নারায়ণগঞ্জে ৭ খুন

রোজার কাছে বাবা মানে ছবি

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
নারায়ণগঞ্জ

বাবার ছবি হাতে ছোট্ট রোজা। ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীর আলো দেখার আগেই চিরতরে হারিয়েছে বাবাকে। সেই রোজা আক্তার জান্নাতের বয়স এখন প্রায় ১২। তার কাছে ‘বাবা’ শব্দটি কেবলই এক ধূসর কল্পনা, কিছু বিবর্ণ ছবি আর মায়ের চোখের জল। বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়া কিংবা ঈদের সকালে নতুন জামা পরে বাবার কোলে ওঠার স্বাদ কী—তা রোজার অজানাই রয়ে গেছে।

রোজার বাবা জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জের সেই আলোচিত ‘সাত খুনের’ অন্যতম শিকার। তিনি ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের গাড়িচালক। জাহাঙ্গীরকে যখন অপহরণ ও হত্যা করা হয়, রোজা তখন মায়ের গর্ভে। বাবার মৃত্যুর এক মাস পর তার জন্ম হয়। জন্মের পর থেকেই এক বিশাল শূন্যতা নিয়ে বড় হচ্ছে সে।

রোজার মা শামসুন্নাহার আক্তার নুপুর কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘মাদরাসায় যখন অন্য শিশুরা বাবার হাত ধরে আসে, তখন রোজা চুপচাপ চেয়ে থাকে। বাড়ি ফিরে কান্নাকাটি করে বাবাকে খোঁজে। ওর কষ্ট দেখে বুক ফেটে যায়। যারা আমার নিষ্পাপ মেয়েটাকে এতিম করল, তাদের শাস্তি এখনো কার্যকর হতে দেখলাম না। কবে এই বিচার নিজের চোখে দেখতে পাব, জানি না। খালি দিন গুনছি।’

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে ফিল্মি কায়দায় অপহরণ করা হয় সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, প্রবীণ আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে। তিন দিন পর তাদের মরদেহ ইটের বস্তা বাঁধা অবস্থায় শীতলক্ষ্যা নদী থেকে উদ্ধার করা হয়। রাষ্ট্রীয় বাহিনী র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব-১১) তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ মদদে ও অংশগ্রহণে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল।

নিহতদের তালিকায় নজরুলের সহযোগী তাজুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম লিটন, মনিরুজ্জামান স্বপন এবং গাড়িচালক জাহাঙ্গীর ও ইব্রাহিমও ছিলেন।

ওই হত্যাকাণ্ডের ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও চূড়ান্ত রায় কার্যকর না হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দানা বাঁধছে। মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন এবং র‍্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে ২০১৭ সালের ২২ আগস্ট হাইকোর্ট ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন।

তবে রায়টি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ‘লিভ টু আপিল’ পর্যায়ে আটকে আছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আবুল কালাম আজাদ জাকির জানান, দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার কারণে রায় কার্যকর হতে দেরি হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি বর্তমানে লিভ টু আপিল পর্যায়ে রয়েছে। আমরা দ্রুত এটি নিষ্পত্তির চেষ্টা করছি।’

এদিকে সাবেক কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা আক্তার বিউটি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সবকিছু তো প্রমাণিত। দেশবাসী জানে কী ঘটেছিল। তারপরও কেন এতদিন বিচার ঝুলে থাকবে? আমরা এখনো অপেক্ষায় আছি।’

নিহত তাজুল ইসলামের বৃদ্ধ বাবা আবুল খায়েরের কণ্ঠে ঝরে পড়ল গভীর অনিশ্চয়তা। তিনি বলেন, ‘জীবদ্দশায় এই খুনিদের বিচার দেখে যেতে পারব কি না, জানি না।’

সম্পর্কিত