জনস্বাস্থ্যের ওপর নীরব আঘাত রোধ করতে হবে

প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৬, ১৯: ৩৫
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

বেশির ভাগ মানুষের প্রতিদিনের সকাল শুরু হয় টুথপেস্ট দিয়ে। তাতেই যদি থাকে ক্ষতিকর উপাদান, তবে আমাদের সুরক্ষা কোথায়? সম্প্রতি পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার (ইএসডিও) এক গবেষণায় উঠে এসেছে এ সংক্রান্ত কিছু তথ্য। দেশের বাজারে প্রচলিত ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা পরীক্ষায় দেখা গেছে, এর প্রায় ৭৭ শতাংশ বা ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা প্লাস্টিকের অতি ক্ষুদ্র কণার কমবেশি উপস্থিতি রয়েছে। শিশুদের জন্য তৈরি ছয়টি টুথপেস্টের চারটিতেই আবার এর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) একজন কর্মকর্তার মতে, অনেক প্রতিষ্ঠান খরচ কমিয়ে পণ্যের ওজন বাড়াতে এই প্লাস্টিক কণা ব্যবহার করছেন। এটি সত্য হলে তা কেবল অনৈতিক ব্যবসায়িক চর্চাই নয়, ভোক্তাসাধারণের স্বাস্থ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলার শামিল। ২০১৯ সাল থেকে ফেসওয়াশ ও ফেসপ্যাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বিষয়ে নজরদারি থাকলেও টুথপেস্টের মতো মৌলিক পণ্যের মানদণ্ড সংশোধনে কেন এত দেরি হচ্ছে, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই।

মাইক্রোপ্লাস্টিক কেবল টুথপেস্টে সীমাবদ্ধ নেই। এটি আমাদের চারপাশের প্রায় প্রতিটি খাদ্যপণ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। বোতলজাত পানি, সামুদ্রিক মাছ, চাল, শাকসবজি থেকে শুরু করে গরুর দুধ আর ডিমেও মিলছে প্লাস্টিক কণা। এমনকি প্লাস্টিকের ফিডিং বোতলে দুধ পানের মাধ্যমে শিশুদের শরীরে তুলনামূলক বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করছে বলে ধারণা। গবেষকরা বলছেন, এসব ক্ষুদ্র কণা মানবদেহে প্রদাহ, কোষের ক্ষতি এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের মতো ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ নিয়ে আরও গবেষণায় জোর দিলেও আমরা যে অনিশ্চয়তার দিকে এগোচ্ছি, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

এই নীরব ঘাতক থেকে মুক্তি পেতে হলে সরকারের সমন্বিত নীতি গ্রহণ করা উচিত। প্রথমত, সরকারকে অবিলম্বে জাতীয় মাইক্রোপ্লাস্টিক পর্যবেক্ষণ কর্মসূচির মতো কার্যক্রম চালু করতে হবে। নদী, ভূগর্ভস্থ পানি এবং বাজারে থাকা খাদ্যপণ্যের মান নিয়মিত পরীক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী জাতীয় ডাটাবেস থাকাও জরুরি। দ্বিতীয়ত, একবার ব্যবহারযোগ্য বা সিঙ্গল-ইউজ প্লাস্টিকের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। পলিথিন নিষিদ্ধের আইনটি শুধু কাগজে নয়; কারখানায় অর্থাৎ উৎসে অভিযান চালিয়ে তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হতে পারে ‘এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপন্সিবিলিটি’। যেসব কোম্পানি প্রয়োজনে প্লাস্টিক বাজারজাত করছে, ব্যবহারের পর সেই প্লাস্টিক সংগ্রহের দায়িত্বও তাদের নিতে হবে। ইউরোপের অনেক দেশে এই নীতি কার্যকর হয়ে সুফল দিচ্ছে। এছাড়া আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এবং শিল্পকারখানার ইটিপি ব্যবস্থার তদারকি অপরিহার্য।

মাইক্রোপ্লাস্টিক একবার পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লে তা পুরোপুরি অপসারণ করা যায় না। তাই এর উৎকৃষ্ট সমাধান হলো শুরুতেই এর ব্যবহার কমিয়ে আনা। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারকে কঠোর আইনি কাঠামো ও বৈজ্ঞানিক তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। টুথপেস্টের মতো পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধে বিএসটিআইকে এখনই মানদণ্ড সংশোধন করতে হবে।

নিত্যব্যবহার্য পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকসহ ক্ষতিকর উপাদান থাকলে ভোক্তাদের মধ্যে আতংক ও অনাস্থা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। খাদ্যপণ্যের বিষয়ে স্পর্শকাতরতা আরও বেশি থাকবে। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিতের দায়িত্ব সরকারের। আমদানিকৃত পণ্যসামগ্রী হলে সেইসব প্রতিষ্ঠানও দায় এড়াতে পারে না। ভুলভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান অভিযুক্ত হওয়াটাও কাম্য নয়। আমরা আশা করব, টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্য নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখাসহ ভোক্তাসাধারণের উদ্বেগ দূর করতে সরকারের সংশ্লিষ্টরা এগিয়ে আসবেন। ভোক্তাদের পক্ষে তো নিরাপদ-অনিরাপদ পণ্য আলাদা করে কেনা সম্ভব নয়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত