কক্সবাজারে তলিয়েছে চার হাজার পুকুর-ঘের, শত চাষির সর্বনাশ

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
কক্সবাজার

প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৬, ১৩: ০৪
কক্সবাজারে কমতে শুরু করেছে বন্যার পানি। এতে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে পানিতে তলিয়ে যাওয়া মাছের ঘেরের পাড়। ছবি : স্ট্রিম

টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যায় কক্সবাজারে প্রায় চার হাজার পুকুর ও ঘের তলিয়ে গেছে। এতে মাছ, চিংড়ি, পোনা ও পোস্ট লার্ভা (পিএল) ভেসে আনুমানিক ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। পথে বসার উপক্রম হয়েছে শত শত চাষির।

জেলা মৎস্য বিভাগের প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যায় জেলার তিন হাজার ৯১৮টি পুকুর ও ঘের ভেসে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত জলাশয়ের পরিমাণ পাঁচ হাজার ২৫৪ একর। এতে ৭৬৮ মৎস্যচাষি সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সব মিলিয়ে মৎস্য খাতে প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণ ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্যার পানিতে এক হাজার ৯৭ টন বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, ৩৮৫ টন চিংড়ি, তিন লাখ ৫৬ হাজার পোনা এবং ২২১ লাখ পোস্ট লার্ভা (পিএল) ভেসে গেছে। এর মধ্যে মাছে ১৯ কোটি ২৩ লাখ, চিংড়িতে ১২ কোটি ৬২ লাখ, পোনায় পাঁচ কোটি ১০ লাখ এবং পিএলে এক কোটি ৬০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উখিয়া উপজেলা। সেখানে ৭৩০টি পুকুর ও ঘেরের দুই হাজার একর জলাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৬৫২ টন মাছ, ১৬২ টন চিংড়ি এবং বিপুল পরিমাণ পোনা ও পোস্ট লার্ভা (পিএল) ভেসে যাওয়ায় জেলার মোট ক্ষতির প্রায় এক-তৃতীয়াংশই হয়েছে এই উপজেলায়।

এরপরই রয়েছে মহেশখালী। সেখানে ১০৫টি পুকুর মিলিয়ে এক হাজার ৯৬৫ একর জলাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ ছয় কোটি ৬৩ লাখ টাকার। এ ছাড়া চকরিয়ায় ক্ষতির পরিমাণ ছয় কোটি ৩ লাখ, মাতামুহুরীতে পাঁচ কোটি ৬৭ লাখ, টেকনাফে পাঁচ কোটি ১৪ লাখ, কক্সবাজার সদরে চার কোটি ৪৪ লাখ, পেকুয়ায় দুই কোটি ১০ লাখ, ঈদগাঁওয়ে এক কোটি ৫ লাখ এবং রামুতে ৪২ লাখ টাকা।

মহেশখালীর মৎস্যচাষি শরীফুল আলম বলেন, ‘এদিকের অধিকাংশ পুকুরের বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় মাছ পানির সঙ্গে বেরিয়ে গেছে। কাদায় পুকুর ভরে গেছে। পানি অতিরিক্ত লবণাক্ত হয়ে যাওয়ায় এখনই পোনা ছাড়া যাচ্ছে না। যেসব চাষিরা ব্যাংক বা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে মাছ চাষ করেছিলেন, তারা সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন।’

চকরিয়ার মাছচাষি মনির উদ্দিন বলেন, ‘পুকুরের বাঁধ ভেঙে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এক বছর ধরে পরিচর্যা করা সব মাছ ভেসে গেছে। নতুন করে চাষ শুরু করতে হলে পুকুর সংস্কার, পোনা ও খাদ্যের জন্য অনেক টাকা লাগবে। এখন এত টাকা কোথা থেকে জোগাড় করব।’

বাঁধ উপচে বন্যার পানি ঢুকে পড়ছে মৎস্যঘেরে। ছবি : স্ট্রিম

উখিয়ার রাজাপালং এলাকার চাষি মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘ঋণ নিয়ে মাছ চাষ করেছিলাম। বন্যায় এক রাতেই সব শেষ হয়ে গেছে। মাছ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা ছিল, এখন সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারের জরুরি সহায়তা না পেলে আমাদের আর ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না।’

মহেশখালীর ধলঘাটা এলাকার চিংড়িচাষি নুরুল ইসলাম বলেন, ‘কয়েক মাসের পরিশ্রম একদিনেই শেষ হয়ে গেছে।’

পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া এলাকার জসিম উদ্দিন বলেন, ‘বন্যার পানি নামলেও এখনই পোনা ছাড়তে পারব না। পুকুরে কাদা জমে আছে, পানিও খারাপ। আগে পুকুর পরিষ্কার করতে হবে। আমাদের মতো ক্ষুদ্র চাষিদের সরকার বিনামূল্যে পোনা ও খাদ্য সহায়তা দিলে আবার উৎপাদনে ফিরতে পারব।’

বন্যায় মৎস্য সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের মুখপাত্র আবিদ আহসান সাগর বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের দ্রুত পুনর্বাসন, ভর্তুকি মূল্যে পোনা ও মাছের খাদ্য বিতরণ, স্বল্পসুদে ঋণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর-ঘের পুনঃসংস্কারে সরকারি সহায়তা জরুরি। নাহলে আগামী মৌসুমে মাছ উৎপাদন কমে যেতে পারে।

কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হুদা বলেন, বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের মধ্যে সরকারি সহায়তা বিতরণ করা হবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত