ইরান যুদ্ধ দেখাল ব্রিকস ‘ফোকলা’

লেখা:
লেখা:
রনি পি. সাসমিতা

প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪: ৩৩
ব্রিকসের সীমাবদ্ধতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল ইরান যুদ্ধ। স্ট্রিম গ্রাফিক
ব্রিকসের সীমাবদ্ধতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল ইরান যুদ্ধ। স্ট্রিম গ্রাফিক

অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা বৃদ্ধির চেনা প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে শেষ হলো নয়াদিল্লির ব্রিকস সম্মেলন। জাঁকজমকপূর্ণ এই আয়োজনের মাঝেও একটি বিশেষ অনুপস্থিতি অনেকেরই নজর কেড়েছে।

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসন ব্রিকসের ১১ পূর্ণ সদস্য এবং ১০ অংশীদার দেশকে সরাসরি প্রভাবিত করেছে। চূড়ান্ত ঘোষণাপত্রে এই যুদ্ধের বিষয়ে সরাসরি কোনো কথা বলা হয়নি। আক্রমণকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করে কোনো নিন্দা জানানো হয়নি।

কূটনৈতিক এই কৌশলের কারণে সব সদস্য দেশকে একই ছাতার নিচে রাখা সম্ভব হয়েছে। পশ্চিমা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যৌথ ভূরাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া যে কতটা কঠিন, এই নীরবতা তা স্পষ্ট করে দিয়েছে।

ইরান সংকট ও সদস্য বৃদ্ধির খেসারত

সম্মেলন শুরু হওয়ার কয়েক মাস আগেই এই দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছিল। গত মে মাসে নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে ইরান যুদ্ধের বিষয়ে অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা যায়নি। সদস্যদের মধ্যকার মতভেদ মেনে নিয়ে চূড়ান্ত নথিতে আমেরিকা বা ইসরায়েলের নাম এড়িয়ে যাওয়া হয়।

ব্রিকস সম্মেলনে পুতিন, সি ও পেজেশকিয়ানের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি। ছবি: পিআইবি
ব্রিকস সম্মেলনে পুতিন, সি ও পেজেশকিয়ানের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি। ছবি: পিআইবি

ইরান চেয়েছিল জোটের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সামরিক অভিযানের তীব্র নিন্দা জানানো হোক। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং নিজেদের নিরাপত্তার কথা তুলে ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাত এমন ভাষার বিরোধিতা করে। এই মতভেদ কেবল কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয়, বরং সদস্য বাড়ায় ব্রিকস যে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে, সেই বার্তা দেয়।

সদস্য বাড়িয়ে ব্রিকস তাদের বৈশ্বিক প্রভাব বাড়িয়েছে ঠিকই, আবার সদস্য দেশগুলোর আঞ্চলিক বিরোধও জোটের ভেতরে টেনে এনেছে। ইরান ও আমিরাতের সংঘাত এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। দুই দেশই ব্রিকসের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কৌশলগত অবস্থান সম্পূর্ণ উল্টো। দেশ দুটির এই বিরোধপূর্ণ অবস্থানই মূলত মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ব্রিকসের কার্যকর ভূমিকা রাখার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন একটি ঘোষণাপত্র প্রকাশ করেছে। এতে আপস বার্তা পরিষ্কার। বৈশ্বিক ইস্যুতে কোনো দৃঢ় বা স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণের পরিবর্তে ব্রিকস মূলত সদস্যদেশগুলোর পারস্পরিক অমিল ও দ্বন্দ্ব ব্যবস্থাপনার প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।

অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক ওজনের কোনো অভাব জোটের নেই। কিন্তু এই শক্তিকে একক ভূরাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার জটিলতাই মূল সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবিলায় সদস্য দেশগুলোর ভিন্ন হিসাব

পশ্চিমা আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার লক্ষ্য নিয়ে ব্রিকসের জন্ম হয়েছিল। তবে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে কোনো একক অবস্থানে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে জোটটি। আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিটি সদস্য দেশের নিজস্ব স্বার্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ভারতের অবস্থান এই সংকটকে সবচেয়ে স্পষ্ট করে তোলে। নতুন দিল্লি ব্রিকসকে কোনো মার্কিনবিরোধী সামরিক অক্ষ মনে করে না। নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন (স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি) ধরে রাখার মাধ্যম হিসেবে দেখে দিল্লি। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করছে ভারত। একই সময়ে কোয়াড জোটে সক্রিয় অংশ নিচ্ছে এবং পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি বাড়াচ্ছে। আবার মস্কো ও বেইজিংয়ের সঙ্গেও বন্ধুত্ব বজায় রাখছে তারা।

প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তিগুলোর মাঝে নিজস্ব দর-কষাকষির জায়গা বাঁচিয়ে রাখাই ভারতের প্রধান লক্ষ্য। ব্রিকস কট্টর আমেরিকাবিরোধী জোটে রূপ নিলে ভারতের সেই কৌশলগত সুবিধা নষ্ট হয়ে যাবে।

চীন ও রাশিয়ারও আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি সর্বাত্মক বিরোধে যাওয়ার বিষয়ে নিজস্ব হিসাব রয়েছে। পশ্চিমাদের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমাতে রাশিয়ার কাছে ব্রিকস অবশ্যই এক মূল্যবান প্ল্যাটফর্ম। সামরিক জোটের মাধ্যমে অতিরিক্ত আগ্রাসী নীতি নিলে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ বেধে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই ঝুঁকি যেকোনো মূল্যে এড়াতে চায় মস্কো।

চীনের ক্ষেত্রে সমীকরণ আরও বেশি জটিল। বেইজিং একটি শক্তিশালী বহুপাক্ষিক বিশ্ব এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের (গ্লোবাল সাউথ) বড় প্রভাব দেখতে চায়। বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা ও বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র সুবিধা কমানো তাদের লক্ষ্য।

ব্রাজিল ও ইন্দোনেশিয়ার হিসাব আলাদা। ব্রাজিল উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আরও ভালো অর্থায়ন এবং শক্তিশালী অবস্থান চায়। চীন বা রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের গুটি হতে তারা রাজি নয়। ইন্দোনেশিয়াও কোনো এক পক্ষ বেছে নেওয়ার বদলে নিজেদের অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়ানোর পথ হিসেবে ব্রিকসকে ব্যবহার করতে চায়।

বহুকেন্দ্রিক ফাঁদ ও ভবিষ্যতের ইতিবাচক দিক

ব্রিকস দৃশ্যত একটি ‘বহুকেন্দ্রিক ফাঁদে’ আটকা পড়েছে। এই জোটের সবচেয়ে বড় শক্তি এর অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য। ঐতিহাসিকভাবে বৈশ্বিক শাসন কাঠামোয় যাদের ভূমিকা অত্যন্ত নগণ্য ছিল, এই জোট তার বৈচিত্র্যের কারণে সেসব অঞ্চলে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো, এই বৈচিত্র্যের কারণেই সম্মিলিত ভূরাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। নতুন সদস্য যুক্ত হলে অর্থনৈতিক ক্ষমতা বাড়ে। প্রতিটি দেশের নিজস্ব স্বার্থের বোঝাও একই সঙ্গে যুক্ত হয়। এ কারণেই ব্রিকস ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক জোটের বদলে শক্তিশালী অর্থনৈতিক দর-কষাকষির মঞ্চ হিসেবে বেশি কার্যকর হতে পারে।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সংস্কারের দাবিতে সদস্যরা একমত হতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, ডলারের বাইরে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, খাদ্য ও জ্বালানি সুরক্ষায় তারা যৌথভাবে কাজ করতে পারে।

বাস্তব কোনো রাজনৈতিক সংঘাতে নির্দিষ্ট এক পক্ষ নেওয়ার প্রশ্ন এলেই এই ঐক্য ভেঙে যায়। ইরান যুদ্ধ এই অন্তর্দ্বন্দ্বকে খুব নগ্নভাবে সামনে এনে দিয়েছে। এই সীমাবদ্ধতার কারণে ব্রিকস অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে, এমন ভাবা ভুল হবে। নাটকীয় রাজনৈতিক আস্ফালনের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের কাজে ব্রিকসের গুরুত্ব অনেক বেশি।

আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পুরো বৈশ্বিক ব্যবস্থা ধ্বংস করার প্রয়োজন ব্রিকসের নেই। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংকে সংস্কার আনা সম্ভব। পশ্চিমা প্রভাবমুক্ত বিকল্প অর্থায়ন সংস্থা গড়ে তোলা এবং ডলারের বিকল্প মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করাই ব্রিকসের সবচেয়ে বড় কাজ হতে পারে।

ভূরাজনৈতিক সংঘাত থেকে দূরে থাকাই এই জোটের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে। সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে বিশ্বের অর্থনৈতিক ভারসাম্যে ধীর ও স্থায়ী পরিবর্তন আনার পথ খুলে দিতে পারে এই কৌশল।

লেখক: ইন্দোনেশিয়া স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক্স অ্যাকশন ইনস্টিটিউশনের বিশ্লেষক

আল-জাজিরা থেকে অনূদিত

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত