মো. আব্বাস

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়ে সম্প্রতি যে কথাগুলো এসেছে, তা শুনে যেকোনো বোধবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হতবাক হতে বাধ্য। রাষ্ট্রের একজন মন্ত্রী, যিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেখেন, তাঁর এমন বক্তব্য রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি, নাগরিক অধিকার এবং আইনের শাসন নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান, বাজনা ও সিনেমা নাকি বহু বছর ধরে অনেকটা নিষিদ্ধের মতো, তাই সেখানকার পরিস্থিতি আলাদা। পরিবেশ ও পরিস্থিতি বিবেচনায় যেখানে যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, সরকার তা নিয়েছে। (২২ আগস্ট ২০২৬, দ্য ডেইলি স্টার)
একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি সত্যিই এভাবে বলতে পারেন? ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাংলাদেশের একটি জেলা। কিশোরগঞ্জও বাংলাদেশের একটি জেলা। ঢাকা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ কিংবা অন্য কোনো জেলা, রাষ্ট্রের চোখে নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে কি আলাদা হতে পারে? কোথাও কিছু মানুষ একটি সংস্কৃতিকে পছন্দ করেন না বলে সেখানে সেই সংস্কৃতির চর্চা কার্যত নিষিদ্ধ হয়ে যাবে? আর রাষ্ট্র সেটিকে মেনে নিয়ে বলবে, ‘ওখানকার পরিস্থিতি আলাদা।’ তাহলে বাংলাদেশের কোন অংশে কোন আইন চলবে, সেটি কি এখন স্থানীয় সামাজিক অংশ ঠিক করবে?
এখানে বিষয়টি গান পছন্দ করা বা না করার নয়। কেউ গান শুনবেন না, সিনেমা দেখবেন না, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যাবেন না, সেটি তাঁর ব্যক্তিগত অধিকার। ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কেউ গান বা সিনেমা অপছন্দ করতেই পারেন। কিন্তু নিজের অপছন্দকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার কি কারও আছে? অবশ্যই নেই।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোনো গোষ্ঠী যদি হুমকি দিয়ে একটি বৈধ সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ করে দিতে পারে, তাহলে সেটি আর ব্যক্তিগত ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয় থাকে না। সেটি হয়ে যায় অন্যের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনাটি আরও উদ্বেগজনক। পুলিশ লাইন্সের ভেতরে জেলা পুলিশের আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের হামলার ঘটনায় দুই পক্ষের বেশ কিছু মানুষ আহত হওয়ার খবর এসেছে।
এখানে স্বাভাবিক প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল, পুলিশ লাইন্সে ঢুকে হামলা করার সাহস তারা পেল কীভাবে? কারা হামলা করেছে, কেন করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? ভবিষ্যতে যেন কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সাহস না পায়, সেটি নিশ্চিত করতে সরকার কী করছে?
কিন্তু আলোচনার কেন্দ্র যদি হয়ে যায়, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তো গান বাজনা এমনিতেই হয় না’, তাহলে মূল সমস্যাটিই আড়াল করা হয়।
ধরা যাক, কোনো এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় না। তার মানে কি সেরকম অনুষ্ঠান কেউ করতে চাইলে অন্যরা সেটি বন্ধ করে দেওয়া স্বাভাবিক? কোনো শহরে বহু বছর ধরে সিনেমা হল নেই। সেখানে নতুন করে সিনেমা হল করতে চাইলে স্থানীয় একটি গোষ্ঠী আপত্তি জানিয়ে সেটি বন্ধ করে দিতে পারবে? কোনো এলাকায় মানুষ নাটক দেখতে অভ্যস্ত নন। সেখানে নাটক আয়োজন করলে হামলার আশঙ্কা দেখিয়ে প্রশাসন অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেবে?
যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে আমাদের রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের দায়িত্ব। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা থাকলে নিরাপত্তা বাড়ানো সরকারের কাজ। কিন্তু সম্ভাব্য হামলাকারীর ভয়ে ভুক্তভোগী বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজকের অধিকার কেড়ে নেওয়া কোনো যৌক্তিক দায়িত্বশীল সমাধান হতে পারে না।
কিশোরগঞ্জের ঘটনা সেই জায়গাটিই আরও পরিষ্কার করে। সেখানে কনসার্ট বন্ধের দাবিতে একটি ধর্মীয় সংগঠন জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করে। তাদের বক্তব্য ছিল, গান বাজনা শরিয়তবিরোধী এবং অনুষ্ঠান হলে পরিস্থিতি ঘোলাটে হতে পারে। পরে কনসার্টটি স্থগিত হয়।
এখানে রাষ্ট্রের উচিত ছিল খুব সহজ একটি অবস্থান নেওয়া। অনুষ্ঠানটি বৈধ কি না, আয়োজকদের প্রয়োজনীয় অনুমতি ও কাগজপত্র আছে কি না, শব্দের মাত্রা আইনসঙ্গত কি না, নিরাপত্তার ব্যবস্থা যথেষ্ট কি না, এসব যাচাই করা। কোনো প্রচলিত আইন ভঙ্গ হলে অনুষ্ঠান বন্ধ করা যেত।
কিন্তু ‘আমরা এই অনুষ্ঠান পছন্দ করি না’ কিংবা ‘আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে এটি যায় না’ এই যুক্তি কি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অনুষ্ঠান বন্ধ করার আইনি ভিত্তি হতে পারে?
আর যদি সত্যিই আইনশৃঙ্খলার আশঙ্কা থাকে, তাহলে সেই আশঙ্কা তৈরি করছে কারা? যারা গান শুনতে যাচ্ছে তারা, নাকি যারা গান বন্ধ করার জন্য হুমকি দিচ্ছে?
এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আজ যদি একটি গোষ্ঠী বলে গান হারাম, তাই কনসার্ট বন্ধ করতে হবে, কাল অন্য একটি গোষ্ঠী বলতে পারে কোনো বই তাদের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে, তাই বইমেলা বন্ধ করতে হবে। আরেকটি গোষ্ঠী বলতে পারে কোনো চলচ্চিত্র তাদের মূল্যবোধের বিরুদ্ধে, তাই সিনেমা প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে। কেউ বলতে পারে নাটক অশালীন, কেউ বলতে পারে ভাস্কর্য ধর্মবিরোধী।
প্রতিটি দাবির সামনে রাষ্ট্র যদি বলে, ‘পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যবস্থা নিতে হয়েছে’, তাহলে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সংস্কৃতি-নীতি কে নির্ধারণ করবে? সরকার, নাকি রাস্তায় লোক জড়ো করতে পারে এমন গোষ্ঠী?
রাষ্ট্রের শক্তি এখানেই যে সে সংখ্যাগরিষ্ঠের পছন্দ এবং সংখ্যালঘুর অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করবে। রাষ্ট্রের কাজ সংখ্যাগরিষ্ঠের রুচিকে আইন বানানো নয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সবচেয়ে সমস্যাজনক জায়গা সম্ভবত এখানেই। একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বলেন, একটি এলাকার ‘পরিস্থিতি আলাদা’, তখন তিনি স্থানীয় বাস্তবতার কথা বলতে চেয়েছেন। কিন্তু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছ থেকে এমন অজুহাত বিপজ্জনক বার্তা তৈরি করতে পারে। সেটি হলো, স্থানীয় বাস্তবতার অজুহাত দিয়ে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন করাকে যৌক্তিক প্রতিপন্ন করার সুযোগ তৈরি হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি সামাজিক গোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভূতি যেমন সম্মানের, তেমনি সেখানে বসবাসকারী একজন শিল্পী, গায়ক, চলচ্চিত্রপ্রেমী কিংবা সাধারণ নাগরিকের সাংস্কৃতিক অধিকারও সমান সম্মান পাওয়ার অধিকার রাখে। একজন নাগরিকের ধর্ম পালন করার স্বাধীনতা এবং আরেকজন নাগরিকের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার স্বাধীনতা যদি একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়ায়, তাহলে সেটি সামাল দিতে না পারার দায় রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো দুই অধিকারই রক্ষা করা।
আরেকটি বিষয়ও পরিষ্কার হওয়া দরকার। গান বাজনা বা সিনেমা নিয়ে কারও আপত্তি থাকলে তিনি শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করতে পারেন। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করতে পারেন। আদালতে যেতে পারেন। কিন্তু হামলা, হুমকি, ভাঙচুর কিংবা জনমতকে ভয় দেখিয়ে কোনো অনুষ্ঠান বন্ধ করা হলে সেটিকে ‘স্থানীয় বাস্তবতা’ বলে স্বাভাবিক করে দেওয়া যায় না।
গতকাল কিশোরগঞ্জ। আজ ব্রাহ্মণবাড়িয়া। কাল অন্য কোনো জেলা। তারপর আরেকটি জেলা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন একেক জায়গায় একেক রকম হতে পারে না। স্থানীয় সংস্কৃতি ভিন্ন হতে পারে, মানুষের রুচি ভিন্ন হতে পারে, ধর্মীয় অনুশীলনের ধরন ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু নাগরিকের মৌলিক অধিকার ভিন্ন হতে পারে না।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া কি বাংলাদেশের বাইরে? যদি না হয়, তাহলে সেখানে আইনও বাংলাদেশেরই আইন, অধিকারও বাংলাদেশের নাগরিকেরই অধিকার। আর যদি কোনো গোষ্ঠী আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, তাদের থামানোর দায়িত্বও সরকারেরই।
‘ওখানকার পরিস্থিতি আলাদা’ বলে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এই মুহূর্তে সরকারের সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো স্পষ্ট করে বলা, গান পছন্দ করা বা না করা যার যার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু হুমকি দিয়ে, হামলা করে বা মব তৈরি করে অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়ার বাংলাদেশ আমরা চাই না।
রাষ্ট্র যদি এই জায়গায় আপস করে, তাহলে শুধু কয়েকটি কনসার্ট বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ হবে না। ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাবে মানুষের স্বাধীনভাবে বেছে নেওয়ার অধিকারও।
আর সেটি কোনো জেলার সমস্যা নয়। সেটি পুরো বাংলাদেশের সমস্যা।
• মো. আব্বাস: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়ে সম্প্রতি যে কথাগুলো এসেছে, তা শুনে যেকোনো বোধবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হতবাক হতে বাধ্য। রাষ্ট্রের একজন মন্ত্রী, যিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেখেন, তাঁর এমন বক্তব্য রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি, নাগরিক অধিকার এবং আইনের শাসন নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান, বাজনা ও সিনেমা নাকি বহু বছর ধরে অনেকটা নিষিদ্ধের মতো, তাই সেখানকার পরিস্থিতি আলাদা। পরিবেশ ও পরিস্থিতি বিবেচনায় যেখানে যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, সরকার তা নিয়েছে। (২২ আগস্ট ২০২৬, দ্য ডেইলি স্টার)
একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি সত্যিই এভাবে বলতে পারেন? ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাংলাদেশের একটি জেলা। কিশোরগঞ্জও বাংলাদেশের একটি জেলা। ঢাকা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ কিংবা অন্য কোনো জেলা, রাষ্ট্রের চোখে নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে কি আলাদা হতে পারে? কোথাও কিছু মানুষ একটি সংস্কৃতিকে পছন্দ করেন না বলে সেখানে সেই সংস্কৃতির চর্চা কার্যত নিষিদ্ধ হয়ে যাবে? আর রাষ্ট্র সেটিকে মেনে নিয়ে বলবে, ‘ওখানকার পরিস্থিতি আলাদা।’ তাহলে বাংলাদেশের কোন অংশে কোন আইন চলবে, সেটি কি এখন স্থানীয় সামাজিক অংশ ঠিক করবে?
এখানে বিষয়টি গান পছন্দ করা বা না করার নয়। কেউ গান শুনবেন না, সিনেমা দেখবেন না, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যাবেন না, সেটি তাঁর ব্যক্তিগত অধিকার। ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কেউ গান বা সিনেমা অপছন্দ করতেই পারেন। কিন্তু নিজের অপছন্দকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার কি কারও আছে? অবশ্যই নেই।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোনো গোষ্ঠী যদি হুমকি দিয়ে একটি বৈধ সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ করে দিতে পারে, তাহলে সেটি আর ব্যক্তিগত ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয় থাকে না। সেটি হয়ে যায় অন্যের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনাটি আরও উদ্বেগজনক। পুলিশ লাইন্সের ভেতরে জেলা পুলিশের আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের হামলার ঘটনায় দুই পক্ষের বেশ কিছু মানুষ আহত হওয়ার খবর এসেছে।
এখানে স্বাভাবিক প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল, পুলিশ লাইন্সে ঢুকে হামলা করার সাহস তারা পেল কীভাবে? কারা হামলা করেছে, কেন করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? ভবিষ্যতে যেন কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সাহস না পায়, সেটি নিশ্চিত করতে সরকার কী করছে?
কিন্তু আলোচনার কেন্দ্র যদি হয়ে যায়, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তো গান বাজনা এমনিতেই হয় না’, তাহলে মূল সমস্যাটিই আড়াল করা হয়।
ধরা যাক, কোনো এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় না। তার মানে কি সেরকম অনুষ্ঠান কেউ করতে চাইলে অন্যরা সেটি বন্ধ করে দেওয়া স্বাভাবিক? কোনো শহরে বহু বছর ধরে সিনেমা হল নেই। সেখানে নতুন করে সিনেমা হল করতে চাইলে স্থানীয় একটি গোষ্ঠী আপত্তি জানিয়ে সেটি বন্ধ করে দিতে পারবে? কোনো এলাকায় মানুষ নাটক দেখতে অভ্যস্ত নন। সেখানে নাটক আয়োজন করলে হামলার আশঙ্কা দেখিয়ে প্রশাসন অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেবে?
যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে আমাদের রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের দায়িত্ব। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা থাকলে নিরাপত্তা বাড়ানো সরকারের কাজ। কিন্তু সম্ভাব্য হামলাকারীর ভয়ে ভুক্তভোগী বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজকের অধিকার কেড়ে নেওয়া কোনো যৌক্তিক দায়িত্বশীল সমাধান হতে পারে না।
কিশোরগঞ্জের ঘটনা সেই জায়গাটিই আরও পরিষ্কার করে। সেখানে কনসার্ট বন্ধের দাবিতে একটি ধর্মীয় সংগঠন জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করে। তাদের বক্তব্য ছিল, গান বাজনা শরিয়তবিরোধী এবং অনুষ্ঠান হলে পরিস্থিতি ঘোলাটে হতে পারে। পরে কনসার্টটি স্থগিত হয়।
এখানে রাষ্ট্রের উচিত ছিল খুব সহজ একটি অবস্থান নেওয়া। অনুষ্ঠানটি বৈধ কি না, আয়োজকদের প্রয়োজনীয় অনুমতি ও কাগজপত্র আছে কি না, শব্দের মাত্রা আইনসঙ্গত কি না, নিরাপত্তার ব্যবস্থা যথেষ্ট কি না, এসব যাচাই করা। কোনো প্রচলিত আইন ভঙ্গ হলে অনুষ্ঠান বন্ধ করা যেত।
কিন্তু ‘আমরা এই অনুষ্ঠান পছন্দ করি না’ কিংবা ‘আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে এটি যায় না’ এই যুক্তি কি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অনুষ্ঠান বন্ধ করার আইনি ভিত্তি হতে পারে?
আর যদি সত্যিই আইনশৃঙ্খলার আশঙ্কা থাকে, তাহলে সেই আশঙ্কা তৈরি করছে কারা? যারা গান শুনতে যাচ্ছে তারা, নাকি যারা গান বন্ধ করার জন্য হুমকি দিচ্ছে?
এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আজ যদি একটি গোষ্ঠী বলে গান হারাম, তাই কনসার্ট বন্ধ করতে হবে, কাল অন্য একটি গোষ্ঠী বলতে পারে কোনো বই তাদের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে, তাই বইমেলা বন্ধ করতে হবে। আরেকটি গোষ্ঠী বলতে পারে কোনো চলচ্চিত্র তাদের মূল্যবোধের বিরুদ্ধে, তাই সিনেমা প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে। কেউ বলতে পারে নাটক অশালীন, কেউ বলতে পারে ভাস্কর্য ধর্মবিরোধী।
প্রতিটি দাবির সামনে রাষ্ট্র যদি বলে, ‘পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যবস্থা নিতে হয়েছে’, তাহলে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সংস্কৃতি-নীতি কে নির্ধারণ করবে? সরকার, নাকি রাস্তায় লোক জড়ো করতে পারে এমন গোষ্ঠী?
রাষ্ট্রের শক্তি এখানেই যে সে সংখ্যাগরিষ্ঠের পছন্দ এবং সংখ্যালঘুর অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করবে। রাষ্ট্রের কাজ সংখ্যাগরিষ্ঠের রুচিকে আইন বানানো নয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সবচেয়ে সমস্যাজনক জায়গা সম্ভবত এখানেই। একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বলেন, একটি এলাকার ‘পরিস্থিতি আলাদা’, তখন তিনি স্থানীয় বাস্তবতার কথা বলতে চেয়েছেন। কিন্তু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছ থেকে এমন অজুহাত বিপজ্জনক বার্তা তৈরি করতে পারে। সেটি হলো, স্থানীয় বাস্তবতার অজুহাত দিয়ে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন করাকে যৌক্তিক প্রতিপন্ন করার সুযোগ তৈরি হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি সামাজিক গোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভূতি যেমন সম্মানের, তেমনি সেখানে বসবাসকারী একজন শিল্পী, গায়ক, চলচ্চিত্রপ্রেমী কিংবা সাধারণ নাগরিকের সাংস্কৃতিক অধিকারও সমান সম্মান পাওয়ার অধিকার রাখে। একজন নাগরিকের ধর্ম পালন করার স্বাধীনতা এবং আরেকজন নাগরিকের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার স্বাধীনতা যদি একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়ায়, তাহলে সেটি সামাল দিতে না পারার দায় রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো দুই অধিকারই রক্ষা করা।
আরেকটি বিষয়ও পরিষ্কার হওয়া দরকার। গান বাজনা বা সিনেমা নিয়ে কারও আপত্তি থাকলে তিনি শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করতে পারেন। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করতে পারেন। আদালতে যেতে পারেন। কিন্তু হামলা, হুমকি, ভাঙচুর কিংবা জনমতকে ভয় দেখিয়ে কোনো অনুষ্ঠান বন্ধ করা হলে সেটিকে ‘স্থানীয় বাস্তবতা’ বলে স্বাভাবিক করে দেওয়া যায় না।
গতকাল কিশোরগঞ্জ। আজ ব্রাহ্মণবাড়িয়া। কাল অন্য কোনো জেলা। তারপর আরেকটি জেলা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন একেক জায়গায় একেক রকম হতে পারে না। স্থানীয় সংস্কৃতি ভিন্ন হতে পারে, মানুষের রুচি ভিন্ন হতে পারে, ধর্মীয় অনুশীলনের ধরন ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু নাগরিকের মৌলিক অধিকার ভিন্ন হতে পারে না।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া কি বাংলাদেশের বাইরে? যদি না হয়, তাহলে সেখানে আইনও বাংলাদেশেরই আইন, অধিকারও বাংলাদেশের নাগরিকেরই অধিকার। আর যদি কোনো গোষ্ঠী আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, তাদের থামানোর দায়িত্বও সরকারেরই।
‘ওখানকার পরিস্থিতি আলাদা’ বলে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এই মুহূর্তে সরকারের সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো স্পষ্ট করে বলা, গান পছন্দ করা বা না করা যার যার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু হুমকি দিয়ে, হামলা করে বা মব তৈরি করে অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়ার বাংলাদেশ আমরা চাই না।
রাষ্ট্র যদি এই জায়গায় আপস করে, তাহলে শুধু কয়েকটি কনসার্ট বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ হবে না। ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাবে মানুষের স্বাধীনভাবে বেছে নেওয়ার অধিকারও।
আর সেটি কোনো জেলার সমস্যা নয়। সেটি পুরো বাংলাদেশের সমস্যা।
• মো. আব্বাস: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক
.png)

শিল্পকারখানা একবার বন্ধ হয়ে গেলে তা আবার চালু করা কতটা কঠিন, তা বোঝা যায় বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত কারখানার সংখ্যার দিকে তাকালেই। দুই হাজারের বেশি কারখানা থেকে কমে সেই সংখ্যা এখন আটশোর ঘরে নেমে এসেছে।
৫ ঘণ্টা আগে
রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে মন্ত্রিপরিষদ সচিব দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান হিসেবে মাননীয় (অব.) বিচারপতি এ.কে.এম. আসাদুজ্জামানের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই এ নিয়োগের পক্ষে-বিপক্ষে মতামত দিচ্ছেন এবং প্রশ্ন উঠেছে, নিয়োগ আইনসিদ্ধ হলো কিনা। বাংলাদেশে সংবিধানই রা
২০ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ঐতিহাসিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও, সাম্প্রতিককালে এতে এক কৌশলগত রূপান্তর বা 'প্যারাডাইম শিফট' ঘটেছে। ক্ষমতার পরিবর্তন, জনগণের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর এবং নতুন পররাষ্ট্রনীতির আগমন এই বহুমাত্রিক সম্পর্ককে এক জটিল ও সংবেদনশীল মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে।
২২ আগস্ট ২০২৬
সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকলেও একটি ছোট রাষ্ট্র তার ভূ-কৌশলগত অবস্থান, অর্থনীতি, মানবসম্পদ ও বহুমাত্রিক কূটনীতির মাধ্যমে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে, যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ সিঙ্গাপুর। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগর, ভৌগোলিক অবস্থান ও বিশাল বাজার হলো প্রধান কৌশলগত সম্পদ।
২২ আগস্ট ২০২৬