নুরুল হুদা সাকিব

বাংলাদেশে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং জবাবদিহির সংকট বহুদিনের বাস্তবতা। স্বাধীনতার পর থেকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর সামাজিক প্রতিরোধ এখনও দুর্বল। এই বাস্তবতায় ‘হুইসেলব্লোয়িং’ বা জনস্বার্থে অন্যায়-অনিয়ম প্রকাশের সংস্কৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক হাতিয়ার হতে পারে।
বিশ্বের অনেক দেশে হুইসেলব্লোয়াররা দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং প্রশাসনিক অপব্যবহারের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু বাংলাদেশে হুইসেলব্লোয়িং এখনও একটি অচর্চিত ও ভীতিকর বিষয়।
বাংলাদেশ সরকার ২০১১ সালে ‘জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা প্রদান) আইন’ প্রণয়ন করে, যা সাধারণভাবে হুইসেল ব্লোয়ার প্রোটেকশন অ্যাক্ট নামে পরিচিত। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশকারীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া এবং নাগরিকদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে উৎসাহিত করা। কিন্তু আইন প্রণয়নের এক দশকেরও বেশি সময় পার হলেও এর কার্যকারিতা অত্যন্ত সীমিত। অধিকাংশ মানুষ এখনো জানেন না, বাংলাদেশে এমন একটি আইন রয়েছে। ফলে আইনটি কাগজে থাকলেও বাস্তবে একটি শক্তিশালী নাগরিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারেনি।
সম্প্রতি বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরিচালিত কর্মশালা ও গবেষণায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ শিক্ষার্থী কর্মশালার আগে ‘হুইসেলব্লোয়িং’ সম্পর্কে কোনো ধারণাই রাখতেন না। কিন্তু সচেতনতা বৃদ্ধির পর তারা বুঝতে পারেন যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি নাগরিক জবাবদিহিতার অংশ। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে হুইসেলব্লোয়িং সংস্কৃতি গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে, তবে তার জন্য প্রয়োজন আইনি সংস্কার, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করা।
বাংলাদেশের বিদ্যমান হুইসেলব্লোয়িং আইনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এর সীমিত প্রয়োগ ও অস্পষ্টতা। আইনটি তাত্ত্বিকভাবে হুইসেলব্লোয়ারকে সুরক্ষা দেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে কীভাবে সেই সুরক্ষা নিশ্চিত হবে, তা স্পষ্ট নয়। একজন ব্যক্তি যদি সরকারি কোনো অনিয়ম প্রকাশ করেন এবং পরে চাকরি হারান, হয়রানির শিকার হন বা রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েন, তাহলে তার জন্য কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থার নিশ্চয়তা আইনে যথেষ্টভাবে উল্লেখ নেই। ফলে মানুষ আইনটির ওপর আস্থা রাখতে পারেন না।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো আইনটির সঙ্গে অন্যান্য আইনের সাংঘর্ষিক সম্পর্ক। বাংলাদেশে অফিশিয়াল সিকরেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩ কিংবা ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট-এর মতো কিছু আইন অনেক সময় তথ্য প্রকাশকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। ফলে একজন নাগরিক বা সরকারি কর্মকর্তা যদি কোনো দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করতে চান, তাহলে তিনি দ্বিধায় পড়ে যান—তিনি কি জনস্বার্থ রক্ষা করছেন, নাকি আইন ভঙ্গ করছেন? এই আইনি দ্বৈততা হুইসেলব্লোয়িং সংস্কৃতিকে দুর্বল করে।
আইনের আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো সচেতনতার অভাব। সাধারণ মানুষ তো বটেই, এমনকি অনেক সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর মধ্যেও এই আইন সম্পর্কে ধারণা খুবই সীমিত। গবেষণায় অংশ নেওয়া অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক পর্যন্ত বলেছেন যে তারা আগে হুইসেলব্লোয়িং ধারণাটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতেন না। আইন যদি জনগণের কাছে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে তার সামাজিক প্রভাবও তৈরি হয় না।
বাংলাদেশে হুইসেলব্লোয়িং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভয় একটি বড় বাধা। অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বললে সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা পেশাগত ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। অনেক সময় মানুষ মনে করেন যে সত্য প্রকাশ করলে তারা একা হয়ে যাবেন। দুর্নীতিবাজ গোষ্ঠীগুলো সাধারণত সংগঠিত ও ক্ষমতাবান হয়, কিন্তু একজন হুইসেলব্লোয়ার প্রায়শই বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকেন। ফলে নৈতিক সাহস থাকা সত্ত্বেও অনেকে নীরব থাকেন।
রাজনৈতিক সংস্কৃতিও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। বাংলাদেশে দলীয় আনুগত্যকে অনেক সময় নৈতিকতার চেয়েও বড় হিসেবে দেখা হয়। ফলে নিজের দল, প্রতিষ্ঠান বা পরিচিত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কথা বলা “বিশ্বাসঘাতকতা” হিসেবে বিবেচিত হয়। কিছু শিক্ষার্থী এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন যেখানে রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্যদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে চুপ থাকতে বলা হয়।
আবার কখনো প্রতিপক্ষকে হেয় করতে “ভুয়া অভিযোগ” ব্যবহার করা হয়। এতে হুইসেলব্লোয়িংয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাও এই সমস্যাকে জটিল করে তুলেছে। দক্ষিণ এশীয় সমাজে পরিবার, সম্পর্ক ও গোষ্ঠীগত আনুগত্যকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে নিজের পরিচিত মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে না। অনেকেই মনে করেন, ‘নিজেদের বিষয় বাইরে বলা উচিত নয়।’ এই মানসিকতা দুর্নীতিকে আড়াল করে এবং জবাবদিহি দুর্বল করে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা ও অনলাইন নজরদারির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দুর্নীতি প্রকাশের একটি বড় প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু অনেকে আশঙ্কা করেন যে অনলাইনে কোনো তথ্য প্রকাশ করলে আইনি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফলে মানুষ আত্মনিয়ন্ত্রণে চলে যায়। অথচ ডিজিটাল যুগে “ভার্চুয়াল হুইসেলব্লোয়িং” হতে পারে দুর্নীতি প্রতিরোধের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো যুবসমাজ। তরুণরা তুলনামূলকভাবে বেশি সচেতন, প্রযুক্তিবান্ধব এবং সামাজিক পরিবর্তনে আগ্রহী। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক কর্মশালাগুলোতে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে আগ্রহী, যদি তারা নিরাপত্তা ও সামাজিক সমর্থন পায়।
অনেক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন যে কর্মশালার পর তারা নিজেদের ক্যাম্পাস বা সমাজের অনিয়ম নিয়ে আরও সচেতন হয়েছেন। যুবসমাজ এই আইন থেকে বিভিন্নভাবে উপকৃত হতে পারে। প্রথমত, এটি তাদের নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে। হুইসেলব্লোয়িং কেবল দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; এটি গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের অংশ। একজন তরুণ যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, তখন তিনি শুধু নিজের নয়, পুরো সমাজের স্বার্থ রক্ষা করেন।
দ্বিতীয়ত, এই আইন তরুণদের নেতৃত্ব ও নৈতিক সাহস গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। শিক্ষার্থীরা যদি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নৈতিকতার চর্চা করেন, তাহলে ভবিষ্যতে তারা প্রশাসন, রাজনীতি, ব্যবসা কিংবা উন্নয়ন খাতে দায়িত্বশীল নেতৃত্ব দিতে পারবেন। দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের জন্য এমন প্রজন্ম অত্যন্ত প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, হুইসেলব্লোয়িং তরুণদের ডিজিটাল নাগরিকত্বের ধারণাকে শক্তিশালী করতে পারে। বর্তমানে তরুণরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নানা সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলছে। যদি তারা দায়িত্বশীলভাবে তথ্য যাচাই করে জনস্বার্থে ব্যবহার করতে শেখে, তাহলে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার বড় মাধ্যম হতে পারে। চতুর্থত, নারীদের জন্যও এই আইন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া কয়েকজন নারী শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তারা হয়রানি বা অনৈতিক আচরণের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পেয়েছেন। কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা গণপরিবহনে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থার সংস্কৃতি নারীদের ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করতে হলে কিছু বাস্তবধর্মী উদ্যোগ প্রয়োজন—
প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে হুইসেলব্লোয়িং, নাগরিক অধিকার ও নৈতিকতা বিষয়ে কর্মশালা ও কোর্স চালু করা উচিত।
দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যমে ইতিবাচক প্রচারণা বাড়াতে হবে যাতে হুইসেলব্লোয়ারদের “সমস্যা সৃষ্টিকারী” নয় বরং “পরিবর্তনের প্রতিনিধি” হিসেবে দেখা হয়।
তৃতীয়ত, আইনি সহায়তা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে, যাতে মানুষ বাস্তবে সুরক্ষা অনুভব করেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই কেবল আইন দিয়ে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ যেখানে সত্য বলা অপরাধ নয়। যদি রাষ্ট্র, গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজ একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে হুইসেলব্লোয়িং বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী সামাজিক সংস্কৃতি হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ আজ উন্নয়ন, স্মার্ট রাষ্ট্র ও ডিজিটাল রূপান্তরের কথা বলছে। কিন্তু জবাবদিহি ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না। একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে এমন নাগরিক প্রয়োজন যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকবে না। সেই দায়িত্ব পালনে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মই হতে পারে সবচেয়ে বড় শক্তি। হয়তো আগামী দিনের বাংলাদেশে হুইসেলব্লোয়িং শুধু একটি আইন থাকবে না; বরং এটি হয়ে উঠবে নাগরিক সাহস, নৈতিকতা এবং গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতীক।
লেখক: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক

বাংলাদেশে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং জবাবদিহির সংকট বহুদিনের বাস্তবতা। স্বাধীনতার পর থেকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর সামাজিক প্রতিরোধ এখনও দুর্বল। এই বাস্তবতায় ‘হুইসেলব্লোয়িং’ বা জনস্বার্থে অন্যায়-অনিয়ম প্রকাশের সংস্কৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক হাতিয়ার হতে পারে।
বিশ্বের অনেক দেশে হুইসেলব্লোয়াররা দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং প্রশাসনিক অপব্যবহারের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু বাংলাদেশে হুইসেলব্লোয়িং এখনও একটি অচর্চিত ও ভীতিকর বিষয়।
বাংলাদেশ সরকার ২০১১ সালে ‘জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা প্রদান) আইন’ প্রণয়ন করে, যা সাধারণভাবে হুইসেল ব্লোয়ার প্রোটেকশন অ্যাক্ট নামে পরিচিত। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশকারীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া এবং নাগরিকদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে উৎসাহিত করা। কিন্তু আইন প্রণয়নের এক দশকেরও বেশি সময় পার হলেও এর কার্যকারিতা অত্যন্ত সীমিত। অধিকাংশ মানুষ এখনো জানেন না, বাংলাদেশে এমন একটি আইন রয়েছে। ফলে আইনটি কাগজে থাকলেও বাস্তবে একটি শক্তিশালী নাগরিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারেনি।
সম্প্রতি বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরিচালিত কর্মশালা ও গবেষণায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ শিক্ষার্থী কর্মশালার আগে ‘হুইসেলব্লোয়িং’ সম্পর্কে কোনো ধারণাই রাখতেন না। কিন্তু সচেতনতা বৃদ্ধির পর তারা বুঝতে পারেন যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি নাগরিক জবাবদিহিতার অংশ। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে হুইসেলব্লোয়িং সংস্কৃতি গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে, তবে তার জন্য প্রয়োজন আইনি সংস্কার, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করা।
বাংলাদেশের বিদ্যমান হুইসেলব্লোয়িং আইনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এর সীমিত প্রয়োগ ও অস্পষ্টতা। আইনটি তাত্ত্বিকভাবে হুইসেলব্লোয়ারকে সুরক্ষা দেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে কীভাবে সেই সুরক্ষা নিশ্চিত হবে, তা স্পষ্ট নয়। একজন ব্যক্তি যদি সরকারি কোনো অনিয়ম প্রকাশ করেন এবং পরে চাকরি হারান, হয়রানির শিকার হন বা রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েন, তাহলে তার জন্য কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থার নিশ্চয়তা আইনে যথেষ্টভাবে উল্লেখ নেই। ফলে মানুষ আইনটির ওপর আস্থা রাখতে পারেন না।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো আইনটির সঙ্গে অন্যান্য আইনের সাংঘর্ষিক সম্পর্ক। বাংলাদেশে অফিশিয়াল সিকরেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩ কিংবা ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট-এর মতো কিছু আইন অনেক সময় তথ্য প্রকাশকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। ফলে একজন নাগরিক বা সরকারি কর্মকর্তা যদি কোনো দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করতে চান, তাহলে তিনি দ্বিধায় পড়ে যান—তিনি কি জনস্বার্থ রক্ষা করছেন, নাকি আইন ভঙ্গ করছেন? এই আইনি দ্বৈততা হুইসেলব্লোয়িং সংস্কৃতিকে দুর্বল করে।
আইনের আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো সচেতনতার অভাব। সাধারণ মানুষ তো বটেই, এমনকি অনেক সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর মধ্যেও এই আইন সম্পর্কে ধারণা খুবই সীমিত। গবেষণায় অংশ নেওয়া অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক পর্যন্ত বলেছেন যে তারা আগে হুইসেলব্লোয়িং ধারণাটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতেন না। আইন যদি জনগণের কাছে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে তার সামাজিক প্রভাবও তৈরি হয় না।
বাংলাদেশে হুইসেলব্লোয়িং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভয় একটি বড় বাধা। অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বললে সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা পেশাগত ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। অনেক সময় মানুষ মনে করেন যে সত্য প্রকাশ করলে তারা একা হয়ে যাবেন। দুর্নীতিবাজ গোষ্ঠীগুলো সাধারণত সংগঠিত ও ক্ষমতাবান হয়, কিন্তু একজন হুইসেলব্লোয়ার প্রায়শই বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকেন। ফলে নৈতিক সাহস থাকা সত্ত্বেও অনেকে নীরব থাকেন।
রাজনৈতিক সংস্কৃতিও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। বাংলাদেশে দলীয় আনুগত্যকে অনেক সময় নৈতিকতার চেয়েও বড় হিসেবে দেখা হয়। ফলে নিজের দল, প্রতিষ্ঠান বা পরিচিত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কথা বলা “বিশ্বাসঘাতকতা” হিসেবে বিবেচিত হয়। কিছু শিক্ষার্থী এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন যেখানে রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্যদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে চুপ থাকতে বলা হয়।
আবার কখনো প্রতিপক্ষকে হেয় করতে “ভুয়া অভিযোগ” ব্যবহার করা হয়। এতে হুইসেলব্লোয়িংয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাও এই সমস্যাকে জটিল করে তুলেছে। দক্ষিণ এশীয় সমাজে পরিবার, সম্পর্ক ও গোষ্ঠীগত আনুগত্যকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে নিজের পরিচিত মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে না। অনেকেই মনে করেন, ‘নিজেদের বিষয় বাইরে বলা উচিত নয়।’ এই মানসিকতা দুর্নীতিকে আড়াল করে এবং জবাবদিহি দুর্বল করে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা ও অনলাইন নজরদারির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দুর্নীতি প্রকাশের একটি বড় প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু অনেকে আশঙ্কা করেন যে অনলাইনে কোনো তথ্য প্রকাশ করলে আইনি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফলে মানুষ আত্মনিয়ন্ত্রণে চলে যায়। অথচ ডিজিটাল যুগে “ভার্চুয়াল হুইসেলব্লোয়িং” হতে পারে দুর্নীতি প্রতিরোধের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো যুবসমাজ। তরুণরা তুলনামূলকভাবে বেশি সচেতন, প্রযুক্তিবান্ধব এবং সামাজিক পরিবর্তনে আগ্রহী। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক কর্মশালাগুলোতে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে আগ্রহী, যদি তারা নিরাপত্তা ও সামাজিক সমর্থন পায়।
অনেক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন যে কর্মশালার পর তারা নিজেদের ক্যাম্পাস বা সমাজের অনিয়ম নিয়ে আরও সচেতন হয়েছেন। যুবসমাজ এই আইন থেকে বিভিন্নভাবে উপকৃত হতে পারে। প্রথমত, এটি তাদের নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে। হুইসেলব্লোয়িং কেবল দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; এটি গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের অংশ। একজন তরুণ যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, তখন তিনি শুধু নিজের নয়, পুরো সমাজের স্বার্থ রক্ষা করেন।
দ্বিতীয়ত, এই আইন তরুণদের নেতৃত্ব ও নৈতিক সাহস গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। শিক্ষার্থীরা যদি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নৈতিকতার চর্চা করেন, তাহলে ভবিষ্যতে তারা প্রশাসন, রাজনীতি, ব্যবসা কিংবা উন্নয়ন খাতে দায়িত্বশীল নেতৃত্ব দিতে পারবেন। দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের জন্য এমন প্রজন্ম অত্যন্ত প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, হুইসেলব্লোয়িং তরুণদের ডিজিটাল নাগরিকত্বের ধারণাকে শক্তিশালী করতে পারে। বর্তমানে তরুণরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নানা সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলছে। যদি তারা দায়িত্বশীলভাবে তথ্য যাচাই করে জনস্বার্থে ব্যবহার করতে শেখে, তাহলে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার বড় মাধ্যম হতে পারে। চতুর্থত, নারীদের জন্যও এই আইন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া কয়েকজন নারী শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তারা হয়রানি বা অনৈতিক আচরণের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পেয়েছেন। কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা গণপরিবহনে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থার সংস্কৃতি নারীদের ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করতে হলে কিছু বাস্তবধর্মী উদ্যোগ প্রয়োজন—
প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে হুইসেলব্লোয়িং, নাগরিক অধিকার ও নৈতিকতা বিষয়ে কর্মশালা ও কোর্স চালু করা উচিত।
দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যমে ইতিবাচক প্রচারণা বাড়াতে হবে যাতে হুইসেলব্লোয়ারদের “সমস্যা সৃষ্টিকারী” নয় বরং “পরিবর্তনের প্রতিনিধি” হিসেবে দেখা হয়।
তৃতীয়ত, আইনি সহায়তা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে, যাতে মানুষ বাস্তবে সুরক্ষা অনুভব করেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই কেবল আইন দিয়ে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ যেখানে সত্য বলা অপরাধ নয়। যদি রাষ্ট্র, গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজ একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে হুইসেলব্লোয়িং বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী সামাজিক সংস্কৃতি হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ আজ উন্নয়ন, স্মার্ট রাষ্ট্র ও ডিজিটাল রূপান্তরের কথা বলছে। কিন্তু জবাবদিহি ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না। একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে এমন নাগরিক প্রয়োজন যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকবে না। সেই দায়িত্ব পালনে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মই হতে পারে সবচেয়ে বড় শক্তি। হয়তো আগামী দিনের বাংলাদেশে হুইসেলব্লোয়িং শুধু একটি আইন থাকবে না; বরং এটি হয়ে উঠবে নাগরিক সাহস, নৈতিকতা এবং গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতীক।
লেখক: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক
.png)

টানা চার বছর বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর দেশ থাকার পর ২০২৩ সালেও ৭৭ দশমিক ৯ মাইক্রোগ্রাম ঘনমাত্রা নিয়ে দূষণের শীর্ষেই ছিল বাংলাদেশ। তবে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রশাসনিক রদবদল, অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদ ও কঠোর নীতি প্রয়োগের পর সেই দূষণমাত্রা কমে ৬৬ দশমিক ১ মাইক্রোগ্রামে নেমে এসেছে।
৭ মিনিট আগেএকটি এলএনজি টার্মিনাল অকেজো হয়ে পড়ার পর তা মেরামতে যে সময় লাগছে, সেটা যন্ত্রণাদায়ক। মাত্র দুটি টার্মিনালের একটি বিকল হয়ে পড়লে কী পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, সেটা কারও অজানা নয়। এমনিতেও পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছিল না দীর্ঘদিন ধরে।
১১ মিনিট আগে
বাংলাদেশের কূটনীতিতে কিছু বিবৃতি ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। কারণ সেগুলো কেবল একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়; রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নীতির ঘোষণা। গত ৫ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিবৃতিটি সেই ধরনের একটি দলিল। এটি দৈনন্দিন প্রেস রিলিজ নয়।
৬ ঘণ্টা আগে
মেট্রোরেল তার আধুনিক অবকাঠামো, সিসিটিভি নজরদারি এবং ইলেকট্রনিক টিকিটিং ব্যবস্থার কারণে শুরুতে একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ গণপরিবহন হিসেবে গণ্য হলেও, সাম্প্রতিক কিছু অনভিপ্রেত ঘটনা এই নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
৭ ঘণ্টা আগে