
আইন বিষয়টিকে অনেকে স্বতন্ত্র একটি ব্যাপার মনে করেন, কিন্তু আইন আসলে সমাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা বিষয়। সমাজের প্রয়োজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইনকেও তাই বিবর্তিত হতে হয়। স্থবির থাকলে সেই আইন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ আইনটি পাশ হয়েছে। এই সংশোধনীর সবচেয়ে বড় দিক হলো—‘দানের পরও দাতার আমৃত্যু ভোগদখলের অধিকার’ বা আজীবন জীবনস্বত্ব। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি তার সম্পত্তি প্রিয়জনকে দান করে দিলেও যতদিন তিনি বেঁচে থাকবেন, ততদিন সেই সম্পত্তিতে তার নিরঙ্কুশ ভোগদখলের অধিকার থাকবে।
ট্রান্সফার অব প্রপারটি বা সম্পত্তি হস্তান্তর আইনটি মূলত ১৮৮২ সালের ঔপনিবেশিক যুগের একটি আইন। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য মানুষ জীবিত অবস্থায় কীভাবে ব্যক্তিগত সম্পত্তি হস্তান্তর করবে, তা নজরদারির মধ্যে রাখা। কিন্তু ১৪৪ বছর আগের সময়ের থেকে আজ আমাদের সমাজকাঠামো, ব্যবসা-বাণিজ্যের ধরন এবং সম্পত্তির ধারণায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশের সমাজে এমন অনেক আচার বা প্র্যাকটিস আছে যা আপাতভাবে আইনানুগ মনে হয়, কিন্তু বাস্তবিক প্রয়োগে তা অনেক দুর্বল জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করে।
বাংলাদেশে এমনটা প্রায়ই দেখা যায় যে, বাবা-মা তাদের সারাজীবনের উপার্জিত সম্পত্তি ভালোবেসে সন্তানদের নামে লিখে দেওয়ার পর বৃদ্ধ বয়সে চরম অবহেলা ও প্রতারণার শিকার হন। অনেক সময় তাদেরকে নিজ বাড়ি থেকেই উচ্ছেদ করা হয়। আইন পেশাজীবী, গবেষক এবং বিচারকগণ আইনের এরকম সামাজিক প্রয়োগজনিত সমস্যা সম্পর্কে সম্যক অবগত। সমাজের এই বিষয়গুলোকে সামনে রেখে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের নতুন সংশোধনী (ধারা ১২২-এর ‘ক’ ও ‘খ’) আনা হয়েছে, যা বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থার জন্য যুগোপযোগী। এই একটি ধারা আমাদের সমাজের প্রবীণ নাগরিক এবং নারীদের সুরক্ষায় একটি বড় পদক্ষেপ।
বাংলাদেশের আইন ব্যবস্থা ‘কমন ল’ সিস্টেম অনুসরণ করে। কমন ল’তে এরকম জীবনস্বত্ত্ব রেখে দানের ধারণাটি নতুন কিছু নয়। মালিকানা হস্তান্তর হলেও সম্পত্তির ব্যবহার বা ভোগদখল করার অধিকার নিজের কাছে রাখার এই আইনি সুযোগটি এখন বাবা-মা’দের নিঃসঙ্কোচে সন্তানকে সম্পত্তি দান করার ক্ষেত্রে রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। আশা করা যায় যে বৃদ্ধ বয়সে গৃহহীন বা অসহায় হওয়ার আইনি ঝুঁকি প্রশমিত হবে।
এমনকি আইনে চিকিৎসা, আর্থিক বা পারিবারিক ভরণপোষণের মতো ‘প্রকৃত প্রয়োজনে’ এই দান বাতিলের সুযোগও রাখা হয়েছে। যদিও ‘প্রকৃত প্রয়োজন’-এর আইনি সংজ্ঞা আগামীতে আদালতের বিভিন্ন রায়ের মাধ্যমে আরও সুনির্দিষ্ট হবে, তবে প্রাথমিকভাবে এটি দাতার জন্য একটি বড় আস্থার জায়গা তৈরি করেছে।
কন্যা সন্তান থাকা বাবা-মায়ের সুরক্ষাকবচ
আমাদের দেশে যে পরিবারগুলোতে কোনো পুত্রসন্তান নেই, কেবল কন্যাসন্তান রয়েছে, তারা সম্পত্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে একধরনের গভীর সামাজিক ও মানসিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। কোরআনে কন্যাসন্তানের উত্তরাধিকার অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট করে দেওয়া থাকলেও আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা নানা অজুহাতে নারীদের সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চায়।
এক্ষেত্রে নতুন আইনটি একটি ভালো সমাধান নিয়ে এসেছে। যে বাবা-মায়েরা কেবল কন্যাসন্তানের অধিকারী, তারা চাইলে জীবদ্দশাতেই তাদের সম্পূর্ণ সম্পত্তি কন্যাকে দান করে যেতে পারবেন। এতে করে বাবা-মা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই বাড়িতে সম্মানের সঙ্গে বসবাস করবেন, আবার তাদের মৃত্যুর পর সেই সম্পত্তির নিরঙ্কুশ মালিকানা কোনো আইনি জটিলতা ছাড়াই কন্যার হাতে চলে যাবে। অন্য কোনো শরিক এসে কন্যাকে বঞ্চিত করার সুযোগ পাবে না।
আধুনিক বিশ্বের অনেক মুসলিম রাষ্ট্র, যেমন—মিশর, তিউনিসিয়া, মরক্কোতে কন্যাসন্তানের অধিকার নিশ্চিত করতে অনেক আগেই উত্তরাধিকার ও সম্পত্তি আইনে নানা সংস্কার আনা হয়েছে। ১৪০০ বছর আগের সমাজকাঠামো এবং বর্তমান সমাজ ও অর্থনীতির কাঠামো এক নয়। তাই ইসলামি আইনের মূল স্পিরিট বা চেতনাকে ক্ষুণ্ন না করেই কন্যাসন্তানদের অর্থনৈতিক সুরক্ষা দেওয়ার এই আইনি সুযোগকে আমাদের সাধুবাদ জানানো উচিত।
আবার, বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের নারীদের সম্পত্তির অধিকারের ক্ষেত্রে একটি বড় আইনি শূন্যতা রয়েছে। হিন্দু আইনে কন্যাসন্তানরা, বিশেষ করে বিবাহিত ও পুত্রহীন কন্যারা উত্তরাধিকার সূত্রে বাবার সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। ভারতে এ বিষয়ে অনেক আইনি সংস্কার হলেও বাংলাদেশে তা এখনো হয়নি। নতুন এই আইনটি হিন্দু নারীদের জন্য একটি রাষ্ট্রীয়ভাবে সুরক্ষা দিতে পারে। হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো বাবা-মা যদি চান তাদের কন্যাসন্তান সম্পত্তির অধিকার পাক, তবে তারা এই আইনের আওতায় জীবিত অবস্থায় কন্যাকে সম্পত্তি দান করে যেতে পারবেন। বাবা-মা যতদিন বাঁচবেন, সম্পত্তির ভোগদখল করবেন এবং তাদের অবর্তমানে কন্যা সেই সম্পত্তির পূর্ণ মালিক হবেন।
ইসলামি ধর্মীয় আইনের পরিপন্থী হওয়ার সমালোচনা
এই আইনটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বড় সমালোচনা চোখে পড়ছে। অনেকেই দাবি করছেন, এটি কোরআন-সুন্নাহ বা ইসলামি উত্তরাধিকার আইনের পরিপন্থী। কিন্তু ইসলামিক আইন এবং সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের মূলনীতিগুলোকে ঠিকমত পর্যালোচনা করলে এটি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, এই সমালোচনা আইনি ও যৌক্তিক—উভয় দিক থেকেই ভ্রান্ত।
প্রথমত, আমাদের মনে রাখতে হবে ১৮৮২ সালের আইনটি একটি রাষ্ট্রীয় আইন, যা ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-লিঙ্গ নির্বিশেষে বাংলাদেশের সকল নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য। কাজের কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় নিয়মের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় আইন করার দাবিটি সাংবিধানিকভাবে সঠিক হবে না।
দ্বিতীয়ত, এই আইনটি কোনো বাধ্যতামূলক আইন নয়, অর্থাৎ বাংলাদেশের একজন নাগরিক এই আইনটি ব্যবহার করতে না চাইলে করবেন না—সেই স্বাধীনতা কোনোভাবেই খর্ব হচ্ছে না। বরং, একজন ব্যক্তি তাঁর জীবদ্দশায় ইচ্ছামতো স্বাধীনভাবে নিজের সম্পত্তি ব্যবহার, লেন-দেন করতে পারবেন, সেই অধিকারটি এখানে আরও শক্তিশালী হচ্ছে। উপরন্তু, ২০২৬-এর সংশোধনী স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে এই ধারার কারণে কোনো বাংলাদেশি মুসলিম নাগরিকের হিবা করার সুযোগ বা অধিকার খর্ব হবে না।
তৃতীয়ত, এটি সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, উত্তরাধিকার আইন নয়। ইসলামিক আইনের ফারায়েজ কার্যকর হয় একজন মুসলিম ব্যক্তির মৃত্যুর পর। কিন্তু ২০২৬ এর সংশোধনীটি কেবল জীবিত ব্যক্তির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। জীবিত অবস্থায় একজন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ তার সম্পত্তি বিক্রি করবেন, নষ্ট করবেন নাকি কাউকে দান করবেন—এতে তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
ইসলামি আইনে ‘উইল’ বা অসিয়তের ক্ষেত্রে মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের বেশি উইল না করার একটি বিধান রয়েছে, যদি না অন্যান্য উত্তরাধিকারী এতে সম্মতি দেন। কিন্তু উইল এবং জীবদ্দশায় দান দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। জীবিত অবস্থায় নিজের সম্পত্তি দান করার ওপর ইসলামের হানাফি এবং মালিকি ফিকহ শাস্ত্রে কোনো সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা নেই। বরং, অধ্যাপক হাশিম কামালি তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে মাসালাহ-এর নীতির যথার্থ প্রয়োগের একটি উদাহরণ হলো বৃদ্ধ পিতামাতার অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
অধ্যাপক হালাক তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে ইসলামিক সম্পত্তি আইন কখনই স্থবির কোনো বিষয় ছিল না। ইসলামিক সম্পত্তি আইনে সম্পত্তির মূল সত্তা আর এর অপযোগ ভোগের মালিকানার মধ্যে পার্থক্য করা হতো। আহলি ওয়াকফের ধারণাটির সঙ্গেই ২০২৬ এর সংশোধনী সামঞ্জস্যপূর্ণ। সুতরাং, নিজের সম্পত্তি কাউকে দান করে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তা নিজে ভোগ করা ইসলামি উত্তরাধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।
সফল বাস্তবায়নে করণীয়
আইন যতই যুগোপযোগী হোক না কেন, সমাজের সর্বস্তরে এর সঠিক প্রয়োগ না হলে তা কাগুজে দলিলেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। বাংলাদেশে অনেক ভালো আইন আছে, কিন্তু প্রচারণার অভাবে সাধারণ মানুষ তা জানে না।
এই আইনের সর্বোচ্চ সুফল পেতে রাষ্ট্রকে অবশ্যই ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণার উদ্যোগ নিতে হবে। সবচেয়ে বেশি জরুরি হলো, এই আইন নিয়ে যে ধর্মীয় অপব্যাখ্যা বা ভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে, তা দূর করা। আমাদের দেশের মানুষ অত্যন্ত ধর্মভীরু। তারা যেন মনে না করেন যে এই আইনের আশ্রয় নিলে তারা কোনো পাপের অংশীদার হবেন বা ধর্মীয় বিধান লঙ্ঘন করবেন। আইনি অধিকার সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি, এই আইনটির সঠিক ব্যবহার যেন নিশ্চিত হয় তা দেখতে হবে।
প্রবীণ ও নারীদের অর্থনৈতিক সুরক্ষা যেন শুধু আইনি বাধ্যবাধকতায় আটকে না থেকে একটি সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়—সেই প্রত্যাশাই করছি। ২০২৬ সাল বা তার পর এই সংশোধনীটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে এটি যে বৈষম্যহীন এবং সুরক্ষিত সমাজ গঠনে একটি বড় ভূমিকা রাখবে, সে বিষয়ে আমরা আশাবাদী হতে পারি।
- ড. অর্পিতা শামস মিজান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।
.png)

-7c29dd-256x144.webp)







