রক্তস্নাত ৫ আগস্ট

গণবিস্ফোরণ থেকে স্বৈরাচারের পতন

স্ট্রিম গ্রাফিক

গুমোট রাতের পর অনিশ্চিত ভোর। সাঁজোয়া যানসহ গাড়িবহর নিয়ে একটু পরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল। গা ছমছম সেই পরিবেশেও মধ্যে বাড়ির মূল ফটকে, গলির মুখে, বড় সড়কের মাথায় মানুষের উঁকিঝুঁকি। লক্ষ্য একটাই¬– যেতে হবে জাতির কাঁধের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা শাসকের বাসভবনে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকাল ছিল এমনই। কারফিউ, দেখামাত্র গুলির ভয়, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা– কোনো কিছুই শেষ পর্যন্ত বাধা হতে পারেনি। বেলা গড়াতেই ছাত্র-জনতার উত্তাল স্রোত আছড়ে পড়ে রাজধানীর বুকে। এতেই দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের একচ্ছত্র ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালান শেখ হাসিনা। জন্ম হয় এক নতুন সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের।

তার পদত্যাগের খবর পেতেই বাঁধভাঙা আনন্দের জোয়ার ভাসে দেশজুড়ে। উল্লাসরত হাজার হাজার মানুষ ঢুকে পড়ে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবন, তার কার্যালয় ও সংসদ ভবনে। জনতার ক্ষোভের আগুনে পোড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়ি, অফিসসহ বিভিন্ন স্থাপনা।

রক্তাক্ত স্মৃতি

দুপুরের মধ্যেই শেখ হাসিনার পতন হলেও আন্দোলনকারীদের জন্য ৫ আগস্ট ভোর মোটেই সহজ ছিল না। রাতভর ছিল আশঙ্কা, উৎকণ্ঠা আর লড়াইয়ের প্রস্তুতি।

আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সেই রাতের স্মৃতিচারণ করে স্ট্রিমকে বলেন, ‘৪ আগস্ট লং মার্চ ঘোষণার পর তো আর ঘুম হয় নাই। সারারাত খোঁজখবর নিচ্ছিলাম যে সারা দেশ থেকে মানুষ আসতেছে কিনা। অনেকে ছবি দিচ্ছিলেন যে আসতেছে বাসে করে, ট্রাকে করে। বোঝার চেষ্টা করছিলাম, কাল আসলে পতন করা সম্ভব হবে কিনা। পুলিশ-সেনাবাহিনী কী অবস্থান হবে, তারা গুলি করবে কি করবে না—সবকিছু মিলিয়ে একটা শঙ্কার মধ্য দিয়ে পুরো রাতটা গেছে।’

সকালে মগবাজার থেকে সহযোদ্ধাদের নিয়ে পুরান ঢাকা হয়ে চানখাঁরপুলের দিকে রওনা হন আসিফ মাহমুদ। শাহবাগে জমায়েত হওয়ার কথা থাকলেও রাস্তায় রাস্তায় ছিল পুলিশি ব্যারিকেড ও দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত ছাত্রলীগ-যুবলীগের মহড়া। চানখাঁরপুলে পৌঁছে তারা মুখোমুখি হন এক ভয়াবহ দৃশ্যের।

আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘চানখাঁরপুলে এসে দেখলাম খুব ভয়ানক দৃশ্য। পুলিশ মোড় থেকে চারদিকে যতগুলো গলি আছে সব গলিতে গুলি করছে। মানুষ জড়ো হয়ে আছে, কিন্তু কেউ যেতে পারতেছে না। আমার সামনেই নাজিমউদ্দিন রোডে শহীদ আনাসসহ পাঁচজন শহীদ হন।’

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ দুই ঘণ্টা পুলিশের গুলির মুখে ইট-পাটকেল ছুড়ে লড়াই চালায় ছাত্র-জনতা। আহতদের ধরাধরি নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল মিটফোর্ড হাসপাতালে। এরমধ্যেই খবর আসে রাজনৈতিক দলগুলোকে সেনানিবাসে ডাকা হয়েছে এবং সেনাপ্রধান ভাষণ দেবেন। হয়তো মার্শাল ল (সামরিক শাসন) জারি হতে পারে।

এরপর গোলাগুলির মধ্যেই লাইভ করে আসিফ মাহমুদ ঘোষণা দেন, ‘কোনো ধরনের মার্শাল ল আমরা মেনে নেব না। সামরিক শাসন মেনে নেওয়া হবে না। আমরা গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা চাই।’

একই সময়ে রাজধানীর আরেক প্রবেশমুখ যাত্রাবাড়ীর কাজলা মোড়ে চলছিল মুখোমুখি সংঘর্ষ। জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টির (জেডিপি) আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ সেই সময়ের ভয়াবহতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে স্ট্রিমকে বলেন, ‘৫ আগস্ট আমরা যাত্রাবাড়ীর কাজলা মোড়ে অবস্থান নিয়েছিলাম। এরমধ্যে খবর এলো— হাসিনা পালিয়ে গেছে। তবে অবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বিষহ। একদিকে সবাই স্লোগান দিচ্ছিল– পালাইছে রে পালাইছে, খুনি হাসিনা পালাইছে! অন্যদিকে তখনও যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ দিগ্‌বিদিক গুলি ছুড়ছিল। অসংখ্য আহত ও নিহত ব্যক্তিকে ভ্যানে করে আবাবিল হাসপাতালের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।’

লংমার্চের দিনে ছাত্র-জনতার ত্যাগের কথা উঠে আসে তরুণ আন্দোলনকারী রায়হান আহমেদ তামীমের স্মৃতিচারণেও। আগের রাতে এক স্ট্যাটাসে লক্ষাধিক টাকা ক্রাউড ফান্ডিং তুলে খাবার ও পানির ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, সকালে বন্ধু ও সংবাদকর্মী শেখ ফরিদের সঙ্গে শাহবাগের উদ্দেশে বের হয়ে ধানমন্ডিতে পুলিশের হাতে আটক হই। আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় ধানমন্ডি থানায়। সেখানে প্রায় ৩০ জন আন্দোলনকারীকে একসঙ্গে হাজতে আটকে রাখা হয় এবং পরে তোলা হয় প্রিজন ভ্যানে। তবে ভ্যানে তোলার ১০ মিনিট পর অলৌকিকভাবে বদলে যায় দৃশ্যপট। শেখ হাসিনার পতনের খবর ছড়াতেই পুলিশ তাদের ছেড়ে দেয়।

গণভবনের পতন

আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ জানান, চানখাঁরপুলে যখন মৃত্যুর মুখোমুখি ছাত্ররা, ঠিক তখনই যাত্রাবাড়ীর দিক থেকে আসা বিশাল মিছিল পরিস্থিতি বদলে দেয়। বিশাল মিছিল দেখে পুলিশ চানখাঁরপুল ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। সেখান থেকে সোজা শাহবাগে পৌঁছান তিনি। গিয়ে দেখেন লাখ লাখ মানুষের মহাসমুদ্র। প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম একটি রিকশার ওপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। তিনি সেই রিকশায় উঠে পড়েন। সেখান থেকে তাদের নেতৃত্বে মিছিল চলতে থাকে গণভবনের দিকে।

তিনি বলেন, ফার্মগেটের কাছাকাছি পৌঁছাতেই এক সাংবাদিকের ফোনে খবর আসে— শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। দুই-তিনটি ফোনে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে বিজয়ের খবর।

অবশ্য আসিফ মাহমুদ, নাহিদ ইসলামসহ শাহবাগ থেকে যাওয়া দলের আগেই গণভবনে পৌঁছে যায় উত্তরা ও মিরপুর-মোহাম্মদপুর থেকে আসা দুটি মিছিল।

এর আগে শেখ হাসিনা আকাশপথে ভারতের উদ্দেশে দেশ ছাড়েন। হাসিনাপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় পরে সংবাদমাধ্যমকে জানান, শেখ হাসিনা আর রাজনীতিতে ফিরবেন না। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, তার এখানেই শেষ। আমার পরিবার এবং আমি—আমাদের যথেষ্ট হয়েছে।’

সেনাসদর থেকে বঙ্গভবন

শেখ হাসিনার পতন হলেও সামনে ছিল দীর্ঘপথ। দেশ পরিচালনার রূপরেখা নিয়ে সেনানিবাসে বসেন সেনাপ্রধানসহ দেশের বাকি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। তবে সেখানে ছিলেন না ছাত্র সমন্বয়করা।

এ নিয়ে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আমরা একটু বিরক্তই ছিলাম পলিটিক্যাল পার্টিগুলোর ওপরে, তারা কেন বঙ্গভবনে গেল, তারা তো আমাদের সঙ্গে বসেই সিদ্ধান্ত নিতে পারত। তারা সেনানিবাসে যাওয়ার মধ্য দিয়ে মিলিটারি এস্টাবলিশমেন্টকে দেশের ভাগ্য নির্ধারণের একটা লেজিটিমেসি দিয়ে আসে।’

এরপর সমন্বয়করা ৫ আগস্ট মধ্যরাতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে প্রস্তাব করে ভিডিও বার্তা দেন। ৬ আগস্ট সকালে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান সমন্বয়কদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং দ্রুত সরকার গঠনের জন্য বসার আহ্বান জানান।

আসিফ মাহমুদ জানান, তারা সেনানিবাসে বসতে অস্বীকৃতি জানানোর পাশাপাশি জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করার দাবি জানান। পরে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন সংসদ ভেঙে দিলে ওই দিন সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে শুরু হয় দীর্ঘ ও রুদ্ধদ্বার বৈঠক।

বৈঠকের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘উনারা (সেনাবাহিনী) চাচ্ছিলেন ডক্টর ইউনূস যেন প্রধান উপদেষ্টা না হন। তারা নাম বলেছিলেন– সালেহউদ্দিন আহমেদ, ড. আসিফ নজরুলের। বাট ড. ইউনূসকে কোনোভাবেই চাচ্ছিলেন না। এটা নিয়ে দীর্ঘ ৩ ঘণ্টার মতো ডিসকাশন হয় এবং শেষ পর্যন্ত তারা মানতে বাধ্য হন। এরপর রাষ্ট্রপতি নিজেই ড. ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করার ঘোষণা দেন এবং লিয়াজোঁ কমিটির মাধ্যমে সব রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়, যা ৮ আগস্ট শপথ গ্রহণ করে।’

গণঅভ্যুত্থান কেন, সামনে কী

৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি তাৎক্ষণিক ঘটনার ফসল নয়, এটি এর আগের প্রায় ১৬ বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও লুণ্ঠনমুখী শাসনব্যবস্থার যৌক্তিক পরিণতি— এমনটাই মনে করেন কবি, সংগীতশিল্পী ও চিন্তক অরূপ রাহী।

ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে অরূপ রাহী বলেন, পাঁচ তারিখের আগের প্রতিটা দিনই ছিল এমন– যেকোনো সময় যেকোনো কিছু ঘটতে পারে। এরমধ্যেই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন রূপ নেয় এক দফায়। সব জায়গা থেকেই এই দাবি ওঠে।

তিনি শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগকে এই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, ‘আবু সাঈদের শহীদ হওয়াটা, সেটাকে এই অভ্যুত্থানের নির্ধারক ঘটনা বলা যায়। আমার ধারণা ছিল, এই আবু সাঈদের মৃত্যু মানেই হচ্ছে শেখ হাসিনার পতন নিশ্চিত হয়ে গেল এবার। কারণ, এর আগে মানুষের সাহসটা পরিষ্কার হয়ে গেছে, মানুষ সেটা মানবে না। এক দফায় মানুষ পৌঁছে গেছে।’

এই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত তুলে ধরে অরূপ রাহী বলেন, ‘তবে এই গণঅভ্যুত্থান আসলে কোনো এক সপ্তাহ বা দুই সপ্তাহের আন্দোলনের ফলাফল নয়। আবু সাঈদসহ অসংখ্য শহীদের মৃত্যু সেটাকে অবশ্যম্ভাবী করছে। কিন্তু এটাও ঠিক, গত ১৫ বছরের শেখ হাসিনা সরকারের শাসন, দমন, নিপীড়ন, নির্যাতন, গুম, ক্রসফায়ার, লুণ্ঠন, চাঁদাবাজি ও অর্থপাচারের বিরুদ্ধে মানুষ নানাভাবে প্রতিবাদ করে আসছিল। রাতের ভোটসহ বহু রকমভাবে মানুষের অধিকার বঞ্চিত করে সরকার টিকে ছিল। যখন সেটা এমন জায়গায় গেল যে তাকে গণহত্যা করতে হচ্ছে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য, তখন মানুষ তার সর্বস্ব দিয়ে রাজপথে নেমে এসেছে।’

ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গঠনের রূপরেখা নিয়ে তিনি বলেন, আমাদের এমন একটা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যার মধ্য দিয়ে বৈষম্যহীন, মানবিক মর্যাদার ও ন্যায়-ইনসাফের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবে। তবে এখানকার পুঁজিবাদের যে ধরন, তা লুণ্ঠনধর্মী বা উত্তর-ঔপনিবেশিক। এই লুণ্ঠনতান্ত্রিক কাঠামো না ভাঙলে পূর্ণাঙ্গ মুক্তি সম্ভব নয়।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত