পাসপোর্ট কখন শক্তিশালী কখন দুর্বল হয়

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০২৬, ১৬: ২৫
বাংলাদেশের পাসপোর্ট। সংগৃহীত ছবি

প্রতি বছরই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাসপোর্ট নিয়ে বৈশ্বিক র‍্যাংকিং প্রকাশিত হয়। কোথাও বলা হয়, সিঙ্গাপুরের পাসপোর্ট সবচেয়ে শক্তিশালী, আবার কোথাও দেখা যায় সংযুক্ত আরব আমিরাত শীর্ষে। অন্যদিকে বাংলাদেশের অবস্থানও বিভিন্ন সূচকে কিছুটা ভিন্ন দেখা যায়। এতে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—একই দেশের পাসপোর্টের অবস্থান একেক সূচকে একেক রকম কেন? ‘শক্তিশালী পাসপোর্ট’ বলতেই বা কী বোঝায়?

পাসপোর্ট সূচক কী

পাসপোর্ট সূচক বা পাসপোর্ট ইনডেক্স হলো এমন একটি বৈশ্বিক র‍্যাংকিং, যেখানে বিভিন্ন দেশের পাসপোর্টধারীরা কতটি দেশে ভিসামুক্ত, আগমনের পর ভিসা বা ভিসা অন অ্যারাইভাল অথবা ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন নিয়ে প্রবেশ করতে পারেন, তার ভিত্তিতে দেশগুলোর অবস্থান নির্ধারণ করা হয়।

এটি কোনো সরকারি আন্তর্জাতিক সংস্থার সূচক নয়। বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিজস্ব পদ্ধতিতে এই সূচক তৈরি করে। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো, হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স। এটি সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত সূচক। এই সূচকটি তৈরি করা হয় টিম্যাটিক বা ট্রাভেল ইনফরমেশন ম্যানুয়াল অটোমেটিক থেকে পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। আর টিম্যাটিক হচ্ছে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (আইএটিএ) পরিচালিত একটি বৈশ্বিক ভ্রমণ-তথ্যভান্ডার। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাসপোর্ট, ভিসা, স্বাস্থ্যবিধি এবং দেশে প্রবেশ-সংক্রান্ত নিয়মের হালনাগাদ তথ্য সংরক্ষিত থাকে।

আরেকটি পাসপোর্ট ইনডেস্ক প্রকাশ করে থাকে আরটন ক্যাপিটাল। এই সূচকটি তৈরি করার সময় ভিসামুক্ত প্রবেশকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ কারণে একই দেশের অবস্থান একেক সূচকে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।

কীভাবে নির্ধারণ করা হয় পাসপোর্টের শক্তিমত্তা

একটি পাসপোর্ট কতটা শক্তিশালী, তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হলো—সেই দেশের নাগরিক কতটি দেশে আগে থেকে ভিসা না নিয়েই যেতে পারেন।

সাধারণভাবে চারভাবে এই প্রবেশব্যবস্থা বিবেচনা করা হয়। প্রথমত, ভিসামুক্ত। অর্থাৎ কোনো ভিসা ছাড়াই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রবেশ করা যায়। দ্বিতীয়ত, আগমনের পর ভিসা। গন্তব্য দেশে পৌঁছে বিমানবন্দর বা সীমান্তে ভিসা নেওয়া যায়। এরপর আছে, ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন। এটি পূর্ণাঙ্গ ভিসা নয়। ভ্রমণের আগে অনলাইনে একটি অনুমোদন নিতে হয়। কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো কয়েকটি দেশ এই ব্যবস্থা ব্যবহার করে।

এছাড়াও আছে ই-ভিসা। তবে অনেক সূচক এটিকে ভিসামুক্ত প্রবেশ হিসেবে গণনা করে না, কারণ আবেদন ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেই হয়।

তবে শুধু ভিসামুক্ত দেশের সংখ্যাই নয়, একটি দেশের পাসপোর্টের নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত মানও আন্তর্জাতিক আস্থা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইসিএও) জাতিসংঘের একটি বিশেষায়িত সংস্থা, যা বিশ্বের দেশগুলোর পাসপোর্টের প্রযুক্তিগত মান, মেশিনে পাঠযোগ্য ও বায়োমেট্রিক পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণ করে।

উন্নত নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যযুক্ত ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পাসপোর্ট জালিয়াতির ঝুঁকি কমায় এবং বিভিন্ন দেশের সীমান্ত কর্তৃপক্ষের কাছে আস্থা তৈরি করে। তবে পাসপোর্ট সূচকের স্কোর সরাসরি এই প্রযুক্তিগত মানের ওপর নির্ধারিত হয় না, সূচকে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো ভিসামুক্ত বা সহজ শর্তে ভ্রমণের সুযোগ।

অন্যদিকে যদি কোনো দেশের নাগরিককে প্রতিটি সফরের আগে দূতাবাস বা কনস্যুলেটে গিয়ে নিয়মিত ভিসা নিতে হয়, তাহলে সেই পাসপোর্ট তুলনামূলক দুর্বল হিসেবে বিবেচিত হয়।

একেক সূচকে একেক রকম পাসপোর্ট র‍্যাংকিং দেখা যায়। এর মূল কারণ হলো, সব সূচক একই পদ্ধতি অনুসরণ করে না।

টিম্যাটিক ও আরটন ক্যাপিটালের তথ্য অনুযায়ী, হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স সাধারণত ভিসামুক্ত, আগমনের পর ভিসা এবং ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন সুবিধাকে গুরুত্ব দেয়। অন্যদিকে কিছু সূচক ই-ভিসাকেও আলাদাভাবে মূল্যায়ন করে, আবার কোনো কোনো সূচকে করব্যবস্থা, নাগরিকত্বের সুযোগ বা বৈশ্বিক চলাচলের সামগ্রিক স্বাধীনতার মতো অতিরিক্ত সূচকও যুক্ত করা হয়।

এ ছাড়া তথ্য হালনাগাদের সময়ও ভিন্ন হতে পারে। একটি দেশ নতুন কোনো ভিসামুক্ত চুক্তি করলে একটি সূচকে তা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিফলিত হলেও অন্য সূচকে কিছুটা সময় লাগতে পারে।

পাসপোর্ট কখন শক্তিশালী হয়

একটি দেশের পাসপোর্ট রাতারাতি শক্তিশালী হয়ে যায় না। এর পেছনে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কাজ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্য দেশের সঙ্গে ভিসা অব্যাহতি চুক্তি হলে সেই দেশের নাগরিকরা সহজে ভ্রমণের সুযোগ পান। এছাড়াও, দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক যত উন্নত হয়, তত বেশি দেশ পারস্পরিক ভ্রমণ সহজ করার বিষয়ে আগ্রহী হয়। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশের পাসপোর্ট জাল হওয়ার ঝুঁকি কম হলে, বায়োমেট্রিক প্রযুক্তি উন্নত হলে এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী হলে অন্যান্য দেশের আস্থা বাড়ে।

এছাড়াও, অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি কম থাকাও বড় বিষয়। যদি কোনো দেশের নাগরিকদের মধ্যে অবৈধভাবে থেকে যাওয়ার প্রবণতা কম থাকে, তাহলে অনেক দেশ ভিসানীতি শিথিল করতে আগ্রহী হয়। আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা, সন্ত্রাসবাদ দমন, তথ্য বিনিময় এবং সীমান্ত নিরাপত্তায় সহযোগিতাও ভিসা সহজ হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কখন পাসপোর্ট দুর্বল হয়ে পড়ে

পাসপোর্ট দুর্বল হওয়ার পেছনেও একাধিক কারণ রয়েছে। যদি কোনো দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাড়ে, যুদ্ধ বা বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়, তাহলে অন্য দেশগুলো ভিসা নীতি কঠোর করতে পারে। একইভাবে কোনো দেশের নাগরিকদের মধ্যে যদি ভিসার শর্ত ভঙ্গ, অবৈধ অভিবাসন, মানবপাচার বা জাল কাগজপত্র ব্যবহারের ঘটনা বেশি দেখা যায়, তাহলে নতুন করে ভিসা বিধিনিষেধ আরোপ হতে পারে।

কখনও কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতিও প্রভাব ফেলে। দুই দেশের সম্পর্ক খারাপ হলে ভিসা সহজীকরণ চুক্তি স্থগিত বা বাতিল হতে পারে। তবে একটি দেশের পাসপোর্টের অবস্থান নিচে নেমে গেলেই যে সেই দেশ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে গেছে, এমনটি নয়। এটি মূলত আন্তর্জাতিক ভ্রমণের সুবিধার একটি সূচক।

Ad 300x250

সম্পর্কিত