কালশীর ছাইস্তূপে নিরানন্দ ঈদ, সর্বস্বান্ত শত পরিবার

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ২৮ মে ২০২৬, ২০: ৫২
পুড়ে যাওয়া কালশীর বস্তি। স্ট্রিম ছবি

ঈদের দিন যেখানে নতুন পোশাক আর ভালো খাবারের আনন্দে মেতে ওঠার কথা, সেখানে রাজধানীর কালশী বস্তির (বাউনিয়াবাঁধ) চিত্র ছিল একেবারেই ভিন্ন। আগুনে সব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে, পলিথিন আর ত্রিপলের নিচে দিন কেটেছে শত শত পরিবারের।

গত সোমবার (২৫ মে) আগুনে মুহূর্তেই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে নিম্ন আয়ের এই মানুষদের বেঁচে থাকার সম্বল ও ঈদের স্বপ্ন।

ঈদের দিন বিকেলে (বৃহস্পতিবার) ক্ষতিগ্রস্ত বস্তির বাসিন্দা তানিয়া আক্তার বলেন, ‘ঈদ নিয়ে তো সবারই অনেক স্বপ্ন থাকে। আমরা নিম্ন আয়ের মানুষ, সামর্থ্য অনুযায়ী বাচ্চাদের জন্য দু-একটা নতুন কাপড় কিনেছিলাম। কিন্তু একদম কেউ কিছু বের করতে পারে নাই। যার গায়ে যেটা ছিল, ততটুকুই সম্বল। আজকে যে ঈদ, এটা আমাদের মনেই নাই।’

ক্ষতিগ্রস্ত নাজমা বেগম জানান, আগে যেখানে আড়াই হাজার টাকায় রুম ভাড়া পাওয়া যেত, অগ্নিকাণ্ডের পর আশপাশের এলাকায় তা ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা চাইছে। থাকার জায়গা না থাকায় অনেকেই ত্রিপল টাঙিয়ে বা আত্মীয়স্বজনের বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন।

সব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে থাকা এই মানুষগুলোর ঈদের দিনটি কেটেছে সরকারি খাবার ও আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের পক্ষ থেকে খাবার ও নগদ অর্থ সহায়তা পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।

আর্থিক সহায়তার বিষয়ে তিনি ও আরেক ক্ষতিগ্রস্ত নারী জাহানারা বেগম বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি রুমের জন্য ১০ হাজার টাকা করে নগদ অর্থ দেওয়া হয়েছে।পরিবার নয়, এক রুমে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। ধরেন আমার ৯টা বা ১২টা রুম ছিল, সেখানে থাকা ৯ জনই এই টাকা পেয়েছে।’

এ ছাড়া, পুনর্বাসনের বিষয়ে আমিনুল হক তাদের আশ্বস্ত করেছেন জানিয়ে নাজমা বলেন, তিনি বলে গেছেন—যে যেখানে আছেন সে সেখানেই থাকবেন, পুনর্বাসন না দেওয়া পর্যন্ত এখান থেকে নড়বেন না।

বস্তির অনেকেই ঈদ কাটিয়েছেন খোলা আকাশের নিচে। স্ট্রিম ছবি

অগ্নিকাণ্ডে ঘর পোড়ার ভয়াবহতা সম্পর্কে নাজমা বেগম বলেন, একটি বাড়িতে ১৫, ২০ বা ২৫টা করে রুম। মিন্টু, লালু, খোকন, রাজ্জাক হুজুর, কাজল মাঝিসহ অন্তত ১৪ জনের বাড়ি পুড়েছে। সব মিলিয়ে ৪০০-৫০০ রুম পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

২০-২২ বছর ধরে বসবাস করা জাহানারা বেগম জানান, একসময় এখানে জলাশয় ছিল, মাচা পেতে তার ওপর ঘর তুলেছিলেন তারা। ৫-৬ বছর আগের এক অগ্নিকাণ্ডে তার দুটি গরু মারা গিয়েছিল, আর এবারের আগুনে পুড়েছে ছয়-সাতটি ঘর ও দুটি দোকান। শরীয়তপুর থেকে আসা সুফিয়া এবং লালু বাড়ির আরেক বাসিন্দা জানান, এই বস্তিতে গত ২০-২২ বছরে অন্তত দুবার এমন ভয়াবহ আগুন লেগেছে।

একটি চুরি যাওয়া টিনের দরজার বিচার চাওয়ার জেরেই এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে বলে জানান কয়েকজন বস্তিবাসী।

আঞ্জু বেগম জানান, নাজমুল নামের এক তরুণ অন্যের একটি টিনের দরজা চুরি করে বিক্রি করে দেয়। এর বিচার নাজমুলের বাবার কাছে দেওয়ায় সে ক্ষিপ্ত হয়।

আঞ্জু বেগম বলেন, ‘দোকানের সামনে এসে সে গালাগালি করে এবং ছুরি বের করে আমাকে গলা চেপে ধরে। পরে হুমকি দিয়ে যায় যে আজই দোকান পুড়িয়ে দেবে।’

তানিয়া আক্তার বলেন, ‘বিচার দেওয়ায় সে হুমকি দিয়ে বলে, এক ঘণ্টার ভেতরে পুড়িয়ে ছাই করে দেব।আর ঠিক এক ঘণ্টার মধ্যেই সে আগুন লাগিয়ে দেয়।

আগুনের সূত্রপাতের পর নাজমুলকে হাতেনাতে ধরার বর্ণনা দিয়ে হাজেরা বেগম বলেন, ‘মেডিকেল থেকে ফিরে পান বানাচ্ছিলাম, তখন শুনি আগুন। ঘর থেকে বের হয়ে দেখি আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে, চারপাশ আলো হয়ে গেছে। নাতনিকে রাস্তায় ফেলে আমি দৌড়ে গিয়ে নাজমুলের কলার চেপে ধরি। পরে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।’

স্থানীয় নারীরা জানান, নাজমুল আগেও অন্তত তিনবার এমন ঘটনা ঘটিয়েছে। মাদকাসক্তরাই মূলত এসব আগুন লাগানোর ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকে বলে অভিযোগ তাদের।

সম্পর্কিত