জ্বালানি কেনায় বৈচিত্র্যহীন উৎসে আটকা বাংলাদেশ

স্ট্রিম গ্রাফিক

ইরানে মার্কিন-ইসরাইল হামলার পর থেকে বিশ্বজুড়ে দেখা দিয়েছে জ্বালানির ঘাটতি। আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে সেই চাপে ধুঁকছে বাংলাদেশও। বিশ্লেষকেরা বলছেন, জ্বালানি আমদানির উৎসের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যহীনতায় আটকে আছে বাংলাদেশ। ভবিষ্যতে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করতে বাংলাদেশকে নতুন উৎস খুঁজতে হবে।

জ্বালানির এই সংকট এখনই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয় বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী। পাশাপাশি, যেসব দেশ সস্তায় জ্বালানি তেল বিক্রি করে, তাদের থেকে কেনা বাংলাদেশের জন্য এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যারা সস্তায় জ্বালানি দেবে, তাদের থেকে কিনতে পারব কি না, সেটাই বড় চ্যালেঞ্জ। যেমন, বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বিষয়টি আছে—এটা স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত অন্য দেশের সঙ্গে নতুন চুক্তি করা কঠিন।’

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি আমলে নিয়েই জ্বালানির বহুমুখী উৎসগুলো কী হবে, সেগুলো নিয়ে বিশদভাবে চিন্তা করা উচিত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা যেন অন্তত ৮–১০টি উৎস থেকে জ্বালানি নিতে পারি, সেভাবে পরিকল্পনা নিতে হবে। জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে যদি বৈচিত্র্য আনা যায়, তাহলে ঝুঁকি কমবে। যেখানে দিনে দিনে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) চাহিদা বাড়ছে, সেখানে দুটি দেশের মধ্যে আটকে থাকলে তা বড় ঝুঁকির কারণ হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের জ্বালানি-সংক্রান্ত ও সরবরাহের চুক্তিগুলো দীর্ঘমেয়াদি। এসব চুক্তি বাতিল কিংবা নতুন করে করাও কঠিন। যেমন, বাংলাদেশের এলএনজির চুক্তি কাতার ও ওমানভিত্তিক। এই দুই রাষ্ট্রই যখন সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তখন আমাদের বিকল্প থাকে না।’

তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ যদি ফের শুরু হয়েও যায়, তবুও জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা অব্যাহত রাখতে হবে। কারণ, এক জায়গায় বেশি মনোযোগ সব সময় ঝুঁকি তৈরি করে। আমরা এলএনজির ক্ষেত্রে মাত্র দুটি দেশের ওপর নির্ভরশীল। যদি বিভিন্ন দেশ থেকে অল্প অল্প করে আনতাম, তাহলে দুটি দেশ বন্ধ হয়ে গেলেও সমস্যা হতো না। কিন্তু এখন দুই দেশই পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। ফলে আমাদের কোনো বিকল্প নেই।’

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬৩ শতাংশই ডিজেল। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ডিজেলের চাহিদা ছিল প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন। এর বড় অংশ সরাসরি আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়। আর বছরে সাত থেকে সাড়ে সাত লাখ টন পাওয়া যায় অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে।

জ্বালানি সংকটের জন্য কেবল যুদ্ধ দায়ী নয়

কেবল যুদ্ধের কারণেই বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট হচ্ছে বলে মনে করেন না কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম। তিনি বলেন, ‘বাস্তবিক অর্থে আমাদের সমস্যা যুদ্ধ নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি এটা না বোঝে, তাহলে সমস্যার সমাধান করতে পারব না। যদি আজ যুদ্ধ না-ও হতো, আমরা এই সংকটের মধ্যে ছিলাম এবং গ্রীষ্মে আরও তীব্র হতো। গত বছরও হয়েছিল। এখনো গ্রীষ্ম ঠিকমতো আসেনি।’

পরিস্থিতি সামলাতে সঠিক পরিকল্পনার পরামর্শ দিয়ে অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘ব্যয় কমিয়ে আনার জন্য সরকারকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) নির্দেশ দিতে হবে। বিইআরসি সঠিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা কমানো সম্ভব, অর্থাৎ বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা যাবে।’

ক্যাব সভাপতি বলেন, ‘দেশে তেলভিত্তিক বিদ্যুতের দরকার নেই। আমাদের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৭ হাজার মেগাওয়াটের ওপর। এটি গত বছরে ৪৫ শতাংশ সক্ষমতায় চলেছে। এটি ৯০ শতাংশ পর্যন্ত চালানো যায়। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ বন্ধ করে যদি আমরা কয়লার সরবরাহ বাড়াই, তাহলে পূর্ণ সক্ষমতায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ব্যবহার করা সম্ভব। এতে তেলভিত্তিক বিদ্যুতের চেয়েও বেশি উৎপাদন সম্ভব হবে। তখন আদানির বিদ্যুতেরও প্রয়োজন হবে না।’

তিনি বলেন, ‘এ ছাড়া ছাতক ও ইস্ট হরিপুর গ্যাসক্ষেতে প্রায় এক ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট (টিসিএফ) গ্যাস মজুদ আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সরকার যদি বাপেক্সকে নির্দেশ দেয়, তাহলে তারা এই গ্যাস উত্তোলন করে প্রায় ৩ টাকা প্রতি এমসিএফ মূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস সরবরাহ করতে পারে। এতে চার–পাঁচ বছর জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।’

এ ছাড়া শুধু জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল না থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে মনোযোগ দিতে হবে বলেও জানান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী। ঢাবির এই অধ্যাপক অভিযোগ করেন, অনেক দিন ধরেই এ কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু এই খাতে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এই বিকল্প উৎসগুলো নিয়ে এখন গুরুত্বসহকারে ভাবার সময় এসেছে।

শামসুল আলম বলেন, আগামী তিন–সাড়ে তিন বছরে যদি ব্যাপক উন্নয়ন করা হয়, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ সম্ভব। পাশাপাশি সাপ্লাই ও ডিমান্ড সাইডে দক্ষতা উন্নয়ন এবং জ্বালানি সংরক্ষণের মাধ্যমে ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত এনার্জি সাশ্রয় করা যাবে। এভাবে গ্রিডের ২৫ শতাংশ বিদ্যুৎ চাহিদা কমিয়ে জ্বালানি আমদানিও ২৫ শতাংশ কমানো সম্ভব।

সরকার যা বলছে

সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, ডিজেল আমদানির উৎস এখন অনেক। জিটুজি চুক্তির পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রেও ডিজেল কেনা হচ্ছে। ফলে সরবরাহে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা কমেছে। ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে পাইপলাইনে সহজেই ডিজেল আনা যাচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা ব্রুনেই থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টন তেল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করছি। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকেও আমদানি করা যাবে। এতে আমদানির উৎসে আরও বৈচিত্র্য আসবে।’

বাংলাদেশের জ্বালানি মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর হলেও মূল উৎস মধ্যপ্রাচ্য নয় বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী। তবে মধ্যপ্রাচ্য অচল হলে পুরো জ্বালানি সরবরাহই অচল হয়ে যাবে বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা।

শনিবার (১১ এপ্রিল) তিনি বলেন, জ্বালানির উৎসকে আমরা বহুমুখীকরণ ও বৈচিত্র্যকরণের কাজ করছি। হরমুজ প্রণালী দিয়ে পৃথিবীর ২০ শতাংশ জ্বালানি আসে। আমরা সেখান থেকে শুধু অপরিশোধিত তেল আনি, বাকিটা প্রায় পুরোটাই বাইরে থেকে আসে। বাংলাদেশের মূল উৎস আসলে মধ্যপ্রাচ্য নয়, কিন্তু এটি মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। কারণ, আমরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে না আনলেও চীন কিংবা মালয়েশিয়া যারা পরিশোধন করে, তারা মধ্যপ্রাচ্য থেকেই এনে করে। ফলে বৈচিত্র্য খুঁজলেই হবে না—মধ্যপ্রাচ্য অচল হলে সবাই অচল হয়ে যাবে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এই যুগ্মসচিব আরও বলেন, ‘আমরা আমাদের বৈচিত্র্য খুঁজছি। আমরা আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা—সবার সঙ্গেই চেষ্টা করছি। রাশিয়াও আছে। কিন্তু এটি অনেকটাই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর। আমাদের অন্যান্য উৎসগুলোর সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) আছে। আমরা চেষ্টা করছি, কিন্তু কমবেশি সবাই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। প্রায় সব দেশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল নিয়ে পরিশোধন করে। বিশেষ করে দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো, যেখান থেকে আমরা পরিশোধিত তেল আনি। আমরা এখন আফ্রিকার আলজেরিয়া, মধ্য এশিয়ার কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তানের সঙ্গেও এমওইউ করছি।’

সম্পর্কিত