জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

রাজপথের তামাশা, কার পকেটে কার টাকা

স্ট্রিম গ্রাফিক

পুরো ঢাকা শহর ফাঁকা করে বাড়ি যাচ্ছে মানুষ। সেই দলে আমিও আছি। আসলে কত মানুষ বাড়ি যাচ্ছে এবার?

বিভিন্ন সংস্থার (যেমন, যাত্রী কল্যাণ সমিতি ও স্ক্রাফ) তথ্যানুযায়ী, এই ঈদে ঢাকা ছাড়ছে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ। এর মধ্যে বাসে যাতায়াত করছে প্রায় ৬০ শতাংশ বা ৯০ লাখ যাত্রী।

এবার দেখা যাক লুটের অঙ্কটা কত বড়। যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, প্রায় ৮৭ শতাংশ বাস যাত্রীপ্রতি ৩৫০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া দিচ্ছে। অনেক রুটে (যেমন ঢাকা-রংপুর বা ঢাকা-পাবনা) ৫০০ টাকার ভাড়া বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৫০০ টাকায়।

তাহলে, একটি সাধারণ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, শুধু গত ৫ দিনে বাসের যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়েছে প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে দূরপাল্লার বাসগুলো পকেটে ভরেছে প্রায় ১২২ কোটি টাকা, আর লোকাল ও সিটি সার্ভিসগুলো বাড়তি নিয়েছে প্রায় ২৬ কোটি টাকা।

এই বিশাল অঙ্কের টাকা সাধারণ মানুষের উৎসবের বাজেট থেকে সরাসরি পরিবহন মাফিয়াদের পকেটে যাচ্ছে।

সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলো, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম গতকাল (১৮ মার্চ) গাবতলী টার্মিনাল পরিদর্শনে গিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা যাত্রীদের সাথে এক নিষ্ঠুর তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়।

মন্ত্রী মহোদয় অবলীলায় দাবি করেছেন, ‘পরিবহনমালিকেরা সরকারি নির্ধারিত ভাড়াই রাখছেন, বরং কোথাও কোথাও ২০-৩০ টাকা কম নেওয়া হচ্ছে।’

মন্ত্রীর এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে, তিনি হয় বাস্তব জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন, অথবা তিনি সরাসরি এই চাঁদাবাজি ও লুটপাটের মদদদাতা।

এসব নিয়ে কথা হচ্ছিল পাশের সিটের যাত্রী হাবিবের সঙ্গে। তিনি বিরক্তমুখে বললেন, মন্ত্রী মহোদয়ের চোখ কি বন্ধ? যখন সাধারণ মানুষ সোশ্যাল মিডিয়া এবং নিউজ পোর্টালে টিকিটের রসিদসহ দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়ার প্রমাণ দিচ্ছে, তখন তিনি কোন জাদুবলে ‘বাড়তি ভাড়া নেই’ এমন সার্টিফিকেট দিচ্ছেন?

কিছুদিন আগে মন্ত্রী নিজেই মন্তব্য করেছিলেন, ‘পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে টাকা নেওয়া চাঁদাবাজি নয়।’ তাঁর এই একপেশে দর্শনই কি আজ পরিবহন মালিকদের বেপরোয়া হয়ে ওঠার লাইসেন্স দেয়নি?

হাবিব সাহেব ব্যঙ্গাত্মক হাসি দিয়ে বললেন, রবিউল সাহেব যেন আগের মন্ত্রী কাদের সাহেবের লাইট ভার্সন। কয়েক দিন আগে হুমকি দিয়েছিলেন, অতিরিক্ত ভাড়া নিলে গাড়ির রুট পারমিট বাতিল হবে। গত তিন দিনে কয়টি বাসের পারমিট বাতিল হয়েছে? কয়জন মালিককে জেল দেওয়া হয়েছে?

আমি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না।

এরইমধ্যে এলেঙ্গার কাছে এসে আমাদের গাড়ি থেমে গেল। সুপারভাইজার বললেন, সামনে মনে হয় অ্যাক্সিডেন্ট হইছে। এই রাস্তা যে কহন কিলিয়ার হইব!

আমার মনে পড়ল যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনের কথা। সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, গত ৫ দিনে সড়কে ১৮৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

অন্যদিকে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, এই ৫ দিনে মহাসড়কে দুর্ঘটনার হার গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি।

এ ছাড়া গতকাল (১৮ মার্চ) বগুড়ার আদমদীঘিতে নীলসাগর এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে রেল ক্রসিংয়ে গত ৫ দিনে মোট ১১ জন মারা গেছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে, গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ‘এমভি আশা-যাওয়া-৫’ ও ‘এমভি জাকির সম্রাট-৩’ লঞ্চের সংঘর্ষে ২ জন নিহত এবং বেশ কয়েকজন নিখোঁজ হন (পরে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬-এ পৌঁছায়)।

তারপরও মন্ত্রী মহোদয় দাবি করেই যাচ্ছেন, এবারের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন ও স্বস্তির!

মারুফ ইসলাম: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

সম্পর্কিত