জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

পাক-আফগান সংঘাত থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় কীভাবে তৈরি হচ্ছে নতুন ভূ-রাজনৈতিক সংকট

প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৬, ১৭: ৫৫
স্ট্রিম গ্রাফিক

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে গত কয়েক দশকে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত জটিল ও দ্বান্দ্বিক। একসময় যে দেশটিকে তালেবানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক মনে করা হতো, সেই পাকিস্তানের সঙ্গেই এখন আফগান তালেবান সরকারের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। দীর্ঘদিনের ‘ইসলামিক ভ্রাতৃত্ব’ এবং ‘কৌশলগত মিত্রতার’ বয়ান ছাপিয়ে এখন দুই দেশের সীমান্তে কামানের গর্জন আর পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তান আফগান সীমান্তে তালেবান হামলার প্রতিক্রিয়ায় ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'অপারেশন গজব লিল হক' শুরু করে । এই অভিযানের অংশ হিসেবে পাকিস্তানের বিমানবাহিনী আফগানিস্তানের কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ তালেবান সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। ২০২১ সালে কাবুলে তালেবানের পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর ধারণা করা হয়েছিল পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্ত হয়তো নিরাপদ হবে, কিন্তু বাস্তবতা তার উল্টো। এই সংঘাত এখন আর কেবল দুটি দেশের দ্বিপাক্ষিক সীমান্ত বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই বরং এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার জন্য এক নতুন ও গভীর ভূ-রাজনৈতিক সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

আফগান-পাক বর্তমান সংঘাতের ঐতিহাসিক বীজ বপন করা হয়েছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে, যা আজও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক অমীমাংসিত ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে। এই সংকটের মূলে রয়েছে ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব স্যার মর্টিমার ডুরান্ড এবং আফগান আমির আব্দুর রহমান খানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি বিতর্কিত সীমান্ত চুক্তি, যা বিশ্বরাজনীতিতে ‘ডুরান্ড লাইন’ নামে পরিচিত।

২,৬৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্ত রেখাটি কোনো ভৌগোলিক, নৃ-তাত্ত্বিক বা জাতিগত মানদণ্ড বিবেচনা না করেই মূলত পশতুন অধ্যুষিত অঞ্চলকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছিল। ব্রিটিশদের মূল লক্ষ্য ছিল রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে একটি ‘বাফার স্টেট’ বা মধ্যবর্তী অঞ্চল তৈরি করা, কিন্তু এই কৃত্রিম বিভাজন কয়েক কোটি পশতুনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ঐতিহাসিকভাবে, আফগানিস্তানের কোনো সরকারই ডুরান্ড লাইনকে কখনোই স্থায়ী আন্তর্জাতিক সীমানা হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি, তা সে ১৯১৯ সালের আমানুল্লাহ খানের রাজতন্ত্র হোক, শীতল যুদ্ধকালীন কমিউনিস্ট শাসন, হামিদ কারজাই বা আশরাফ গনি সরকার, কিংবা বর্তমানের কট্টরপন্থী তালেবান প্রশাসন।

২০২১ সালের ১৫ আগস্ট যখন ২০ বছরের যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে তালেবান দ্বিতীয়বার কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখন ইসলামাবাদের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এক ধরনের প্রকাশ্য উল্লাস ও স্বস্তি দেখা গিয়েছিল। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান একে ‘মানসিক দাসত্বের জিঞ্জির ভাঙা’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।

কাবুলের নীতিগত অবস্থান হলো, ১৮৯৩ সালের সেই চুক্তিটি ছিল ব্রিটিশদের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তির কাছে বাধ্য হয়ে মেনে নেওয়া একটি ১০০ বছরের সাময়িক সমঝোতা, যার মেয়াদ ১৯৯৩ সালেই শেষ হয়ে গেছে। তাদের মতে, ডুরান্ড লাইন কোনো সীমানা নয়, বরং এটি একটি ‘ডি-ফ্যাক্টো’ বা কার্যকরী রেখামাত্র। অন্যদিকে, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত বিভক্তির পর পাকিস্তান উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এই রেখাকে একটি স্থায়ী, বৈধ এবং অপরিবর্তনীয় আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে বিবেচনা করে।

পাকিস্তানের জন্য এই রেখার স্বীকৃতি জাতীয় অখণ্ডতা রক্ষার একটি অপরিহার্য শর্ত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তান এই সীমানার সুরক্ষায় কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে অত্যন্ত বিতর্কিতভাবে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করেছে। তালেবান সরকার এই বেড়া নির্মাণকে তাদের ভূমির সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত এবং পশতুনদের পৈত্রিক ভিটেমাটি থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র হিসেবে গণ্য করে। সীমান্ত সংঘর্ষের সময় তালেবান যোদ্ধাদের নিজ হাতে এই বেড়া উপড়ে ফেলার ঘটনা দুই দেশের শত্রুতাকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

এই সীমানা বিতর্ক কেবল মানচিত্রের একটি কাল্পনিক রেখা নয়, বরং এটি গভীর 'পশতুন জাতীয়তাবাদ' এর আবেগের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। খাইবার পাখতুনখাওয়া এবং আফগানিস্তানের পশতুনদের মধ্যে যে শত বছরের পুরাতন সাংস্কৃতিক, ভাষাগত, বৈবাহিক ও জাতিগত ঐক্য রয়েছে, ডুরান্ড লাইন তাকে কৃত্রিমভাবে বাধাগ্রস্ত করে। পশতুনদের কাছে এটি তাদের হৃৎপিণ্ডের ওপর দিয়ে টানা এক করাত, যা এক রক্তমাংসের জাতিকে দুই ভাগে চিরে ফেলেছে। এই জাতিগত বিভাজন এবং সীমান্তের অনিশ্চয়তাই দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাস, সীমান্ত সংঘাত এবং বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক সংকটের প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২১ সালের ১৫ আগস্ট যখন ২০ বছরের যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে তালেবান দ্বিতীয়বার কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখন ইসলামাবাদের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এক ধরনের প্রকাশ্য উল্লাস ও স্বস্তি দেখা গিয়েছিল। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান একে ‘মানসিক দাসত্বের জিঞ্জির ভাঙা’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। পাকিস্তানের সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই ভেবেছিল, তাদের দীর্ঘদিনের লালিত ‘কৌশলগত গভীরতা’ বা স্ট্রাটেজিক ডেপথ নীতি অবশেষে সফল হয়েছে। তাদের ধারণা ছিল, একটি বন্ধুপ্রতিম ও পাকিস্তানের ওপর নির্ভরশীল তালেবান সরকার আফগানিস্তানে ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব চিরতরে মুছে দেবে এবং পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তকে একটি 'নিরাপদ অঞ্চলে' পরিণত করবে। কিন্তু তালেবান দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পরবর্তী কয়েক বছরের বাস্তবতা পাকিস্তানের সেই হিসাব-নিকাশকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়েছে।

ক্ষমতায় বসার পরপরই আফগান তালেবান স্পষ্ট করে দেয় যে, তারা কোনো দেশের ‘প্রক্সি’ বা আজ্ঞাবহ শক্তি হিসেবে কাজ করতে আগ্রহী নয়। পাকিস্তান আশা করেছিল যে, ডুরান্ড লাইন ইস্যুতে তালেবান নমনীয় হবে এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ গোষ্ঠীগুলোকে দমন করবে। কিন্তু বাস্তবে তালেবান সরকার অত্যন্ত কঠোরভাবে তাদের সার্বভৌমত্বের কথা বলতে শুরু করে। তারা কেবল ডুরান্ড লাইনকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকারই করেনি, বরং সীমান্তে পাকিস্তানের তৈরি করা কাঁটাতারের বেড়া উপড়ে ফেলে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। এটি পাকিস্তানের সামরিক পরিকল্পনাকারীদের জন্য ছিল এক অভাবনীয় ধাক্কা, যা তাদের কয়েক দশকের আফগান নীতিকে এক চরম ব্যর্থতার মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।

আফগান-পাক এই অস্থিতিশীলতা দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্যকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করছে। ঐতিহাসিকভাবে আফগানিস্তানে ভারতের শক্তিশালী প্রভাব ছিল। পাকিস্তান-তালেবান দ্বন্দ্বের ফলে ভারতের জন্য এক নতুন কৌশলগত সুযোগ তৈরি হয়েছে। তালেবান এখন পাকিস্তানের ওপর তাদের অতিনির্ভরতা কমাতে ভারতের সাথে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহী।

এই ‘প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা’র দ্বন্দ্বে সবচেয়ে বড় বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়ায় তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। পাকিস্তান শুরু থেকেই দাবি করে আসছে যে, আফগান তালেবান যেন তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানে হামলা চালানো টিটিপি জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু আদর্শগতভাবে একই ঘরানার হওয়ায় আফগান তালেবান তাদের 'ভাই'দের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে অস্বীকৃতি জানায়। বরং তারা টিটিপিকে আফগানিস্তানের মাটিতে নিরাপদ আশ্রয় এবং লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করছে বলে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিশ্চিত করেছে।

আফগান তালেবানের এই অবস্থান ইসলামাবাদের জন্য এক বড় ধরনের কৌশলগত পরাজয়। পাকিস্তান ভেবেছিল তালেবান হবে তাদের হাতের অস্ত্র, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে তালেবান নিজেই পাকিস্তানের জন্য এক বিশাল নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, তালেবানের ওপর পাকিস্তানের যে তথাকথিত ‘নিয়ন্ত্রণ’ ছিল, তা এখন কেবল ইতিহাস। বর্তমানের তালেবান প্রশাসন নিজেদের একটি স্বাধীন আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, যা পাকিস্তানের আঞ্চলিক আধিপত্যের স্বপ্নের জন্য এক বড় অন্তরায়।

২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) নামক এই গোষ্ঠীটির মূল লক্ষ্য পাকিস্তানে শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠা এবং পাকিস্তানি রাষ্ট্রের কাঠামোর আমূল পরিবর্তন। ২০২১ সালে কাবুলে আফগান তালেবানের বিজয়ের পর টিটিপি এক নতুন প্রাণশক্তি পায়। পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগান তালেবান কেবল টিটিপি-কে নৈতিক সমর্থনই দিচ্ছে না, বরং তাদের অত্যাধুনিক মার্কিন অস্ত্রশস্ত্র (যা ন্যাটো বাহিনী ফেলে গিয়েছিল) এবং আফগানিস্তানের খোস্ত ও কুনার প্রদেশে নিরাপদ অভয়ারণ্য প্রদান করছে।সাউথ এশিয়া টেরোরিজম পোর্টাল এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলার হার গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখোয়া এবং বেলুচিস্তান প্রদেশে টিটিপি তাদের আত্মঘাতী হামলা ও চোরাগোপ্তা আক্রমণের তীব্রতা বাড়িয়ে দিয়েছে। পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ এর ২০২৫ সালের বার্ষিক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৪ সালে পাকিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ৭০% বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই নিরাপত্তা সংকটের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে যখন পাকিস্তান সরকার তাদের দীর্ঘদিনের 'ধৈর্য ধরার' নীতি ত্যাগ করে সরাসরি সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। রয়টার্স এবং আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালের বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তান বিমানবাহিনী আফগানিস্তানের খোস্ত ও কুনার প্রদেশে টিটিপির আস্তানা লক্ষ্য করে বেশ কিছু ড্রোন ও বিমান হামলা চালায়। পাকিস্তান একে ‘সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আত্মরক্ষা’ হিসেবে বর্ণনা করলেও আফগান তালেবান একে তাদের আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছে।

এই নিরাপত্তা সংকটের আরেকটি গভীর দিক হলো টিটিপির সাথে অন্যান্য বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী, বিশেষ করে বেলুচ লিবারেশন আর্মির এক ধরনের কৌশলগত জোট। দ্য ডিপ্লোম্যাট এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আফগান ভূমি ব্যবহার করে এই গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তানের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড এবং বিশেষ করে চীনা বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। ফলে এই টিটিপি ফ্যাক্টরটি কেবল পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নয়, বরং পাকিস্তানের সমগ্র জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল এবং বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের জন্ম দিয়েছে।

আফগান-পাক এই অস্থিতিশীলতা দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্যকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করছে। ঐতিহাসিকভাবে আফগানিস্তানে ভারতের শক্তিশালী প্রভাব ছিল। পাকিস্তান-তালেবান দ্বন্দ্বের ফলে ভারতের জন্য এক নতুন কৌশলগত সুযোগ তৈরি হয়েছে। তালেবান এখন পাকিস্তানের ওপর তাদের অতিনির্ভরতা কমাতে ভারতের সাথে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহী। ভারতও কাবুলে তার কারিগরি মিশন পুনরায় চালু করেছে। এছাড়া পাকিস্তান তোর্খাম ও চামান সীমান্ত বারবার বন্ধ করে দেওয়ায় আফগানিস্তান এখন ইরানের চাবাহার বন্দরের মাধ্যমে ভারতের সাথে বাণিজ্যে আগ্রহী হচ্ছে, যা পাকিস্তানের ‘ট্রানজিট পলিটিক্স’এর গুরুত্ব কমিয়ে দিচ্ছে।

চীন এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী এবং তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বা সিপেক প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পাকিস্তানে চীনা প্রকৌশলী ও প্রকল্পগুলোর ওপর টিটিপি এবং বেলুচ বিদ্রোহীদের হামলা চীনকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। চীন বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের চেষ্টা করছে, যাতে এই সংঘাত তাদের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ কে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। রাশিয়া আফগানিস্তানের অস্থিতিশীলতাকে তার ‘প্রভাব বলয়’ বা মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে। মস্কো ভয় পায় যে এই সংঘাতের সুযোগ নিয়ে আইএস-কে বা অন্যান্য উগ্রবাদী গোষ্ঠী ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে রাশিয়া এখন সরাসরি তালেবানের সাথে নিরাপত্তা বিষয়ক সংলাপ বাড়াচ্ছে।

এই রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ এবং দুই দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি। পাকিস্তান বর্তমানে চরম অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত। এই অবস্থায় একটি দীর্ঘস্থায়ী সীমান্ত যুদ্ধ বা নিরাপত্তা ব্যয় বৃদ্ধি দেশটির জন্য আত্মঘাতী হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তোর্খাম ও চামান সীমান্ত বারবার বন্ধ করে দেওয়ার ফলে আফগানিস্তানের ল্যান্ডলকড অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ছে। অন্যদিকে, পাকিস্তানও আফগানিস্তানের মাধ্যমে মধ্য এশিয়ার বাজারে প্রবেশের পথ হারাচ্ছে। পাকিস্তান থেকে প্রায় ১৭ লক্ষ অনিবন্ধিত আফগান শরণার্থীকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্কের তিক্ততা চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে। ইউএনএইচসিআর এর তথ্যমতে, এই সিদ্ধান্ত এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় তৈরি করেছে, যেখানে হাজার হাজার পরিবার তীব্র শীতে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সংঘাত একটি ‘নিম্ন-মাত্রার যুদ্ধে’ রূপ নিয়েছে। সাউথ এশিয়া টেরোরিজম পোর্টাল এবং রয়টার্স এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদ ও সীমান্ত সংঘাতজনিত কারণে নিহতের সংখ্যা প্রায় ৩,৪০০ ছাড়িয়েছে। জাতিসংঘের আফগানিস্তান সহায়তা মিশন এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ সালের সীমান্ত সংঘর্ষে এবং পাকিস্তানের বিমান হামলায় অন্তত ৪৫০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। যুদ্ধ ও শরণার্থী বহিষ্কারের ফলে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে প্রায় ৬৫,০০০ মানুষ নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

বিবিসি এই পরিস্থিতিকে ‘দুই মিত্রের শত্রুতা’ এবং দক্ষিণ এশিয়ার নতুন ‘ফ্ল্যাশপয়েন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। চ্যাথাম হাউস এর মতে, পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের আফগান কৌশল এখন সম্পূর্ণ ব্যর্থ। বর্তমানে চীন এ সংঘাতে সবচেয়ে সক্রিয় মধ্যস্থতাকারী। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে চীনের বিশেষ দূত ইউয়ে জিয়াওয়ং অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছেন। এছাড়া কাতার এবং রাশিয়া পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা চালাচ্ছে। ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের কারণে সার্ক বর্তমানে এই সংকট মোকাবিলায় প্রায় অকার্যকর ভূমিকা পালন করছে।

আফগান-পাক বর্তমান সংঘাতকে কেবল একটি সাধারণ সীমান্ত বিরোধ বা সাময়িক উত্তেজনা হিসেবে দেখার অবকাশ নেই, বরং এটি ধর্মীয় আদর্শিক দ্বন্দ্ব, পশতুন জাতিগত পরিচয় এবং কয়েক দশকের ত্রুটিপূর্ণ ও অদূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতির এক বিস্ফোরক মিশ্রণ। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার স্বার্থে এই সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হলো একটি কার্যকর দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এবং ডুরান্ড লাইন ইস্যুতে উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদী সমঝোতায় আসা। যদি এই সংঘাত অদূর ভবিষ্যতে প্রশমিত না হয়, তবে এর চড়া মূল্য দিতে হবে পুরো দক্ষিণ এশিয়াকে।

সীমান্তের এই অস্থিরতা ও নিরাপত্তা শূন্যতাকে পুঁজি করে আইএস-কে বা আল-কায়েদার মতো আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো তাদের নেটওয়ার্ক পুনরায় শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে। ফলে এই অঞ্চলটি আবারও বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা কেবল পাকিস্তান বা আফগানিস্তান নয়, বরং ভারত, বাংলাদেশসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকেও বিঘ্নিত করতে পারে। বিশেষ করে, এই অস্থিতিশীলতা দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক সংযোগের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান উভয় দেশকেই তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে সরে এসে বাস্তববাদী হতে হবে। আফগান তালেবানকে যেমন তাদের মাটি ব্যবহার করে পরিচালিত আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ দমনে কঠোর হতে হবে, তেমনি পাকিস্তানকেও তাদের ‘কৌশলগত গভীরতা’ বা অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের নীতি থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর উচিত এখানে সক্রিয় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা। মনে রাখতে হবে, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ কখনোই দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনতে পারে না। প্রকৃত ও টেকসই শান্তি কেবল আলোচনার টেবিলেই সম্ভব, রণক্ষেত্রে নয়। ইতিহাসের শিক্ষা হলো প্রতিবেশীকে অশান্ত রেখে কোনো দেশই দীর্ঘমেয়াদে শান্তিতে থাকতে পারে না।

লেখক: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক।

ই-মেইলঃ [email protected]

সম্পর্কিত