কে এম মহিউদ্দিন

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্থানীয় সরকার জনগণের সবচেয়ে নিকটবর্তী শাসন প্রতিষ্ঠান এবং অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ সরাসরি তাদের প্রতিনিধিদের নির্বাচন করে স্থানীয় উন্নয়ন, জনসেবা, জবাবদিহিতা ও অংশগ্রহণমূলক শাসন নিশ্চিত করার সুযোগ পায়। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেবল জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি স্থানীয় গণতন্ত্র, সুশাসন, বিকেন্দ্রীকরণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের অন্যতম কার্যকর উপায়।
বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ঐতিহাসিক ভিত্তি ঔপনিবেশিক আমলে গড়ে উঠলেও স্বাধীনতার পর সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ এবং পার্বত্য অঞ্চলের বিশেষ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের জন্য পৃথক আইনের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এসব নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ৭ জুলাই মঙ্গলবার সচিবালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে বলেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ধাপে ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু করার লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশন কাজ করে যাচ্ছে। একই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সচিবালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশন আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে তফসিল ঘোষণা করে অক্টোবরের প্রথমার্ধে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা নিয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে পর্যায়ক্রমে পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন ভোটগ্রহণের কমপক্ষে ২৫ দিন আগে ভোটকেন্দ্রের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, স্থানীয় সরকারের অধিকাংশ স্তরে বর্তমানে নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকলেও সীমানা পুনর্নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিমালার সংশোধন, নির্বাচনী আচরণবিধি চূড়ান্তকরণ এবং সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পারস্পরিক সমন্বয়ের ওপরই নির্বাচনের চূড়ান্ত সময়সূচি নির্ভর করবে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন নির্বাচন কমিশন ও সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংবিধানের ১১৯(১) অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যে নির্বাচন কমিশন- রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং আইন অনুযায়ী নির্ধারিত অন্যান্য নির্বাচন পরিচালনা করবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সরাসরি সংবিধানে আলাদাভাবে উল্লেখ নেই; স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো সংশ্লিষ্ট স্বায়ত্তশাসিত আইনের (যেমন- ইউনিয়ন পরিষদ আইন, ২০০৯ ও পৌরসভা আইন, ২০০৯) অধীনে পরিচালিত হয়। এসব আইন অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন।
যদিও নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, তবুও বাস্তবে এর কার্যকর স্বাধীনতা অনেকাংশে নির্বাহী বিভাগের সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদে নির্বাহী বিভাগকে নির্বাচন কমিশনকে সহায়তার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশেও (আরপিও) একই ধরনের বিধান রয়েছে। কিন্তু ‘সহায়তা’ বলতে কী বোঝায়, সহযোগিতা না করলে তার পরিণতি কী হবে কিংবা কমিশনের নির্দেশ অমান্য করলে কী ধরনের জবাবদিহিতা থাকবে-এসব বিষয়ে সংবিধান ও আইনে স্পষ্টতা নেই। ফলে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক মর্যাদা ও কার্যকর সক্ষমতার মধ্যে একটি বাস্তব ব্যবধান থেকে গেছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব মাঠ প্রশাসন নেই। নির্বাচন পরিচালনার জন্য তাকে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ এবং অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয়। অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বদলি, রাজনৈতিক বিবেচনায় পদায়ন, পক্ষপাতমূলক আচরণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। স্থানীয় পর্যায়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সামাজিক ও পারিবারিক বিভাজন, অর্থের প্রভাব এবং স্থানীয় স্বার্থের সংঘাত নির্বাচনকে অধিক সংবেদনশীল করে তোলে। তাই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি সরকারেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, নির্বাচনী সহিংসতা প্রতিরোধ, অর্থের অপব্যবহার রোধ এবং সকল প্রার্থীর জন্য সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি ছাড়া একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়।
এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের বিধান বাতিলের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থীরা দলীয় প্রতীকের পরিবর্তে স্বতন্ত্র পরিচয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
২০১৫ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক চালুর পর স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক মেরূকরণ, সংঘাত এবং দলীয় প্রভাব বৃদ্ধির যে সমালোচনা তৈরি হয়েছিল, এই সিদ্ধান্তকে তারই একটি প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা যায়। তবে দলীয় প্রতীক বাতিল করলেই নির্বাচন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দলীয় হয়ে যাবে এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক দলগুলো আনুষ্ঠানিক প্রতীক ব্যবহার না করেও অনানুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে পারে। ফলে নির্বাচনের প্রকৃত নিরপেক্ষতা নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর সংযম, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন কমিশনের কার্যকর স্বাধীনতা এবং নির্বাচনী আইন ও আচরণবিধির কঠোর প্রয়োগের ওপর।
দলীয় প্রতীক বাতিলের সিদ্ধান্ত নির্বাচন ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনলেও এর সফলতা অনেকাংশে রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণের ওপর নির্ভর করবে। প্রতীক না থাকলেও দলগুলো যদি অনানুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালায়, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে বা স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে উসকে দেয়, তাহলে নির্বাচন কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দলীয় থাকবে; বাস্তবে দলীয় প্রতিযোগিতা ও মেরূকরণ বহাল থাকবে।
তাই এই নির্বাচন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও একটি সংযমের পরীক্ষা। তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সত্যিকার অর্থে স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচনের প্রতিযোগিতা হিসেবে গ্রহণ করে কি না, নাকি দলীয় প্রভাব ও আধিপত্য বজায় রাখার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করে তার ওপরই নতুন ব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেবল নির্বাচন কমিশনের জন্য নয়, সরকারের জন্যও একটি বড় পরীক্ষা। এই নির্বাচনের সফলতা নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলো আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে কতটা সংযম প্রদর্শন করে এবং প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতটা পেশাদার ও নিরপেক্ষ আচরণ করে তার ওপর। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনকে নিশ্চিত করতে হবে যে, কোনো দল বা প্রার্থী যেন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে অন্যায্য সুবিধা অর্জন করতে না পারে।
সব মিলিয়ে একটি সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নির্ভর করছে নির্বাচন কমিশন কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে তার ওপর।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্থানীয় সরকার জনগণের সবচেয়ে নিকটবর্তী শাসন প্রতিষ্ঠান এবং অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ সরাসরি তাদের প্রতিনিধিদের নির্বাচন করে স্থানীয় উন্নয়ন, জনসেবা, জবাবদিহিতা ও অংশগ্রহণমূলক শাসন নিশ্চিত করার সুযোগ পায়। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেবল জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি স্থানীয় গণতন্ত্র, সুশাসন, বিকেন্দ্রীকরণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের অন্যতম কার্যকর উপায়।
বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ঐতিহাসিক ভিত্তি ঔপনিবেশিক আমলে গড়ে উঠলেও স্বাধীনতার পর সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ এবং পার্বত্য অঞ্চলের বিশেষ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের জন্য পৃথক আইনের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এসব নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ৭ জুলাই মঙ্গলবার সচিবালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে বলেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ধাপে ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু করার লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশন কাজ করে যাচ্ছে। একই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সচিবালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশন আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে তফসিল ঘোষণা করে অক্টোবরের প্রথমার্ধে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা নিয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে পর্যায়ক্রমে পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন ভোটগ্রহণের কমপক্ষে ২৫ দিন আগে ভোটকেন্দ্রের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, স্থানীয় সরকারের অধিকাংশ স্তরে বর্তমানে নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকলেও সীমানা পুনর্নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিমালার সংশোধন, নির্বাচনী আচরণবিধি চূড়ান্তকরণ এবং সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পারস্পরিক সমন্বয়ের ওপরই নির্বাচনের চূড়ান্ত সময়সূচি নির্ভর করবে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন নির্বাচন কমিশন ও সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংবিধানের ১১৯(১) অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যে নির্বাচন কমিশন- রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং আইন অনুযায়ী নির্ধারিত অন্যান্য নির্বাচন পরিচালনা করবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সরাসরি সংবিধানে আলাদাভাবে উল্লেখ নেই; স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো সংশ্লিষ্ট স্বায়ত্তশাসিত আইনের (যেমন- ইউনিয়ন পরিষদ আইন, ২০০৯ ও পৌরসভা আইন, ২০০৯) অধীনে পরিচালিত হয়। এসব আইন অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন।
যদিও নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, তবুও বাস্তবে এর কার্যকর স্বাধীনতা অনেকাংশে নির্বাহী বিভাগের সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদে নির্বাহী বিভাগকে নির্বাচন কমিশনকে সহায়তার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশেও (আরপিও) একই ধরনের বিধান রয়েছে। কিন্তু ‘সহায়তা’ বলতে কী বোঝায়, সহযোগিতা না করলে তার পরিণতি কী হবে কিংবা কমিশনের নির্দেশ অমান্য করলে কী ধরনের জবাবদিহিতা থাকবে-এসব বিষয়ে সংবিধান ও আইনে স্পষ্টতা নেই। ফলে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক মর্যাদা ও কার্যকর সক্ষমতার মধ্যে একটি বাস্তব ব্যবধান থেকে গেছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব মাঠ প্রশাসন নেই। নির্বাচন পরিচালনার জন্য তাকে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ এবং অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয়। অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বদলি, রাজনৈতিক বিবেচনায় পদায়ন, পক্ষপাতমূলক আচরণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। স্থানীয় পর্যায়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সামাজিক ও পারিবারিক বিভাজন, অর্থের প্রভাব এবং স্থানীয় স্বার্থের সংঘাত নির্বাচনকে অধিক সংবেদনশীল করে তোলে। তাই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি সরকারেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, নির্বাচনী সহিংসতা প্রতিরোধ, অর্থের অপব্যবহার রোধ এবং সকল প্রার্থীর জন্য সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি ছাড়া একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়।
এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের বিধান বাতিলের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থীরা দলীয় প্রতীকের পরিবর্তে স্বতন্ত্র পরিচয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
২০১৫ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক চালুর পর স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক মেরূকরণ, সংঘাত এবং দলীয় প্রভাব বৃদ্ধির যে সমালোচনা তৈরি হয়েছিল, এই সিদ্ধান্তকে তারই একটি প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা যায়। তবে দলীয় প্রতীক বাতিল করলেই নির্বাচন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দলীয় হয়ে যাবে এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক দলগুলো আনুষ্ঠানিক প্রতীক ব্যবহার না করেও অনানুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে পারে। ফলে নির্বাচনের প্রকৃত নিরপেক্ষতা নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর সংযম, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন কমিশনের কার্যকর স্বাধীনতা এবং নির্বাচনী আইন ও আচরণবিধির কঠোর প্রয়োগের ওপর।
দলীয় প্রতীক বাতিলের সিদ্ধান্ত নির্বাচন ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনলেও এর সফলতা অনেকাংশে রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণের ওপর নির্ভর করবে। প্রতীক না থাকলেও দলগুলো যদি অনানুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালায়, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে বা স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে উসকে দেয়, তাহলে নির্বাচন কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দলীয় থাকবে; বাস্তবে দলীয় প্রতিযোগিতা ও মেরূকরণ বহাল থাকবে।
তাই এই নির্বাচন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও একটি সংযমের পরীক্ষা। তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সত্যিকার অর্থে স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচনের প্রতিযোগিতা হিসেবে গ্রহণ করে কি না, নাকি দলীয় প্রভাব ও আধিপত্য বজায় রাখার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করে তার ওপরই নতুন ব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেবল নির্বাচন কমিশনের জন্য নয়, সরকারের জন্যও একটি বড় পরীক্ষা। এই নির্বাচনের সফলতা নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলো আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে কতটা সংযম প্রদর্শন করে এবং প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতটা পেশাদার ও নিরপেক্ষ আচরণ করে তার ওপর। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনকে নিশ্চিত করতে হবে যে, কোনো দল বা প্রার্থী যেন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে অন্যায্য সুবিধা অর্জন করতে না পারে।
সব মিলিয়ে একটি সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নির্ভর করছে নির্বাচন কমিশন কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে তার ওপর।
.png)

বিএনপি সরকারের পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হওয়ার মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এবং তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র আন্তরিকতা ও সাফল্যের সঙ্গে সরকারের দায়িত্ব পালনের যে বিবরণ দিয়েছেন, সে বিষয়ে কেউ শতভাগ একমত কিংবা ভিন্নমত হবেন না।
৯ ঘণ্টা আগে
গত ২০ বছরে পাহাড় ধসে মৃতের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়েছে। সাম্প্রতিককালে, কেবল জুলাই মাসেই ১২০টি ভূমি ও পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে বলে সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, পাহাড় ধসের এই ভয়াবহতা কেন বাড়ছে এবং এর দায় কার?
১১ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের রাজনীতির কয়েকটি ‘ব্ল্যাকহোল’ আছে। জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড তার অন্যতম। রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে সেনাবাহিনীর একটি অংশ তাকে গুলি করে হত্যা করে। সেই ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর ছিলেন জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ। ঘটনার পরপর প্রধান অভিযুক্ত
১২ ঘণ্টা আগে
উন্নত দেশগুলোর অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের কারণে উন্নয়নশীল দেশের মানুষের জীবন আজ চরম বিপর্যয়ের মুখে। উপকূলীয় অঞ্চলে জ্বলোচ্ছাসের কারণে মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। লবণাক্ততা বেড়ে সুপেয় পানির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। কৃষিজমির পরিমাণ অবিশ্বাস্যভাবে কমছে। বায়ুমান নিম্নগামী হওয়ায় মানুষের আয়ুষ্কাল কমে যাচ্ছে।
১৫ ঘণ্টা আগে