জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধ যেভাবে ‘ব্যাকফায়ার’ করল

লেখা:
লেখা:
নেইট সোয়ানসন

প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৬, ০৯: ০৯
স্ট্রিম গ্রাফিক

সতেরো বছর আগে আমি যখন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে ইরান-সংক্রান্ত দায়িত্বে ছিলাম, তখন এক জ্যেষ্ঠ সহকর্মীকে মাহমুদ আহমাদিনেজাদের একটি উসকানিমূলক বক্তব্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, আহমাদিনেজাদের দিকে বেশি নজর না দিতে। তার ভাষায়, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন শুধু ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি। তিনি আরও বলেছিলেন, চিন্তার কিছু নেই, পরিবর্তন আসছে। তখন খামেনির বয়স ছিল ৬৯ এবং অনেকে মনে করতেন তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত। সেই সহকর্মীর ধারণা ছিল, তিনি যেকোনো সময় মারা যেতে পারেন।

কিন্তু খামেনি তখন মারা যাননি। দুই সপ্তাহ আগে পর্যন্তও তিনি বেঁচে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এমন কাজই করলেন, যা প্রকৃতি করতে পারেনি। তারা ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ৩৬ বছরের শাসনের সমাপ্তি ঘটালেন।

খামেনি একটি কঠিন এবং ভারী উত্তরাধিকার রেখে গেছেন। ১৯৮৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ইরানি রিয়ালের মূল্য ডলারের তুলনায় প্রায় পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও দেশটি নিয়মিত বিদ্যুৎ ও পানির সংকটে ভোগে। গত এক বছরে খাদ্যের দামও ৭০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

ইরানের এই অর্থনৈতিক দুরবস্থার বড় একটি কারণ ছিল এমন এক পররাষ্ট্রনীতি, যার লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরোধিতা করা। জনগণের অসন্তোষের মুখে খামেনি বারবার সংস্কারের পথ এড়িয়ে গেছেন। তার বদলে তিনি দমন-পীড়নের পথ বেছে নেন। বিশেষ করে গত জানুয়ারিতে তার সরকার হাজার হাজার নাগরিককে হত্যা করে। তবে একই সঙ্গে তিনি ইরানকে বর্তমান এই মুহূর্তের জন্যও প্রস্তুত করেছিলেন।

এবার প্রকৃতই অস্তিত্বের হুমকিতে পড়ে ইরান অনেকের ধারণার চেয়ে বেশি হিসাবি, বিকেন্দ্রীভূত এবং কার্যকর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। তারা শুধু ইসরায়েলি ভূখণ্ড বা মার্কিন কূটনৈতিক ও সামরিক স্থাপনাই নয়, পারস্য উপসাগরজুড়ে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত করেছে। এর মধ্যে বিমানবন্দর, হোটেল এবং জ্বালানি অবকাঠামোও রয়েছে।

ট্রাম্প সম্ভবত শিগগিরই বিজয় ঘোষণা করবেন। ইরানের সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে আসতে পারে। বৈশ্বিক বাজার স্থিতিশীল রাখতে হরমুজ প্রণালিও দ্রুত খুলে দেওয়া দরকার, অথচ ইরান ইতোমধ্যে সেটি তাদের শত্রুদের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে।

তবে এমন একটি সরকারকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যায় না, যে সরকার আত্মসমর্পণ করতে রাজি নয়। ইরানের সামরিক শক্তি বড় ধরনের আঘাত পেলেও, খামেনির তৈরি শাসনব্যবস্থার সামনে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার শক্তিশালী প্রণোদনা এখনো রয়ে গেছে। তাছাড়া, দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধ চালানোর মতো নানা উপায়ও তাদের হাতে আছে।

ফলে যুদ্ধ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে সম্ভাব্য সব পথই খারাপ। যুদ্ধবিরতির জন্য তেহরান প্রায় নিশ্চিতভাবেই এই নিশ্চয়তা চাইবে যে ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি হামলা যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করবে। নেতানিয়াহুর ওপর ট্রাম্পের যথেষ্ট প্রভাব আছে, কারণ ইসরায়েল মার্কিন সামরিক সহায়তার ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু তবুও এটি খুব বড় এবং কঠিন দাবি।

খুব শিগগিরই মার্কিন প্রেসিডেন্টকে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি হয়তো একটি অজনপ্রিয় যুদ্ধকে আরও গভীর করবেন। অথবা যুদ্ধ থামাতে গিয়ে ইসরায়েলের কাছ থেকে এমন একটি ছাড় আদায় করবেন, যেটিকে ইরান নিজেদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে পারবে।

অনিচ্ছাকৃত পরিণতি

ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ সামরিক অভিযানে কৌশলগত দক্ষতা দেখালেও যুক্তরাষ্ট্র এখনো প্রকৃত কৌশলগত সাফল্য পায়নি। ট্রাম্প ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষের একটি দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গিয়েছিলেন, কিন্তু যুদ্ধ শেষে কী হবে, সে বিষয়ে তার কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। শুরুতে তিনি বলেছিলেন, বিজয় তখনই আসবে যখন ইরানের জনগণ নিজেরাই উঠে দাঁড়িয়ে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে ভেঙে ফেলবে। এটি ছিল একদিকে অস্বাভাবিক, অন্যদিকে অবাস্তব প্রত্যাশা।

জানুয়ারিতে সরকারের ভয়াবহ দমন-পীড়নও ইরানের শাসনব্যবস্থা বা নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে কোনো অর্থবহ ভাঙন সৃষ্টি করতে পারেনি। বরং সরকার ইতোমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছে, ক্ষমতায় টিকে থাকতে তারা নিজেদের যত মানুষকেই হত্যা করতে হোক, তা করতে প্রস্তুত।

২০২৩ সালে যখন আমি জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে ইরানবিষয়ক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম, তখন বড় এক বিক্ষোভের পর এক ইরানি কর্মকর্তার সঙ্গে একটি কূটনৈতিক বৈঠকে অংশ নিয়েছিলাম। বিস্ময়করভাবে তিনি স্বীকার করেছিলেন যে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে দেশে প্রবল বিরোধিতা রয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র একটি বিষয় বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে। তার মতে, যত মানুষ এই শাসনের পতন চায়, প্রায় তত মানুষই আছে যারা এই শাসন রক্ষার জন্য মরতেও প্রস্তুত। আর অধিকাংশ সাধারণ মানুষ মূলত শুধু একটি ভালো দৈনন্দিন জীবন চায়।

তিনি বিষয়টি সংখ্যা দিয়ে ব্যাখ্যা করেননি, কিন্তু আমি একে পরে ২০-২০-৬০ অনুপাত হিসেবে ভাবতে শুরু করি। আমার ধারণা ছিল, ২০ শতাংশ ইরানি ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের পতন চায়। আরও ২০ শতাংশ এর টিকে থাকা চায়। আর বাকি ৬০ শতাংশ মানুষের প্রধান চাওয়া হলো একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকা।

আমি দীর্ঘদিন ধরে মনে করতাম, খামেনির মৃত্যুর পর যারা ভালো জীবন চায়, তারা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কট্টর বিরোধীদের সঙ্গে একজোট হবে। তারপর তারা দেশটির নেতৃত্বকে সর্বোচ্চ নেতার নির্ধারিত পথ থেকে অন্য দিকে নিতে বাধ্য করবে। কিন্তু তিক্ত বিদ্রুপ হলো, সাম্প্রতিক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যে কৌশল দেখা গেছে, তা খামেনিকে এক ধরনের শহীদি মৃত্যু দিয়েছে। এটি শাসনব্যবস্থার জন্য এক অর্থে উপহার হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ এর ফলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ব্যর্থতা থেকে মানুষের দৃষ্টি সরে গেছে।

এই পরিস্থিতি খামেনির কট্টরপন্থী ছেলের অবস্থানও শক্তিশালী করেছে। একই সঙ্গে পুরো জাতির মনোযোগ দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে সরে গিয়ে বাইরের হামলা থেকে টিকে থাকার দিকে চলে গেছে। ফলে সেই নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আরও প্রান্তিক হয়ে পড়েছে, যারা আসলে শুধু ন্যূনতম স্বস্তি ও স্থিতিশীল জীবন চায়।

এখন সামনে এগোতে ইরানের প্রতিদিন বড় সামরিক সাফল্য অর্জন করার প্রয়োজন নেই। তারা মাঝেমধ্যে এমন ক্ষতি করতে পারলেই হবে যাতে আঞ্চলিক অংশীদার, বৈশ্বিক বাজার এবং মার্কিন জনমত অস্থির থাকে। ইরানের নৌবাহিনী ও সামরিক বাহিনীর অন্য অংশগুলো ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়লেও, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করা তেলবাহী জাহাজের ওপর মাঝেমধ্যে ড্রোন হামলাই যথেষ্ট হতে পারে। কারণ এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়।

অবশ্য এই কৌশলের ঝুঁকিও অনেক বড়। এতে উপসাগরীয় দেশগুলো তেহরানের বিরুদ্ধে আরও ঐক্যবদ্ধ হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ সংঘাতে গড়াতে পারে। এ ছাড়া ইরানকে তাদের কিছু আক্রমণাত্মক সক্ষমতা ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করেও রাখতে হবে।

সম্ভবত এ কারণেই ইরান এখনো ইয়েমেনের হুথিদের আরও বড় পরিসরে ব্যবহারের পথ নেয়নি। তারা এখনো ব্যাপক সাইবার হামলা চালায়নি। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলাতেও যায়নি। কিন্তু খামেনি সম্ভবত এই হিসাবেই বাজি ধরেছিলেন যে, তিনি মারা গেলেও তার গড়া শাসনব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্র বা উপসাগরীয় দেশগুলোর তুলনায় বেশি ক্ষতি সহ্য করতে পারবে।

দুই কঠিন বিপদের মাঝখানে

ইসরায়েলের বর্তমান কৌশল ও লক্ষ্য অনেকটাই ২০২৪ সালে লেবাননে হিজবুল্লাহকে দুর্বল করার অভিযানের মতো মনে হচ্ছে। সে সময় তারা হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছিল। একই সঙ্গে ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে গোষ্ঠীটির সক্ষমতাও দ্রুত কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই কৌশলগত সাফল্যকে পরে ইসরায়েল এমন এক অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে তারা প্রয়োজনমতো মাঝেমধ্যে আবার হামলা চালাতে পারে এবং তাতে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে হয় না।

ইসরায়েলের নেতারা বুঝতে পারছেন, ট্রাম্প এই সংঘাত দ্রুত শেষ করতে চাইতে পারেন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তারা এমন কোনো যুদ্ধবিরতিতে সন্তুষ্ট হবে না, যাতে ইসলামি প্রজাতন্ত্র মূলত আগের মতোই টিকে থাকে। সে ক্ষেত্রে সময়ের ব্যবধানে তারা আবার সংঘাত শুরু করার চেষ্টা করবে এবং ইরানকে আরও দুর্বল করতে চাইবে।

অন্যদিকে ট্রাম্পকে দেখে মনে হচ্ছে, তিনি নির্দিষ্ট কোনো কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের চেয়ে নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার উজ্জ্বল করতেই বেশি মনোযোগী। ইরানে তার “ছোট্ট অভিযান” প্রসঙ্গটি ১৮৯৮ সালের একটি মার্কিন মন্তব্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। সে সময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন হে স্পেনের সঙ্গে চার মাসের যুদ্ধকে “দারুণ এক ছোট যুদ্ধ” বলে বর্ণনা করেছিলেন, যা নাকি আমেরিকার শক্তি ও গৌরব দেখিয়েছিল।

কিন্তু একসময় এসে মার্কিন অস্ত্রভান্ডারের ওপর চাপ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ক্ষতি ট্রাম্পকে এই যুদ্ধ থামাতে বাধ্য করতে পারে। তবে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিজবুল্লাহর পরিণতি এড়াতে চায়। সে কারণে তারা এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছে না। বরং ইরানের নেতারা যুদ্ধ যত দীর্ঘ করা যায়, ততই করতে চান, যাতে ভবিষ্যতে নতুন কোনো সংঘাতে জড়াতে ট্রাম্প আরও অনাগ্রহী হয়ে ওঠেন।

ট্রাম্প চাইলে ইরানে তার বিধ্বংসী বিমান হামলা চালিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু এই কৌশলের ফল ধীরে ধীরে কমে আসছে। কারণ মার্কিন বাহিনী ইতোমধ্যেই বেশির ভাগ সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। এর বিকল্প হলো স্থলবাহিনী পাঠানো। কিন্তু সেটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পথ। নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি কখনো এমন পদক্ষেপ নেবেন না।

ট্রাম্প তুলনামূলক ছোট ও নির্দিষ্ট কিছু অভিযানও বিবেচনা করতে পারেন। যেমন, সামুদ্রিক নিরাপত্তা বা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ঘিরে সীমিত হামলা। কিন্তু এসব পদক্ষেপও মার্কিন সেনাদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করবে। একই সঙ্গে এগুলো ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে। আর এসবের মাধ্যমে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে, এমন সম্ভাবনাও খুব কম।

আরেকটি পথ হতে পারে, তেহরানের শাসনের বিরোধী রাজনৈতিক বা জাতিগত গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র দিয়ে এই যুদ্ধকে পরোক্ষভাবে চালানো। কিন্তু সেটি হবে বিপর্যয়ের সূত্রপাত। কুর্দি বা অন্য কোনো জাতিগত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে সক্রিয় করলে বহু সরকারবিরোধী ইরানিও পিছু হটবে। এতে বিরোধী শিবির আরও বিভক্ত হয়ে পড়বে। এমন পদক্ষেপে হয়তো আরও কিছু ইরানি সেনা নিহত হতে পারে, কিন্তু শাসনব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নের ক্ষমতা তাতে বাস্তবে খুব বেশি কমবে না। বরং এতে আঞ্চলিক সংঘাত আরও বাড়তে পারে এবং বড় পরিসরে মানুষের দেশত্যাগের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

তাহলে শেষ পর্যন্ত একটি পথই বাকি থাকে। তা হলো, একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতির চেষ্টা করা। তাত্ত্বিকভাবে ট্রাম্প চাইলে বলতে পারেন, ইরানের সামরিক শক্তিকে দুর্বল করা এবং খামেনিকে হত্যা করাই বিজয়, তারপর সরে যেতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়।

তিনি একতরফাভাবে তেহরানকে মার্কিন স্থাপনা বা উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলা বন্ধ করতে বাধ্য করতে পারবেন না। ইরান এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ করতে রাজি, যদি তাতে আগামী বছরগুলোতে ইসরায়েলের সঙ্গে বারবার যুদ্ধ এড়ানো যায়। তাই যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে পিছু হটলেও, যদি ভবিষ্যতে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত অনিবার্য মনে হয়, তাহলে ইরান সম্ভবত এই অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ, উপসাগরীয় দেশ এবং জ্বালানি অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু বানাতে থাকবে।

এখন ইরানের কৌশলগত লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর এমন উচ্চ ব্যয় চাপানো, যাতে ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত এমন একটি যুদ্ধবিরতিতে রাজি হন, যেখানে ভবিষ্যতে ইসরায়েলের পদক্ষেপের ওপরও কিছু সীমাবদ্ধতা থাকবে। মূলত ইরান তাকে এমন এক অবস্থায় নিতে চায়, যেখানে তাকে ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থ এবং বৈশ্বিক বাজারের স্থিতিশীলতার মধ্যে একটি বেছে নিতে হয়।

সব মিলিয়ে বাস্তবতা খুব কঠিন। ট্রাম্প যে যুদ্ধ শুরু করেছেন, তার ভালো কোনো সমাপ্তি চোখে পড়ে না। আর যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ইরানের সাধারণ মানুষের জন্য ভালো ভবিষ্যৎ ততই দূরে সরে যাচ্ছে। এই ট্র্যাজেডির জন্য খামেনি ও ট্রাম্প দুজনই দায়ী।

(ফরেইন অ্যাফেয়ার্সে প্রকাশিত ‘হাউ আমেরিকা’স ওয়ার অন ইরান ব্যাকফায়ার্ড’ শিরোনামের বিশ্লেষণমূলক লেখাটির অনুবাদ করেছেন মাহবুবুল আলম তারেক)

সম্পর্কিত