ইয়াসমিন হত্যার ৩১ বছর: কমেনি নারীর প্রতি সহিংসতা, বরিশালে গণপ্রতিরোধের আহ্বান

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
বরিশাল

নারী নির্যাতন ও প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে বরিশাল সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের মানববন্ধন। ছবি: সংগৃহীত
নারী নির্যাতন ও প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে বরিশাল সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের মানববন্ধন। ছবি: সংগৃহীত

আজ ২৪ আগস্ট ‘নারী নির্যাতন ও প্রতিরোধ দিবস’। ইয়াসমিন হত্যার ৩১ বছর পরও দেশে নারী নির্যাতন বন্ধ হয়নি, বরং ধর্ষণ, হত্যা ও পারিবারিক সহিংসতাসহ নানা ধরনের নির্যাতন বেড়েই চলেছে। এ পরিস্থিতিতে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে বরিশাল সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম।

সোমবার (২৪ আগস্ট) দিবসটি উপলক্ষে বরিশাল সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক মানববন্ধন থেকে এ আহ্বান জানানো হয়।

১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট কিশোরী ইয়াসমিনকে পুলিশ সদস্যরা পুলিশ ভ্যানে তুলে দিনাজপুরের দশমাইল এলাকায় ধর্ষণের পর হত্যা করেন। এরপর তার লাশ রাস্তার পাশে ফেলে চলে যান। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন দিনাজপুরের মানুষ। দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের দাবিতে উত্তাল দিনাজপুরে আন্দোলনরত জনতার ওপর গুলি চালায় পুলিশ। এতে সামু, কাদের, সিরাজসহ নাম না জানা আরও সাতজন নিহত হন।

ইয়াসমিন হত্যার বিচার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন পরে দেশে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত হয়। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এই ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রতিবছর ২৪ আগস্ট দিনটি ‘নারী নির্যাতন ও প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। তবে দিনাজপুরের মানুষ দিবসটিকে ‘ইয়াসমিন হত্যা দিবস’ হিসেবেই পালন করে থাকেন।

ইয়াসমিন হত্যা মামলায় তিন পুলিশ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড হয়। ২০০৪ সালে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে ইয়াসমিন হত্যার পরও দেশে নারী ও শিশুর ওপর নির্যাতনের ঘটনা থামেনি। দিবসটি উপলক্ষে বরিশালে আয়োজিত কর্মসূচিতে বক্তারা জানান, শুধু আইন করে নারী নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব নয়। অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও শাস্তির পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের নেত্রী মনীষা চক্রবর্তী বলেন, ইয়াসমিন হত্যা মামলায় তিনজনের ফাঁসি হয়েছে। কিন্তু ধর্ষণ বন্ধ হয়নি, উল্টো ধর্ষণসহ নারী নির্যাতনের ঘটনা বেড়েই চলেছে।

তিনি বলেন, ১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা মানিকের ধর্ষণের ঘটনাকে সেঞ্চুরি হিসেবে উদযাপন করতে দেখা গেছে। কল্পনা চাকমাকে অপহরণের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় পাওয়ার চর্চা ছিল। কোনো সরকারই নারী নির্যাতন বন্ধে স্থায়ী ও দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়নি।

মনীষা চক্রবর্তী জানান, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে অন্তত এক হাজার নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এ সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৬০০ হয়েছে। একই সময়ে শিশু নির্যাতনের ঘটনাও দ্বিগুণ হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ৬০০ শিশু নির্যাতনের শিকার হলেও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এ সংখ্যা অন্তত ১ হাজার ২০০। পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, নির্যাতনের ঘটনা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। গণআন্দোলন ছাড়া এই নির্যাতন দমন করা সম্ভব নয়। তাই নারী নির্যাতনের প্রতিবাদে সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বক্তারা জানান, নারী নির্যাতন এখন শুধু ঘরের ভেতরের বিষয় নয়। কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণপরিবহন ও রাস্তাঘাটেও নারীরা হয়রানি ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এর সঙ্গে রয়েছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য। তারা সম্পত্তিতে নারীর সমান উত্তরাধিকার, সমান মজুরি এবং সমাজের সব ক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করার দাবি জানান।

তাদের মতে, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধকে শুধু দিবসকেন্দ্রিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত, বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত