বাড়ছে পাহাড় ধস, নেপথ্যে কী?

ড. মো. ইকবাল সারোয়ার
ড. মো. ইকবাল সারোয়ার

প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০২৬, ১৯: ৫৫
সম্প্রতি চট্টগ্রামে বন্যা ও পাহাড় ধসের ঘটনা আবারও আমাদের সামনে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরেছে। স্ট্রিম গ্রাফিক

সম্প্রতি চট্টগ্রামে বন্যা ও পাহাড় ধসের ঘটনা আবারও আমাদের সামনে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরেছে। কয়েক দিনের টানা বর্ষণে কয়েকটি উপজেলা তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বন্যা ও পাহাড় ধসে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৫৮ জন মানুষ। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে পাহাড় ধসের ঘটনা এবং এতে প্রাণহানির সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২২ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর গড়ে ১১টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। গড়ে বছরে ৩৪ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০০৭ সালে ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনায় ১২৭ জন এবং ২০১৭ সালে ১৬০ জনের প্রাণহানি আমাদের বড় দুটি ক্ষতের কথা মনে করিয়ে দেয়।

গত ২০ বছরে পাহাড় ধসে মৃতের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়েছে। সাম্প্রতিককালে, কেবল জুলাই মাসেই ১২০টি ভূমি ও পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে বলে সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, পাহাড় ধসের এই ভয়াবহতা কেন বাড়ছে এবং এর দায় কার?

মূলত পাহাড় ধস প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট—এই দুই কারণের এক মারাত্মক সংমিশ্রণ। বাংলাদেশের প্রায় ১২ শতাংশ ভূমি পাহাড়ি এলাকা, যা মূলত দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও চট্টগ্রাম বেল্টে অবস্থিত। ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো টারশিয়ারি যুগের পাহাড় এবং এর মাটির গঠন মূলত বেলে বা বালি ধরনের।

প্রাকৃতিক কারণের মধ্যে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হলো জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে, বাংলাদেশে বর্ষাকালীন বৃষ্টিপাত অন্তত ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আগের দিনের মতো টানা ঝিরিঝিরি বৃষ্টির বদলে এখন অল্প সময়ে অতিভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, জুলাই মাসে চট্টগ্রামে যেখানে ৭০০ থেকে ৮০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হওয়ার কথা, সেখানে মাত্র পাঁচ দিনেই প্রায় ১৪০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ পানি ধারণ করার ক্ষমতা বেলে দোআঁশ মাটির পাহাড়গুলোর নেই। এছাড়া আমাদের অঞ্চলটি ভূমিকম্পপ্রবণ হওয়ায় ছোটখাটো ভূকম্পনে পাহাড়ের গায়ে অদৃশ্য ফাটল তৈরি হয়। অতিবৃষ্টির সময় সেই ফাটল দিয়ে পানি ঢুকে পাহাড়ের বুনট আরও দুর্বল করে দেয়।

তবে প্রাকৃতিক কারণের চেয়ে পাহাড় ধসের জন্য মানবসৃষ্ট কারণগুলোই বেশি দায়ী। নির্বিচারে গাছ ও পাহাড় কাটা, অবৈধ বসতি স্থাপন এবং পাহাড়ের স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বা ন্যাচারাল ড্রেনেজ সিস্টেম ধ্বংস করার ফলে পাহাড় তার ভারসাম্য হারাচ্ছে। গাছের শিকড় পাহাড়ের মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখে। কিন্তু বৃক্ষনিধনের ফলে শিকড় পচে গিয়ে মাটি আলগা হয়ে যায়, যা বৃষ্টির পানিতে সহজেই ধসে পড়ে।

মূলত পাহাড় ধস প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট—এই দুই কারণের এক মারাত্মক সংমিশ্রণ। তবে প্রাকৃতিক কারণের চেয়ে পাহাড় ধসের জন্য মানবসৃষ্ট কারণগুলোই বেশি দায়ী। নির্বিচারে গাছ ও পাহাড় কাটা, অবৈধ বসতি স্থাপন এবং পাহাড়ের স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বা ন্যাচারাল ড্রেনেজ সিস্টেম ধ্বংস করার ফলে পাহাড় তার ভারসাম্য হারাচ্ছে।

পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো এই প্রাণহানির প্রধান শিকার। কক্সবাজারের ৫১টি পাহাড়ে প্রায় ২২ হাজার, মহেশখালীর ২২টি পাহাড়ে ৮ হাজার এবং টেকনাফে ২৩টি পাহাড়ে প্রায় ১২০০ অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে। পাহাড়ে বসবাসকারী এই মানুষগুলোর প্রায় সবাই নিম্ন আয়ের। কিন্তু তারা স্বেচ্ছায় পাহাড়ে যায় না; এর পেছনে রয়েছে বিশাল এক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিন্ডিকেট। প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় পাহাড় দখল করে খুপরি ঘর বানিয়ে এসব গরিব মানুষের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়। বর্ষার আগে প্রশাসন মাইকিং বা সাময়িক উচ্ছেদ অভিযান চালালেও স্থায়ী কোনো সমাধান হয় না।

পাহাড় কাটার পেছনে রয়েছে আরেক বিশাল বাণিজ্য। নগরীর পুকুর-জলাশয় ভরাট, আবাসন প্রকল্প এবং রাস্তা তৈরির কাজে অবাধে ব্যবহার করা হচ্ছে পাহাড় কাটা মাটি। দুঃখজনক হলেও সত্য, পাহাড় কাটার মহোৎসবে কেবল অসাধু চক্রই জড়িত নয়, অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক ও অভিজাত স্তরেও পাহাড় ধ্বংস করা হয়। চট্টগ্রামের খুলশীর মতো অভিজাত আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছে পাহাড়ের ওপর। এমনকি ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়, বিটিভি ভবন, ডায়াবেটিক হাসপাতাল থেকে শুরু করে খোদ পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যালয়ও পাহাড়ের ওপর স্থাপিত। এতে পাহাড়ের ওয়াটার শেড ম্যানেজমেন্ট বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তবে পাহাড়কে রক্ষা করেও এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব। জুম চাষের সনাতন পদ্ধতির বদলে এখন পাহাড়ে বৈজ্ঞানিক উপায়ে ফলমূলের চাষ হচ্ছে। ইদানীং রাজশাহীকে পাল্লা দিয়ে চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলে প্রচুর আম ও আনারসের ফলন হচ্ছে। তবে এই কৃষিকাজ পাহাড়ের মাটির কোনো ক্ষতি করছে কি না, তা নিয়ে গভীর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। পাহাড়ের ক্ষতি না করে, সবুজের আচ্ছাদন বাড়িয়ে যদি কৃষি ও পর্যটনকে ঢেলে সাজানো যায়, তবে তা দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারে।

পাহাড় ধস রোধে ও প্রাণহানি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে সবার আগে প্রয়োজন জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক মতৈক্য। যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, 'পাহাড় কাটা যাবে না'—এই নীতিতে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। সারা দেশের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ 'রিস্ক ম্যাপ' বা মানচিত্র তৈরি করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসরত নিম্ন আয়ের মানুষদের উচ্ছেদ করার পাশাপাশি তাদের জন্য নিরাপদ স্থানে নির্দিষ্ট জোনিং করে আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। অবৈধ পাহাড়ি বসতিগুলোতে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগ স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে, যাতে সেখানে মানুষ বসবাস করতে নিরুৎসাহিত হয়।

পাহাড় প্রকৃতির এক অমূল্য দান। উন্নয়ন বা আবাসন—কোনো অজুহাতেই পাহাড়কে তার স্বাভাবিক অবস্থা থেকে বিচ্যুত করা যাবে না। পাহাড়ের কান্না থামাতে হলে প্রকৃতিকে তার মতো করে থাকতে দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। এখনই সময় সচেতন হওয়ার, নয়ত ভবিষ্যতের প্রতিটি বর্ষা আমাদের জন্য আরও বড় কোনো শোকের বার্তা নিয়ে আসবে।

  • ড. মো. ইকবাল সারোয়ার: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের একজন অধ্যাপক
Ad 300x250

সম্পর্কিত