বার করা হয়। সামাজিক বনায়নের বড় অংশে রয়েছে আকাশমনি গাছ। এসব বনায়নের সুবিধাভোগী প্রায় দেড় হাজার মানুষ।

উদ্বেগের বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুল হাসান মিলন বলেন, ইকোপার্ক ফুলবাড়িয়ার মানুষের জন্য আশীর্বাদ হবে। স্থানীয়দের আয় বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। যাঁরা জমি বা বসতি নিয়ে শঙ্কিত, তাদের কাউকে উচ্ছেদ বা ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে না। স্থানীয় বাসিন্দাদের অধিকার সংরক্ষণ করেই ইকোপার্ক বাস্তবায়ন করা হবে।

বনের ভেতরে মাটির রাস্তা ইকোপার্ক প্রকল্পেও রাখার পরামর্শ দিয়েছেন পরিবেশবিদরা। স্ট্রিম ছবি
বনের ভেতরে মাটির রাস্তা ইকোপার্ক প্রকল্পেও রাখার পরামর্শ দিয়েছেন পরিবেশবিদরা। স্ট্রিম ছবি

তবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে শুধু সুবিধাভোগী নয়, ইকোপার্কের অংশীদ্বার বা ব্যবস্থাপনার অংশ করার ওপর গুরুত্ব দেন অধ্যাপক এমএ ফারুক। তিনি বলেন, এটি করা গেলে তাদের মধ্যে প্রকল্পটির প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরি হবে। একইসঙ্গে তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে। তবে শুধু ইকোপার্ক করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। দুই বা পাঁচ বছর পরপর ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা করে দেখতে হবে– যে উদ্দেশে এটি করা, তা কতটা অর্জিত হয়েছে এবং কোথায় ঘাটতি রয়েছে।

বিস্তীর্ণ বনভূমি জবরদখলে

সন্তোষপুরের প্রায় ১৫০ একর বনভূমি জবরদখলে। যদিও বনবিভাগের দাবি, গত দুই বছরে ১১২ একর জমি দখলমুক্ত করে সামাজিক বনায়ন করা হয়েছে। গাছ কাটা ও বনভূমি দখলের অভিযোগে ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে গত আগস্ট পর্যন্ত ৪২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে গত দুই বছরেই হয়েছে ৩৪টি মামলা।

এ ব্যাপারে সন্তোষপুর বিটের ডেপুটি রেঞ্জার ও বিট কর্মকর্তা এমদাদুল হক বলেন, ইকোপার্কের আওতাভুক্ত জমি বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। লোকজন বনভূমি দখল ও গাছ কাটার চেষ্টা করছেন। জনবল সংকটে সব সময় তাদের প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় না।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত