ফজিলাতুন নেসা শাপলা

‘আনন্দ নিয়ে শেখা’—এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করে আবার পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে আমাদের জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থায়। নতুন পাঠক্রমের আওতায় ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে এবং ২০২৮ সাল থেকে অন্যান্য শ্রেণিতে নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্তিকরণ ও মিড-ডে মিলের প্রসার আপাতদৃষ্টিতে একটি বৈপ্লবিক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ বলে মনে করাই যেতে পারে।
একজন শিক্ষার্থীর সার্বিক বিকাশের ক্ষেত্রে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং সুষম পুষ্টির অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে। এ বিষয়ে দ্বিমত করার অবকাশ নেই। দীর্ঘকাল ধরে দেশের প্রাথমিক শিক্ষায় ‘শারীরিক শিক্ষা’ যেভাবে অবহেলিত হয়ে এসেছে, সেখান থেকে বের হয়ে আসার এই সদিচ্ছা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে ‘আনন্দ নিয়ে শেখা’ ভাবনার রূপরেখা যত বড় বৈপ্লবিক হোক না কেন, বাস্তব কাঠামোগত সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি ছাড়া তা কতটা ফলপ্রসূ হবে—সেই সংশয় থেকেই যায়।
চতুর্থ শ্রেণির জন্য প্রস্তাবিত ‘খেলাধুলা’ বিষয়টি কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এতে ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, কাবাডি, দাবা, অ্যাথলেটিকস, সাঁতার ও মার্শাল আর্ট—এই আটটি জনপ্রিয় খেলাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে ‘শরীরচর্চা ও ব্যায়াম’ অধ্যায়ে ওয়ার্ম-আপ, স্ট্রেচিং, ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ এবং শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের বৈজ্ঞানিক দিকগুলো রাখা হয়েছে।
খেলাধুলা ও শরীরচর্চা শিশুদের শুধু শারীরিক সুস্থতাই দেয় না, মস্তিষ্কের নিউরনে সংযোগ বাড়ায়, যা সরাসরি কগনিটিভ বা বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঘটায়। এর মাধ্যমে শিশুদের কৌশলগত চিন্তা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়। আবেগীয় ও সামাজিক বিকাশের ক্ষেত্রে খেলাধুলা দলগত চেতনা, জয়-পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা, নেতৃত্ব এবং শৃঙ্খলা শেখায়। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম শিশুদের মানসিক অবসাদ ও দুশ্চিন্তা দূর করে মানসিকভাবে প্রফুল্ল রাখে।
শিক্ষা পরিকল্পনায় খেলাধুলাকে যুক্ত করার উদ্যোগটি যতখানি দুর্দান্ত, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ঠিক ততখানিই নির্মম। দেশের অধিকাংশ সরকারি-বেসরকারি স্কুলে, বিশেষ করে নগর এলাকায় নিজস্ব কোনো খেলার মাঠ নেই। এমনকি আউটডোর গেমস খেলার জন্য কোনো অডিটোরিয়াম বা পরিকাঠামোও নেই, যেখানে শিশুরা স্কুল ভবনের ভেতরে ব্যাডমিন্টন, ভলিবল বা ফুটবল খেলতে পারে। অন্যদিকে আমাদের স্কুলগুলোতে সুইমিং পুলের কোনো ধারণাই তৈরি হয়নি, ব্যবস্থা থাকা তো দূরের কথা। অথচ সুইমিং পুল কেবল সাঁতার কাটার জায়গা নয়; স্কুলে সুইমিং পুল থাকার অর্থ হলো শিশুরা সাঁতার শেখার পাশাপাশি নানা ধরনের কৌশল, শৃঙ্খলা ও ম্যানার্স শেখার সুযোগ পায়।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো কীভাবে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটায়, তা থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। উদাহরণস্বরূপ, জাপানের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাথমিক স্তর (বিশেষ করে পঞ্চম শ্রেণি) থেকেই শিশুদের শারীরিক সহনশীলতা ও মানসিক দৃঢ়তা গড়ে তুলতে দৌড় বা ম্যারাথনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেখানে ক্লাস শেষে শিশুরা ৩ থেকে ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ দূরত্বের দৌড়ে অংশ নিয়ে তবেই বাড়ি ফেরে। এই দৌড়ের উদ্দেশ্য প্রথম হওয়া নয়, নিজের ভেতরের সহনশীলতা, অধ্যবসায় ও আত্মনিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করা। এর বিপরীতে দেখা যায়, আমাদের দেশের স্কুলের ভেতর বা বাইরে কোনো খেলার মাঠই নেই। আর তাই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, কেবল পাঠ্যপুস্তকের পৃষ্ঠায় খেলাধুলার নিয়মকানুন ছাপিয়ে কতটুকু বিকাশ নিশ্চিত করা সম্ভব।
নতুন পাঠক্রমে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য, সুসংহত সম্পর্ক এবং মানসিক প্রশান্তির বিষয়টি স্থান পেয়েছে। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো, ক্লাসগুলোতে এই সংবেদনশীল বিষয়সমূহ কারা পরিচালনা করবেন? বিশেষ করে প্রাথমিক স্কুলে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য পেশাদার কাউন্সেলর বা সাইকোলজিস্ট নিয়োগ এখন সময়ের দাবি। কারণ, স্বল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সাধারণ শিক্ষকদের পক্ষে কোমলমতি শিশুর সঠিক মানসিক বিকাশ ও গভীর আচরণগত সমস্যা নিরূপণ করা এবং সে অনুযায়ী পরিচর্যা করা এককভাবে কখনোই সম্ভব নয়। একজন দক্ষ সাইকোলজিস্ট এবং শিক্ষক মিলেই কেবল শিশুদের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে কার্যকর সহায়তা করতে পারেন।
শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক সংকট মোকাবিলায় যেখানে পেশাদার সাইকোলজিস্ট বা কাউন্সেলর নিয়োগের প্রয়োজন, সেখানে তড়িঘড়ি করে প্রচলিত ব্যবস্থা ও সামান্য সাময়িক প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের দিয়েই এই গভীর মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষাকে বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে, শারীরিক শিক্ষার যে শিক্ষকরা বর্তমানে রয়েছেন, তারা সব ধরনের খেলায় কতটা পারদর্শী এবং আধুনিক স্পোর্টস সায়েন্স সম্পর্কে তাদের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক ধারণা কতটুকু—সে বিষয়েও যথেষ্ট অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।
শিক্ষামন্ত্রী উপজেলা পর্যায়ে মিড-ডে মিল চালুর যে ঘোষণা দিয়েছেন, তার একটি মহৎ সামাজিক ও শিক্ষাগত উদ্দেশ্য রয়েছে। স্কুলে দলবেঁধে দুপুরের খাবার খাওয়া কেবল পেট ভরানোর বিষয় নয়; এই উদ্যোগ সমতা বিধান, টেবিল ম্যানার্স, শৃঙ্খলা এবং সামাজিক মেলবন্ধনের একটি বড় পাঠের সুযোগ তৈরি করে দেয়। কিন্তু বর্তমানে মিড-ডে মিল বলতে বোঝায় কেবল চাল-ডালের খিচুড়ি বা একটি সেদ্ধ ডিম।
প্রাথমিক স্তরের শিশুর বয়সভেদে দুপুরে কত কিলো ক্যালরি শক্তি প্রয়োজন, খাবারে সুষম প্রোটিন, ফ্যাট ও ভিটামিনের অনুপাত ঠিক আছে কি না—তা মূল্যায়নের জন্য কোনো বিশেষজ্ঞ নিউট্রিশনিস্টের ভূমিকা রাখা হয়নি। খাবারের গুণগত মান ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ কে বা কারা তদারকি করবেন, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ফ্রেমওয়ার্ক নেই। একজন নিউট্রিশনিস্ট বা ডায়েটেশিয়ানই পারেন সারা মাসের সুষম খাবারের তালিকা দিতে। সুষম খাবার নিশ্চিত না করে কেবল খাদ্য বিতরণের ওপর জোর দিলে ‘মিড-ডে মিল’ কনসেপ্টটি সাংঘাতিকভাবে ব্যাহত হবে।
চতুর্থ শ্রেণিতে ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইটি অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে শিশুরা নিজের শিকড়, ঐতিহ্য, লোকসংগীত, পোশাক, মেলা ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারবে, যা তাদের আত্মপরিচয় গঠনে সহায়ক হবে। একজন শিশু যখন বিশ্বনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে, তখন নিজের সংস্কৃতির পাশাপাশি বৈশ্বিক সংস্কৃতির বৈচিত্র্য সম্পর্কে জানা একইভাবে জরুরি। উন্নত বিশ্বে শিশুদের নিজের দেশের পাশাপাশি বিশ্বের বিখ্যাত দেশগুলোর খাদ্যাভ্যাস, ঐতিহাসিক স্থান ও জীবনধারা সম্পর্কে শেখানো হয়, যা শিশুদের মধ্যে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়ায়। আমাদের সংস্কৃতি বইয়ে এমন আন্তর্জাতিক উপাদান যুক্ত করা হয়েছে কিনা এবং ক্লাসরুমে তা প্র্যাকটিক্যালি প্রদর্শনের জন্য শিক্ষাসহায়ক উপকরণ তৈরির সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা আছে কিনা, তা স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে, সংস্কৃতি শিক্ষার কথা বলা হলেও স্কুলগুলোতে সংগীত শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ রাখা হয়েছে এবং স্থায়ী কোনো নাচের শিক্ষকও নেই। এর পাশাপাশি বড় আরেকটি বাধা আমাদের অভিভাবক। প্রচলিত ফলাফলভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থায় অভিভাবকরা চান কেবল ভালো গ্রেড বা ফলাফল। তারা স্কুলে সন্তানদের শুধু পুঁথিগত শিক্ষার জন্যই পাঠান; সংস্কৃতি শিক্ষার জন্য নয়। এই অবস্থায় অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত না বসে, মতবিনিময়ের মাধ্যমে তাদের সচেতন না করে কীভাবে এত বড় পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব?
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাটি হলো নতুন বিষয়গুলো চালুর সময়সীমা নিয়ে। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে এই বিশাল রূপরেখা বাস্তবায়নের জন্য এত তাড়াহুড়োর যৌক্তিকতা কতটুকু? ২০২৮ সাল থেকে অন্যান্য শ্রেণিগুলোতে নতুন কারিকুলাম শুরু করা হলে, চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণির ক্ষেত্রে কেন এক বছরের অতিরিক্ত সময় নেওয়া সম্ভব নয়?
এক বা দুই বছরের একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতিমূলক সময় থাকলে মাঠপর্যায়ের স্কুলগুলোতে খেলার জন্য বিকল্প অবকাঠামো তৈরি, শিক্ষকদের দীর্ঘমেয়াদি উন্নত প্রশিক্ষণ, স্কুলে সাইকোলজিস্ট নিয়োগ, মিড-ডে মিলের জন্য পুষ্টিবিদ ও মনিটরিং টিমের রূপরেখা প্রস্তুত এবং শিক্ষাসাহাযক উপকরণ তৈরির কাজগুলো গুছিয়ে আনা যেত। পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি ছাড়া খেলাধুলা, মানসিক স্বাস্থ্য বা সংস্কৃতি শিক্ষার মতো বাস্তবভিত্তিক বিষয়গুলো প্রবর্তন করলে তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত না হয়ে কেবল বইয়ের পাতাতেই বন্দি হয়ে থাকার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।
লেখক: কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

‘আনন্দ নিয়ে শেখা’—এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করে আবার পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে আমাদের জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থায়। নতুন পাঠক্রমের আওতায় ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে এবং ২০২৮ সাল থেকে অন্যান্য শ্রেণিতে নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্তিকরণ ও মিড-ডে মিলের প্রসার আপাতদৃষ্টিতে একটি বৈপ্লবিক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ বলে মনে করাই যেতে পারে।
একজন শিক্ষার্থীর সার্বিক বিকাশের ক্ষেত্রে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং সুষম পুষ্টির অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে। এ বিষয়ে দ্বিমত করার অবকাশ নেই। দীর্ঘকাল ধরে দেশের প্রাথমিক শিক্ষায় ‘শারীরিক শিক্ষা’ যেভাবে অবহেলিত হয়ে এসেছে, সেখান থেকে বের হয়ে আসার এই সদিচ্ছা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে ‘আনন্দ নিয়ে শেখা’ ভাবনার রূপরেখা যত বড় বৈপ্লবিক হোক না কেন, বাস্তব কাঠামোগত সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি ছাড়া তা কতটা ফলপ্রসূ হবে—সেই সংশয় থেকেই যায়।
চতুর্থ শ্রেণির জন্য প্রস্তাবিত ‘খেলাধুলা’ বিষয়টি কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এতে ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, কাবাডি, দাবা, অ্যাথলেটিকস, সাঁতার ও মার্শাল আর্ট—এই আটটি জনপ্রিয় খেলাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে ‘শরীরচর্চা ও ব্যায়াম’ অধ্যায়ে ওয়ার্ম-আপ, স্ট্রেচিং, ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ এবং শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের বৈজ্ঞানিক দিকগুলো রাখা হয়েছে।
খেলাধুলা ও শরীরচর্চা শিশুদের শুধু শারীরিক সুস্থতাই দেয় না, মস্তিষ্কের নিউরনে সংযোগ বাড়ায়, যা সরাসরি কগনিটিভ বা বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঘটায়। এর মাধ্যমে শিশুদের কৌশলগত চিন্তা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়। আবেগীয় ও সামাজিক বিকাশের ক্ষেত্রে খেলাধুলা দলগত চেতনা, জয়-পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা, নেতৃত্ব এবং শৃঙ্খলা শেখায়। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম শিশুদের মানসিক অবসাদ ও দুশ্চিন্তা দূর করে মানসিকভাবে প্রফুল্ল রাখে।
শিক্ষা পরিকল্পনায় খেলাধুলাকে যুক্ত করার উদ্যোগটি যতখানি দুর্দান্ত, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ঠিক ততখানিই নির্মম। দেশের অধিকাংশ সরকারি-বেসরকারি স্কুলে, বিশেষ করে নগর এলাকায় নিজস্ব কোনো খেলার মাঠ নেই। এমনকি আউটডোর গেমস খেলার জন্য কোনো অডিটোরিয়াম বা পরিকাঠামোও নেই, যেখানে শিশুরা স্কুল ভবনের ভেতরে ব্যাডমিন্টন, ভলিবল বা ফুটবল খেলতে পারে। অন্যদিকে আমাদের স্কুলগুলোতে সুইমিং পুলের কোনো ধারণাই তৈরি হয়নি, ব্যবস্থা থাকা তো দূরের কথা। অথচ সুইমিং পুল কেবল সাঁতার কাটার জায়গা নয়; স্কুলে সুইমিং পুল থাকার অর্থ হলো শিশুরা সাঁতার শেখার পাশাপাশি নানা ধরনের কৌশল, শৃঙ্খলা ও ম্যানার্স শেখার সুযোগ পায়।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো কীভাবে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটায়, তা থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। উদাহরণস্বরূপ, জাপানের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাথমিক স্তর (বিশেষ করে পঞ্চম শ্রেণি) থেকেই শিশুদের শারীরিক সহনশীলতা ও মানসিক দৃঢ়তা গড়ে তুলতে দৌড় বা ম্যারাথনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেখানে ক্লাস শেষে শিশুরা ৩ থেকে ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ দূরত্বের দৌড়ে অংশ নিয়ে তবেই বাড়ি ফেরে। এই দৌড়ের উদ্দেশ্য প্রথম হওয়া নয়, নিজের ভেতরের সহনশীলতা, অধ্যবসায় ও আত্মনিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করা। এর বিপরীতে দেখা যায়, আমাদের দেশের স্কুলের ভেতর বা বাইরে কোনো খেলার মাঠই নেই। আর তাই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, কেবল পাঠ্যপুস্তকের পৃষ্ঠায় খেলাধুলার নিয়মকানুন ছাপিয়ে কতটুকু বিকাশ নিশ্চিত করা সম্ভব।
নতুন পাঠক্রমে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য, সুসংহত সম্পর্ক এবং মানসিক প্রশান্তির বিষয়টি স্থান পেয়েছে। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো, ক্লাসগুলোতে এই সংবেদনশীল বিষয়সমূহ কারা পরিচালনা করবেন? বিশেষ করে প্রাথমিক স্কুলে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য পেশাদার কাউন্সেলর বা সাইকোলজিস্ট নিয়োগ এখন সময়ের দাবি। কারণ, স্বল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সাধারণ শিক্ষকদের পক্ষে কোমলমতি শিশুর সঠিক মানসিক বিকাশ ও গভীর আচরণগত সমস্যা নিরূপণ করা এবং সে অনুযায়ী পরিচর্যা করা এককভাবে কখনোই সম্ভব নয়। একজন দক্ষ সাইকোলজিস্ট এবং শিক্ষক মিলেই কেবল শিশুদের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে কার্যকর সহায়তা করতে পারেন।
শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক সংকট মোকাবিলায় যেখানে পেশাদার সাইকোলজিস্ট বা কাউন্সেলর নিয়োগের প্রয়োজন, সেখানে তড়িঘড়ি করে প্রচলিত ব্যবস্থা ও সামান্য সাময়িক প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের দিয়েই এই গভীর মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষাকে বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে, শারীরিক শিক্ষার যে শিক্ষকরা বর্তমানে রয়েছেন, তারা সব ধরনের খেলায় কতটা পারদর্শী এবং আধুনিক স্পোর্টস সায়েন্স সম্পর্কে তাদের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক ধারণা কতটুকু—সে বিষয়েও যথেষ্ট অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।
শিক্ষামন্ত্রী উপজেলা পর্যায়ে মিড-ডে মিল চালুর যে ঘোষণা দিয়েছেন, তার একটি মহৎ সামাজিক ও শিক্ষাগত উদ্দেশ্য রয়েছে। স্কুলে দলবেঁধে দুপুরের খাবার খাওয়া কেবল পেট ভরানোর বিষয় নয়; এই উদ্যোগ সমতা বিধান, টেবিল ম্যানার্স, শৃঙ্খলা এবং সামাজিক মেলবন্ধনের একটি বড় পাঠের সুযোগ তৈরি করে দেয়। কিন্তু বর্তমানে মিড-ডে মিল বলতে বোঝায় কেবল চাল-ডালের খিচুড়ি বা একটি সেদ্ধ ডিম।
প্রাথমিক স্তরের শিশুর বয়সভেদে দুপুরে কত কিলো ক্যালরি শক্তি প্রয়োজন, খাবারে সুষম প্রোটিন, ফ্যাট ও ভিটামিনের অনুপাত ঠিক আছে কি না—তা মূল্যায়নের জন্য কোনো বিশেষজ্ঞ নিউট্রিশনিস্টের ভূমিকা রাখা হয়নি। খাবারের গুণগত মান ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ কে বা কারা তদারকি করবেন, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ফ্রেমওয়ার্ক নেই। একজন নিউট্রিশনিস্ট বা ডায়েটেশিয়ানই পারেন সারা মাসের সুষম খাবারের তালিকা দিতে। সুষম খাবার নিশ্চিত না করে কেবল খাদ্য বিতরণের ওপর জোর দিলে ‘মিড-ডে মিল’ কনসেপ্টটি সাংঘাতিকভাবে ব্যাহত হবে।
চতুর্থ শ্রেণিতে ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইটি অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে শিশুরা নিজের শিকড়, ঐতিহ্য, লোকসংগীত, পোশাক, মেলা ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারবে, যা তাদের আত্মপরিচয় গঠনে সহায়ক হবে। একজন শিশু যখন বিশ্বনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে, তখন নিজের সংস্কৃতির পাশাপাশি বৈশ্বিক সংস্কৃতির বৈচিত্র্য সম্পর্কে জানা একইভাবে জরুরি। উন্নত বিশ্বে শিশুদের নিজের দেশের পাশাপাশি বিশ্বের বিখ্যাত দেশগুলোর খাদ্যাভ্যাস, ঐতিহাসিক স্থান ও জীবনধারা সম্পর্কে শেখানো হয়, যা শিশুদের মধ্যে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়ায়। আমাদের সংস্কৃতি বইয়ে এমন আন্তর্জাতিক উপাদান যুক্ত করা হয়েছে কিনা এবং ক্লাসরুমে তা প্র্যাকটিক্যালি প্রদর্শনের জন্য শিক্ষাসহায়ক উপকরণ তৈরির সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা আছে কিনা, তা স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে, সংস্কৃতি শিক্ষার কথা বলা হলেও স্কুলগুলোতে সংগীত শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ রাখা হয়েছে এবং স্থায়ী কোনো নাচের শিক্ষকও নেই। এর পাশাপাশি বড় আরেকটি বাধা আমাদের অভিভাবক। প্রচলিত ফলাফলভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থায় অভিভাবকরা চান কেবল ভালো গ্রেড বা ফলাফল। তারা স্কুলে সন্তানদের শুধু পুঁথিগত শিক্ষার জন্যই পাঠান; সংস্কৃতি শিক্ষার জন্য নয়। এই অবস্থায় অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত না বসে, মতবিনিময়ের মাধ্যমে তাদের সচেতন না করে কীভাবে এত বড় পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব?
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাটি হলো নতুন বিষয়গুলো চালুর সময়সীমা নিয়ে। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে এই বিশাল রূপরেখা বাস্তবায়নের জন্য এত তাড়াহুড়োর যৌক্তিকতা কতটুকু? ২০২৮ সাল থেকে অন্যান্য শ্রেণিগুলোতে নতুন কারিকুলাম শুরু করা হলে, চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণির ক্ষেত্রে কেন এক বছরের অতিরিক্ত সময় নেওয়া সম্ভব নয়?
এক বা দুই বছরের একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতিমূলক সময় থাকলে মাঠপর্যায়ের স্কুলগুলোতে খেলার জন্য বিকল্প অবকাঠামো তৈরি, শিক্ষকদের দীর্ঘমেয়াদি উন্নত প্রশিক্ষণ, স্কুলে সাইকোলজিস্ট নিয়োগ, মিড-ডে মিলের জন্য পুষ্টিবিদ ও মনিটরিং টিমের রূপরেখা প্রস্তুত এবং শিক্ষাসাহাযক উপকরণ তৈরির কাজগুলো গুছিয়ে আনা যেত। পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি ছাড়া খেলাধুলা, মানসিক স্বাস্থ্য বা সংস্কৃতি শিক্ষার মতো বাস্তবভিত্তিক বিষয়গুলো প্রবর্তন করলে তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত না হয়ে কেবল বইয়ের পাতাতেই বন্দি হয়ে থাকার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।
লেখক: কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
.png)

জঙ্গি ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশের সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একধরনের অস্বীকারের সংস্কৃতি যেমন আছে। প্রতিপক্ষ দমনে জঙ্গি কার্ড ব্যবহারের অভিযোগও বেশ পুরোনো। এরকম সব কারণে কখনোই প্রকৃত অর্থে জঙ্গি নির্মূল করা যায়নি। বরং জঙ্গিরা নানা ফর্মে সমাজের নানা পরিসরে মিশেছিল। এখনও আছে। কেউ একদিনে জঙ্গি হয়ে ওঠে
২০ ঘণ্টা আগে
চুক্তির আসল উদ্দেশ্য যদি মুসলিম দেশগুলোর নিরাপত্তা, প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং স্থিতিশীলতা বাড়ানো হয়, তবে তা শুধু স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এর লক্ষ্য হওয়া উচিত আরও বড়। এমন একটি কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে যেকোনো মুসলিম দেশ বাইরের শত্রুর অবৈধ হামলার শিকার হলে সাহায্য পায়।