সুমন সুবহান

তুরস্কের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘কান’ প্রকল্পে সৌদি আরবের কৌশলগত অংশগ্রহণ মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছে। কয়েক দশক ধরে একক পশ্চিমা আধিপত্য এবং ইসরাইলের ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ বা আকাশ শক্তির শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার মার্কিন নীতির কারণে রিয়াদ যে নিরাপত্তা সংকটে ভুগছিল, এই অংশীদারত্ব তার একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
ওয়াশিংটনের প্রযুক্তিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ এবং সম্প্রতি ইরানের আক্রমণ ঠেকাতে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অকার্যকারিতা উপসাগরীয় দেশগুলোকে স্বনির্ভর হওয়ার পাঠ শিখিয়েছে। আঙ্কারার উন্নত এভিয়েশন প্রযুক্তি এবং রিয়াদের বিশাল আর্থিক সক্ষমতার এই মিলন কেবল একটি যুদ্ধবিমান তৈরি নয়, বরং পশ্চিমা বলয়ের বাইরে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে সৌদি আরব নিজেকে নিছক ক্রেতা থেকে সমরাস্ত্র নির্মাতার পর্যায়ে উন্নীত করতে চাইছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের একচেটিয়া অস্ত্র বাজারে বড় ধরনের ফাটল ধরাবে। তুরস্ক, সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর এই ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন আর কেবল ওয়াশিংটনের মর্জির ওপর নির্ভরশীল থাকতে প্রস্তুত নয়। ‘কান’ প্রকল্প সফল হলে তা ইসরাইলের সামরিক অহমিকা চূর্ণ করার পাশাপাশি এই অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য রক্ষা এবং একটি বহু-মেরু কেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। এটি কেবল একটি সামরিক চুক্তি নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার এক সাহসী পদক্ষেপ।
তুরস্ক ও সৌদি আরবের এই কৌশলগত অংশীদারত্বের মূল লক্ষ্য হলো যুদ্ধবিমান সংগ্রহের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের ওপর দীর্ঘদিনের অতি-নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা। তুরস্ক যখন তার পঞ্চম প্রজন্মের ‘কান’ যুদ্ধবিমানের জন্য কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিশাল তহবিল ও বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা খুঁজছে, রিয়াদ তখন ‘ভিশন ২০৩০’ অর্জনে নিজস্ব মাটিতে একটি শক্তিশালী মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা শিল্প গড়তে মরিয়া। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সৌদি আরব কেবল একজন সাধারণ ক্রেতা হিসেবে নয়, বরং বিমানের সহ-উত্পাদক বা নির্মাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে এফ-৩৫ চুক্তিতে মার্কিন শর্ত ও ইসরাইলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা রিয়াদকে এই বিকল্প পথে হাঁটতে উৎসাহিত করেছে।
আঙ্কারার উন্নত ড্রোন ও এভিয়েশন প্রযুক্তি এবং রিয়াদের বিশাল মূলধনের মিলন মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা অস্ত্রের একচেটিয়া বাজারে বড় ধরনের ফাটল ধরাতে পারে। ইতিমধ্যে পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যকার প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মডেলটি সৌদি আরবের জন্য একটি সফল উদাহরণ হিসেবে কাজ করছে। এই নতুন মেরুকরণ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো উন্নত সমরাস্ত্রের জন্য শুধুমাত্র ওয়াশিংটনের মর্জির ওপর নির্ভর করে থাকবে না।
২০২৫ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে মার্কিন এফ-৩৫ চুক্তির প্রাথমিক সম্মতি সত্ত্বেও ইসরাইলের ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ বজায় রাখার শর্ত রিয়াদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পেন্টাগন গভীরভাবে উদ্বিগ্ন যে, সৌদি আরব যদি তুরস্কের ‘কান’ প্রকল্পে সফলভাবে যুক্ত হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের অস্ত্র বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশকের একচেটিয়া আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ ধসে পড়বে।
ওয়াশিংটনের দ্বিমুখী আচরণ একদিকে মিত্রদের ওপর যুদ্ধের বিশাল ব্যয়ভার চাপানো এবং অন্যদিকে উন্নত প্রযুক্তি হস্তান্তরে গড়িমসি করা—রিয়াদের মধ্যে গভীর আস্থার সংকট তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতির সুযোগে তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, যা মার্কিন কৌশলগত প্রভাবকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। বিশেষ করে এফ-৩৫ এর সক্ষমতায় নানা কৃত্রিম সীমাবদ্ধতা আরোপের প্রচেষ্টা সৌদি আরবকে পূর্ণ পরিচালনগত স্বায়ত্তশাসনের সন্ধানে আঙ্কারার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মূলত আমেরিকার নিজস্ব সামরিক নীতির কঠোরতা ও ইসরায়েল-তোষণ নীতি এখন তাদের দীর্ঘদিনের আরব মিত্রদের হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
ওয়াশিংটনের দোদুল্যমানতা মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন স্বাধীন প্রতিরক্ষা বলয় তৈরির পথ প্রশস্ত করছে, যেখানে মার্কিন খবরদারি হ্রাস পাবে। এটি কেবল একটি বাণিজ্য হারানো নয়, বরং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে ওয়াশিংটনের কৌশলগত পরাজয়েরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন এফ-৩৫ ক্রয়ে ইসরাইলি আপত্তির কারণে সৃষ্ট কারিগরি সীমাবদ্ধতা এড়িয়ে পূর্ণ পরিচালনগত স্বায়ত্তশাসন অর্জনই রিয়াদের মূল লক্ষ্য। ওয়াশিংটনের প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকারের সংকীর্ণতার বিপরীতে তুরস্কের কাছ থেকে সরাসরি প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং যৌথ উৎপাদনের সুযোগ সৌদি আরবের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প বিকাশে সহায়ক হবে। ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতায় নিরাপত্তার জন্য একক কোনো পশ্চিমা শক্তির ওপর নির্ভর না করে অংশীদারিত্বে বৈচিত্র্য আনতেই মূলত রিয়াদ ‘কান’ প্রকল্পের দিকে ঝুঁকছে।
মার্কিন যুদ্ধবিমান ক্রয়ের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন প্রায়শই ‘এন্ড-ইউজার’ মনিটরিং এবং ব্যবহারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে, যা অনেক সময় ক্রেতা দেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্তকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করে। এর একটি নেতিবাচক উদাহরণ হলো পাকিস্তান, যারা এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ব্যবহারের ক্ষেত্রে মার্কিনীদের কঠিন নজরদারি ও সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হয়; এমনকি সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী অভিযানের বাইরে এগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তাদের ওয়াশিংটনের অনুমতির অপেক্ষায় থাকতে হয়।
তুরস্কের ‘কান’ প্রকল্পের অংশীদার হলে রিয়াদ কোনো বাহ্যিক রাজনৈতিক চাপ বা এই ধরনের অমর্যাদাকর নজরদারি ছাড়াই স্বাধীনভাবে বিমানটি মোতায়েন ও ব্যবহারের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন পাবে। আঙ্কারার সঙ্গে এই চুক্তি সৌদি আরবকে এমন এক কৌশলগত স্বাধীনতা দেবে, যা বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা সমরাস্ত্রের ক্ষেত্রে কার্যত অসম্ভব। নিজের আকাশসীমা রক্ষায় কখন এবং কীভাবে বিমানটি পরিচালিত হবে, তার চাবিকাঠি নিজের হাতে রাখতেই রিয়াদ তুরস্কের দিকে ঝুঁকছে। এই স্বায়ত্তশাসন মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবের সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী, স্বাধীন এবং যেকোনো ব্ল্যাকমেইল থেকে মুক্ত রাখবে।
পশ্চিমা দেশগুলো সাধারণত তাদের পঞ্চম প্রজন্মের বিমানের মূল ‘সোর্স কোড’ বা স্পর্শকাতর এভিয়েশন প্রযুক্তি হস্তান্তরে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখে, যা সৌদি আরবের নিজস্ব শিল্প বিকাশের পথে বড় বাধা। অথচ এর বিপরীতে, তুরস্ক ‘কান’ প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি প্রযুক্তি বিনিময় ও স্থানীয়ভাবে যন্ত্রাংশ উৎপাদনের সুযোগ দিতে আগ্রহী, যা রিয়াদের জন্য একটি গেম-চেঞ্জার। এই কৌশলের সফল উদাহরণ হলো চীন-পাকিস্তানের যৌথ উদ্যোগে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার প্রকল্প, যেখানে প্রযুক্তির পূর্ণ অধিকার পাওয়ায় পাকিস্তান আজ যুদ্ধবিমান রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। আঙ্কারার এই উদার প্রযুক্তি নীতি সৌদি আরবকে কেবল আমদানিকারক নয়, বরং ভবিষ্যতে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সামরিক শক্তিতে রূপান্তর করবে।
সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের সময় মার্কিন প্যাট্রিয়ট ও থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের ঝাঁকে ঝাঁকে আসা ড্রোন ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে শতভাগ কার্যকর না হওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে চরম নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং কাতার, কুয়েত ও সৌদি আরবের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরানের নির্ভুল আঘাত ঠেকাতে আমেরিকার ব্যর্থতা রিয়াদকে ভাবিয়ে তুলেছে।
২০১৯ সালে সৌদি আরবের আবকাইক-খুরাইস তেল স্থাপনায় হুথি-ইরান ড্রোন হামলায় মার্কিন ব্যবস্থার অকার্যকারিতা এবং আল উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে আমেরিকার বৃহত্তম সামরিক উপস্থিতি (১০,০০০-এর বেশি সেনা) এবং শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (যেমন- প্যাট্রিয়ট সিস্টেম) থাকা সত্ত্বেও ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে ইসরায়েলি আক্রমণ প্রতিহত করতে না পারা ওয়াশিংটনের ‘নিরাপত্তা গ্যারান্টি’কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউক্রেন যুদ্ধেও দেখা গেছে যে রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা সবসময় অভেদ্য ঢাল হতে পারছে না, যা বিশ্বের অনেক দেশের জন্য এক বিরূপ অভিজ্ঞতা। এছাড়া পোল্যান্ডের মতো দেশগুলোও অনেক সময় মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছে। এই আস্থার সংকট থেকেই সৌদি আরব এখন তুরস্কের ‘কান’ বা দক্ষিণ কোরিয়ার ‘চেওংগুং-২’-এর মতো বিকল্প ও আধুনিক প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে।
আঙ্কারার সোশ্যাল সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বারিন কায়াওগলুর মতে, ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার সাম্প্রতিক উত্তেজনা উপসাগরীয় দেশগুলোর কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন এনেছে। এই দেশগুলো এখন স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছে যে, সংকটের চরম মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র তার আঞ্চলিক মিত্রদের তুলনায় ইসরাইলের নিরাপত্তাকেই একক অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। ওয়াশিংটনের এই পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের বিপরীতে পাকিস্তানের চীন-নির্মিত জে-১০সি যুদ্ধবিমানের সফল মোতায়েন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের দক্ষিণ কোরীয় ‘চেওংগুং-২’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে যে, পশ্চিমা বলয়ের বাইরেও অত্যন্ত শক্তিশালী সামরিক বিকল্প বিদ্যমান।
এই নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় তুরস্কের উন্নত প্রযুক্তি, সৌদি আরবের বিশাল অর্থায়ন, পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতা এবং মিসরের কৌশলগত অবস্থানকে কেন্দ্র করে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই সম্ভাব্য জোট কেবল সমরাস্ত্র ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং যৌথ মহড়ার মাধ্যমে একটি স্বাধীন প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করবে। ইতিমধ্যে আজারবাইজান ও লিবিয়া সংকটে তুরস্কের ড্রোনের সাফল্য এবং কাতার সংকটের সময় আঙ্কারার দৃঢ় অবস্থান এই ধরণের আঞ্চলিক সংহতির কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। একইভাবে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো মুসলিম প্রধান দেশগুলোও এখন পশ্চিমা প্রযুক্তির পরিবর্তে এই উদীয়মান ব্লকের দিকে নজর দিচ্ছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এখন আর মার্কিন নিরাপত্তার ‘ছায়াতলে’ থাকতে বাধ্য নয়, বরং তারা নিজস্ব স্বার্থ রক্ষায় বহুমুখী অংশীদারিত্বের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
তুরস্কের ‘কান’ যুদ্ধবিমান প্রকল্প কেবল একটি সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে পশ্চিমা আধিপত্যের অবসান এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জনের একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।
সৌদি আরবের আর্থিক শক্তি ও তুরস্কের উন্নত প্রযুক্তির এই মেলবন্ধন ইসরাইলের একক আকাশ শ্রেষ্ঠত্ব এবং মার্কিন ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ নীতিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা আস্থার সংকট এবং প্রযুক্তিতে পশ্চিমাদের কৃত্রিম বিধিনিষেধ রিয়াদকে ওয়াশিংটনের বলয় থেকে বের হয়ে নিজস্ব ও নির্ভরযোগ্য আঞ্চলিক জোট গঠনের দিকে ধাবিত করেছে। এই উদ্যোগ সফল হলে তুরস্ক, সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী স্বাধীন প্রতিরক্ষা ব্লক তৈরি হবে, যা অদূর ভবিষ্যতে মার্কিন মর্জির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনবে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই অংশীদারিত্ব মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় নতুন শক্তির ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করবে এবং সমরাস্ত্র বাজারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ খর্ব করে বহু-মেরু কেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থাকে ত্বরান্বিত করবে।
এছাড়াও নিরাপত্তার গ্যারান্টি হিসেবে পশ্চিমা শক্তির ওপর আর অন্ধ নির্ভর না করে, নিজস্ব সক্ষমতা ও আঞ্চলিক সংহতির মাধ্যমেই এই দেশগুলো তাদের ভবিষ্যৎ সার্বভৌমত্ব সুনিশ্চিত করতে চায়। ‘কান’ প্রকল্প সফল হওয়া মানেই হলো মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এক নতুন ভোরের সূচনা, যেখানে আঞ্চলিক সিদ্ধান্তগুলো আর ওয়াশিংটন থেকে নিয়ন্ত্রিত হবে না। এটি বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে মুসলিম বিশ্বের সামরিক মর্যাদাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে যা অজেয় ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়।

তুরস্কের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘কান’ প্রকল্পে সৌদি আরবের কৌশলগত অংশগ্রহণ মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছে। কয়েক দশক ধরে একক পশ্চিমা আধিপত্য এবং ইসরাইলের ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ বা আকাশ শক্তির শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার মার্কিন নীতির কারণে রিয়াদ যে নিরাপত্তা সংকটে ভুগছিল, এই অংশীদারত্ব তার একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
ওয়াশিংটনের প্রযুক্তিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ এবং সম্প্রতি ইরানের আক্রমণ ঠেকাতে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অকার্যকারিতা উপসাগরীয় দেশগুলোকে স্বনির্ভর হওয়ার পাঠ শিখিয়েছে। আঙ্কারার উন্নত এভিয়েশন প্রযুক্তি এবং রিয়াদের বিশাল আর্থিক সক্ষমতার এই মিলন কেবল একটি যুদ্ধবিমান তৈরি নয়, বরং পশ্চিমা বলয়ের বাইরে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে সৌদি আরব নিজেকে নিছক ক্রেতা থেকে সমরাস্ত্র নির্মাতার পর্যায়ে উন্নীত করতে চাইছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের একচেটিয়া অস্ত্র বাজারে বড় ধরনের ফাটল ধরাবে। তুরস্ক, সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর এই ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন আর কেবল ওয়াশিংটনের মর্জির ওপর নির্ভরশীল থাকতে প্রস্তুত নয়। ‘কান’ প্রকল্প সফল হলে তা ইসরাইলের সামরিক অহমিকা চূর্ণ করার পাশাপাশি এই অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য রক্ষা এবং একটি বহু-মেরু কেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। এটি কেবল একটি সামরিক চুক্তি নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার এক সাহসী পদক্ষেপ।
তুরস্ক ও সৌদি আরবের এই কৌশলগত অংশীদারত্বের মূল লক্ষ্য হলো যুদ্ধবিমান সংগ্রহের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের ওপর দীর্ঘদিনের অতি-নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা। তুরস্ক যখন তার পঞ্চম প্রজন্মের ‘কান’ যুদ্ধবিমানের জন্য কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিশাল তহবিল ও বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা খুঁজছে, রিয়াদ তখন ‘ভিশন ২০৩০’ অর্জনে নিজস্ব মাটিতে একটি শক্তিশালী মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা শিল্প গড়তে মরিয়া। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সৌদি আরব কেবল একজন সাধারণ ক্রেতা হিসেবে নয়, বরং বিমানের সহ-উত্পাদক বা নির্মাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে এফ-৩৫ চুক্তিতে মার্কিন শর্ত ও ইসরাইলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা রিয়াদকে এই বিকল্প পথে হাঁটতে উৎসাহিত করেছে।
আঙ্কারার উন্নত ড্রোন ও এভিয়েশন প্রযুক্তি এবং রিয়াদের বিশাল মূলধনের মিলন মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা অস্ত্রের একচেটিয়া বাজারে বড় ধরনের ফাটল ধরাতে পারে। ইতিমধ্যে পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যকার প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মডেলটি সৌদি আরবের জন্য একটি সফল উদাহরণ হিসেবে কাজ করছে। এই নতুন মেরুকরণ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো উন্নত সমরাস্ত্রের জন্য শুধুমাত্র ওয়াশিংটনের মর্জির ওপর নির্ভর করে থাকবে না।
২০২৫ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে মার্কিন এফ-৩৫ চুক্তির প্রাথমিক সম্মতি সত্ত্বেও ইসরাইলের ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ বজায় রাখার শর্ত রিয়াদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পেন্টাগন গভীরভাবে উদ্বিগ্ন যে, সৌদি আরব যদি তুরস্কের ‘কান’ প্রকল্পে সফলভাবে যুক্ত হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের অস্ত্র বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশকের একচেটিয়া আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ ধসে পড়বে।
ওয়াশিংটনের দ্বিমুখী আচরণ একদিকে মিত্রদের ওপর যুদ্ধের বিশাল ব্যয়ভার চাপানো এবং অন্যদিকে উন্নত প্রযুক্তি হস্তান্তরে গড়িমসি করা—রিয়াদের মধ্যে গভীর আস্থার সংকট তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতির সুযোগে তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, যা মার্কিন কৌশলগত প্রভাবকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। বিশেষ করে এফ-৩৫ এর সক্ষমতায় নানা কৃত্রিম সীমাবদ্ধতা আরোপের প্রচেষ্টা সৌদি আরবকে পূর্ণ পরিচালনগত স্বায়ত্তশাসনের সন্ধানে আঙ্কারার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মূলত আমেরিকার নিজস্ব সামরিক নীতির কঠোরতা ও ইসরায়েল-তোষণ নীতি এখন তাদের দীর্ঘদিনের আরব মিত্রদের হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
ওয়াশিংটনের দোদুল্যমানতা মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন স্বাধীন প্রতিরক্ষা বলয় তৈরির পথ প্রশস্ত করছে, যেখানে মার্কিন খবরদারি হ্রাস পাবে। এটি কেবল একটি বাণিজ্য হারানো নয়, বরং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে ওয়াশিংটনের কৌশলগত পরাজয়েরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন এফ-৩৫ ক্রয়ে ইসরাইলি আপত্তির কারণে সৃষ্ট কারিগরি সীমাবদ্ধতা এড়িয়ে পূর্ণ পরিচালনগত স্বায়ত্তশাসন অর্জনই রিয়াদের মূল লক্ষ্য। ওয়াশিংটনের প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকারের সংকীর্ণতার বিপরীতে তুরস্কের কাছ থেকে সরাসরি প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং যৌথ উৎপাদনের সুযোগ সৌদি আরবের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প বিকাশে সহায়ক হবে। ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতায় নিরাপত্তার জন্য একক কোনো পশ্চিমা শক্তির ওপর নির্ভর না করে অংশীদারিত্বে বৈচিত্র্য আনতেই মূলত রিয়াদ ‘কান’ প্রকল্পের দিকে ঝুঁকছে।
মার্কিন যুদ্ধবিমান ক্রয়ের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন প্রায়শই ‘এন্ড-ইউজার’ মনিটরিং এবং ব্যবহারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে, যা অনেক সময় ক্রেতা দেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্তকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করে। এর একটি নেতিবাচক উদাহরণ হলো পাকিস্তান, যারা এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ব্যবহারের ক্ষেত্রে মার্কিনীদের কঠিন নজরদারি ও সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হয়; এমনকি সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী অভিযানের বাইরে এগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তাদের ওয়াশিংটনের অনুমতির অপেক্ষায় থাকতে হয়।
তুরস্কের ‘কান’ প্রকল্পের অংশীদার হলে রিয়াদ কোনো বাহ্যিক রাজনৈতিক চাপ বা এই ধরনের অমর্যাদাকর নজরদারি ছাড়াই স্বাধীনভাবে বিমানটি মোতায়েন ও ব্যবহারের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন পাবে। আঙ্কারার সঙ্গে এই চুক্তি সৌদি আরবকে এমন এক কৌশলগত স্বাধীনতা দেবে, যা বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা সমরাস্ত্রের ক্ষেত্রে কার্যত অসম্ভব। নিজের আকাশসীমা রক্ষায় কখন এবং কীভাবে বিমানটি পরিচালিত হবে, তার চাবিকাঠি নিজের হাতে রাখতেই রিয়াদ তুরস্কের দিকে ঝুঁকছে। এই স্বায়ত্তশাসন মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবের সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী, স্বাধীন এবং যেকোনো ব্ল্যাকমেইল থেকে মুক্ত রাখবে।
পশ্চিমা দেশগুলো সাধারণত তাদের পঞ্চম প্রজন্মের বিমানের মূল ‘সোর্স কোড’ বা স্পর্শকাতর এভিয়েশন প্রযুক্তি হস্তান্তরে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখে, যা সৌদি আরবের নিজস্ব শিল্প বিকাশের পথে বড় বাধা। অথচ এর বিপরীতে, তুরস্ক ‘কান’ প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি প্রযুক্তি বিনিময় ও স্থানীয়ভাবে যন্ত্রাংশ উৎপাদনের সুযোগ দিতে আগ্রহী, যা রিয়াদের জন্য একটি গেম-চেঞ্জার। এই কৌশলের সফল উদাহরণ হলো চীন-পাকিস্তানের যৌথ উদ্যোগে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার প্রকল্প, যেখানে প্রযুক্তির পূর্ণ অধিকার পাওয়ায় পাকিস্তান আজ যুদ্ধবিমান রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। আঙ্কারার এই উদার প্রযুক্তি নীতি সৌদি আরবকে কেবল আমদানিকারক নয়, বরং ভবিষ্যতে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সামরিক শক্তিতে রূপান্তর করবে।
সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের সময় মার্কিন প্যাট্রিয়ট ও থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের ঝাঁকে ঝাঁকে আসা ড্রোন ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে শতভাগ কার্যকর না হওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে চরম নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং কাতার, কুয়েত ও সৌদি আরবের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরানের নির্ভুল আঘাত ঠেকাতে আমেরিকার ব্যর্থতা রিয়াদকে ভাবিয়ে তুলেছে।
২০১৯ সালে সৌদি আরবের আবকাইক-খুরাইস তেল স্থাপনায় হুথি-ইরান ড্রোন হামলায় মার্কিন ব্যবস্থার অকার্যকারিতা এবং আল উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে আমেরিকার বৃহত্তম সামরিক উপস্থিতি (১০,০০০-এর বেশি সেনা) এবং শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (যেমন- প্যাট্রিয়ট সিস্টেম) থাকা সত্ত্বেও ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে ইসরায়েলি আক্রমণ প্রতিহত করতে না পারা ওয়াশিংটনের ‘নিরাপত্তা গ্যারান্টি’কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউক্রেন যুদ্ধেও দেখা গেছে যে রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা সবসময় অভেদ্য ঢাল হতে পারছে না, যা বিশ্বের অনেক দেশের জন্য এক বিরূপ অভিজ্ঞতা। এছাড়া পোল্যান্ডের মতো দেশগুলোও অনেক সময় মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছে। এই আস্থার সংকট থেকেই সৌদি আরব এখন তুরস্কের ‘কান’ বা দক্ষিণ কোরিয়ার ‘চেওংগুং-২’-এর মতো বিকল্প ও আধুনিক প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে।
আঙ্কারার সোশ্যাল সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বারিন কায়াওগলুর মতে, ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার সাম্প্রতিক উত্তেজনা উপসাগরীয় দেশগুলোর কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন এনেছে। এই দেশগুলো এখন স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছে যে, সংকটের চরম মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র তার আঞ্চলিক মিত্রদের তুলনায় ইসরাইলের নিরাপত্তাকেই একক অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। ওয়াশিংটনের এই পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের বিপরীতে পাকিস্তানের চীন-নির্মিত জে-১০সি যুদ্ধবিমানের সফল মোতায়েন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের দক্ষিণ কোরীয় ‘চেওংগুং-২’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে যে, পশ্চিমা বলয়ের বাইরেও অত্যন্ত শক্তিশালী সামরিক বিকল্প বিদ্যমান।
এই নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় তুরস্কের উন্নত প্রযুক্তি, সৌদি আরবের বিশাল অর্থায়ন, পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতা এবং মিসরের কৌশলগত অবস্থানকে কেন্দ্র করে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই সম্ভাব্য জোট কেবল সমরাস্ত্র ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং যৌথ মহড়ার মাধ্যমে একটি স্বাধীন প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করবে। ইতিমধ্যে আজারবাইজান ও লিবিয়া সংকটে তুরস্কের ড্রোনের সাফল্য এবং কাতার সংকটের সময় আঙ্কারার দৃঢ় অবস্থান এই ধরণের আঞ্চলিক সংহতির কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। একইভাবে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো মুসলিম প্রধান দেশগুলোও এখন পশ্চিমা প্রযুক্তির পরিবর্তে এই উদীয়মান ব্লকের দিকে নজর দিচ্ছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এখন আর মার্কিন নিরাপত্তার ‘ছায়াতলে’ থাকতে বাধ্য নয়, বরং তারা নিজস্ব স্বার্থ রক্ষায় বহুমুখী অংশীদারিত্বের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
তুরস্কের ‘কান’ যুদ্ধবিমান প্রকল্প কেবল একটি সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে পশ্চিমা আধিপত্যের অবসান এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জনের একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।
সৌদি আরবের আর্থিক শক্তি ও তুরস্কের উন্নত প্রযুক্তির এই মেলবন্ধন ইসরাইলের একক আকাশ শ্রেষ্ঠত্ব এবং মার্কিন ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ নীতিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা আস্থার সংকট এবং প্রযুক্তিতে পশ্চিমাদের কৃত্রিম বিধিনিষেধ রিয়াদকে ওয়াশিংটনের বলয় থেকে বের হয়ে নিজস্ব ও নির্ভরযোগ্য আঞ্চলিক জোট গঠনের দিকে ধাবিত করেছে। এই উদ্যোগ সফল হলে তুরস্ক, সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী স্বাধীন প্রতিরক্ষা ব্লক তৈরি হবে, যা অদূর ভবিষ্যতে মার্কিন মর্জির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনবে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই অংশীদারিত্ব মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় নতুন শক্তির ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করবে এবং সমরাস্ত্র বাজারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ খর্ব করে বহু-মেরু কেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থাকে ত্বরান্বিত করবে।
এছাড়াও নিরাপত্তার গ্যারান্টি হিসেবে পশ্চিমা শক্তির ওপর আর অন্ধ নির্ভর না করে, নিজস্ব সক্ষমতা ও আঞ্চলিক সংহতির মাধ্যমেই এই দেশগুলো তাদের ভবিষ্যৎ সার্বভৌমত্ব সুনিশ্চিত করতে চায়। ‘কান’ প্রকল্প সফল হওয়া মানেই হলো মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এক নতুন ভোরের সূচনা, যেখানে আঞ্চলিক সিদ্ধান্তগুলো আর ওয়াশিংটন থেকে নিয়ন্ত্রিত হবে না। এটি বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে মুসলিম বিশ্বের সামরিক মর্যাদাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে যা অজেয় ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়।

মানুষের স্মৃতিতে জিয়াউর রহমান এমন এক শাসক, যিনি উন্নয়নের ভাষাকে শহরের মসনদ থেকে নামিয়ে খাল, মাঠ ও ইউনিয়ন পরিষদের উঠোনে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। খাল কাটা কর্মসূচি, স্বনির্ভর বাংলাদেশ ও গ্রাম সরকার; এসব ধারণা আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রশ্ন হচ্ছে, তাঁর সেই উন্নয়ন-দর্শন আজকের
৩ ঘণ্টা আগে
১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর এক চরম ভূ-রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ সংকটের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের শাসনভার গ্রহণ করেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত ভারত এবং সোভিয়েত ব্লকের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল থাকলেও, জিয়াউর রহমানের শাসনামল (১৯৭৭-১৯৮১) দেশের জাতীয় নিরাপত
৪ ঘণ্টা আগে
একটি বিকল্প বা অনুমিত ইতিহাসের দিকে তাকানো যাক। যখন মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম বন্দরে থাকার নির্দেশ মেনে নিয়েছিলেন অথবা পদক্ষেপ নেওয়ার আগেই তাঁকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়েছিল। ভাবা যাক মেজর জিয়ার এই দৃশ্যপটে আগমনের কারণ।
৬ ঘণ্টা আগে
সমকালীন ভারতীয় রাজনীতিতে আদর্শিক অবস্থানের সাথে বাস্তবতার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে যে রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটেছে, তার ধারাবাহিকতায় পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতিকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উদ্বেগজনক ‘কেস স্টাডি’ হিসেবে ধরা যায়।
১ দিন আগে