সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল/৪ বছরেও হয়নি পূর্ণাঙ্গ চালু, ‘কোম্পানি কাঠামোয়’ স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবাই চ্যালেঞ্জ

জনবল ও পরিচালনা সংকট কাটাতে কোম্পানি কাঠামোয় যাচ্ছে বিএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক
জনবল ও পরিচালনা সংকট কাটাতে কোম্পানি কাঠামোয় যাচ্ছে বিএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী রোগীর চাপ কমাতে রাজধানীর শাহবাগে নির্মাণ করা হয়েছে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল। চার বছর আগে উদ্বোধন হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি হাসপাতালটি। পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও সহায়ক জনবলের অভাব, পরিচালন কাঠামোর জটিলতা এবং প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতায় এতদিন সীমিত পরিসরেই চলছে হাসপাতালটির কার্যক্রম। এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হাসপাতালটিকে কোম্পানি আইনের আওতায় এনে করপোরেট কাঠামোয় পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (দ্বিতীয় সংশোধন) বিল, ২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিএমইউ’র ৯০ শতাংশ এবং সরকারের ১০ শতাংশ মালিকানায় পৃথক একটি কোম্পানি গঠন করে হাসপাতালটি পরিচালনা করা হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন কাঠামোয় প্রয়োজনীয় দক্ষ চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে এবং হাসপাতালটি দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হবে।

তবে স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, করপোরেট কাঠামোয় পরিচালিত হলে সরকারি হাসপাতালের তুলনায় সেবার মূল্য বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে একদিকে হাসপাতালটিকে আর্থিকভাবে কার্যকর করা, অন্যদিকে চিকিৎসাসেবা সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা—দুটি বিষয়ই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

২০১৬ সালে যে স্বপ্ন নিয়ে প্রকল্প

সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল ২০১৬ সালে। পরিকল্পনা ছিল ক্যান্সার, বন্ধ্যত্ব, বোন ম্যারো, কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট, লিভার ট্রান্সপ্লান্ট, স্টেম সেল থেরাপি, লেজার থেরাপিসহ বিভিন্ন জটিল রোগের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে চিকিৎসা পেশাজীবীদের দক্ষতার উন্নয়ন।

২০১৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর এই বিশেষায়িত হাসপাতালটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিল থেকে ১ হাজার কোটি, তৎকালীন সরকার ৩৩০ কোটি এবং তৎকালীন বিএসএমএমইউ ১৭০ কোটি টাকা দেওয়ার কথা ছিল। পরবর্তী সময়ে হাসপাতালটির নির্মাণ ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকায়।

৭৫০ শয্যার হাসপাতালটির উদ্বোধন করা হয় ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে। কিন্তু উদ্বোধনের পরও এর জন্য আলাদা জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে বিএমইউ’র বিদ্যমান কর্মী ও বাজেট দিয়েই সীমিত পরিসরে চলে হাসপাতালটির কার্যক্রম।

ধাপে ধাপে কিছু সেবা চালু করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল স্বল্প পরিসরে আইসিইউ ইউনিট চালু হয়। একই বছরের ২৬ মে অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের উদ্যোগে রোগী ভর্তি সেবা শুরু হয়। এরপর ৩১ আগস্ট দীর্ঘমেয়াদি স্নায়ুজনিত রোগ ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের চিকিৎসায় রোবোটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার উদ্বোধন করা হয়।

রোবোটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে চীন। উদ্বোধনের সময় মোট ৫৭টি রোবট দিয়ে সহযোগিতা করে দেশটি।

এদিকে অবকাঠামোগত সক্ষমতার দিক থেকে হাসপাতালটি দেশের অন্যতম বড় বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র। এখানে ৭৫০টি শয্যার পাশাপাশি ১০০ শয্যার আইসিইউ, ১৪টি অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটার এবং ১০০ শয্যার জরুরি ইউনিট রয়েছে। আছে ভিভিআইপি, ভিআইপি ও ডিলাক্স কেবিনও। অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন, জিন থেরাপি ও রোবোটিক সার্জারির মতো বিশেষায়িত চিকিৎসার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা কমানোর লক্ষ্যেও পাঁচটি বিশেষায়িত কেন্দ্র রাখা হয়েছে। এগুলো হলো—কার্ডিও অ্যান্ড সেরিব্রোভাসকুলার সেন্টার, হেপাটোবিলিয়ারি অ্যান্ড লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সেন্টার, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা সেন্টার, কিডনি রোগ ও ইউরোলজি সেন্টার এবং জরুরি ও ট্রমা সেন্টার।

কিন্তু এত বড় অবকাঠামো থাকার পরও পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু না হওয়ার পেছনে মূল বাধা হিসেবে উঠে এসেছে জনবল ও পরিচালন কাঠামো সংকট।

জনবল সংকট কাটাতে কোম্পানি কাঠামো

হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে পরিচালনার জন্য বিএমইউ’র সিন্ডিকেট কোম্পানি আইনের আওতায় এটি পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়। এজন্য বিদ্যমান আইনে সংশোধনের প্রয়োজন হয়। সেই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ১৩ জুলাই বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (দ্বিতীয় সংশোধন) বিল, ২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস হয়।

বিল পাসের সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, কোরিয়ার এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নে নির্মিত হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে এবং যন্ত্রপাতিও এসেছে। এখন দক্ষ ও অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা দিতে আইনি কাঠামো প্রয়োজন। হাসপাতাল থেকে অর্জিত আয় বাইরে নেওয়া যাবে না বলেও জানান তিনি।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, কোনো তৃতীয়পক্ষের কাছে শেয়ার দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। অর্থাৎ হাসপাতালটি বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে না। মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ থাকবে বিএমইউ’র কাছেই; তবে পরিচালন পদ্ধতি হবে অনেকটা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মতো।

বিএমইউ কর্মকর্তাদের যুক্তি- প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত হলে ভালো বেতন দিয়ে দক্ষ চিকিৎসক ও পেশাজীবীদের নিয়োগ করা সহজ হবে। প্রচলিত বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামোয় নিয়োগ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করতে হয়। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সময় লাগে। কোম্পানি কাঠামোয় সেই জটিলতা কম হয় বলে জানান তারা।

ডিসেম্বরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ চালুর লক্ষ্য

হাসপাতালটির এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্ট্রিমকে বলেন, ‘চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। সংসদে বিল পাস হয়েছে এবং কোম্পানির অধীনে যাওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমও শেষ হয়েছে। এখন নিবন্ধনের প্রক্রিয়া চলছে।’

তিনি জানান, এটি একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হবে। মালিকানার বড় অংশ থাকবে বিএমইউ’র হাতে, বাকীটা সরকারের। নতুন ব্যবস্থায় স্থায়ী সরকারি নিয়োগের পরিবর্তে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রয়োজনীয় পেশাজীবী খুঁজে বের করে আগ্রহপত্র আহ্বান এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা সেবাই চ্যালেঞ্জ

হাসপাতালটির নতুন পরিচালন কাঠামো নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—রোগীদের চিকিৎসা খরচ কতটা বাড়বে?

স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ এ বিষয়ে স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালটি করপোরেট ব্যবস্থাপনায় গেলে সরকারি হাসপাতালের তুলনায় সেবার মূল্য বেশি হতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কোনো সেবার মূল্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ১০০ টাকা এবং সরকারি ব্যবস্থায় ২০ টাকা হলে নতুন কাঠামোয় সেটি মাঝামাঝি পর্যায়ে থাকতে পারে। এতে দরিদ্র মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। সেক্ষেত্রে সরকার দরিদ্র রোগীর চিকিৎসা ব্যয়ের একটি অংশ ভর্তুকি হিসেবে বহন করতে পারে।’

তবে হাসপাতালের আয়কে সরাসরি মুনাফা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেও তিনি মনে করেন। অধ্যাপক হামিদের মতে, হাসপাতালটির প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকে থাকার জন্য একটি কার্যকর পরিচালন কাঠামো প্রয়োজন। একই সঙ্গে দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে সরকার চাইলে আলাদা ভর্তুকি দিতে পারে। পরিচালন কাঠামো যাই হোক, এত বড় অবকাঠামোকে ফেলে না রেখে সচল করাই এখন প্রধান বিষয়।

ছয় মাসের আশ্বাস

জাতীয় সংসদে বিল পাস হওয়ার আগে চলতি বছরের ৫ জুলাই সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেনও হাসপাতালটিকে কোম্পানি কাঠামোয় আনার কথা জানান। তিনি বলেন, হাসপাতালটিকে আধুনিকতর করার জন্য কোম্পানি হিসেবে সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে।

মন্ত্রী তখন ছয় মাসের মধ্যে হাসপাতালটি পুরোপুরি চালুর আশ্বাস দিয়েছিলেন। তার ভাষ্য ছিল, হাসপাতালটি ওয়ানস্টপ পদ্ধতিতে অত্যাধুনিক ব্যবস্থায় পরিচালিত হবে। এ ক্ষেত্রে থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ আন্তর্জাতিক হাসপাতাল ও সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের কোম্পানি কাঠামোর উদাহরণ দেন তিনি।

মন্ত্রী আরও বলেন, নতুন ব্যবস্থায় জনগণ তুলনামূলক স্বল্প মূল্যে উন্নত চিকিৎসা পাবে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত