আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস ২০২৬

সংঘাতময় বিশ্বে টেকসই শান্তি, বৈশ্বিক ন্যায়বিচার ও আমাদের করণীয়

প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০: ০৫
এআই জেনারেটেড ছবি
এআই জেনারেটেড ছবি

২১ সেপ্টেম্বর, বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস’। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক ১৯৮১ সালে ঘোষিত এই দিবসটি কেবল আনুষ্ঠানিক এক বৈশ্বিক আয়োজন নয়; বরং যুদ্ধ, সংঘাত ও বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক উত্তেজনার এই ঘনঘটায় মানবজাতিকে অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ দেওয়ার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

প্রতি বছরের মতো ২০২৬ সালে এবারও জাতিসংঘ বিশ্ব শান্তি দিবসের একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে—“Invest in Peace: For Everyone, Everywhere, Every Day”, যার বাংলায় ভাবার্থ—“শান্তিতে বিনিয়োগ: সবার জন্য, সর্বত্র, প্রতিদিন”। সংঘাতের ঘনঘটায় আচ্ছন্ন বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় এই প্রতিপাদ্য কেবল একটি স্লোগান নয়; বরং সামরিক ব্যয় কমিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীলতা ও মানবিক উন্নয়নে সম্পদ পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে মানবজাতির টিকে থাকার এক অপরিহার্য ও দূরদর্শী দিকনির্দেশনা।

আজকের ভূ-রাজনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত আধুনিক মারণাস্ত্রের প্রতিযোগিতা এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বৈষম্যের দিকে তাকালে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, শান্তির অভাব আজ কেবল ভৌগোলিক কোনো সীমান্ত যুদ্ধেই সীমাবদ্ধ নেই; তা আঘাত হানছে মানব অস্তিত্বের গভীরে। আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস ২০২৬-এর এই মহৎ লগ্নে বিশ্ব শান্তির বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ, শান্তিতে প্রকৃত বিনিয়োগের বাধ্যবাধকতা এবং একবিংশ শতাব্দীতে টেকসই শান্তির রূপরেখা নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করা অত্যন্ত জরুরি।

সংঘাতময় বিশ্বচিত্র: আন্তর্জাতিক শান্তির বিদ্যমান সংকট

একবিংশ শতাব্দীর এই তৃতীয় দশকে এসে বিশ্বশান্তি সম্ভবত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে পূর্ব ইউরোপ, আফ্রিকা থেকে শুরু করে আমাদের নিকটবর্তী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত—যুদ্ধের ডামাডোল এবং মানবিক বিপর্যয় আমাদের বিবেককে প্রতিদিন নাড়া দিচ্ছে।

ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাত ও ইউরোপের অস্থিরতা: ইউরোপে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান এই সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারকে চরম অস্থিরতার মুখে ঠেলে দিয়েছে। পরাশক্তিগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশগ্রহণে বিশ্ব আজ এক ধরনের ‘নব্য স্নায়ুযুদ্ধে’ আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষরণ ও মানবিক বিপর্যয়: গাজা উপত্যকাসহ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ, দীর্ঘস্থায়ী সংকট এবং হাজার হাজার নিরীহ নারী ও শিশুর প্রাণহানি আন্তর্জাতিক আইন, জেনেভা কনভেনশন এবং বিশ্বশান্তি রক্ষায় জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকাকে এক বিশাল প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

মিয়ানমার সংকট ও রোহিঙ্গা শরণার্থী চাপ: আমাদের প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে দীর্ঘদিনের সামরিক স্বৈরাচার, অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ এবং জাতিগত নিধনযজ্ঞ কেবল দেশটির অভ্যন্তরেই ট্র্যাজেডি ঘটায়নি, বরং বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎকে এক গভীর অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট এক বড় হুমকি।

শান্তিতে বিনিয়োগ: সামরিক বাজেট বনাম মানবিক নিরাপত্তা

বিশ্বজুড়ে এখন প্রতি বছর ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হচ্ছে নতুন নতুন পারমাণবিক অস্ত্র, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ড্রোন এবং হাইপারসনিক মিজাইল তৈরিতে। অথচ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ এখনও খাদ্য নিরাপত্তা, সুপেয় পানির সংকট, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অভাবের মুখোমুখি। এই বছরের মূল সুর—“শান্তিতে বিনিয়োগ: সবার জন্য, সর্বত্র, প্রতিদিন”—আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অস্ত্র দিয়ে সাময়িক ভয় দেখানো যায়, কিন্তু শান্তি কেনা যায় না।

শান্তিতে বিনিয়োগের অর্থ হলো: প্রথমত, শিক্ষা ও দারিদ্র্য বিমোচনে বরাদ্দ বাড়ানো: অস্ত্র প্রতিযোগিতা কমিয়ে সেই অর্থ বিশ্বব্যাপী চরম দারিদ্র্য ও অনাহার দূরীকরণে ব্যবহার করা। দ্বিতীয়ত, সামাজিক নিরাপত্তা ও মানব উন্নয়ন: তরুণ সমাজকে সহিংস উগ্রবাদ ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গুণগত শিক্ষায় বিনিয়োগ নিশ্চিত করা।

গ্লোবাল গভর্নেন্স ও শান্তিশৃঙ্খলার নতুন রূপরেখা: ব্লু পলিসিং প্যারাডাইম

একবিংশ শতাব্দীর জটিল ও বহুমাত্রিক সংঘাত নিরসনে প্রথাগত সামরিক উপস্থিতি বা সামরিক সমাধান যে ব্যর্থ হচ্ছে, তা আজ বৈশ্বিক গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের কাছে স্পষ্ট। বিশ্বশান্তি নিশ্চিতকরণে এখন বিশ্বজুড়ে জোর দেওয়া হচ্ছে ‘ব্লু পলিসিং প্যারাডাইম’ বা জাতিসংঘের বৈশ্বিক পিসকিপিংকে একটি টেকসই বিশ্ব পুলিশিং গভর্নেন্সে রূপান্তরের ওপর। আন্তর্জাতিক এই আধুনিক ধারণার মূল কথাই হলো—যুদ্ধ থামানোই শেষ কথা নয়; অপরাধ দমন, নাগরিক নিরাপত্তা প্রদান, বেসামরিক শাসনব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি সমাজকে ভেতর থেকে শান্তিময় করে তোলা।

জাতিসংঘের পিসকিপিং মিশনগুলো এখন আর কেবল প্রথাগত ‘সৈন্য মোতায়েন’-এ সীমাবদ্ধ নেই; এটি বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা ও স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে শক্তিশালী করার এক প্রাতিষ্ঠানিক মডেলে পরিণত হচ্ছে। সংঘাত-পরবর্তী রাষ্ট্রগুলোতে মানবাধিকার রক্ষা ও টেকসই সামাজিক স্থিতিশীলতা আনতে এই আন্তর্জাতিক পুলিশিং রূপরেখা প্রয়োগ নিশ্চিত করা ২০২৬ সালের বিশ্বশান্তি ভাবনায় এক নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে।

প্রথাগত শান্তির ধরণ থেকে রূপান্তর: ‘পিসকিপিং’ থেকে ‘পিসবিল্ডিং’

ঐতিহাসিকভাবে জাতিসংঘ এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো শান্তি বলতে যা বুঝিয়েছে, তা মূলত ‘যুদ্ধবিরতি’ বা ‘প্রথাগত শান্তিরক্ষা’। অর্থাৎ, যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার পর সেখানে শান্তি রক্ষাকারী বাহিনী পাঠিয়ে কোনোমতে রক্তপাত বন্ধ রাখা। কিন্তু আধুনিক সমাজতত্ত্ব ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোকে এটি কোনো টেকসই শান্তি হতে পারে না। সংঘাতের মূল কারণ বা উৎসগুলোকে উপড়ে না ফেলে কেবল সশস্ত্র পাহারায় প্রাপ্ত ‘শান্তি’ যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বকে এখন জোর দিতে হবে ‘শান্তি গঠন’ বা ‘পিসবিল্ডিং’-এর ওপর। এর অর্থ হলো—সামাজিক বৈষম্য নিরসন, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ এবং দুর্বল ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা।

নরওয়েজিয়ান সমাজবিজ্ঞানী ও শান্তি গবেষণার জনক ইয়োহান গালতুং শান্তির দুটি রূপ চিহ্নিত করেছিলেন: ‘নেতিবাচক শান্তি’—যা কেবল সরাসরি সহিংসতার অনুপস্থিতি; এবং ‘ইতিবাচক শান্তি’—যা ন্যায়বিচার, সামাজিক সাম্য এবং কাঠামোগত সহিংসতার অবসান ঘটায়। আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস ২০২৬-এর মূল লক্ষ্য হতে হবে এই ‘ইতিবাচক শান্তি’ প্রতিষ্ঠা করা।

জলবায়ু পরিবর্তন ও সাইবার যুদ্ধ: শান্তির নতুন হুমকি

আন্তর্জাতিক শান্তির ক্ষেত্রে প্রথাগত সামরিক অস্ত্রের পাশাপাশি এখন নতুন কিছু অ-সামরিক কিন্তু অত্যন্ত ক্ষতিকারক উপাদান যুক্ত হয়েছে। আর তা হলো- জলবায়ু পরিবর্তন ও সম্পদ কেন্দ্রিক সংঘাত। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে প্রথাগত কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে, পানির উৎস শুকিয়ে যাচ্ছে এবং বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ ‘জলবায়ু শরণার্থী’ হতে বাধ্য হচ্ছে। সম্পদ ও পানির এই সংকট ভবিষ্যতে দেশগুলোর মধ্যে বা আঞ্চলিক পর্যায়ে বড় ধরনের সংঘাতের বীজ রোপণ করছে।

আধুনিক প্রযুক্তি যেমন মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি তা আন্তর্জাতিক শান্তির নতুন ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। এআই-চালিত স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র, ভুয়া তথ্য ছড়ানোর ডিজিটাল অপপ্রচার এবং অন্য দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় নেটওয়ার্কে সাইবার হামলা বিশ্বকে এক অদৃশ্য ও বিপজ্জনক যুদ্ধের ময়দানে পরিণত করেছে।

দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা

বিশ্বশান্তির আলোচনায় বাংলাদেশের ভূমিকা সবসময়ই উজ্জ্বল ও দৃষ্টান্তমূলক। আমাদের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং সর্বপ্রকার সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে সর্বোচ্চ সৈন্য ও পুলিশ প্রেরণকারী দেশগুলোর অন্যতম হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে পরম ধৈর্য, দক্ষতা ও মানবিকতার সাথে শান্তি বজায় রেখে চলেছে। আমাদের অনুকরণীয় ‘ব্লু হেলমেট’ সদস্যরা বাংলাদেশের পতাকাকে বিশ্বদরবারে শান্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন।

বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশ হওয়া সত্ত্বেও কেবল মানবিকতার তাগিদে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা কে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে বিশ্বশান্তি ও মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত। তবে এই সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

শান্তি কেবল কোনো চুক্তিপত্রের স্বাক্ষর নয়; শান্তি হলো মানুষের মনের অবস্থা, একটি সমাজের ন্যায়বিচার এবং বিশ্বের সহনশীল পরিবেশ। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, “হিংসেয় উন্মত্ত প্রথ্বী, নিত্য নিষ্ঠুর দ্বন্দ্ব / ঘোর কুটিল তার গহন পন্থ / গান তাহে পুণ্যগীতি, আনো নব আনন্দ...”—আজকের বিশ্বেও সংঘাত ও হিংসার মেঘ কাটাতে আমাদের সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের গান গাইতে হবে।

আজকের এই ২১ সেপ্টেম্বরে বিশ্বের সব দেশের শাসক, রাষ্ট্রনেতা এবং সাধারণ নাগরিকদের শপথ নিতে হবে—আমরা হিংসা ও অস্ত্রের ভাষা এবং ধ্বংসাত্মক সামরিক ব্যয়ের পথ প্রত্যাখ্যান করব। ‘শান্তিতে বিনিয়োগ: সবার জন্য, সর্বত্র, প্রতিদিন’ এই নীতিকে ধারণ করে একটি ন্যায়ভিত্তিক, নিরাপদ ও শান্তিময় পৃথিবী আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেব। কারণ দিনশেষে যুদ্ধ কোনো বিজয়ী ঘোষণা করে না, যুদ্ধ কেবল ধ্বংস ও শোক দিয়ে যায়; জয়ী হয় কেবল শান্তি।

  • ড. মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান: সমাজনীতি ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষক; শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত