স্ট্রিম ডেস্ক

কর্ণফুলী নদীর তীরে লালদিয়া চর। সেখানে ঝোপঝাড় আর ঘাসের জঙ্গল। কোনো বসতি নেই। প্রায় অবকাঠামোহীন একটি এলাকা। কিন্তু বদলে যাচ্ছে সেই চিরচেনা দৃশ্য। এখন সেখানেই তৈরি হচ্ছে এমন একটি কনটেইনার টার্মিনাল, যা বাংলাদেশের বৈশ্বিক বাণিজ্যের সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গত রোববার (৩০ আগস্ট) আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে দেশের প্রথম গ্রিনফিল্ড কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণকাজ। প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্প নির্মাণ ও পরিচালনা করবে ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস। এটি বিশ্বের অন্যতম বড় শিপিং গ্রুপ এপি মোলার-মার্সকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে টার্মিনালটি চালু হওয়ার কথা।
বছরে ৮ লাখের বেশি টুয়েন্টি ফুট ইকুইভেলেন্ট ইউনিট (টিইইউ) কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা থাকবে এই কনটেইনার টার্মিনালের। এই টিইইউ হলো জাহাজ চলাচল এবং নৌ-বাণিজ্য শিল্পে একটি আন্তর্জাতিক পরিমাপের একক। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বড় কনটেইনার জাহাজ সরাসরি টার্মিনালে ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। এতে পণ্য পরিবহনের চাপ কমবে, জাহাজের অপেক্ষার সময় কমতে পারে এবং আমদানি-রপ্তানির লজিস্টিকস ব্যয়ও কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশই চট্টগ্রাম বন্দরনির্ভর। তৈরি পোশাক থেকে শুরু করে শিল্পের কাঁচামাল রপ্তানি ও আমদানির পণ্য দ্রুত ও কম খরচে পরিবহন করতে পারা এখন বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার অন্যতম শর্ত।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই রূপান্তরের শুরুটা কবে থেকে শুরু হলো? লালদিয়ায় আগে কী ছিল? কীভাবে একটি চরকে আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের উপযোগী করে তোলা হলো? আর ২০৩০ সালে টার্মিনালটি চালু হলে বাংলাদেশের বন্দর, আমদানি-রপ্তানি ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?
‘গ্রিনফিল্ড’ শব্দটি শুনে পরিবেশবান্ধব টার্মিনাল মনে হলেও এর মূল অর্থ ভিন্ন। অব্যবহৃত বা নতুন জায়গায় শুরু থেকে একটি নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করাকে গ্রিনফিল্ড প্রকল্প বলা হয়। বিশ্বব্যাংকের সংজ্ঞা অনুযায়ী, গ্রিনফিল্ড প্রকল্পে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যাগে নতুন একটি স্থাপনা তৈরি করে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেটি পরিচালনা করে। অন্যদিকে, বিদ্যমান কোনো টার্মিনাল সংস্কার, সম্প্রসারণ বা আধুনিকায়ন করা হলে সেটিকে সাধারণত ‘ব্রাউনফিল্ড’ প্রকল্প বলা হয়।
লালদিয়ায় আগে থেকে চালু কোনো কনটেইনার টার্মিনালকে সংস্কার করা হচ্ছে না, বরং নদীর তীরের জায়গাটিকে নতুন করে পরিকল্পনা করে জেটি, ইয়ার্ড, ক্রেন, গেট, সড়ক যোগাযোগসহ পুরো টার্মিনাল অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। তাই এটিকে দেশের প্রথম গ্রিনফিল্ড বন্দর প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
লালদিয়া চর দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম বন্দরের একটি অব্যবহৃত এলাকা হিসেবে পড়ে ছিল। জায়গাটি আগে অবৈধ দখলেও ছিল। ২০২১ সালে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে এলাকা দখলমুক্ত করা হয়। এরপর বেশ কিছু সময় জায়গাটি মূলত খালি অবস্থায় পড়ে ছিল। ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে লালদিয়ার প্রস্তাবিত টার্মিনাল এলাকা ঘাসে ঢাকা খালি জমি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। ২০১৩ সালে লালদিয়া চরে একটি ‘বাল্ক টার্মিনাল’ নির্মাণের প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশেষায়িত যন্ত্রপাতির মাধ্যমে বাল্ক কার্গো পরিচালনা করা এবং বিদ্যমান কনটেইনার টার্মিনালের ওপর চাপ কমানো। কিন্তু প্রকল্পটি দীর্ঘদিন বাস্তবায়িত হয়নি। পরে পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনে লালদিয়ায় কনটেইনার ও বহুমুখী কার্গো ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এরই মধ্যে ২০২৫ সালে লালদিয়ায় ১৪ একর জমিতে একটি কনটেইনার ইয়ার্ড চালু করা হয়, যেখানে প্রায় ১০ হাজার টিইইউ কনটেইনার রাখার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। তবে সেটি বর্তমান গ্রিনফিল্ড লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো নয়। নতুন প্রকল্পটি অনেক বড় এবং আধুনিক সমুদ্রবন্দর টার্মিনাল হিসেবে নির্মিত হবে।
লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল তৈরি ও পরিচালনা করবে ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনাল, যা এপি মোলার-মার্সকের গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় অংশীদার হিসেবে রয়েছে কিউএনএস কনটেইনার সার্ভিস। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে সরকারি-বেসরকারি অংশীদার পিপিপি মডেলে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বন্দরের মালিকানা ধরে রাখবে; আর এপিএম টার্মিনালটির নকশা, অর্থায়ন, নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব নেবে। চুক্তির মেয়াদ ৩৩ বছর। এর মধ্যে তিন বছর নির্মাণ এবং ৩০ বছর পরিচালনা। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। প্রকল্পটিতে বিনিয়োগ ধরা হয়েছে প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ডলার। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এটি বাংলাদেশের অন্যতম বড় পিপিপি প্রকল্প এবং দেশের সবচেয়ে বড় ইউরোপীয় ইকুইটি বিনিয়োগগুলোর একটি।
লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল চালু হলে বাড়বে কনটেইনার সামলানোর সক্ষমতা। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর দেশের সমুদ্রপথের বাণিজ্যের বড় অংশ নির্ভরশীল। ফলে বন্দরে কনটেইনারের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন সক্ষমতার প্রয়োজন হবে। লালদিয়া টার্মিনাল বছরে ৮ লাখের বেশি টিইইউ কনটেইনার পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে তৈরি হচ্ছে। সরকারি হিসাব মতে, এতে বন্দরের বর্তমান সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং বিদ্যমান টার্মিনালগুলোর ওপর চাপ কমবে। কিছু সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে পূর্ণ সক্ষমতায় বছরে প্রায় ১০ লাখ টিইইউ পর্যন্ত পরিচালনার কথাও বলা হয়েছে।
এ প্রকল্পের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হতে পারে বড় কনটেইনার জাহাজ পরিচালনা। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রায় ২৭০ টিইইউ সক্ষমতার জাহাজ চলাচলের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। লালদিয়া টার্মিনাল প্রায় ৬,০০০ টিইইউ ধারণক্ষমতার জাহাজ পরিচালনার জন্য ডিজাইন করা হচ্ছে। অর্থাৎ বড় জাহাজ সরাসরি বন্দরে এসে পণ্য ওঠানামা করতে পারবে।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম লয়েডস লিস্টও লালদিয়া প্রকল্পের ক্ষেত্রে বড় জাহাজ পরিচালনার সক্ষমতাকে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে তুলে ধরেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান নদীমুখের অবকাঠামো ও নাব্যতার সীমাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রামে বড় জাহাজ প্রবেশে বাধা রয়েছে।
বড় জাহাজ একসঙ্গে বেশি পণ্য বহন করতে পারে। ফলে প্রতি ইউনিট পণ্যের পরিবহন ব্যয় কমানোর সুযোগ থাকে। একই সঙ্গে বড় জাহাজ সরাসরি বাংলাদেশে এলে কিছু ক্ষেত্রে অন্য বন্দরে ট্রান্সশিপমেন্টের প্রয়োজন কমতে পারে।
এটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছাতে সময় ও পরিবহন ব্যয় দুটিই বিশ্ব বাণিজ্যের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার বড় বিষয়। এপিএম টার্মিনালের এর পরিকল্পনা অনুযায়ী, বড় জাহাজ ও আধুনিক অপারেশন ব্যবস্থার ফলে বাংলাদেশের লজিস্টিক ব্যয় এবং পণ্য পৌঁছানোর সময় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। এছাড়া প্রস্তাবিত টার্মিনালে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। রাতেও অনুমোদিত আকার ও ড্রাফটের জাহাজ পরিচালনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে জাহাজের অপেক্ষার সময় কমানো এবং বন্দরের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
লালদিয়ার আরেকটি বড় গুরুত্ব হলো এটি শুধু একটি টার্মিনাল নয়, বাংলাদেশের বন্দর খাতে আন্তর্জাতিক অপারেটরের প্রবেশও। এপিএম টার্মিনাল বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টার্মিনাল পরিচালনা করে। তাদের প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা ও কর্মীদের প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশে এলে স্থানীয় বন্দর ব্যবস্থাপনায় নতুন দক্ষতা তৈরি হতে পারে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্প থেকে সরাসরি কয়েকশ এবং পরোক্ষভাবে কয়েক হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন, ‘গ্রিনফিল্ড’ এবং ‘গ্রিন পোর্ট’ দুটি বিষয় আলাদা হলেও লালদিয়া প্রকল্পে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এপিএম টার্মিনাল জানিয়েছে, টার্মিনালে বৈদ্যুতিক কার্গো হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম, সৌরবিদ্যুৎ এবং ভবিষ্যতে জাহাজকে সরাসরি বিদ্যুৎ সরবরাহের মতো ব্যবস্থা রাখা হবে। এর ফলে জ্বালানি ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ, শব্দ ও বায়ুদূষণ কমানোর সুযোগ থাকবে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিমাণ যত বাড়ছে, ততই সমুদ্রবন্দরকে দ্রুত ও কম খরচে পণ্য পরিবহনের উপযোগী করার প্রয়োজন হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকও বলছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতামূলক থাকতে হলে দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য সমুদ্রবন্দর থাকা প্রয়োজন। বিদ্যমান টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন গ্রিনফিল্ড টার্মিনাল অনেক ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য নতুন সক্ষমতা তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের বন্দর অবকাঠামোকে পুরোনো সক্ষমতা থেকে নতুন প্রজন্মের বন্দর ব্যবস্থাপনায় নেওয়ার একটি পরীক্ষা। ২০৩০ সালের দিকে এটি পুরোপুরি চালু হলে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর—নির্ধারিত সময়ে নির্মাণ শেষ করা, বড় জাহাজের জন্য প্রয়োজনীয় নাব্যতা ও নৌ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং আধুনিক টার্মিনালকে দেশের সড়ক-রেলসহ সামগ্রিক লজিস্টিক ব্যবস্থার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা। তখন হয়তো পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে লালদিয়ার বন্দরে নোঙর ফেলবে ভিনদেশি জাহাজ।

কর্ণফুলী নদীর তীরে লালদিয়া চর। সেখানে ঝোপঝাড় আর ঘাসের জঙ্গল। কোনো বসতি নেই। প্রায় অবকাঠামোহীন একটি এলাকা। কিন্তু বদলে যাচ্ছে সেই চিরচেনা দৃশ্য। এখন সেখানেই তৈরি হচ্ছে এমন একটি কনটেইনার টার্মিনাল, যা বাংলাদেশের বৈশ্বিক বাণিজ্যের সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গত রোববার (৩০ আগস্ট) আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে দেশের প্রথম গ্রিনফিল্ড কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণকাজ। প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্প নির্মাণ ও পরিচালনা করবে ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস। এটি বিশ্বের অন্যতম বড় শিপিং গ্রুপ এপি মোলার-মার্সকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে টার্মিনালটি চালু হওয়ার কথা।
বছরে ৮ লাখের বেশি টুয়েন্টি ফুট ইকুইভেলেন্ট ইউনিট (টিইইউ) কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা থাকবে এই কনটেইনার টার্মিনালের। এই টিইইউ হলো জাহাজ চলাচল এবং নৌ-বাণিজ্য শিল্পে একটি আন্তর্জাতিক পরিমাপের একক। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বড় কনটেইনার জাহাজ সরাসরি টার্মিনালে ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। এতে পণ্য পরিবহনের চাপ কমবে, জাহাজের অপেক্ষার সময় কমতে পারে এবং আমদানি-রপ্তানির লজিস্টিকস ব্যয়ও কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশই চট্টগ্রাম বন্দরনির্ভর। তৈরি পোশাক থেকে শুরু করে শিল্পের কাঁচামাল রপ্তানি ও আমদানির পণ্য দ্রুত ও কম খরচে পরিবহন করতে পারা এখন বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার অন্যতম শর্ত।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই রূপান্তরের শুরুটা কবে থেকে শুরু হলো? লালদিয়ায় আগে কী ছিল? কীভাবে একটি চরকে আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের উপযোগী করে তোলা হলো? আর ২০৩০ সালে টার্মিনালটি চালু হলে বাংলাদেশের বন্দর, আমদানি-রপ্তানি ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?
‘গ্রিনফিল্ড’ শব্দটি শুনে পরিবেশবান্ধব টার্মিনাল মনে হলেও এর মূল অর্থ ভিন্ন। অব্যবহৃত বা নতুন জায়গায় শুরু থেকে একটি নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করাকে গ্রিনফিল্ড প্রকল্প বলা হয়। বিশ্বব্যাংকের সংজ্ঞা অনুযায়ী, গ্রিনফিল্ড প্রকল্পে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যাগে নতুন একটি স্থাপনা তৈরি করে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেটি পরিচালনা করে। অন্যদিকে, বিদ্যমান কোনো টার্মিনাল সংস্কার, সম্প্রসারণ বা আধুনিকায়ন করা হলে সেটিকে সাধারণত ‘ব্রাউনফিল্ড’ প্রকল্প বলা হয়।
লালদিয়ায় আগে থেকে চালু কোনো কনটেইনার টার্মিনালকে সংস্কার করা হচ্ছে না, বরং নদীর তীরের জায়গাটিকে নতুন করে পরিকল্পনা করে জেটি, ইয়ার্ড, ক্রেন, গেট, সড়ক যোগাযোগসহ পুরো টার্মিনাল অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। তাই এটিকে দেশের প্রথম গ্রিনফিল্ড বন্দর প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
লালদিয়া চর দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম বন্দরের একটি অব্যবহৃত এলাকা হিসেবে পড়ে ছিল। জায়গাটি আগে অবৈধ দখলেও ছিল। ২০২১ সালে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে এলাকা দখলমুক্ত করা হয়। এরপর বেশ কিছু সময় জায়গাটি মূলত খালি অবস্থায় পড়ে ছিল। ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে লালদিয়ার প্রস্তাবিত টার্মিনাল এলাকা ঘাসে ঢাকা খালি জমি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। ২০১৩ সালে লালদিয়া চরে একটি ‘বাল্ক টার্মিনাল’ নির্মাণের প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশেষায়িত যন্ত্রপাতির মাধ্যমে বাল্ক কার্গো পরিচালনা করা এবং বিদ্যমান কনটেইনার টার্মিনালের ওপর চাপ কমানো। কিন্তু প্রকল্পটি দীর্ঘদিন বাস্তবায়িত হয়নি। পরে পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনে লালদিয়ায় কনটেইনার ও বহুমুখী কার্গো ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এরই মধ্যে ২০২৫ সালে লালদিয়ায় ১৪ একর জমিতে একটি কনটেইনার ইয়ার্ড চালু করা হয়, যেখানে প্রায় ১০ হাজার টিইইউ কনটেইনার রাখার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। তবে সেটি বর্তমান গ্রিনফিল্ড লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো নয়। নতুন প্রকল্পটি অনেক বড় এবং আধুনিক সমুদ্রবন্দর টার্মিনাল হিসেবে নির্মিত হবে।
লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল তৈরি ও পরিচালনা করবে ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনাল, যা এপি মোলার-মার্সকের গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় অংশীদার হিসেবে রয়েছে কিউএনএস কনটেইনার সার্ভিস। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে সরকারি-বেসরকারি অংশীদার পিপিপি মডেলে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বন্দরের মালিকানা ধরে রাখবে; আর এপিএম টার্মিনালটির নকশা, অর্থায়ন, নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব নেবে। চুক্তির মেয়াদ ৩৩ বছর। এর মধ্যে তিন বছর নির্মাণ এবং ৩০ বছর পরিচালনা। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। প্রকল্পটিতে বিনিয়োগ ধরা হয়েছে প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ডলার। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এটি বাংলাদেশের অন্যতম বড় পিপিপি প্রকল্প এবং দেশের সবচেয়ে বড় ইউরোপীয় ইকুইটি বিনিয়োগগুলোর একটি।
লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল চালু হলে বাড়বে কনটেইনার সামলানোর সক্ষমতা। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর দেশের সমুদ্রপথের বাণিজ্যের বড় অংশ নির্ভরশীল। ফলে বন্দরে কনটেইনারের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন সক্ষমতার প্রয়োজন হবে। লালদিয়া টার্মিনাল বছরে ৮ লাখের বেশি টিইইউ কনটেইনার পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে তৈরি হচ্ছে। সরকারি হিসাব মতে, এতে বন্দরের বর্তমান সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং বিদ্যমান টার্মিনালগুলোর ওপর চাপ কমবে। কিছু সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে পূর্ণ সক্ষমতায় বছরে প্রায় ১০ লাখ টিইইউ পর্যন্ত পরিচালনার কথাও বলা হয়েছে।
এ প্রকল্পের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হতে পারে বড় কনটেইনার জাহাজ পরিচালনা। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রায় ২৭০ টিইইউ সক্ষমতার জাহাজ চলাচলের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। লালদিয়া টার্মিনাল প্রায় ৬,০০০ টিইইউ ধারণক্ষমতার জাহাজ পরিচালনার জন্য ডিজাইন করা হচ্ছে। অর্থাৎ বড় জাহাজ সরাসরি বন্দরে এসে পণ্য ওঠানামা করতে পারবে।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম লয়েডস লিস্টও লালদিয়া প্রকল্পের ক্ষেত্রে বড় জাহাজ পরিচালনার সক্ষমতাকে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে তুলে ধরেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান নদীমুখের অবকাঠামো ও নাব্যতার সীমাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রামে বড় জাহাজ প্রবেশে বাধা রয়েছে।
বড় জাহাজ একসঙ্গে বেশি পণ্য বহন করতে পারে। ফলে প্রতি ইউনিট পণ্যের পরিবহন ব্যয় কমানোর সুযোগ থাকে। একই সঙ্গে বড় জাহাজ সরাসরি বাংলাদেশে এলে কিছু ক্ষেত্রে অন্য বন্দরে ট্রান্সশিপমেন্টের প্রয়োজন কমতে পারে।
এটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছাতে সময় ও পরিবহন ব্যয় দুটিই বিশ্ব বাণিজ্যের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার বড় বিষয়। এপিএম টার্মিনালের এর পরিকল্পনা অনুযায়ী, বড় জাহাজ ও আধুনিক অপারেশন ব্যবস্থার ফলে বাংলাদেশের লজিস্টিক ব্যয় এবং পণ্য পৌঁছানোর সময় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। এছাড়া প্রস্তাবিত টার্মিনালে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। রাতেও অনুমোদিত আকার ও ড্রাফটের জাহাজ পরিচালনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে জাহাজের অপেক্ষার সময় কমানো এবং বন্দরের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
লালদিয়ার আরেকটি বড় গুরুত্ব হলো এটি শুধু একটি টার্মিনাল নয়, বাংলাদেশের বন্দর খাতে আন্তর্জাতিক অপারেটরের প্রবেশও। এপিএম টার্মিনাল বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টার্মিনাল পরিচালনা করে। তাদের প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা ও কর্মীদের প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশে এলে স্থানীয় বন্দর ব্যবস্থাপনায় নতুন দক্ষতা তৈরি হতে পারে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্প থেকে সরাসরি কয়েকশ এবং পরোক্ষভাবে কয়েক হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন, ‘গ্রিনফিল্ড’ এবং ‘গ্রিন পোর্ট’ দুটি বিষয় আলাদা হলেও লালদিয়া প্রকল্পে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এপিএম টার্মিনাল জানিয়েছে, টার্মিনালে বৈদ্যুতিক কার্গো হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম, সৌরবিদ্যুৎ এবং ভবিষ্যতে জাহাজকে সরাসরি বিদ্যুৎ সরবরাহের মতো ব্যবস্থা রাখা হবে। এর ফলে জ্বালানি ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ, শব্দ ও বায়ুদূষণ কমানোর সুযোগ থাকবে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিমাণ যত বাড়ছে, ততই সমুদ্রবন্দরকে দ্রুত ও কম খরচে পণ্য পরিবহনের উপযোগী করার প্রয়োজন হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকও বলছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতামূলক থাকতে হলে দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য সমুদ্রবন্দর থাকা প্রয়োজন। বিদ্যমান টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন গ্রিনফিল্ড টার্মিনাল অনেক ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য নতুন সক্ষমতা তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের বন্দর অবকাঠামোকে পুরোনো সক্ষমতা থেকে নতুন প্রজন্মের বন্দর ব্যবস্থাপনায় নেওয়ার একটি পরীক্ষা। ২০৩০ সালের দিকে এটি পুরোপুরি চালু হলে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর—নির্ধারিত সময়ে নির্মাণ শেষ করা, বড় জাহাজের জন্য প্রয়োজনীয় নাব্যতা ও নৌ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং আধুনিক টার্মিনালকে দেশের সড়ক-রেলসহ সামগ্রিক লজিস্টিক ব্যবস্থার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা। তখন হয়তো পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে লালদিয়ার বন্দরে নোঙর ফেলবে ভিনদেশি জাহাজ।
.png)

বাংলাদেশ যদি শেষ পর্যন্ত চীনের তৈরি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনে, তাহলে দেশের বিমানবাহিনীর সক্ষমতা নিঃসন্দেহে বাড়বে। কিন্তু এর সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও সামনে আসছে—নতুন যুদ্ধবিমান কেনার মাধ্যমে বাংলাদেশ কি ধীরে ধীরে চীনের আরও বড় একটি সামরিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে? বাংলাদেশের জে-১০সিই কেনার প্রস্
২৬ মিনিট আগে
১৯৫৭ সালের ১৭ মার্চ। ফিলিপাইনের আকাশে হঠাৎ একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়। সেই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট র্যামন ম্যাগসাইসাই। তাঁর সততা ও জনকল্যাণমুখী কাজ ছিল ফিলিপাইনে সর্বজনবিদিত। এমন একজন নেতাকে হারিয়ে শোকে মুষড়ে পড়েছিল ফিলিপাইনের সর্বস্তরের মানুষ। সেই শোক থেকেই জন্ম নেয় ‘র
১ দিন আগে
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর ছয় মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এ সময়ে দেশটির অধিকাংশ মানুষের জীবনযাত্রার মান, আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম। এতে অন্তত ৯ কোটি সাধারণ মানুষের জীবন এখন প্রতিদিনের সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।
৩১ আগস্ট ২০২৬
একজন মানুষকে রাষ্ট্রীয় বাহিনী তুলে নিয়ে গেল। কিন্তু কোথায় নেওয়া হলো, কেন নেওয়া হলো, তিনি বেঁচে আছেন কি না—কিছুই জানল না পরিবার। থানায় মামলা হলো না, আদালতে হাজির করা হলো না, রাষ্ট্রও স্বীকার করল না যে তাকে আটক করা হয়েছে। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর শুধু অপেক্ষা। বাংলাদেশে এভাবেই ‘গুম’ একটা ভয়
৩০ আগস্ট ২০২৬