ছয় মাসে অর্থনীতিতে স্বস্তির চেয়ে উদ্বেগই বেশি: সিপিডি

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

সিপিডির মিডিয়া সংলাপ। সংগৃহীত ছবি
সিপিডির মিডিয়া সংলাপ। সংগৃহীত ছবি

নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে স্বস্তির চেয়ে উদ্বেগই বেশি বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়নে ৩১টি প্রধান অর্থনৈতিক সূচকের মধ্যে ১৯টিতে অবনতি হয়েছে, উন্নতি হয়েছে ১২টিতে।

সোমবার (২৪ আগস্ট) ঢাকায় সিপিডির কার্যালয়ে ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে এ মূল্যায়ন তুলে ধরেন অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দুর্বল ব্যাংক খাত, কম রাজস্ব আহরণ, বিনিয়োগে স্থবিরতা ও ঋণের চাপের মতো কাঠামোগত সমস্যা পেয়েছে। এর সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি নতুন সংকট তৈরি করেছে। তবে দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সরকার কোনো সমন্বিত তথ্যভিত্তিক দলিল তৈরি করেনি। ফলে এখন সরকার কী পরিস্থিতি থেকে দায়িত্ব নিয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে কী পরিবর্তন হয়েছে, তা তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা কঠিন হচ্ছে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো আরও বলেন, নতুন সরকারের কাছে দুটি বড় প্রত্যাশা ছিল—অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর প্রত্যাশা থাকলেও গত ছয় মাসে সেই গতি তৈরি হয়নি। একইভাবে বিভিন্ন সময়ে সংস্কারের কথা বলা হলেও সেগুলোকে একটি সমন্বিত ও সময়বদ্ধ কর্মসূচিতে আনা যায়নি।

সরকারের নেওয়া কার্যকর পদক্ষেপের মধ্যে ৩৬২টি কার্যক্রম পর্যালোচনা করেছে সিপিডি। এগুলোকে ৯ খাতে ভাগ করে ‘স্বস্তি’ ও ‘অস্বস্তির’ জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে।

সংসদ সদস্যদের প্লট ও গাড়ি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, দ্রুত বিচার, সরকারি ব্যয় সংকোচনের উদ্যোগ এবং পরিবহন ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। ব্যক্তিগত করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, অপ্রকাশিত অর্থ বৈধ করার প্রস্তাব প্রত্যাহার, ই-রিটার্ন সম্প্রসারণ এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগও স্বস্তির জায়গা হিসেবে এসেছে।

তবে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উচ্চপদে নিয়োগ, মব সহিংসতা, নারী, শিশু ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং সংস্কারে ধীরগতিকে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখছে সিপিডি।

রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতির আশঙ্কা করছে সংস্থাটি। চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। এনবিআরের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ১ শতাংশে এবং মোট কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ৪ দশমিক ৯ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে ব্যাংক ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে।

মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা উন্নতি হলেও সাধারণ মানুষের জন্য পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি। সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে। কিন্তু মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ৮ দশমিক ২ শতাংশে উঠলেও প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক রয়েছে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক পতনও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ থেকে দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ এবং তৃতীয় প্রান্তিকে ২ দশমিক ২২ শতাংশে নেমেছে প্রবৃদ্ধি। একই সময়ে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ৩ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে উঠলেও আমদানি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ২১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৮ শতাংশে এবং মাসিক গড় বিদেশে কর্মসংস্থান ৯৫ হাজার ৫২১ জন থেকে ৫১ হাজার ২৩৫ জনে নেমেছে।

ড. দেবপ্রিয়ের মতে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রধান লক্ষণ হওয়া উচিত প্রবৃদ্ধির ত্রৈমাসিক ধারাকে আবার ঊর্ধ্বমুখী করা। কিন্তু গত ছয় মাসে সেই গতি তৈরি হয়নি। এর পেছনে নীতিগত সমন্বয়ের ঘাটতি, জ্বালানি সংকট, বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ধীরগতিকে দায়ী করেন তিনি।

সরকারের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করতে গিয়ে ড. দেবপ্রিয় বলেন, সরকারকে ‘এ’ দিতে চাইলেও বাস্তবতা তাকে ‘বি’র দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘দেয়ার আর অ্যা লট অব নয়েজ, বাট নো মিউজিক।’

এই পরিস্থিতিতে অক্টোবর ২০২৬ থেকে জুন ২০২৭ মেয়াদের একটি বাস্তবভিত্তিক ‘কোর বাজেট’, জ্বালানি, ব্যাংক, এনবিআর, রাজস্ব-ব্যয়, এডিপি ও বেতন কাঠামোসহ সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচি নেওয়ার সুপারিশ করেছে সিপিডি।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত