আইসিইউ থেকে ফিরেই ফের সংকটাপন্ন হাম আক্রান্ত শিশু, এবার সিরিয়াল ৩৬

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
রাজশাহী

রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশু জান্নাতুল মাওয়া। স্ট্রিম ছবি

আট মাসের শিশু জান্নাতুল মাওয়া হামে আক্রান্ত। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে সে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) শয্যা পেয়েছিল চারদিন অপেক্ষার পর। কিছুটা সুস্থ হলে এক দিন পরই তাকে দেওয়া হয় সাধারণ ওয়ার্ডে। এখন তার ভীষণ শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। আবার তাকে আইসিইউতে নিতে বলেছেন চিকিৎসক। এবার আইসিইউর জন্য অপেক্ষাধীনদের মধ্যে তার সিরিয়াল ৩৬ নম্বর। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন শিশুটির বাবা-মা।

সোমবার দুপুরে হাসপাতালের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বারান্দায় গিয়ে দেখা যায়, একটি বেডে শিশুটিকে নিয়ে বসে আছেন তার মা উম্মে কুলসুম ও নানি ফরিদা বেগম। শিশুটির সারা গায়ে হামের চিহ্ন। হাতে ক্যানুলা লাগানো। ন্যাসাল ক্যানুলার মাধ্যমে অক্সিজেনও দেওয়া হচ্ছে। পাশে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে আছেন বাবা হৃদয়।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে শিশুর মা উম্মে কুলসুম বলেন, ‘আইসিইউ থেকে সাধারণ ওয়ার্ডে দেওয়া হলে আমার বাচ্চার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। ডাক্তার ম্যাডাম দেখেই আমাকে বললেন, আইসিইউতে কল লাগাও। এবার আইসিইউতে সিরিয়াল পড়েছে ৩৬। আমরা এখন কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না।’

রামেক হাসপাতালের লোকজন ও রোগীদের সূত্রে জানা গেছে, এখানে শিশুদের আইসিইউ বেড আছে মাত্র ১২টি। চলে হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়। প্রতিবার একটি বেডের জন্য ৩০ থেকে ৫০ জনের সিরিয়ালে অপেক্ষা করতে হয়। আইসিইউতে কোনো শিশু কিছুটা সুস্থ হলে বা মারা গেলে অন্যদের ডাক পড়ে। এ অবস্থায় অপেক্ষায় থাকতে থাকতে অনেক শিশু মারা যায়।

এদিকে দেশে শিশুদের সাধারণ অসুস্থতার পাশাপাশি এখন ছোঁয়াচে রোগ হামের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। এতে আইসিইউর চাহিদা আরও বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের রেকর্ড অনুযায়ী, চলতি মার্চের ১১ থেকে ২২ তারিখের মধ্যে রামেক হাসপাতালে আইসিইউর জন্য অপেক্ষায় থাকে ৩৩ শিশু মারা গেছে। গত বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) এই খবর সংবাদমাধ্যমে আসার পর ব্যাপক আলোচনার জন্ম হয়। ওই দিনও সকাল পর্যন্ত আইসিইউ শয্যার জন্য ৩৮ জন শিশু অপেক্ষমাণ তালিকায় ছিল।

বৃহস্পতিবার হামে আক্রান্ত চার শিশুকে আইসিইউতে নেওয়ার জন্য সুপারিশ করেন ওয়ার্ডের দায়িত্বরত চিকিৎসক। তাদের মধ্যে শিশু জহির ও হুমায়রা শুক্রবার সকালেই মারা গেছে। আর হিয়া মারা গেছে রাতে। ওই চারজনের মধ্যে অবশিষ্ট শিশু জান্নাতুল মাওয়াকে রোববার বিকেল তিনটার আইসিইউতে নেওয়া হয়। সোমবার দুপুরে তাকে আইসিইউ থেকে সাধারণ ওয়ার্ডে দেওয়া হয়। এখন তার আবারও আইসিইউ প্রয়োজন।

শিশু জান্নাতুল মাওয়ার বাবা ইটভাটার শ্রমিক হৃদয় ইসলাম বলেন, ‘চোখের সামনে একের পর এক বাচ্চা মারা যাচ্ছে। এসব দেখে কেমন থাকি বলেন? চারদিন অপেক্ষার পর বাচ্চাকে আইসিইউতে নিতে পেরেছিলাম। একদিন পরই বের করে দিলে এখন আবার ৩৬ নম্বর সিরিয়াল পড়েছে। এর মধ্যে দুর্ঘটনা ঘটে গেলে কে দায় নেবে?’

শিশুটির বিষয়ে জানতে চাইলে রামেক হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, ‘যথেষ্ট উন্নতি হওয়ার পর জান্নাতুল মাওয়াকে সাধারণ ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়েছিল। যেকোনো রোগী যেকোনো সময় খারাপ হতেই পারে। আবার যদি খারাপ হয় তাকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আইসিইউতে নিয়ে আসা হবে। বরাবর সেটাই করা হয়।’

হাসপাতাল থেকেই সংক্রমিত হওয়ার শঙ্কা

শিশু জান্নাতুল মাওয়ার বাবা হৃদয় ইসলামের বাড়ি রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার কোহার গ্রামে। হাসপাতালে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রোজার মাঝামাঝি সময়ে জান্নাতুল মাওয়া নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। তখন তাকে রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এক সপ্তাহ পর ছুটি দিলে শিশুটিকে নিয়ে বাড়ি যান। কিন্তু বাড়ি গিয়েই শিশুর শরীরে হাম উঠতে দেখেন তাঁরা। গত ২৭ রমজান শিশুকে নিয়ে তাঁরা আবার হাসপাতালে আসেন। কিন্তু ঈদের আবহে চিকিৎসক না পেয়ে ফিরে যান। ঈদের তৃতীয় দিন আবার হাসপাতালে আসেন তাঁরা।

পরদিনই শিশুটিকে আইসিইউতে নিয়ে যাওয়ার কথা লিখে দেন ওয়ার্ডের চিকিৎসক। তখন আইসিইউর জন্য অপেক্ষমাণদের মধ্যে সিরিয়াল পড়ে ২৯। চার দিন পর রোববার বিকেলে শিশুটিকে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছিল। সোমবার দুপুরেই শিশুটিকে আবার সাধারণ ওয়ার্ডে দেওয়া হয়।

রামেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ২০০ শয্যার বিপরীতে ঈদের আগে প্রায় ৭০০ রোগী ভর্তি ছিল। তাদের মধ্যে ছিল হামে আক্রান্ত শিশুরাও। তিন মাস ধরে সংক্রামক হাম রোগের রোগী শনাক্ত হলেও সব শিশুর একসঙ্গেই চিকিৎসা চলছিল। ঈদের আগে প্রথমবার মাওয়াকে হাসপাতালে ভর্তির সময়ই সে হামে আক্রান্ত হয় বলে জানান তার নানি ফরিদা বেগম। বলেন, ‘হাসপাতালে থাকার সময়ই শরীরে মশার কামড়ের মতো দাগ দেখি। মনে করেছি মশার কামড়। কিন্তু বাড়ি যাওয়ার পরই সারা শরীরে দগদগে হাম ফুটে উঠে।’

সম্পর্কিত