মতামত/ইয়াসমিন থেকে তনু: রাষ্ট্র কেন বারবার রক্ষা করতে ব্যর্থ

প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১৪: ২৩
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট। তেরো-চৌদ্দ বছরের কিশোরী গৃহকর্মী ইয়াসমিন আখতার ঢাকা থেকে মায়ের কাছে ফিরছিল। ভুল বাসে উঠে পথ হারিয়ে দশমাইল বাসস্ট্যান্ডে নেমে পড়েছিল সে। রাতের অন্ধকারে একা একটি মেয়েকে দেখে এগিয়ে আসে একটি পুলিশ ভ্যান। নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেয়ার আশ্বাস দেয়। মেয়েটি দ্বিধা বোধ করছিলে, পরে স্থানীয়রাও পরামর্শ দেওয়ায় ভ্যানে উঠে পড়ে। পরদিন গোবিন্দপুর এলাকায় তার লাশ পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের নারী নিরাপত্তার ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর বিদ্রূপটি ধরা পড়ে এই ঘটনার মাধ্যমে। ওই রক্ষকেরা নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে গণধর্ষণের পর হত্যা করেন ইয়াসমিনকে। কিন্তু ইয়াসমিনের গল্প এখানেই শেষ হয়নি। বিচার পাওয়ার লড়াই ছিল দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক। স্থানীয় পুলিশ প্রথমে মামলা নিতেই রাজি হয়নি, নিজেদের সহকর্মীদের বাঁচাতে। প্রথম ময়নাতদন্তে বলা হয়েছিল ধর্ষণের কোনো প্রমাণ নেই। প্রশাসন এমনকি প্রেস নোট দিয়ে দায় চাপানোর চেষ্টা করে ইয়াসমিনের ওপরেই। দাবি করা হয়, সে নাকি নিজেই গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়ে আহত হয়েছিল।

জনরোষ যখন প্রবল হয়, দিনাজপুর শহর যখন বিক্ষোভে ফেটে পড়ে, তখনই কেবল লাশ কবর থেকে তুলে দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত করানো হয়, যাতে ধর্ষণের সত্যতা প্রমাণিত হয়। বিক্ষোভ এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছিল যে থানা ঘেরাও করা জনতার ওপর পুলিশ গুলি চালায়, যাতে সাতজন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। এই রক্তের বিনিময়েই ১৯৯৭ সালে তিন পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়, বিচার শুরু হয়, আর ২০০৪ সালে তাদের ফাঁসি কার্যকর হয়—অপরাধ সংঘটনের প্রায় ৯ বছর পর। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে থাকা অপরাধীদের বিরুদ্ধে এটিই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা।

ইয়াসমিনের মৃত্যুবার্ষিকী আজ ‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তিরিশ বছরে আমরা আসলে কতটা এগিয়েছি?

২০১৬ সালে কুমিল্লা সেনানিবাসে খুন হন কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনু। প্রথম ময়নাতদন্তে আবারও একই কাহিনি—ধর্ষণ বা হত্যার কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়।

হাইকোর্টের নির্দেশে দ্বিতীয় ময়নাতদন্তে ধর্ষণের আলামত মেলে। এরপর দশ বছর কেটে গেছে।

চারটি সংস্থার ছয়জন তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছেন, তনুর মা-বাবাকে বারবার একই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে, অথচ একজনকেও গ্রেপ্তার করা যায়নি দীর্ঘদিন। এই বছরের এপ্রিলেই কেবল আদালতের নির্দেশে তিনজন সাবেক সেনাসদস্যের ডিএনএ নমুনা মেলানোর উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তনুর মা আনোয়ারা বেগম বলেছিলেন, ‘বিচার পাওয়ার আশা দিন দিন ফিকে হয়ে যাচ্ছে।’

ইয়াসমিন থেকে তনু, আছিয়া থেকে রামিসা—তিরিশ বছরের এই দীর্ঘ তালিকা একটিই সত্য বারবার প্রমাণ করে: রাষ্ট্র নিজে থেকে সাড়া দেয় না, রাষ্ট্রকে সাড়া দিতে বাধ্য করতে হয়। ইয়াসমিনের ক্ষেত্রে সাতজন মানুষের রক্ত ঝরাতে হয়েছিল থানা ঘেরাও করে। তনুর ক্ষেত্রে লেগেছে দশ বছরের অবিরাম চাপ। আছিয়া বা রামিসার ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যমের প্রবল ক্ষোভ।

এই প্যাটার্ন থামেনি। ২০২৫ সালের মার্চে মাগুরায় আট বছরের শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যায়, যে ঘটনা সারা দেশে ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে ধর্ষণ-সংক্রান্ত আইনে সংশোধনী আনতে বাধ্য করে। এ বছরের মে মাসে রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা করে শিরশ্ছেদ করা হয়। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বিশ মাসে ধর্ষণ ও নির্যাতনে নিহত হয়েছে ৬৪৩ শিশু—গড়ে মাসে ৩২ জনেরও বেশি। শুধু ২০২৫ সালেই দেশজুড়ে রেকর্ড সাত হাজার আটষট্টিটি ধর্ষণ মামলা হয়েছে। অথচ মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে, দেড় লক্ষাধিক ধর্ষণ মামলা এখনো বিচারের অপেক্ষায়, আর গত দেড় দশকে সর্বোচ্চ সাজা কার্যকর হয়েছে মাত্র পাঁচটি মামলায়।

ইয়াসমিন থেকে তনু, আছিয়া থেকে রামিসা—তিরিশ বছরের এই দীর্ঘ তালিকা একটিই সত্য বারবার প্রমাণ করে: রাষ্ট্র নিজে থেকে সাড়া দেয় না, রাষ্ট্রকে সাড়া দিতে বাধ্য করতে হয়।

ইয়াসমিনের ক্ষেত্রে সাতজন মানুষের রক্ত ঝরাতে হয়েছিল থানা ঘেরাও করে। তনুর ক্ষেত্রে লেগেছে দশ বছরের অবিরাম চাপ। আছিয়া বা রামিসার ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যমের প্রবল ক্ষোভ। প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল প্রায় একই রকম। অস্বীকার, প্রমাণ লোপাট বা দুর্বল করার চেষ্টা, তদন্তে গড়িমসি, আর নির্যাতিতার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা। আমাদের সমাজব্যবস্থাই পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধের স্বাভাবিকীকরণ ঘটায়। এই সমাজব্যবস্থাই নারীর শরীর, চলাচল আর শ্রমের ওপর পুরুষের নিয়ন্ত্রণকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শেখায়। আর রাষ্ট্রযন্ত্র সেই একই যুক্তিতে চলে।

এখানেই আসল সমস্যাটা লুকিয়ে আছে। এটা কেবল তদন্তের দুর্বলতা নয়, এটা একটা কাঠামোগত সমস্যা। যে প্রতিষ্ঠান নিজেই অপরাধে জড়িত বা যার সদস্য অপরাধী, সেই প্রতিষ্ঠানের কাছেই তদন্তের ভার দিলে ফলাফল অনুমেয়। পুলিশ যখন নিজেদের সহকর্মীকে বাঁচাতে চায়, সেনাবাহিনীর কেউ জড়িত থাকলে যখন প্রভাবশালী মহল রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়ায়, তখন ন্যায়বিচার নির্ভর করে কেবল জনতার সহনশক্তির ওপর। আর সেই সহনশক্তি সবসময় টেকে না। রামিসার বাবা তো নিজেই বলেছিলেন, বিচারের আশা তিনি করেন না।

তিরিশ বছর পর আজ প্রশ্ন তোলা জরুরি যে, শুধু আরেকটি প্রতিবাদ মিছিল নয়, দরকার প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা। যে বাহিনীর সদস্য অপরাধে জড়িত, তার তদন্তভার স্বাধীন কোনো সংস্থার হাতে দেওয়া, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল কার্যকর রাখা, ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, নির্যাতিতাকে নয়, অপরাধীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সংস্কৃতি তৈরি করা। যতদিন না রাষ্ট্র নিজে থেকে সাড়া দিতে শিখবে, ইয়াসমিনের নাম কেবল একটি স্মৃতিদিবসের নাম হয়েই থেকে যাবে, বাস্তবতা বদলাবে না।

নাজিয়া আফরিন: শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত