ড. আবদুল লতিফ মাসুম

আজ ১ সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই রাজনৈতিক দলটির দীর্ঘ পথচলায় যেমন রয়েছে ঈর্ষণীয় সাফল্য, তেমনই রয়েছে নানা চড়াই-উতরাই ও ব্যর্থতার গল্প। গত প্রায় পাঁচ দশকে দলটি তাদের মূল দর্শন—বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও বহুদলীয় গণতন্ত্র—কতটা ধারণ করতে পেরেছে বা দলটির ভবিষ্যৎ গন্তব্যই বা কী, তা আজ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অন্যতম আলোচ্য বিষয়।
বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্নটির কথা আমার স্পষ্টভাবে মনে আছে। সে সময় রাজনৈতিক ও আদর্শিকভাবে বাংলাদেশে এক বিশাল শূন্যতা বিরাজ করছিল। তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সেকুলারিজম এবং ভারত-তোষণ নীতির বিপরীতে জিয়াউর রহমান একটি ঐক্যের রাজনীতির সূচনা করতে চেয়েছিলেন। আমাদের নৃতত্ত্ব, ধর্ম, ভাষা, ভূগোল ও ইতিহাস—সবকিছুর সমন্বয়ে তিনি ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ প্রতিষ্ঠা করেন; সেই সঙ্গে বিএনপিকে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম বা ‘পলিটিক্যাল ভেহিকেল’ হিসেবে গড়ে তোলেন।
অনেকেই বলেন সামরিক শাসন থেকে দলটির জন্ম, কিন্তু নিপাতনে সিদ্ধ ঘটনার মতো একজন সামরিক শাসক হয়েও তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্যের যে ডাক দিয়েছিলেন, তাতে তিনি সর্বাংশে সফল হয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান যথার্থভাবেই একটি ‘সেন্ট্রিস্ট’ বা মধ্যপন্থী ভূমিকা পালন করেছিলেন। বাম ধারার ডান অংশ এবং ডান ধারার বাম অংশের মধ্যে এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন তিনি।
তবে জিয়াউর রহমান বিএনপিকে যে আদর্শিক ভিত্তি, ঐক্য ও নিয়মতান্ত্রিকতা দিতে চেয়েছিলেন, তা পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়ার আগেই তিনি প্রাণ হারান। রাজনৈতিক দীক্ষা বা প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো আদর্শিক দল গড়ে ওঠে না—এই সত্যটি জিয়াউর রহমান বুঝতেন বলেই তিনি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। কিন্তু তাঁর অকাল প্রয়াণে সেই আদর্শিক ভিত্তিটি ‘ক্রিস্টালাইজড’ বা সুসংগঠিত হওয়ার পর্যাপ্ত সময় পায়নি।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, আদর্শিক বন্ধনের অভাব এবং সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে বিএনপি যখন এক ভয়াবহ বিভাজনের মুখে পড়ে—এমনকি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পক্ষে বিএনপির একটি বড় অংশ যখন কাজ শুরু করে—তখন আমি আবারও এক অসম্ভবকে সম্ভব হতে দেখি। একজন গৃহবধূ থেকে বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির কাণ্ডারি হয়ে ওঠেন। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। তাঁর আপোসহীন নেতৃত্বের মাধ্যমেই স্বৈরাচার পতন ঘটে এবং বিএনপি রাজনৈতিকভাবে শক্ত ভিত পায়।
আমার সরাসরি শিক্ষক ও বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান তাঁর ‘পলিটিক্যাল পার্টিজ ইন বাংলাদেশ’ গ্রন্থে অকপটে স্বীকার করেছেন যে, বিএনপি একসময় যে ‘সরকারি পার্টি’ হিসেবে পরিচিত ছিল, বেগম জিয়ার নেতৃত্বে সেটি ‘পপুলার পার্টি’ বা গণমানুষের দলে রূপান্তরিত হয়। ক্যান্টনমেন্ট থেকে জন্ম নেওয়া দলটিকে গণভিত্তি দেওয়ার কৃতিত্ব সম্পূর্ণ তাঁর। ১৯৯০-৯১ সালের নির্বাচনে যখন সবাই ধরেই নিয়েছিল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে, তখন সবাইকে অবাক করে দিয়ে বিএনপি জয়লাভ করে। প্রশাসনিকভাবেও তিনি সফল ছিলেন।
বাংলাদেশের রাজনীতি ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’ বা ভুল ও সংশোধনের মধ্য দিয়েই এগোয়। বিএনপি ক্ষমতায় ছিল, আবার ক্ষমতাচ্যুতও হয়েছে। তবে এক-এগারোর (১/১১) পটপরিবর্তন ও ক্ষমতাচ্যুতির জন্য বিএনপি নিজেই অনেকাংশে দায়ী। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের মতো একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে মনোনীত করা এবং বিচারপতি কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করতে গিয়ে বিচারপতির অবসরের বয়সসীমা ৬৫ থেকে ৬৭ বছর করার জেদ ধরা—এগুলো ছিল বিএনপির চরম রাজনৈতিক ভুল।
এই ভুলের মাশুল তাদের কড়ায়-গণ্ডায় মেটাতে হয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর তারা ক্ষমতার বাইরে ছিল, দলের নেতাকর্মীরা নিগৃহীত হয়েছে। তবে ২০২৪-এ জুলাই-আগস্টে যে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশে ঘটে গেল, তার মূল নেতৃত্বে ছাত্ররা থাকলেও এই আন্দোলনের পেছনে বিএনপির দীর্ঘ ১৭ বছরের ত্যাগের একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত ছিল, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
আমেরিকার ইতিহাসে যেমন ‘ম্যানিফেস্ট ডেসটিনি’র কথা বলা হয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতেও যেন জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া এবং বর্তমানে তারেক রহমানের নেতৃত্বে এক অভূতপূর্ব ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে। তিন প্রজন্ম ধরে মানুষের বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্যারিশম্যাটিক নেতার আসন ধরে রাখা বেশ কঠিন কাজ। মানুষ এখন শুধু ধানের শীষকে নয়, তারেক রহমানের ইমেজ বা ভাবমূর্তিকে ভালোবেসে সমর্থন দিচ্ছে। তিনি যেভাবে সাধারণ মানুষের সাথে মিশছেন, তরুণদের সাথে ছবি তুলছেন বা কথা বলছেন—তা মানুষের মনে তাঁর প্রতি এক ধরনের ‘সফট কর্নার’ তৈরি করেছে।
তবে তিন নেতার মধ্যে মাত্রাগত কিছু পার্থক্য রয়েছে। জিয়াউর রহমান ছিলেন অত্যন্ত শক্ত-পোক্ত প্রশাসক। বেগম জিয়া ছিলেন মাতৃসুলভ কিন্তু প্রশাসনিকভাবে পরিপক্ব। অন্যদিকে, তারেক রহমান তাঁর কর্মী-সমর্থকদের প্রতি একটু বেশি সংবেদনশীল ও ক্ষমাসুন্দর। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে নিপীড়িত কর্মীদের তিনি হয়তো এখন কিছুটা ছাড় দিচ্ছেন। কিন্তু এর ফলে যে বিপত্তি ঘটছে, তা আমাকে একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিসেবে ব্যথিত করে।
গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের বিপুল জনসমর্থন নিয়ে বিএনপি একটি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও তাদের কিছু কর্মকাণ্ড হতাশাজনক। জুলাই স্মৃতি নিয়ে অনর্থক বিতর্ক, কিংবা অতি দ্রুত সরকার গঠনের চাপ দেওয়া—এগুলো খুব একটা রাজনৈতিক কুশলতার পরিচয় বহন করে না। মানবাধিকার কমিশন গঠন, বিচার বিভাগ ও পুলিশের সংস্কার বা ‘সেপারেশন অব পাওয়ারস’ নিয়ে বিএনপি বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিলেও মাঠপর্যায়ে বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজ এখনো পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছে না।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো দলের তৃণমূলের অবস্থা। দীর্ঘদিনের বঞ্চনার পর সাধারণ কর্মীদের মধ্যে যে ‘খাইখাই’ রব উঠেছে, সর্বত্র চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব ও আধিপত্য বিস্তারের যে খবর আসছে, তা দলের জন্য অশনিসংকেত। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শুরুতে তারেক রহমান শক্ত হাতে এটি মোকাবিলার চেষ্টা করলেও এখন মনে হচ্ছে কোথাও একটা নিয়ন্ত্রণহীনতা কাজ করছে। অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ইতিমধ্যে প্রায় ১০০ জনের মতো প্রাণ হারিয়েছে, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
আওয়ামী লীগ যেমন ভাবতো ‘উইনার টেক্স অল’ (বিজয়ীরাই সব পাবে), বিএনপিকেও এখন সেই একই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্ড (যেমন ফ্যামিলি কার্ড, বয়স্ক ভাতা, কৃষক কার্ড) যেন দলীয়করণ বা দুর্নীতির শিকার না হয়, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে।
বিএনপির সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তাদের প্রতি জনগণের অফুরন্ত ও নিরঙ্কুশ সমর্থন। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই ক্ষণে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, বিএনপি তাদের অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নেবে। তারা দলের আদর্শিক ভিত্তিকে আরও সুদৃঢ় করবে, তৃণমূলের কর্মীদের নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে আনবে এবং চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সুস্থ, সুন্দর ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণে নেতৃত্ব দেবে।

আজ ১ সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই রাজনৈতিক দলটির দীর্ঘ পথচলায় যেমন রয়েছে ঈর্ষণীয় সাফল্য, তেমনই রয়েছে নানা চড়াই-উতরাই ও ব্যর্থতার গল্প। গত প্রায় পাঁচ দশকে দলটি তাদের মূল দর্শন—বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও বহুদলীয় গণতন্ত্র—কতটা ধারণ করতে পেরেছে বা দলটির ভবিষ্যৎ গন্তব্যই বা কী, তা আজ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অন্যতম আলোচ্য বিষয়।
বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্নটির কথা আমার স্পষ্টভাবে মনে আছে। সে সময় রাজনৈতিক ও আদর্শিকভাবে বাংলাদেশে এক বিশাল শূন্যতা বিরাজ করছিল। তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সেকুলারিজম এবং ভারত-তোষণ নীতির বিপরীতে জিয়াউর রহমান একটি ঐক্যের রাজনীতির সূচনা করতে চেয়েছিলেন। আমাদের নৃতত্ত্ব, ধর্ম, ভাষা, ভূগোল ও ইতিহাস—সবকিছুর সমন্বয়ে তিনি ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ প্রতিষ্ঠা করেন; সেই সঙ্গে বিএনপিকে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম বা ‘পলিটিক্যাল ভেহিকেল’ হিসেবে গড়ে তোলেন।
অনেকেই বলেন সামরিক শাসন থেকে দলটির জন্ম, কিন্তু নিপাতনে সিদ্ধ ঘটনার মতো একজন সামরিক শাসক হয়েও তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্যের যে ডাক দিয়েছিলেন, তাতে তিনি সর্বাংশে সফল হয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান যথার্থভাবেই একটি ‘সেন্ট্রিস্ট’ বা মধ্যপন্থী ভূমিকা পালন করেছিলেন। বাম ধারার ডান অংশ এবং ডান ধারার বাম অংশের মধ্যে এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন তিনি।
তবে জিয়াউর রহমান বিএনপিকে যে আদর্শিক ভিত্তি, ঐক্য ও নিয়মতান্ত্রিকতা দিতে চেয়েছিলেন, তা পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়ার আগেই তিনি প্রাণ হারান। রাজনৈতিক দীক্ষা বা প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো আদর্শিক দল গড়ে ওঠে না—এই সত্যটি জিয়াউর রহমান বুঝতেন বলেই তিনি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। কিন্তু তাঁর অকাল প্রয়াণে সেই আদর্শিক ভিত্তিটি ‘ক্রিস্টালাইজড’ বা সুসংগঠিত হওয়ার পর্যাপ্ত সময় পায়নি।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, আদর্শিক বন্ধনের অভাব এবং সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে বিএনপি যখন এক ভয়াবহ বিভাজনের মুখে পড়ে—এমনকি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পক্ষে বিএনপির একটি বড় অংশ যখন কাজ শুরু করে—তখন আমি আবারও এক অসম্ভবকে সম্ভব হতে দেখি। একজন গৃহবধূ থেকে বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির কাণ্ডারি হয়ে ওঠেন। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। তাঁর আপোসহীন নেতৃত্বের মাধ্যমেই স্বৈরাচার পতন ঘটে এবং বিএনপি রাজনৈতিকভাবে শক্ত ভিত পায়।
আমার সরাসরি শিক্ষক ও বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান তাঁর ‘পলিটিক্যাল পার্টিজ ইন বাংলাদেশ’ গ্রন্থে অকপটে স্বীকার করেছেন যে, বিএনপি একসময় যে ‘সরকারি পার্টি’ হিসেবে পরিচিত ছিল, বেগম জিয়ার নেতৃত্বে সেটি ‘পপুলার পার্টি’ বা গণমানুষের দলে রূপান্তরিত হয়। ক্যান্টনমেন্ট থেকে জন্ম নেওয়া দলটিকে গণভিত্তি দেওয়ার কৃতিত্ব সম্পূর্ণ তাঁর। ১৯৯০-৯১ সালের নির্বাচনে যখন সবাই ধরেই নিয়েছিল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে, তখন সবাইকে অবাক করে দিয়ে বিএনপি জয়লাভ করে। প্রশাসনিকভাবেও তিনি সফল ছিলেন।
বাংলাদেশের রাজনীতি ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’ বা ভুল ও সংশোধনের মধ্য দিয়েই এগোয়। বিএনপি ক্ষমতায় ছিল, আবার ক্ষমতাচ্যুতও হয়েছে। তবে এক-এগারোর (১/১১) পটপরিবর্তন ও ক্ষমতাচ্যুতির জন্য বিএনপি নিজেই অনেকাংশে দায়ী। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের মতো একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে মনোনীত করা এবং বিচারপতি কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করতে গিয়ে বিচারপতির অবসরের বয়সসীমা ৬৫ থেকে ৬৭ বছর করার জেদ ধরা—এগুলো ছিল বিএনপির চরম রাজনৈতিক ভুল।
এই ভুলের মাশুল তাদের কড়ায়-গণ্ডায় মেটাতে হয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর তারা ক্ষমতার বাইরে ছিল, দলের নেতাকর্মীরা নিগৃহীত হয়েছে। তবে ২০২৪-এ জুলাই-আগস্টে যে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশে ঘটে গেল, তার মূল নেতৃত্বে ছাত্ররা থাকলেও এই আন্দোলনের পেছনে বিএনপির দীর্ঘ ১৭ বছরের ত্যাগের একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত ছিল, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
আমেরিকার ইতিহাসে যেমন ‘ম্যানিফেস্ট ডেসটিনি’র কথা বলা হয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতেও যেন জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া এবং বর্তমানে তারেক রহমানের নেতৃত্বে এক অভূতপূর্ব ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে। তিন প্রজন্ম ধরে মানুষের বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্যারিশম্যাটিক নেতার আসন ধরে রাখা বেশ কঠিন কাজ। মানুষ এখন শুধু ধানের শীষকে নয়, তারেক রহমানের ইমেজ বা ভাবমূর্তিকে ভালোবেসে সমর্থন দিচ্ছে। তিনি যেভাবে সাধারণ মানুষের সাথে মিশছেন, তরুণদের সাথে ছবি তুলছেন বা কথা বলছেন—তা মানুষের মনে তাঁর প্রতি এক ধরনের ‘সফট কর্নার’ তৈরি করেছে।
তবে তিন নেতার মধ্যে মাত্রাগত কিছু পার্থক্য রয়েছে। জিয়াউর রহমান ছিলেন অত্যন্ত শক্ত-পোক্ত প্রশাসক। বেগম জিয়া ছিলেন মাতৃসুলভ কিন্তু প্রশাসনিকভাবে পরিপক্ব। অন্যদিকে, তারেক রহমান তাঁর কর্মী-সমর্থকদের প্রতি একটু বেশি সংবেদনশীল ও ক্ষমাসুন্দর। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে নিপীড়িত কর্মীদের তিনি হয়তো এখন কিছুটা ছাড় দিচ্ছেন। কিন্তু এর ফলে যে বিপত্তি ঘটছে, তা আমাকে একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিসেবে ব্যথিত করে।
গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের বিপুল জনসমর্থন নিয়ে বিএনপি একটি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও তাদের কিছু কর্মকাণ্ড হতাশাজনক। জুলাই স্মৃতি নিয়ে অনর্থক বিতর্ক, কিংবা অতি দ্রুত সরকার গঠনের চাপ দেওয়া—এগুলো খুব একটা রাজনৈতিক কুশলতার পরিচয় বহন করে না। মানবাধিকার কমিশন গঠন, বিচার বিভাগ ও পুলিশের সংস্কার বা ‘সেপারেশন অব পাওয়ারস’ নিয়ে বিএনপি বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিলেও মাঠপর্যায়ে বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজ এখনো পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছে না।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো দলের তৃণমূলের অবস্থা। দীর্ঘদিনের বঞ্চনার পর সাধারণ কর্মীদের মধ্যে যে ‘খাইখাই’ রব উঠেছে, সর্বত্র চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব ও আধিপত্য বিস্তারের যে খবর আসছে, তা দলের জন্য অশনিসংকেত। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শুরুতে তারেক রহমান শক্ত হাতে এটি মোকাবিলার চেষ্টা করলেও এখন মনে হচ্ছে কোথাও একটা নিয়ন্ত্রণহীনতা কাজ করছে। অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ইতিমধ্যে প্রায় ১০০ জনের মতো প্রাণ হারিয়েছে, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
আওয়ামী লীগ যেমন ভাবতো ‘উইনার টেক্স অল’ (বিজয়ীরাই সব পাবে), বিএনপিকেও এখন সেই একই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্ড (যেমন ফ্যামিলি কার্ড, বয়স্ক ভাতা, কৃষক কার্ড) যেন দলীয়করণ বা দুর্নীতির শিকার না হয়, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে।
বিএনপির সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তাদের প্রতি জনগণের অফুরন্ত ও নিরঙ্কুশ সমর্থন। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই ক্ষণে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, বিএনপি তাদের অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নেবে। তারা দলের আদর্শিক ভিত্তিকে আরও সুদৃঢ় করবে, তৃণমূলের কর্মীদের নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে আনবে এবং চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সুস্থ, সুন্দর ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণে নেতৃত্ব দেবে।
.png)

বেতন বৃদ্ধির অর্থ জোগাতে উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হলে প্রকল্প বাস্তবায়ন, সরকারি ক্রয় ও অর্থ বরাদ্দের ওপর চাপ বাড়বে। আর সেখানেই নতুন অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে—যা বেতন বৃদ্ধির দুর্নীতিবিরোধী যুক্তিকেই শেষ পর্যন্ত দুর্বল করে দিতে পারে।
৮ মিনিট আগে
বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপিতে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা রয়েছে বলে মনে করেন স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান। তাঁর ভাষ্যে, বড় রাজনৈতিক দলে পদ বা নির্বাচনে প্রার্থিতার জন্য একাধিক নেতার আগ্রহী হওয়া খুবই স্বাভাবিক। তবে এখন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল আগের মতো তীব্র নেই।
২১ মিনিট আগে
যেকোনো সরকারি ই-মেইল থেকে কখনো কখনো দুই দেশের সম্পর্কের গোপন বার্তা বোঝা যায়। এ মাসের শুরুতে ভারতের রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে পাঠানো একটি ই-মেইল তেমনই একটি ঘটনা ঘটায়। সেই ই-মেইলে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রতি সপ্তাহে যে ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান হয়, তা এবার হবে না। কারণ হিসেবে জানানো হয়, বাংলাদে
১ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৮ বছর পূর্ণ হচ্ছে। দীর্ঘ এই যাত্রায় দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক। বিশেষ করে তরুণদের সঙ্গে। তবে সেই সম্পর্ক এখন আগের মতো নেই। বরং একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এসেছে। তরুণরা কেন বিএনপি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে? প্রশ্নটি বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আরও গ
২ ঘণ্টা আগে