ড. মো. আবু সালেহ

ভারতের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে প্রথাগত দলভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জাতিগত সমীকরণ, ধর্মীয় বিভাজন এবং নির্বাচনী পপুলিজমের বৃত্তে আবর্তিত হয়ে আসছে। কিন্তু সম্প্রতি ভারতীয় রাজনীতির এই ব্যাকরণকে তীব্রভাবে নাড়া দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলন। বহুমাত্রিক রাজনৈতিক মেরুকরণের এই যুগে একদল ক্ষুব্ধ, শিক্ষিত এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলার শিকার তরুণদের হাত ধরে সূচনা হওয়া এই আন্দোলন আজ রূপ নিয়েছে প্রথাগত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে এক সুসংগঠিত নাগরিক সামাজিক প্রতিরোধে।
কোনো আন্দোলনের রাজনৈতিক অভিধানে ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকার মতো একটি পতঙ্গের নাম যুক্ত হওয়া দৃশ্যত অদ্ভুত মনে হতে পারে, তবে এর অন্তরালে রয়েছে এক গভীর সামাজিক আঘাত এবং তা থেকে জন্ম নেওয়া প্রতিবাদের আগুন। আন্দোলনের সূত্রপাত হয় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার এক উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে, যেখানে চাকরির দাবিতে ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাজপথে নামা বঞ্চিত বেকার যুবসমাজকে রূপক অর্থে ‘সমাজের পরজীবী’ ও ‘তেলাপোকা’ বলে অভিহিত করা হয়েছিল।
আধুনিক রাষ্ট্রে যে নাগরিকরা কর্মসংস্থান ও স্বচ্ছতার মৌলিক দাবি তুলছেন, তাদের শাসনব্যবস্থার শীর্ষবিন্দু থেকে এভাবে তুচ্ছজ্ঞান করাকে তরুণেরা নিঃশব্দে মেনে নেয়নি। তারা এই অপমানকে প্রত্যাখ্যান না করে বরং তাকেই প্রতিরোধের হাতিয়ার বানিয়ে নেয়। ডিজিটাল রাজনৈতিক ব্যঙ্গ এর অংশ হিসেবে স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান ও তরুণ অ্যাক্টিভিস্ট অভিজিৎ দীপকের উদ্যোগ এবং ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নামে একটি ছদ্ম-রাজনৈতিক ফ্রন্ট গঠনের মধ্য দিয়ে এর আনুষ্ঠানিক উন্মেষ ঘটে।
সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করলে, আন্দোলনের জন্য তেলাপোকাকে প্রতীক হিসেবে বেছে নেওয়ার বিষয়টি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা বহন করে। প্রথমত, সহনশীলতা ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সক্ষমতা। তেলাপোকা চরম প্রতিকূল পরিবেশেও বেঁচে থাকার অদম্য প্রতীক। ভারতীয় বেকার যুবসমাজ আজ দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সংকট, নিয়োগ দুর্নীতি এবং মূল্যস্ফীতির মুখে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার যে নিরবচ্ছিন্ন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, তা এই চিহ্নের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। দ্বিতীয়ত, অবমাননাকে প্রতিরোধে রূপান্তর-শাসক শ্রেণি যাদের ‘পরজীবী’ ভেবে পদদলিত করতে চায়, তারা ক্ষুদ্র হলেও একত্রিত হলে কত বড় বাধার সৃষ্টি করতে পারে, এটি তারই বার্তা। তৃতীয়ত, প্রথাগত রাজনীতির বৃত্তের বাইরে থাকা কোটি কোটি প্রান্তিক তরুণের একতাবদ্ধ হওয়ার চিহ্ন হিসেবে এই নামটিকে গ্রহণ করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষ করে ইনস্টাগ্রাম ও এক্সে কয়েক মিলিয়ন অনুসারী নিয়ে ডিজিটাল হ্যাশট্যাগ আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও, মুহূর্তের মধ্যেই তা ভারতের প্রধান শহরগুলোর রাজপথে নেমে আসে। দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে শুরু করে পুনে, জয়পুর, লখনউ এবং বেঙ্গালুরুর মোড়ে মোড়ে শিক্ষার্থীরা হাতে প্লাকার্ড এবং মুখে কৃত্রিম ককরোচ-মাস্ক পরে বিক্ষোভে অংশ নিতে শুরু করে। এটি ভারতের রাজনীতিতে জেন-জি এবং মিলেনিয়াল প্রজন্মের এমন এক নতুন আগমন বার্তা, যা মূলধারার রাজনীতিবিদদের হিসাব-নিকাশ উল্টে দিচ্ছে।
সামাজিক ও রাজনৈতিক তত্ত্বের দৃষ্টিতে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন একটি কৌতূহলোদ্দীপক কেস স্টাডি। এটিকে সমাজবিজ্ঞানের কয়েকটি আধুনিক ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়। ক্লাসিক্যাল রাজনৈতিক আন্দোলনে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলই মূল লক্ষ্য। কিন্তু ‘নিউ সোশ্যাল মুভমেন্ট’-এর মূল ফোকাস হলো স্বাধিকার, সাংস্কৃতিক পরিচয়, অধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা। সিজেপি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করতে চায় না; বরং তারা বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর সংস্কারের তীব্র চাপ সৃষ্টি করতে চায়। কর্তৃত্ববাদী বা বধির রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ‘ব্যঙ্গ’ বা ‘হাস্যরস’ হলো সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। যখন কোনো নাগরিক রাষ্ট্রকে আর ভয় পায় না বরং হাসির পাত্র করে তোলে, তখন শাসকের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তেলাপোকা বা ককরোচ নামটি গ্রহণ করে তারা রাষ্ট্রীয় অবমাননাকে একটি পরাবাস্তব প্রতীকে পরিণত করেছে, যা প্রচলিত প্রশাসনিক অহংকারকে নস্যাৎ করে দেয়। আধুনিক ডিজিটাল যুগে কোনো স্থায়ী অবকাঠামো বা বিশাল ফান্ডিং ছাড়াই যেকোনো একটি স্পর্শকাতর ইস্যুকে কেন্দ্র করে দ্রুত লাখ লাখ মানুষকে একতাবদ্ধ করা সম্ভব। একে তাত্ত্বিকরা বলছেন ‘পপ-আপ প্রটেস্ট’।
ককরোচ জনতা পার্টির আত্মপ্রকাশের পেছনে রয়েছে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোতে পুঞ্জীভূত হতে থাকা ক্ষোভ, যুবসমাজের গভীর হতাশা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (আইএইচডি) এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ভারতের মোট বেকার জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮৩ শতাংশই তরুণ। আরও ভয়াবহ তথ্য হলো, মাধ্যমিক বা উচ্চশিক্ষা শেষ করা শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার অশিক্ষিতদের তুলনায় প্রায় ৯ গুণ বেশি। সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমির পরিসংখ্যানও নির্দেশ করে, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী ভারতীয় তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৪০ শতাংশ ছুঁইছুঁই।
উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি অর্জনের পরও তরুণদের যখন বছরের পর বছর যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পেয়ে সাধারণ দিনমজুর বা ডেলিভারি বয়ের কাজ করতে হয়, তখন তাদের মধ্যে যে আত্মমর্যাদাবোধের সংকট তৈরি হয়, তা রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর থেকে তাদের আস্থা নড়বড়ে করে দেয়।
ভারতের তরুণদের অসন্তোষ সবচেয়ে তীব্র রূপ ধারণ করেছে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোতে ধারাবাহিক অনিয়ম ও প্রশ্নফাঁসকে কেন্দ্র করে। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় স্তরের সবচেয়ে সম্মানজনক পরীক্ষাগুলো প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এনইইটি-ইউজি কেলেঙ্কারিতে (ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এনট্রান্স টেস্ট-আন্ডারগ্রাজুয়েট) লাখ লাখ মেডিকেল প্রত্যাশী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলে প্রশ্নফাঁস ও গ্রেস মার্কসের অনিয়ম চরম আকার ধারণ করে। এছাড়া ইউজিসি-এনইটি (ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন-ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি টেস্ট) ও অন্যান্য রাজ্যস্তরের পরীক্ষায় অনিয়মের প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সিবিআই তদন্তের মুখে পরীক্ষা বাতিল করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত পাঁচ বছরে ভারতের ১৫টি রাজ্যে প্রায় ৪১টি বড় নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস হয়েছে, যার ফলে ১ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি চাকরিপ্রার্থীর জীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম, পরিবারের জমানো অর্থ টিউশন ফি হিসেবে ঢেলে দেওয়ার পর যখন এক মুহূর্তে পরীক্ষা বাতিল হয়ে যায়, তখন তরুণ প্রজন্মের রাগ রাজপথে বিস্ফোরিত হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।
ভারতের মূলধারার রাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) হোক কিংবা বিরোধী দল কংগ্রেস (আইএনসি) বা আঞ্চলিক দলগুলো কারও মৌলিক এজেন্ডাতেই তরুণদের কর্মসংস্থান এবং স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রাধান্য পায় না। ধর্মীয় মেরুকরণ, জাতপাত বা বিনামূল্যে ভাতা দেওয়ার রাজনীতিতেই বেশি আগ্রহ দেখায় প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো।
দ্য হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়েছে, জেন-জি প্রজন্ম রাজনীতিকে আর কেবল নেতাদের ভাষণ বা প্রতিশ্রুতির চশমায় দেখছে না; তারা ফলাফল চাইছে। শাসক শ্রেণির আমলাতান্ত্রিক অহংকার এবং বিরোধী দলগুলোর কেবল নির্বাচনী রাজনীতিতে আবদ্ধ থাকার প্রবণতা তরুণদের এমন একটি বিকল্প প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে বাধ্য করেছে, যা কোনো একক রাজনৈতিক আদর্শের গোলাম নয়।
ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন যেভাবে বিস্তার লাভ করেছে, তা আধুনিক যুগের সামাজিক আন্দোলনের এক অভূতপূর্ব মডেল। এটি প্রথাগত রাজনীতির মতো কোনো কেন্দ্রীয় কার্যালয় বা দলীয় কার্যালয় থেকে পরিচালিত হয়নি; বরং এর বিকাশ ঘটেছে অনলাইন স্পেস ও রাজপথের এক নিবিড় সমন্বয়ে।
প্রথম ধাপে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষ করে ইনস্টাগ্রাম, এক্স (টুইটার), রেডিট এবং টেলিগ্রাম চ্যানেলগুলোতে ব্যঙ্গাত্মক মিম, শর্ট ভিডিও এবং রিলসের মাধ্যমে আন্দোলনটি ছড়াতে শুরু করে। ডিজিটাল অ্যাক্টিভিস্টরা রাজনীতিকদের অহংকারী বক্তব্য এবং শিক্ষা ব্যবস্থার অসারতাকে খোঁচা দিয়ে হ্যাশট্যাগ ক্যাম্পেইন শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তরুণদের অনলাইন ক্ষোভ একীভূত হতে থাকে।
দ্বিতীয় ধাপে, ডিজিটাল বিক্ষোভ বাস্তবে রূপ নেয়। দিল্লির যন্তর মন্তরে যখন প্রথম শতাধিক শিক্ষার্থী ককরোচ-মাস্ক এবং ব্যঙ্গাত্মক ফেস্টুন নিয়ে জড়ো হন, তখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর কাড়ে এই বিক্ষোভ। রয়টার্স ও দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানার ছাড়া শত শত তরুণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে আসা ভারতীয় রাজনীতির জন্য এক নতুন দৃশ্যপট।
এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর বিকেন্দ্রীভূত নেতৃত্ব। কোনো নির্দিষ্ট শীর্ষ নেতা, রাজনৈতিক অভিভাবক বা মুখপাত্র এই আন্দোলনকে একচ্ছত্রভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন না। আন্দোলনে কোনো সাধারণ সম্পাদক বা সভাপতি নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সামাজিক কর্মী, স্বাধীন কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীরা স্থানভেদে স্থানীয় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এছাড়া জোটবদ্ধ বিভিন্ন নেটওয়ার্ক বিশেষ করে পরিবেশকর্মী (যেমন সোনাম ওয়াংচুকের আন্দোলন সমর্থকরা), বেকার যুব ফোরাম এবং মুক্তমনা ডিজিটাল অ্যাক্টিভিস্টদের সমন্বয়ে একটি সমন্বয় কমিটি কাজ করছে। আন্দোলন কবে, কোথায়, কী কর্মসূচি পালন করবে তা ওপেন সোর্স পোল এবং এনক্রিপ্টেড গ্রুপ চ্যানেলে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।
নিছক সিস্টেমের সমালোচনাতেই আন্দোলন থেমে থাকেনি, তারা সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট কিছু দাবি উত্থাপন করেছে। সেগুলো হলো:
এনটিএ এবং পরীক্ষা পর্যালোচনায় ব্যর্থতার দায়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং জড়িত শীর্ষ আমলাদের বরখাস্ত করা। প্রশ্নফাঁস ও নিয়োগ দুর্নীতি বন্ধে কঠোর শাস্তিমূলক কেন্দ্রীয় আইন প্রণয়ন এবং প্রতিটি পরীক্ষা একটি নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সম্পন্ন করা। সরকারি ও আধা-সরকারি চাকরির সমস্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া তদারকি করতে স্বতন্ত্র নাগরিক ও বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন। বারবার প্রশ্নফাঁসের কারণে যেসব প্রার্থীর বয়সসীমা পার হয়ে গেছে, তাদের বয়স শিথিলকরণ এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া। প্রশ্নফাঁস ও নিয়োগ দুর্নীতির মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে যেসব প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পরীক্ষার্থী দুর্ভাগ্যজনকভাবে আত্মহত্যা করেছেন, তাদের প্রতিটি পরিবারকে ১ কোটি টাকা করে আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করা। আন্দোলনকারী ও সমর্থনকারী সামাজিক কর্মীদের (যেমন: অনশনরত লাদাখি পরিবেশকর্মী সোনাম ওয়াংচুক) অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি প্রদান করা, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর থেকে সমস্ত মামলা বা পুলিশি এফআইআর প্রত্যাহার করা এবং আন্দোলন দমনে পুলিশি নির্যাতনের বিচার করা।
এ আন্দোলনে সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুক্ত হয়েছে। একটি ছাত্র আন্দোলন কীভাবে গণআন্দোলনে রূপ নিল, তা বুঝতে হলে ভারতের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে। ভারতের প্রতিটি পরিবারে অন্তত একজন বেকার বা চাকরিপ্রার্থী তরুণ রয়েছেন, যার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। মধ্যবিত্ত মা-বাবারা, যারা সারাজীবনের সঞ্চয় ঢেলে দিয়েছেন সন্তানের পড়াশোনায়, তারাও শিক্ষার্থীদের পাশে যন্তর মন্তরে এসে বসেছেন। পাঞ্জাব ও হরিয়ানার বেশ কিছু কৃষক সংগঠন এই আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে দিল্লিতে সংহতি মিছিল পাঠিয়েছে। তাদের বক্তব্য ‘কৃষকের সন্তানরাই পড়াশোনা করে সরকারি চাকরির পরীক্ষা দেয়, আর সেই স্বপ্ন কেনাবেচা হচ্ছে।’
ভারতে গত কয়েক দশক ধরে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার প্রধান হাতিয়ার ছিল ধর্মীয় মেরুকরণ এবং জাতপাতের সমীকরণ। ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক দলগুলো ভোটের সময় ‘হিন্দু-মুসলিম বিভাজন’, ‘মন্দির-মসজিদ বিতর্ক’ কিংবা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ‘ভোটব্যাংক রাজনীতিকে’ মূল এজেন্ডা বানিয়ে এসেছে। প্রথাগত দলগুলোর ধারণা ছিল, এই ধরনের আবেগধর্মী ইস্যু সামনে আনলেই সাধারণ মানুষের বাস্তব জীবনের কষ্টগুলোকে ভুলিয়ে রাখা সম্ভব।
কিন্তু সিজেপি আন্দোলন এই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ব্যাকরণকে পুরোপুরি উল্টে দিয়েছে। ভারতের জেন-জি এবং শিক্ষিত যুবসমাজ রাজপথে নেমে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে রুটি-রুজি, মানসম্মত শিক্ষা, চাকরির নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার দাবি যেকোনো ধর্মীয় বিভাজন বা জাতগত পরিচয়ের চেয়ে অনেক বড়। যে রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মের বা জাতের নামে তরুণদের ব্যবহার করত, তারা দেখেছে কীভাবে হিন্দু, মুসলিম, দলিত বা উচ্চবর্ণের ছাত্ররা হাতে হাত ধরে দিল্লির রাজপথে সরকারি দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে। এটি ভারতের রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব সামাজিক সংহতির জন্ম দিয়েছে।

একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের ভুলত্রুটি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে জনআকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব থাকে বিরোধী দলগুলোর (যেমন: ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি, বা বিভিন্ন রাজ্যভিত্তিক আঞ্চলিক দল)। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বিরোধী দলগুলো তরুণ সমাজের এই চরম ক্ষোভ ও বেকারত্বের সংকটকে কেবল ‘নির্বাচনী প্রচারণার ভাষণ’ হিসেবে ব্যবহার করেছে, কোনো কার্যকর নাগরিক আন্দোলনে রূপ দিতে পারেনি।
তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গিতে, মূলধারার বিরোধী দলগুলোও এক ধরনের নির্বাচনী সুবিধাবাদে আক্রান্ত। তারা পরবর্তী নির্বাচনে কীভাবে দু-চারটি আসন বাড়ানো যায়, সেই লাভ-ক্ষতির অংক কষতেই ব্যস্ত থাকে। বাস্তবে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার বা এনটিএর মতো অদক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য রাজপথে দীর্ঘমেয়াদী বা আপসহীন লড়াই করার মানসিকতা তাদের নেই। যখন কোনো প্রথাগত রাজনৈতিক দল বেকার তরুণদের কান্না ও ক্ষোভকে সংগঠিত করতে পারেনি, তখনই সাধারণ শিক্ষার্থীরা কোনো দলীয় ব্যানার ছাড়াই সিজেপির মতো বিকল্প ও অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে বাধ্য হয়েছে। এটি প্রথাগত বিরোধী রাজনীতির চরম সাংগঠনিক ব্যর্থতারই প্রমাণ। ভারতের সংসদ বা রাজ্য বিধানসভাগুলোতে সাধারণ মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলো আড়ালে পড়ে গিয়ে কেবল রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি ও স্লোগান-সর্বস্ব হয়ে পড়েছে, যা এই নাগরিক আন্দোলন প্রমাণ করে দিয়েছে।
হঠাৎ গড়ে ওঠা এই নাগরিক প্রতিরোধকে মোকাবিলা করতে রাষ্ট্রযন্ত্র ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যায়। প্রাথমিকভাবে সরকার ও শাসকদল আন্দোলনটিকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং ‘সামাজিক মাধ্যমে কিছু বিভ্রান্ত যুবকের সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টা’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু আন্দোলন সারা দেশে ছড়াতে শুরু করলে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে।
দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। কোথাও কোথাও টিয়ার গ্যাস ও ওয়াটার ক্যানন ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করা হয়। কিছু স্পর্শকাতর এলাকা এবং ডিজিটাল গ্রুপগুলোর ওপর সার্ভেইল্যান্স বাড়ানো হয় এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে কিছু সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্ট বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
অবশ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে (যেমন বিবিসি, রয়টার্স) সরকারের দমনপীড়নের খবর প্রকাশের পর, প্রশাসনিক নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। সরকার কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাকে (সিবিআই) প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারির তদন্ত দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেয় এবং পরীক্ষা সংস্কারে উপদেষ্টা কমিটি গঠনের ঘোষণা দেয়।
ককরোজ জনতা পার্টির আন্দোলন ভারতীয় রাজনীতিকে যে মৌলিক বার্তাগুলো দিচ্ছে, তা কেবল কোনো সাময়িক রাজনৈতিক আলোড়ন নয়; বরং এগুলো ভারতের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের রূপরেখা নির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদী ভূমিকা রাখবে। ভারতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ‘পরিবারতন্ত্র’ এবং ‘ধর্মীয়-জাতপাত নির্ভর মেরুকরণ’কে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে এই আন্দোলন। তরুণরা বার্তা দিচ্ছে তারা কাকে ভোট দেবে তা নির্ভর করবে সরকারের শিক্ষানীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক পারফরম্যান্সের ওপর। সুতরাং এই আন্দোলন ভারতের প্রথাগত রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে পারফরম্যান্স-বেসড রাজনীতির জন্ম দিতে পারে।
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মকে কীভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ার, অর্থ সংগ্রহ, আন্দোলন পরিচালনা এবং বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরির প্ল্যাটফর্ম হিসেবে রূপ দেওয়া যায়, সিজেপি তার উদাহরণ তৈরি করেছে। এটি আগামী দিনের ভারতীয় রাজনীতিতে রাজনৈতিক প্রচারাভিযানের ধারাকেই বদলে দেবে এবং ডিজিটাল-ফার্স্ট প্রটেস্টের নতুন মডেল হিসেবে আবির্ভূত হবে।
শাসক দল বিজেপি কিংবা প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস উভয়কেই এখন তরুণ ভোটারদের সন্তুষ্ট করতে নিজেদের ইশতেহারে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা যুক্ত করতে হবে। সিজেপি আন্দোলনের চাপেই ইতিমধ্যেই ভারতের একাধিক রাজ্য ও কেন্দ্রীয় স্তরে প্রশ্নফাঁস বিরোধী আইন পাস করার এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার তৎপরতা দৃশ্যমান হচ্ছে যা মূলধারার দলগুলোর নীতিগত পরিবর্তন তরান্বিত করবে।
ককরোচ জনতা পার্টি কালক্রমে কোনো পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে, নাকি একটি শক্তিশালী প্রেশার গ্রুপ হিসেবে কাজ করবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, তারা ভারতের মূলধারার দলগুলোর ওপর একটি সার্বক্ষণিক নাগরিক তদারকি সংস্থাসুলভ মনস্তাত্ত্বিক ভয় তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
ভারতের মূলধারার রাজনীতিকদের জন্য এই আন্দোলন একটি পরিষ্কার সতর্কবার্তা। যদি ভারতীয় গণতন্ত্র সময়মতো তরুণদের মৌলিক অধিকার, কর্মসংস্থান ও আত্মমর্যাদাকে স্বীকার না করে, তবে আগামী দিনে প্রথাগত রাজনীতিকে কেবল ককরোচ আন্দোলন নয়, আরও অনেক বেশি আনকনভেনশনাল বা অপ্রথাগত নাগরিক শক্তির মুখোমুখি হতে হবে। ভারতীয় রাজনীতির আকাশে এই ‘ককরোচ বিপ্লব’ তাই কোনো শেষ নয়, বরং এক নতুন রাজনৈতিক ভোরের সূচনা মাত্র।
লেখক: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক

ভারতের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে প্রথাগত দলভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জাতিগত সমীকরণ, ধর্মীয় বিভাজন এবং নির্বাচনী পপুলিজমের বৃত্তে আবর্তিত হয়ে আসছে। কিন্তু সম্প্রতি ভারতীয় রাজনীতির এই ব্যাকরণকে তীব্রভাবে নাড়া দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলন। বহুমাত্রিক রাজনৈতিক মেরুকরণের এই যুগে একদল ক্ষুব্ধ, শিক্ষিত এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলার শিকার তরুণদের হাত ধরে সূচনা হওয়া এই আন্দোলন আজ রূপ নিয়েছে প্রথাগত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে এক সুসংগঠিত নাগরিক সামাজিক প্রতিরোধে।
কোনো আন্দোলনের রাজনৈতিক অভিধানে ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকার মতো একটি পতঙ্গের নাম যুক্ত হওয়া দৃশ্যত অদ্ভুত মনে হতে পারে, তবে এর অন্তরালে রয়েছে এক গভীর সামাজিক আঘাত এবং তা থেকে জন্ম নেওয়া প্রতিবাদের আগুন। আন্দোলনের সূত্রপাত হয় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার এক উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে, যেখানে চাকরির দাবিতে ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাজপথে নামা বঞ্চিত বেকার যুবসমাজকে রূপক অর্থে ‘সমাজের পরজীবী’ ও ‘তেলাপোকা’ বলে অভিহিত করা হয়েছিল।
আধুনিক রাষ্ট্রে যে নাগরিকরা কর্মসংস্থান ও স্বচ্ছতার মৌলিক দাবি তুলছেন, তাদের শাসনব্যবস্থার শীর্ষবিন্দু থেকে এভাবে তুচ্ছজ্ঞান করাকে তরুণেরা নিঃশব্দে মেনে নেয়নি। তারা এই অপমানকে প্রত্যাখ্যান না করে বরং তাকেই প্রতিরোধের হাতিয়ার বানিয়ে নেয়। ডিজিটাল রাজনৈতিক ব্যঙ্গ এর অংশ হিসেবে স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান ও তরুণ অ্যাক্টিভিস্ট অভিজিৎ দীপকের উদ্যোগ এবং ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নামে একটি ছদ্ম-রাজনৈতিক ফ্রন্ট গঠনের মধ্য দিয়ে এর আনুষ্ঠানিক উন্মেষ ঘটে।
সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করলে, আন্দোলনের জন্য তেলাপোকাকে প্রতীক হিসেবে বেছে নেওয়ার বিষয়টি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা বহন করে। প্রথমত, সহনশীলতা ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সক্ষমতা। তেলাপোকা চরম প্রতিকূল পরিবেশেও বেঁচে থাকার অদম্য প্রতীক। ভারতীয় বেকার যুবসমাজ আজ দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সংকট, নিয়োগ দুর্নীতি এবং মূল্যস্ফীতির মুখে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার যে নিরবচ্ছিন্ন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, তা এই চিহ্নের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। দ্বিতীয়ত, অবমাননাকে প্রতিরোধে রূপান্তর-শাসক শ্রেণি যাদের ‘পরজীবী’ ভেবে পদদলিত করতে চায়, তারা ক্ষুদ্র হলেও একত্রিত হলে কত বড় বাধার সৃষ্টি করতে পারে, এটি তারই বার্তা। তৃতীয়ত, প্রথাগত রাজনীতির বৃত্তের বাইরে থাকা কোটি কোটি প্রান্তিক তরুণের একতাবদ্ধ হওয়ার চিহ্ন হিসেবে এই নামটিকে গ্রহণ করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষ করে ইনস্টাগ্রাম ও এক্সে কয়েক মিলিয়ন অনুসারী নিয়ে ডিজিটাল হ্যাশট্যাগ আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও, মুহূর্তের মধ্যেই তা ভারতের প্রধান শহরগুলোর রাজপথে নেমে আসে। দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে শুরু করে পুনে, জয়পুর, লখনউ এবং বেঙ্গালুরুর মোড়ে মোড়ে শিক্ষার্থীরা হাতে প্লাকার্ড এবং মুখে কৃত্রিম ককরোচ-মাস্ক পরে বিক্ষোভে অংশ নিতে শুরু করে। এটি ভারতের রাজনীতিতে জেন-জি এবং মিলেনিয়াল প্রজন্মের এমন এক নতুন আগমন বার্তা, যা মূলধারার রাজনীতিবিদদের হিসাব-নিকাশ উল্টে দিচ্ছে।
সামাজিক ও রাজনৈতিক তত্ত্বের দৃষ্টিতে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন একটি কৌতূহলোদ্দীপক কেস স্টাডি। এটিকে সমাজবিজ্ঞানের কয়েকটি আধুনিক ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়। ক্লাসিক্যাল রাজনৈতিক আন্দোলনে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলই মূল লক্ষ্য। কিন্তু ‘নিউ সোশ্যাল মুভমেন্ট’-এর মূল ফোকাস হলো স্বাধিকার, সাংস্কৃতিক পরিচয়, অধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা। সিজেপি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করতে চায় না; বরং তারা বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর সংস্কারের তীব্র চাপ সৃষ্টি করতে চায়। কর্তৃত্ববাদী বা বধির রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ‘ব্যঙ্গ’ বা ‘হাস্যরস’ হলো সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। যখন কোনো নাগরিক রাষ্ট্রকে আর ভয় পায় না বরং হাসির পাত্র করে তোলে, তখন শাসকের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তেলাপোকা বা ককরোচ নামটি গ্রহণ করে তারা রাষ্ট্রীয় অবমাননাকে একটি পরাবাস্তব প্রতীকে পরিণত করেছে, যা প্রচলিত প্রশাসনিক অহংকারকে নস্যাৎ করে দেয়। আধুনিক ডিজিটাল যুগে কোনো স্থায়ী অবকাঠামো বা বিশাল ফান্ডিং ছাড়াই যেকোনো একটি স্পর্শকাতর ইস্যুকে কেন্দ্র করে দ্রুত লাখ লাখ মানুষকে একতাবদ্ধ করা সম্ভব। একে তাত্ত্বিকরা বলছেন ‘পপ-আপ প্রটেস্ট’।
ককরোচ জনতা পার্টির আত্মপ্রকাশের পেছনে রয়েছে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোতে পুঞ্জীভূত হতে থাকা ক্ষোভ, যুবসমাজের গভীর হতাশা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (আইএইচডি) এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ভারতের মোট বেকার জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮৩ শতাংশই তরুণ। আরও ভয়াবহ তথ্য হলো, মাধ্যমিক বা উচ্চশিক্ষা শেষ করা শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার অশিক্ষিতদের তুলনায় প্রায় ৯ গুণ বেশি। সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমির পরিসংখ্যানও নির্দেশ করে, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী ভারতীয় তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৪০ শতাংশ ছুঁইছুঁই।
উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি অর্জনের পরও তরুণদের যখন বছরের পর বছর যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পেয়ে সাধারণ দিনমজুর বা ডেলিভারি বয়ের কাজ করতে হয়, তখন তাদের মধ্যে যে আত্মমর্যাদাবোধের সংকট তৈরি হয়, তা রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর থেকে তাদের আস্থা নড়বড়ে করে দেয়।
ভারতের তরুণদের অসন্তোষ সবচেয়ে তীব্র রূপ ধারণ করেছে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোতে ধারাবাহিক অনিয়ম ও প্রশ্নফাঁসকে কেন্দ্র করে। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় স্তরের সবচেয়ে সম্মানজনক পরীক্ষাগুলো প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এনইইটি-ইউজি কেলেঙ্কারিতে (ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এনট্রান্স টেস্ট-আন্ডারগ্রাজুয়েট) লাখ লাখ মেডিকেল প্রত্যাশী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলে প্রশ্নফাঁস ও গ্রেস মার্কসের অনিয়ম চরম আকার ধারণ করে। এছাড়া ইউজিসি-এনইটি (ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন-ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি টেস্ট) ও অন্যান্য রাজ্যস্তরের পরীক্ষায় অনিয়মের প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সিবিআই তদন্তের মুখে পরীক্ষা বাতিল করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত পাঁচ বছরে ভারতের ১৫টি রাজ্যে প্রায় ৪১টি বড় নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস হয়েছে, যার ফলে ১ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি চাকরিপ্রার্থীর জীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম, পরিবারের জমানো অর্থ টিউশন ফি হিসেবে ঢেলে দেওয়ার পর যখন এক মুহূর্তে পরীক্ষা বাতিল হয়ে যায়, তখন তরুণ প্রজন্মের রাগ রাজপথে বিস্ফোরিত হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।
ভারতের মূলধারার রাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) হোক কিংবা বিরোধী দল কংগ্রেস (আইএনসি) বা আঞ্চলিক দলগুলো কারও মৌলিক এজেন্ডাতেই তরুণদের কর্মসংস্থান এবং স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রাধান্য পায় না। ধর্মীয় মেরুকরণ, জাতপাত বা বিনামূল্যে ভাতা দেওয়ার রাজনীতিতেই বেশি আগ্রহ দেখায় প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো।
দ্য হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়েছে, জেন-জি প্রজন্ম রাজনীতিকে আর কেবল নেতাদের ভাষণ বা প্রতিশ্রুতির চশমায় দেখছে না; তারা ফলাফল চাইছে। শাসক শ্রেণির আমলাতান্ত্রিক অহংকার এবং বিরোধী দলগুলোর কেবল নির্বাচনী রাজনীতিতে আবদ্ধ থাকার প্রবণতা তরুণদের এমন একটি বিকল্প প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে বাধ্য করেছে, যা কোনো একক রাজনৈতিক আদর্শের গোলাম নয়।
ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন যেভাবে বিস্তার লাভ করেছে, তা আধুনিক যুগের সামাজিক আন্দোলনের এক অভূতপূর্ব মডেল। এটি প্রথাগত রাজনীতির মতো কোনো কেন্দ্রীয় কার্যালয় বা দলীয় কার্যালয় থেকে পরিচালিত হয়নি; বরং এর বিকাশ ঘটেছে অনলাইন স্পেস ও রাজপথের এক নিবিড় সমন্বয়ে।
প্রথম ধাপে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষ করে ইনস্টাগ্রাম, এক্স (টুইটার), রেডিট এবং টেলিগ্রাম চ্যানেলগুলোতে ব্যঙ্গাত্মক মিম, শর্ট ভিডিও এবং রিলসের মাধ্যমে আন্দোলনটি ছড়াতে শুরু করে। ডিজিটাল অ্যাক্টিভিস্টরা রাজনীতিকদের অহংকারী বক্তব্য এবং শিক্ষা ব্যবস্থার অসারতাকে খোঁচা দিয়ে হ্যাশট্যাগ ক্যাম্পেইন শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তরুণদের অনলাইন ক্ষোভ একীভূত হতে থাকে।
দ্বিতীয় ধাপে, ডিজিটাল বিক্ষোভ বাস্তবে রূপ নেয়। দিল্লির যন্তর মন্তরে যখন প্রথম শতাধিক শিক্ষার্থী ককরোচ-মাস্ক এবং ব্যঙ্গাত্মক ফেস্টুন নিয়ে জড়ো হন, তখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর কাড়ে এই বিক্ষোভ। রয়টার্স ও দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানার ছাড়া শত শত তরুণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে আসা ভারতীয় রাজনীতির জন্য এক নতুন দৃশ্যপট।
এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর বিকেন্দ্রীভূত নেতৃত্ব। কোনো নির্দিষ্ট শীর্ষ নেতা, রাজনৈতিক অভিভাবক বা মুখপাত্র এই আন্দোলনকে একচ্ছত্রভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন না। আন্দোলনে কোনো সাধারণ সম্পাদক বা সভাপতি নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সামাজিক কর্মী, স্বাধীন কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীরা স্থানভেদে স্থানীয় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এছাড়া জোটবদ্ধ বিভিন্ন নেটওয়ার্ক বিশেষ করে পরিবেশকর্মী (যেমন সোনাম ওয়াংচুকের আন্দোলন সমর্থকরা), বেকার যুব ফোরাম এবং মুক্তমনা ডিজিটাল অ্যাক্টিভিস্টদের সমন্বয়ে একটি সমন্বয় কমিটি কাজ করছে। আন্দোলন কবে, কোথায়, কী কর্মসূচি পালন করবে তা ওপেন সোর্স পোল এবং এনক্রিপ্টেড গ্রুপ চ্যানেলে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।
নিছক সিস্টেমের সমালোচনাতেই আন্দোলন থেমে থাকেনি, তারা সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট কিছু দাবি উত্থাপন করেছে। সেগুলো হলো:
এনটিএ এবং পরীক্ষা পর্যালোচনায় ব্যর্থতার দায়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং জড়িত শীর্ষ আমলাদের বরখাস্ত করা। প্রশ্নফাঁস ও নিয়োগ দুর্নীতি বন্ধে কঠোর শাস্তিমূলক কেন্দ্রীয় আইন প্রণয়ন এবং প্রতিটি পরীক্ষা একটি নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সম্পন্ন করা। সরকারি ও আধা-সরকারি চাকরির সমস্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া তদারকি করতে স্বতন্ত্র নাগরিক ও বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন। বারবার প্রশ্নফাঁসের কারণে যেসব প্রার্থীর বয়সসীমা পার হয়ে গেছে, তাদের বয়স শিথিলকরণ এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া। প্রশ্নফাঁস ও নিয়োগ দুর্নীতির মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে যেসব প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পরীক্ষার্থী দুর্ভাগ্যজনকভাবে আত্মহত্যা করেছেন, তাদের প্রতিটি পরিবারকে ১ কোটি টাকা করে আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করা। আন্দোলনকারী ও সমর্থনকারী সামাজিক কর্মীদের (যেমন: অনশনরত লাদাখি পরিবেশকর্মী সোনাম ওয়াংচুক) অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি প্রদান করা, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর থেকে সমস্ত মামলা বা পুলিশি এফআইআর প্রত্যাহার করা এবং আন্দোলন দমনে পুলিশি নির্যাতনের বিচার করা।
এ আন্দোলনে সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুক্ত হয়েছে। একটি ছাত্র আন্দোলন কীভাবে গণআন্দোলনে রূপ নিল, তা বুঝতে হলে ভারতের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে। ভারতের প্রতিটি পরিবারে অন্তত একজন বেকার বা চাকরিপ্রার্থী তরুণ রয়েছেন, যার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। মধ্যবিত্ত মা-বাবারা, যারা সারাজীবনের সঞ্চয় ঢেলে দিয়েছেন সন্তানের পড়াশোনায়, তারাও শিক্ষার্থীদের পাশে যন্তর মন্তরে এসে বসেছেন। পাঞ্জাব ও হরিয়ানার বেশ কিছু কৃষক সংগঠন এই আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে দিল্লিতে সংহতি মিছিল পাঠিয়েছে। তাদের বক্তব্য ‘কৃষকের সন্তানরাই পড়াশোনা করে সরকারি চাকরির পরীক্ষা দেয়, আর সেই স্বপ্ন কেনাবেচা হচ্ছে।’
ভারতে গত কয়েক দশক ধরে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার প্রধান হাতিয়ার ছিল ধর্মীয় মেরুকরণ এবং জাতপাতের সমীকরণ। ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক দলগুলো ভোটের সময় ‘হিন্দু-মুসলিম বিভাজন’, ‘মন্দির-মসজিদ বিতর্ক’ কিংবা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ‘ভোটব্যাংক রাজনীতিকে’ মূল এজেন্ডা বানিয়ে এসেছে। প্রথাগত দলগুলোর ধারণা ছিল, এই ধরনের আবেগধর্মী ইস্যু সামনে আনলেই সাধারণ মানুষের বাস্তব জীবনের কষ্টগুলোকে ভুলিয়ে রাখা সম্ভব।
কিন্তু সিজেপি আন্দোলন এই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ব্যাকরণকে পুরোপুরি উল্টে দিয়েছে। ভারতের জেন-জি এবং শিক্ষিত যুবসমাজ রাজপথে নেমে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে রুটি-রুজি, মানসম্মত শিক্ষা, চাকরির নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার দাবি যেকোনো ধর্মীয় বিভাজন বা জাতগত পরিচয়ের চেয়ে অনেক বড়। যে রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মের বা জাতের নামে তরুণদের ব্যবহার করত, তারা দেখেছে কীভাবে হিন্দু, মুসলিম, দলিত বা উচ্চবর্ণের ছাত্ররা হাতে হাত ধরে দিল্লির রাজপথে সরকারি দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে। এটি ভারতের রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব সামাজিক সংহতির জন্ম দিয়েছে।

একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের ভুলত্রুটি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে জনআকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব থাকে বিরোধী দলগুলোর (যেমন: ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি, বা বিভিন্ন রাজ্যভিত্তিক আঞ্চলিক দল)। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বিরোধী দলগুলো তরুণ সমাজের এই চরম ক্ষোভ ও বেকারত্বের সংকটকে কেবল ‘নির্বাচনী প্রচারণার ভাষণ’ হিসেবে ব্যবহার করেছে, কোনো কার্যকর নাগরিক আন্দোলনে রূপ দিতে পারেনি।
তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গিতে, মূলধারার বিরোধী দলগুলোও এক ধরনের নির্বাচনী সুবিধাবাদে আক্রান্ত। তারা পরবর্তী নির্বাচনে কীভাবে দু-চারটি আসন বাড়ানো যায়, সেই লাভ-ক্ষতির অংক কষতেই ব্যস্ত থাকে। বাস্তবে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার বা এনটিএর মতো অদক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য রাজপথে দীর্ঘমেয়াদী বা আপসহীন লড়াই করার মানসিকতা তাদের নেই। যখন কোনো প্রথাগত রাজনৈতিক দল বেকার তরুণদের কান্না ও ক্ষোভকে সংগঠিত করতে পারেনি, তখনই সাধারণ শিক্ষার্থীরা কোনো দলীয় ব্যানার ছাড়াই সিজেপির মতো বিকল্প ও অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে বাধ্য হয়েছে। এটি প্রথাগত বিরোধী রাজনীতির চরম সাংগঠনিক ব্যর্থতারই প্রমাণ। ভারতের সংসদ বা রাজ্য বিধানসভাগুলোতে সাধারণ মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলো আড়ালে পড়ে গিয়ে কেবল রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি ও স্লোগান-সর্বস্ব হয়ে পড়েছে, যা এই নাগরিক আন্দোলন প্রমাণ করে দিয়েছে।
হঠাৎ গড়ে ওঠা এই নাগরিক প্রতিরোধকে মোকাবিলা করতে রাষ্ট্রযন্ত্র ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যায়। প্রাথমিকভাবে সরকার ও শাসকদল আন্দোলনটিকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং ‘সামাজিক মাধ্যমে কিছু বিভ্রান্ত যুবকের সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টা’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু আন্দোলন সারা দেশে ছড়াতে শুরু করলে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে।
দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। কোথাও কোথাও টিয়ার গ্যাস ও ওয়াটার ক্যানন ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করা হয়। কিছু স্পর্শকাতর এলাকা এবং ডিজিটাল গ্রুপগুলোর ওপর সার্ভেইল্যান্স বাড়ানো হয় এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে কিছু সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্ট বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
অবশ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে (যেমন বিবিসি, রয়টার্স) সরকারের দমনপীড়নের খবর প্রকাশের পর, প্রশাসনিক নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। সরকার কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাকে (সিবিআই) প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারির তদন্ত দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেয় এবং পরীক্ষা সংস্কারে উপদেষ্টা কমিটি গঠনের ঘোষণা দেয়।
ককরোজ জনতা পার্টির আন্দোলন ভারতীয় রাজনীতিকে যে মৌলিক বার্তাগুলো দিচ্ছে, তা কেবল কোনো সাময়িক রাজনৈতিক আলোড়ন নয়; বরং এগুলো ভারতের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের রূপরেখা নির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদী ভূমিকা রাখবে। ভারতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ‘পরিবারতন্ত্র’ এবং ‘ধর্মীয়-জাতপাত নির্ভর মেরুকরণ’কে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে এই আন্দোলন। তরুণরা বার্তা দিচ্ছে তারা কাকে ভোট দেবে তা নির্ভর করবে সরকারের শিক্ষানীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক পারফরম্যান্সের ওপর। সুতরাং এই আন্দোলন ভারতের প্রথাগত রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে পারফরম্যান্স-বেসড রাজনীতির জন্ম দিতে পারে।
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মকে কীভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ার, অর্থ সংগ্রহ, আন্দোলন পরিচালনা এবং বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরির প্ল্যাটফর্ম হিসেবে রূপ দেওয়া যায়, সিজেপি তার উদাহরণ তৈরি করেছে। এটি আগামী দিনের ভারতীয় রাজনীতিতে রাজনৈতিক প্রচারাভিযানের ধারাকেই বদলে দেবে এবং ডিজিটাল-ফার্স্ট প্রটেস্টের নতুন মডেল হিসেবে আবির্ভূত হবে।
শাসক দল বিজেপি কিংবা প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস উভয়কেই এখন তরুণ ভোটারদের সন্তুষ্ট করতে নিজেদের ইশতেহারে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা যুক্ত করতে হবে। সিজেপি আন্দোলনের চাপেই ইতিমধ্যেই ভারতের একাধিক রাজ্য ও কেন্দ্রীয় স্তরে প্রশ্নফাঁস বিরোধী আইন পাস করার এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার তৎপরতা দৃশ্যমান হচ্ছে যা মূলধারার দলগুলোর নীতিগত পরিবর্তন তরান্বিত করবে।
ককরোচ জনতা পার্টি কালক্রমে কোনো পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে, নাকি একটি শক্তিশালী প্রেশার গ্রুপ হিসেবে কাজ করবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, তারা ভারতের মূলধারার দলগুলোর ওপর একটি সার্বক্ষণিক নাগরিক তদারকি সংস্থাসুলভ মনস্তাত্ত্বিক ভয় তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
ভারতের মূলধারার রাজনীতিকদের জন্য এই আন্দোলন একটি পরিষ্কার সতর্কবার্তা। যদি ভারতীয় গণতন্ত্র সময়মতো তরুণদের মৌলিক অধিকার, কর্মসংস্থান ও আত্মমর্যাদাকে স্বীকার না করে, তবে আগামী দিনে প্রথাগত রাজনীতিকে কেবল ককরোচ আন্দোলন নয়, আরও অনেক বেশি আনকনভেনশনাল বা অপ্রথাগত নাগরিক শক্তির মুখোমুখি হতে হবে। ভারতীয় রাজনীতির আকাশে এই ‘ককরোচ বিপ্লব’ তাই কোনো শেষ নয়, বরং এক নতুন রাজনৈতিক ভোরের সূচনা মাত্র।
লেখক: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক
.png)

ভারত সরকারকে জবাবদিহি করতে হবে এবং শিক্ষার সংস্কার করতে হবে। নরেন্দ্র মোদি সরকার তাদের এই সাহসিকতার জবাব দিয়েছে কাপুরুষতা ও নির্বিচার নিষ্ঠুরতা দিয়ে। সরকার এই শিক্ষার্থীদের দেশের ভবিষ্যতের উত্তরাধিকারী হিসেবে দেখেনি, দেখেছে রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে।
১ ঘণ্টা আগে
নেতৃত্বকে জানতে হবে কীভাবে কাজ আদায় করে নিতে হয়। গৃহকর্ত্রীকে যেমন জানতে হয় গৃহকর্মীর কাছ থেকে কীভাবে কাজ আদায় করতে হবে, ঠিক তেমনি সরকারের নীতিনির্ধারকদেরও জানতে হবে আমলাদের দিয়ে কীভাবে নীতি বাস্তবায়ন করতে হয়। সরকারে যদি দলীয়, অযোগ্য বা অপদার্থ লোক বসানো হয়, তারা কোনো ইতিবাচক অবদান রাখতে পারবে না।
৬ ঘণ্টা আগে
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি পাঁচজনের প্রায় দু’জন স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে অক্ষম। সংখ্যায় বললে, প্রায় ৬ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ। এটা ছোট পরিসংখ্যান নয়; একটি জাতির ভবিষ্যতের প্রশ্ন। দক্ষিণ এশিয়ায় কেবল পাকিস্তান আমাদের চেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে।
১৮ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্প্রতি একটি প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে—কোনো সংসদ সদস্য গুরুতর নৈতিক স্খলনের অভিযোগে নিজ রাজনৈতিক দল থেকে বহিষ্কৃত হলে কি তাঁর সংসদ সদস্যপদও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে?
১ দিন আগে