কতটা আইনসিদ্ধ হলো দুদক চেয়ারম্যান নিয়োগ

প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৬, ২২: ৪৩
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে মন্ত্রিপরিষদ সচিব দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান হিসেবে মাননীয় (অব.) বিচারপতি এ.কে.এম. আসাদুজ্জামানের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই এ নিয়োগের পক্ষে-বিপক্ষে মতামত দিচ্ছেন এবং প্রশ্ন উঠেছে, নিয়োগ আইনসিদ্ধ হলো কিনা।

বাংলাদেশে সংবিধানই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। সংবিধানের ৯৯(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সুপ্রীম কোর্টের একজন বিচারপতি অবসর গ্রহণ কিংবা পদ থেকে অপসারণের পর কোন আদালত বা কোন কর্তৃপক্ষের নিকট ওকালতি বা কার্য করবেন না এবং বিচার বিভাগীয় (Judicial) বা আধা-বিচার বিভাগীয় (Quasi-judicial) পদ ব্যতীত প্রজাতন্ত্রের কর্মে অন্য কোন লাভজনক পদে নিয়োগ লাভের যোগ্য হবেন না।

এখানে শেষ অংশটুকু লক্ষ করুন— স্পষ্ট করে বলা আছে, এই প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোন লাভজনক পদে নিয়োগের যোগ্য হবেন না। তবে বিচার বিভাগীয় কিংবা আধা-বিচার বিভাগীয় পদে নিয়োগ পেতে পারেন।

অনুচ্ছেদটি আমাদের কয়েকটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। প্রথমত, দুদকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব-কর্তব্য ‘প্রজাতন্ত্রের কর্ম’-এর অন্তর্ভুক্ত কিনা। দ্বিতীয়ত, এটি কোন ‘লাভজনক পদ’ কিনা। সবশেষে, দুদক কোন বিচার বিভাগীয় বা আধা-বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠান কিনা?

সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্ম’ বলতে অসামরিক (Civil) বা সামরিক (Military) ক্ষমতায় বাংলাদেশ সরকার-সংক্রান্ত যে কোন কর্ম, চাকুরী বা পদ এবং আইনের দ্বারা প্রজাতন্ত্রের কর্ম বলে ঘোষিত হতে পারে, এমন অন্য যে কোন কর্মকে বুঝায়।

পরের প্রশ্ন— দুদক চেয়ারম্যানের কাজকর্ম ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে’র আওতাভূক্ত এবং লাভজনক পদ কিনা? এর উত্তর খুঁজতে শুরুতেই দূর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এ চোখ বুলিয়ে আসা জরুরী। আইনের ২(খ) ধারায় উল্লিখিত সংঙ্গানুসারে এই কমিশনের চেয়ারম্যান বা অন্য যে কোন কমিশনার সকলেই ‘কমিশনার’ বলে গণ্য হবেন।

প্রসঙ্গত একটি মামলার রেফারন্স উল্লেখ করা প্রয়োজন। হাইকোর্ট বিভাগের একটি মামলার (75 DLR (HCD) P 391, ২৬ নম্বর প্যারাগ্রাফ) রায়ে বলা হয়েছে, দুদক একটি স্বাধীন ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা যা দূর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ দ্বারা পরিচালিত এবং এই কমিশনের কমিশনারগণের কাজকর্ম প্রজাতন্ত্রের কর্ম এবং কমিশনার পদটি লাভজনক বলে গণ্য হবে।

এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে যাওয়া হলো আপীল বিভাগে। আপীল বিভাগের ফুল বেঞ্চ হাইকোর্টে বিভাগের এই সিদ্ধান্তকে বহাল রাখলেন এবং এখানেও চেয়ারম্যান পদ এবং কার্যভার নিয়ে কোন ব্যতিক্রমের কথা বলা হয়নি, যা 76 DLR (AD) 49- এ উল্লেখ আছে।

দুদক আইন অনুযায়ী চেয়ারম্যানও কমিশনার বলে গণ্য হবেন। আর 75 DLR (HCD) P 391 মামলার সিদ্ধান্তের কোথাও দুদক চেয়ারম্যানকে কমিশনারদের থেকে আলাদা করে রাখা হয়নি কিংবা ব্যতিক্রম কিছু উল্লেখ করা হয়নি। তাই এই সিদ্ধান্তে উল্লিখিত প্রতিটা শব্দ চেয়ারম্যানের জন্যও সমভাবে প্রযোজ্য। অর্থাৎ, দুদকের চেয়ারম্যান পদটি প্রজাতন্ত্রের একটি লাভজনক পদ এবং চেয়ারম্যানের কাজকর্ম প্রজাতন্ত্রের কর্ম বলে গণ্য হবে।

এবার শেষ প্রশ্নটির দিকে আলোকপাত করা যাক। দুদক বিচার বিভাগীয় কিংবা আধা-বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠান কিনা? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আগে জানতে হবে বিচার বিভাগীয় এবং আধা-বিচার বিভাগীয় বলতে মূলত কী বুঝায়।

বাংলাদেশ সংবিধান কিংবা প্রচলিত অন্য কোন আইনে এই শব্দ দুটির সুনির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞা দেওয়া নেই। তবে বিচার বিভাগীয় কাঠামো ও প্রশাসনিক কাঠামোর বিচার-বিশ্লেষণ করলে এ সম্পর্কে একটি সহজ ধারণা পাওয়া যায়। একটি সংস্থা বিচার বিভাগীয় কিংবা আধা-বিচার বিভাগীয় কিনা, সেটা নির্ভর করে ঐ সংস্থা কিংবা প্রতিষ্ঠানের বিচার করার এখতিয়ার আছে কিনা তার ওপর।

দুদক আইন, ২০০৪ অনুযায়ী, দুদক অবশ্যই কোন অভিযোগ গ্রহণ, অনুসন্ধান, তদন্ত, গ্রেফতার এবং এমনকি শুনানীও করতে পারে। কিন্তু তদন্ত, অনুসন্ধান, গ্রেপ্তারের কিংবা শুনানীর ক্ষমতা আর বিচারিক ক্ষমতা এক নয়। কোনো অভিযোগের চূড়ান্ত বিচার করে রায় দেওয়ার ক্ষমতা দুদকের নেই। তাই দুদককে কোনভাবেই বিচার বিভাগীয় সংস্থা বলা যায় না।

তাহলে দুদক কি আধা-বিচার বিভাগীয় সংস্থা? দুদক আইন কিংবা বিধিমালার কোথাও এই বিষয়ে কিছু বলা নেই। তাই সুপ্রীমকোর্ট ভিন্ন কোন ব্যাখ্যা না দেওয়া পর্যন্ত ধরে নেওয়া যায়, দুদককে আধা-বিচার বিভাগীয় সংস্থা বলারও সুযোগ নেই।

আবার দুদক আইনের ৫ ধারায় স্পষ্ট করে বলা আছে, নিয়োগ বৈধ হোক বা না হোক, চেয়ারম্যান থাকাকালীন তাঁর কোন কাজকর্মের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না। অন্যদিকে, সংবিধানের ১৩৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংবিধানে অন্যথা না থাকলে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির সন্তুষ্টি অনুযায়ী পদে বহাল থাকবেন। ফলে দুদকের চেয়ারম্যানের পদ, তাঁর মেয়াদ এবং রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা—এই সবগুলো বিষয়ও একই সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে।

সুতরাং দুদকের চেয়ারম্যান নিয়োগ নিছক রাজনৈতিক বিতর্ক নয়; সাংবিধানিক ও আইনগত ব্যাখ্যারও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যদি দুদক কোন বিচার বিভাগীয় কিংবা আধা-বিচার বিভাগীয় সংস্থা না হয় এবং চেয়ারম্যানের পদকে প্রজাতন্ত্রের কর্মে একটি লাভজনক পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে সংবিধানের ৯৯(১) অনুচ্ছেদের সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির এই নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

পতিত স্বৈরাচারী সরকার একটু একটু করে রাষ্ট্রের প্রতিটা সেক্টরকে ফ্যাসিস্ট করে তুলে এই রাষ্ট্রযন্ত্রকে শুধু বিকল করেছে তা নয়, ফ্যাসিজমের জাতাকলে দুমড়েমুচড়ে দিয়েছে। এমন ভঙ্গুর অবস্থা থেকে রাষ্ট্রকে টেনে তোলাটা এই সরকারের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রজাতন্ত্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে সরকার তার পছন্দমতো ব্যক্তিকে নিয়োগ দেবে, এটা উপমহাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। তাছাড়া মানুষ মাত্রই যেহেতু রাজনৈতিক, তাই নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু নিয়োগ হতে হবে দক্ষতার ভিত্তিতে। হতে হবে স্বচ্ছ, আইনসিদ্ধ ও বৈধ। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে গঠিত সরকার কর্তৃক কোন নিয়োগদানের বৈধতা নিয়ে যদি প্রশ্ন তোলার সুযোগ সৃষ্টি হয়, তাহলে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে সরকারের বিশ্বাস ও আন্তরিকতা নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরী হওয়াটা স্বাভাবিক।

আশা রাখি এবং বিশ্বাস করি, এই সরকার আইন, রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রের এই জটিল অবস্থার ভারসাম্যপূর্ণ ও আইনসম্মত সমাধানের পথে হাঁটবে। শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির চেয়ে বড় রাষ্ট্র, পদমর্যাদার চেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান এবং সবার ঊর্ধ্বে—সংবিধান।

• সাফ্‌ফাত হোমায়রা: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট

* মতামত লেখকের নিজস্ব

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

কতটা আইনসিদ্ধ হলো দুদক চেয়ারম্যান নিয়োগ