
গলির মোড়ের চা দোকান থেকে শুরু করে মোবাইল ফোনের স্ক্রিন, পত্রিকার পাতা কিংবা সংসদের অধিবেশন—সব জায়গায় যে বিষয়গুলো নিয়ে শোরগোল তার একটি হলো সার। আর এই আলোচনা যৌক্তিকও বটে।
নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি যে টিকে আছে, তার সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ত ‘ভাত’। দেশের এত বিপুলসংখ্যক মানুষ দু-বেলা অন্তত ভাত খেতে পারছে। এটা না হলে দেশটা আদৌ সচল থাকত কি না, কে জানে। তাই সেই খাদ্য উৎপাদন (চাল) এবং কৃষিব্যবস্থার মতো সংবেদনশীল জায়গায় সামান্য ধাক্কা লাগলেও তা বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
বেশ কিছুদিন ধরে বৃহত্তর রংপুর ও নওগাঁ অঞ্চলে সার নিয়ে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে কুড়িগ্রামের রৌমারী ও ভূরুঙ্গামারীর ঘটনা নিয়ে। সেখানে "ক্ষুব্ধ কৃষকেরা" ডিলারের গুদামের বেড়া ভেঙে সার নিয়ে গেছেন।
স্থানীয় প্রশাসন অবশ্য দ্রুত অভিযান চালিয়ে লুট হওয়া সারের বড় অংশ উদ্ধার করেছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। কিন্তু ঘটনার পর একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে—হঠাৎ সারের চাহিদা এত বাড়ল কেন? সারের চাহিদা আর জোগানের মধ্যে কি সমন্বয়ের কোনো অভাব রয়েছে?
বিষয়টি বুঝতে আমরা সরকারি তথ্য উপাত্ত খোঁজার চেষ্টা করি। গত বছর এই সময়ে সারের চাহিদা কেমন ছিল, এ বছর কেমন থাকার কথা—সেই অনুযায়ী সরকারি গুদামে সার আছে কি না, আর মাঠে হঠাৎ সারের এই অদ্ভুত চাহিদা তৈরি হওয়ার আসল কারণ কী?
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অফিশিয়াল পরিসংখ্যান ও সেখানে প্রাপ্ত তথ্যের দিকে তাকালে কাগজের সঙ্গে মাঠের বাস্তবতার এক বিরাট বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত বছরের এই একই সময়ে (আগস্ট-সেপ্টেম্বর) কুড়িগ্রামে রোপা আমন ধানের শেষ দফার সার প্রয়োগকে কেন্দ্র করে সরকারি বরাদ্দ ছিল: ইউরিয়া ৫,১১২ মেট্রিক টন, ডিএপি ১,০৭০ মেট্রিক টন এবং পটাশ (এমওপি) ১,৫৭০ মেট্রিকটন।
এ বছর আমন ধানের জমির পরিমাণের ভিত্তিতে স্বাভাবিক চাহিদা গত বছরের মতোই থাকার কথা। তা সত্ত্বেও কৃষি বিভাগ আগাম চাহিদা বিবেচনা করে সারের বরাদ্দ না কমিয়ে উল্টো বাড়িয়ে দিয়েছে। চলতি মৌসুমে ইউরিয়ার বরাদ্দ বাড়িয়ে ৫,৮৭৫ মেট্রিক টন, ডিএপি ১,৫৭২ মেট্রিক টন এবং পটাশ ১,৬৪৮ মেট্রিক টন করা হয়েছে। পুরো রংপুর বিভাগেই এ বছর সারের সার্বিক জোগান গত বছরের চাহিদার তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ বেশি। ফলে গাণিতিক তথ্য উপাত্ত বলছে—মাঠে যা চাহিদা থাকার কথা, গুদামে তার চেয়েও বেশি সার মজুত রয়েছে।
তাহলে সারের জন্য কৃষকদের এই অস্বাভাবিক উপচে পড়া ভিড় ও চাহিদার কারণ কী? বলা হচ্ছে, আগাম রবি শস্য (ভুট্টা, আলু ও শীতকালীন সবজি) চাষকে কেন্দ্র করে এই চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে এখানে একটি বড় ভৌগোলিক প্রশ্ন সামনে আসে। কুড়িগ্রামের ঠিক ওপরেই ভারতের মেঘালয় ও আসামের পাহাড়ি অঞ্চল। সেপ্টেম্বর মাসে এখনো বৃষ্টি হচ্ছে, মৌসুমি বায়ুর প্রভাব শেষ হয়নি। ফলে দেশে কিম্বা উজানে মাঝারি বা ভারী বৃষ্টি হলেই তিস্তা এবং এর শাখা নদী, উপ নদী বিধৌত অঞ্চল এর নিচু জায়গা তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি এখনো আছে। এই অবস্থায় কৃষকেরা কি সত্যি নদীভাঙন ও আকস্মিক বন্যার ন্যূনতম ঝুঁকি নিয়ে রবি শস্যের জমি প্রস্তুত করছেন?
কৃষি তত্ত্ব ও মাঠের বাস্তবতা বলছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত চরাঞ্চলের সামান্য কিছু কৃষক বাধ্য হয়ে আগাম রবি শস্যের ঝুঁকি নিলেও, অধিকাংশ সচেতন কৃষকই মৌসুমি বায়ুর প্রভাব কাটার আগে জমিতে সার ও বীজ ফেলতে যাবার কথা নয়। তাহলে প্রশ্ন ওঠে মাঠে—যদি এখনো পুরোদমে ফসল বোনার কাজই শুরু না হয়, তবে বাজারে সারের এই হাহাকার আর হঠাৎ চাহিদা কেনো?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই সামনে আসে সারের মাঠপর্যায়ের বাস্তব চাহিদার বিপরীতে তৈরি হওয়া এক মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন। স্বাভাবিক হিসাব অনুযায়ী, এ সময়ে মাঠে মূলত রোপা আমন ধানের ইউরিয়া সারের শেষ কিস্তি প্রয়োগ করার কথা। কিন্তু বাজারে হঠাৎ এমন এক আবহ তৈরি করা হয়েছে, যেন "অক্টোবর-নভেম্বরে সার পাওয়া যাবে না" কিংবা "সামনে সারের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাবে।" এই ধরনের আশঙ্কার বার্তা যখন কৃষক পরিবারগুলোতে পৌঁছায়, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই একধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। ফলে আমন ধানের শেষ কিস্তির সার কেনার পাশাপাশি, দুই মাস পরের রবি শস্যের জন্য প্রয়োজনীয় ডিএপি ও পটাশ সারও এখনই আগাম কিনে ঘরে মজুত করার একটি অহেতুক প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ছেন তারা।
একটি প্রশ্ন এড়ানো যায় না—কৃষকদের এই ভয় ও অনিশ্চয়তাকে পুঁজি করে কোনো অসাধু ডিলার বা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট গোপনে সার মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে কি?
হিসাব যখন মিলছে না, তখন চড়া দামে সার বিক্রির এই পাঁয়তারার পেছনে সরকারি দলের নেতাদের কোনো মদদ আছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। একই সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে, কৃষকদের এই অনিশ্চয়তাকে কাজে লাগিয়ে কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী সরকারের ওপর চাপ তৈরির হীন চেষ্টা করছে কি না? ফ্যাসিস্ট আমলের সুবিধাভোগী ডিলার সিন্ডিকেট কি এখনো মাঠে কৃত্রিম অস্থিরতা তৈরির কারিগর হিসেবে কাজ করছে?
বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের অধিকাংশ সংসদ সদস্যই বিরোধী দলের। কৃষিমন্ত্রী দাবি করেছেন সারের কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু বিরোধী দলীয় এসব জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে কৃষকদের আশ্বস্ত করার ক্ষেত্রে তথ্যের কোনো ঘাটতি থেকে যাচ্ছে কি না, সেটাও ভাবার বিষয়।
প্রশ্ন আসে, সরবরাহ ঠিক থাকার পরও পরিকল্পিতভাবে সংকট তৈরি করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটালে আসলে কার লাভ? সবকিছু তো আর সাদা-কালোয় ভাগ করে দেখা যায় না!
বর্তমানে একটি কথা শোনা যাচ্ছে যে, সারের জন্য আন্দোলন করা কৃষকদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। বিষয়টি কি আসলেই তা-ই? সারের গুদাম লুট করা বা কৃষি কর্মকর্তাদের গায়ে হাত তোলা একটি ফৌজদারি অপরাধ। একে শুধু আন্দোলন বলে চালিয়ে দেওয়া যায় কি? যৌক্তিক সারের দাবির সঙ্গে কিছু দুষ্ট চক্রের লুটপাটকে বিপ্লবের মোড়কে ঢাকার গভীর রাজনীতি কি অস্বীকার করা যাবে?
ঘটনা বাস্তব নাকি কৃত্রিম—সেই তর্ক থাকতেই পারে। তবে এটি নিশ্চিত যে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। যত যৌক্তিক ব্যাখ্যাই থাকুক, সরকার এই দায় এড়াতে পারে না।
অন্যদিকে, যেকোনো ইস্যুতে সরকারের ভুল ধরা বা সমালোচনা করা অবশ্যই বৈধ। তবে কৃষির মতো সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে মাঠের রাজনীতি বা মিডিয়া কাভারেজের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়া উচিত। একটি খবরের শিরোনাম, ফটোকার্ড বা সংসদের একটি খণ্ডিত বক্তব্য হয়তো ইন্টারনেটে ভিউ বাড়াবে। কিন্তু এর কারণে সারা দেশের কৃষকদের কাছে ভুল বার্তা গেলে পুরো কৃষিব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আর এই প্রভাব মোকাবিলা করা আমাদের মতো ভাতনির্ভর জাতির জন্য মোটেই সহজ হবে না।
শুধু সমস্যা নিয়ে কথা বললেই হবে না, সমাধানের পথও খুঁজতে হবে। কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি ও ডিলারদের অস্বচ্ছতা দূর করতে একটি স্থায়ী প্রযুক্তিভিত্তিক সমাধান এখন সময়ের দাবি এবং সেটা করাও সম্ভব।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোতে কৃষক পর্যায়ে আখ কেনার সুবিধার্থে ই-পুর্জি নামক একটি ডিজিটাল সিস্টেম বা সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়। কৃষকেরা কখন এবং কতটুকু আখ চিনিকলে সরবরাহ করবেন, তা এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের মোবাইল ফোনে এসএমএস আকারে পৌঁছে যায়। এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং দুর্নীতি বন্ধ হয়েছে।
এই সিস্টেম এর মধ্যেই "ই-গেজেট ও অটোমেশন" এর আওতায় ‘স্মার্ট ক্যান প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড পেমেন্ট সিস্টেম’ এর পাইলটিং শুরু হয়েছে, কৃষক এর পেমেন্ট ও দেয়া হয় "ই-পেমেন্ট ও ডিজিটাল ওয়ালেট' পদ্ধতিতে। কৃষক আখ বিক্রি করার সঙ্গে সঙ্গেই তার কাছে ওজনের ডিজিটাল রসিদ পাঠানো এবং টাকা দ্রুত পরিশোধের জন্য সফটওয়্যারটির সাথে মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিস যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কৃষকেরা দ্রুত ব্যাংক বা মোবাইলেই আখের মূল্য পেয়ে যান।
ঠিক এই পদ্ধতির উল্টো দিকটি সারের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা গেলে ঝামেলা অনেকটাই কমে যাবে বলে মনে করি।
দেশের মোট কৃষি জমি, চাষাবাদের মৌসুম ও অঞ্চলের ফসলের ধরন ডিজিটালি ম্যাপিং করে একটি ‘কেন্দ্রীয় কৃষি ডাটাবেজ’ তৈরি করা যেতে পারে। এই সিস্টেমে কৃষক তার জমির পরিমাণ, ফসলের নাম ও রোপণের সময় ইনপুট দিলেই সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে কৃষি অধিদপ্তরের সুষম নির্দেশনা অনুযায়ী তার সারের সুনির্দিষ্ট চাহিদা হিসাব করে দেবে।
কৃষক চাইলে মোবাইল ব্যাংকিং বা অনলাইনে সারের সরকারি মূল্য পরিশোধ করলে একটি ডিজিটাল স্লিপ পাবেন অথবা ডিলার পয়েন্টে গিয়ে টাকা পরিশোধের ক্যাশ স্লিপ পাবেন। নির্ধারিত স্লিপ নিয়ে কৃষক সরাসরি তার নিকটবর্তী ডিলারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করবেন।
এই সিস্টেম চালু হলে একদিকে যেমন কৃষকের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার কিনে মজুত করার সুযোগ থাকবে না, অন্যদিকে অসাধু ডিলার বা সিন্ডিকেটের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ফায়দা লোটার সুযোগও কমে যাবে।
শুধু সার নয়, এই পদ্ধতিতে সরকারি বীজ ও সেচের ভর্তুকিও সুষ্ঠুভাবে বিতরণ করা সম্ভব। কৃষি উপকরণের সুষম বণ্টনে এই ডিজিটাল স্বচ্ছতাই হতে পারে কুড়িগ্রামসহ সারা দেশের কৃষকদের জন্য বড় রক্ষাকবচ। নীতিনির্ধারকেরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে দেখতে পারেন।
- মূর্তজা খান লোদী: কৃষি গবেষক
- খান মুহাম্মদ আদনান: তথ্য প্রযুক্তি শিক্ষার্থী
.png)
-7c29dd-256x144.webp)







-847c68-256x144.webp)