সোনিয়া গান্ধীর কলাম

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মোদি সরকারের নীতিরই ফল

লেখা:
লেখা:
সোনিয়া গান্ধী

সরকার এই শিক্ষার্থীদের দেশের ভবিষ্যতের উত্তরাধিকারী হিসেবে দেখেনি, দেখেছে রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে। ছবি: রয়টার্স

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে ভারতজুড়ে তরুণ শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ বেগবান হচ্ছে। তাঁদের দাবিগুলো খুব স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট:

ভারত সরকারকে জবাবদিহি করতে হবে এবং শিক্ষার সংস্কার করতে হবে। নরেন্দ্র মোদি সরকার তাদের এই সাহসিকতার জবাব দিয়েছে কাপুরুষতা ও নির্বিচার নিষ্ঠুরতা দিয়ে। সরকার এই শিক্ষার্থীদের দেশের ভবিষ্যতের উত্তরাধিকারী হিসেবে দেখেনি, দেখেছে রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে।

২০ জুলাই ২০২৬, একটি কলঙ্কিত দিন। এদিন দিল্লি পুলিশ এবং সেন্ট্রাল আর্মড পুলিশ ফোর্সেস (সিএপিএফ) অযাচিত সহিংসতা, নিষ্ঠুর লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ব্যবহার করে তাঁদের দমন করার চেষ্টা করেছে। এতে বহু শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারী আহত হয়েছেন। এমনকি বাড়ির পথে থাকা শিক্ষার্থীরাও রেহাই পাননি। তাঁদের পিঠে ও মাথায় নির্বিচারে লাঠিপেটা করা হয়েছে। পুরো দেশ দেখেছে ছররা গুলিতে ক্ষতবিক্ষত হওয়া তরুণদের হতাশাজনক দৃশ্য।

এই ছররা গুলি ব্যবহারের অনুমোদন স্বয়ং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই দিয়েছেন বলে অনুমান করা যায়। ওই দিনের ভিডিওগুলো আমাদের স্মৃতিতে দাগ কেটে গেছে এবং আমাদের সম্মিলিত বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। কেবল সরকার এবং তাদের আজ্ঞাবহ গণমাধ্যমই এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদের ঢেউকে ঘিরে মনগড়া গল্প ফাঁদছে। এখনই জোরালো ও স্পষ্টভাবে বলার সময় এসেছে: থামুন। এরা আমাদেরই সন্তান, আমাদেরই তরুণ-তরুণী।

মোদি সরকার আলোচনার বদলে নিয়মিতভাবেই সহিংসতার পথ বেছে নেয়। কৃষক থেকে শুরু করে অধিকারকর্মীদের ক্ষেত্রেও তাদের এই একই আচরণ স্পষ্ট দেখা গেছে। কিন্তু চলতি সপ্তাহে এই সংবেদনশীলতাহীন সরকার, যারা স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের এক নতুন নজির স্থাপন করেছে, তারা আরও নিচে নেমে গেছে। আমাদের ভবিষ্যৎ চিকিৎসক ও প্রকৌশলী, শিক্ষক ও সরকারি কর্মকর্তা, উদ্যোক্তা এবং দেশ গড়ার কারিগরদের প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর বদলে সরকার উল্টো তাদের ওপর রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক শক্তি লেলিয়ে দিয়েছে। এটি কোনোভাবেই ক্ষমা করার বা ভুলে যাওয়ার মতো নয়।

যেকোনো ভিন্নমতকেই ‘দেশবিরোধী’ তকমা দেওয়ার পুরোনো অপকৌশলটি এবার শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে কালিমালিপ্ত করতে ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকারের উচিত ছিল যে নীতিগুলোর কারণে এই বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, তা নিয়ে আত্মবিশ্লেষণ করা। তা না করে মোদি সরকার তাদের কূটকৌশলের ঝুলি থেকে নানা অপবাদ ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে দিচ্ছে।

সরকারি শিক্ষার অবনতি

প্রথম মৌলিক সমস্যাটি হলো, সরকারি শিক্ষা খাত থেকে মোদি সরকারের পিছু হটা। তারা স্কুল শিক্ষায় মোট বাজেট বরাদ্দের অনুপাত ৫০ শতাংশ এবং উচ্চশিক্ষায় ৩৩ শতাংশ কমিয়েছে। এমন অযৌক্তিক পিছু হটার মধ্যে কেউ কি কোনো যুক্তি খুঁজে পান? গত ১২ বছরে মোদি সরকার প্রায় এক লাখ সরকারি স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে এবং এর বিপরীতে ৪৩ হাজার বেসরকারি স্কুল খোলার সুযোগ করে দিয়েছে। এর বড় একটি অংশই পরিচালনা করে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস), যারা মূলত তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর পাশাপাশি ঘটনাক্রমে ভারতের সবচেয়ে বড় বেসরকারি স্কুল নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাদের অনুদান কমিয়েছে এবং উচ্চ সুদে ঋণ নিতে তাদের বাধ্য করেছে। এই ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের ফি বাড়াতে বাধ্য হয়েছে।

মানসম্মত ও সাশ্রয়ী সরকারি শিক্ষা হাতের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় ভারতের পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের পড়াশোনার পেছনে নিজেদের পকেট থেকে বিপুল অর্থ খরচ করতে বাধ্য হচ্ছে। কেবল ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট বা নিট পরীক্ষার কোচিংয়ের পেছনে পরিবারগুলো যে পরিমাণ অর্থ খরচ করে, তার পরিমাণ সরকারি শিক্ষায় মোদি সরকারের মোট বিনিয়োগের সমান। বেসরকারি শিক্ষার এই আকাশছোঁয়া খরচ লাখ লাখ মেধাবী শিক্ষার্থীকে পিছিয়ে দিচ্ছে। এসব শিক্ষার্থী সাধারণ পরিবার থেকে এলেও তাঁদের মধ্যে প্রচুর সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। তবে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয় হলো, পড়াশোনার এই বিপুল খরচ শিক্ষার্থীদের কাঁধে অসম্ভব উচ্চ প্রত্যাশার এক বিশাল বোঝাও চাপিয়ে দেয়। তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাগত সাফল্যের স্বপ্নে পরিবার ঠিক কী পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে, সে সম্পর্কে ভারতের তরুণরা খুব ভালো করেই ওয়াকিবহাল। শিক্ষার্থীদের এই তীব্র মরিয়াভাব মূলত শিক্ষার বেসরকারীকরণ এবং বাণিজ্যিকীকরণেরই প্রত্যক্ষ ফল।

ভেঙে পড়া পরীক্ষাব্যবস্থা ও সাফল্যের সংকট

দ্বিতীয় সমস্যাটি হলো ভারতের সরকারি পরীক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়া। এই ব্যবস্থা এখন পুরোপুরি কেন্দ্রীকরণ, বেসরকারীকরণ ও রাজনীতিকরণের শিকার। বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজ্যগুলোর নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাধীনভাবে পরীক্ষা নেওয়ার পুরোনো প্রথা বাতিল করে সেখানে কমন ইউনিভার্সিটি এন্ট্রান্স টেস্টের (সিইউইটি) মতো ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির (এনটিএ) মাধ্যমে কেন্দ্রীভূত পরীক্ষাব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এই এনটিএ নিজেই একটি অসহায় ও চরম কর্মী-সংকটে ভোগা একটি প্রতিষ্ঠান, যারা পরীক্ষা পরিচালনার জন্য পুরোপুরি একদল বেসরকারি ঠিকাদারের ওপর নির্ভরশীল।

এটি সবারই জানা যে, এনটিএর নিয়োগ দেওয়া প্রশ্নকর্তা, অনুবাদক ও বিশেষজ্ঞরা ভারতের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো স্বনামধন্য শিক্ষাবিদ নন; বরং তাঁদের বড় অংশই রাজনৈতিক পরিচয়ধারী মাঝারি মানের ব্যক্তি। এই প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফল হয়েছে মারাত্মক—গত ১২ বছরে সারা দেশে ১৫২ বার প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এনটিএ নিজেই অন্তত ৯ বার প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত ছিল। এমনকি অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থীরাও ব্যর্থতার মুখে পড়ছেন, কারণ কর্তৃপক্ষ পরীক্ষাব্যবস্থাকে মুনাফা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে। আর এ ধরনের অপরাধের জন্য তাদের কোনো শাস্তিরও মুখোমুখি হতে হচ্ছে না।

দ্য হিন্দুতে প্রকাশিত সোনিয়া গান্ধীর কলাম
দ্য হিন্দুতে প্রকাশিত সোনিয়া গান্ধীর কলাম

তৃতীয় সমস্যাটি হলো ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় সফল হওয়ার কঠিন পথ। অর্থনীতি ক্রমশ গুটিকয়েক মানুষের একচেটিয়া দখলে চলে যাওয়ার কারণে স্নাতক পাসের পর এখন মানসম্মত ও ভালো বেতনের চাকরির সুযোগ খুব একটা পাওয়া যায় না। তরুণ স্নাতকদের বেকারত্বের হার ধারাবাহিকভাবে বেশি; গত কয়েক বছরে এই হার গড়ে প্রায় ৪০ শতাংশ। টিকে থাকা অল্প কয়েকটি চাকরির জন্য প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র, আর এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য আমাদের শিক্ষার্থীরা এর আগে কখনো এতটা অপ্রস্তুত অবস্থায় ছিলেন না। কেবল দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে অযোগ্য উপাচার্য নিয়োগ এবং তার ফলশ্রুতিতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অযোগ্য শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়ার কারণে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠদানে এক চরম সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমান কর্মক্ষেত্রে যেখানে দক্ষতার মাপকাঠি অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে, সেখানে ভারতের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা এখনো মান্ধাতার আমলের পুরোনো পদ্ধতি এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পাঠ্যক্রমের মধ্যেই আটকে আছে। এটি আধুনিক পদ্ধতি ও মান থেকে বিপজ্জনকভাবে পিছিয়ে আছে, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বর্তমান এই যুগে বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে এটি পুরোপুরি ব্যর্থ। ক্রমবর্ধমান চাহিদাপূর্ণ এই ব্যবস্থায় সফল হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা পদে পদে বাধার মুখে পড়ছেন, অথচ এ জন্য যে পর্যাপ্ত রসদ ও প্রস্তুতি প্রয়োজন, তা তাঁদের নেই।

সে কারণে শিক্ষাব্যবস্থা এখন ক্রমশ ব্যয়বহুল, দুর্নীতিগ্রস্ত ও সফলতার জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে। তবে এর কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে মোদি সরকার। তারা খুব সচেতন ও ধারাবাহিকভাবে জবাবদিহি এড়িয়ে গেছে এবং শিক্ষা নিয়ে সৎ আলোচনাকে এড়িয়ে যাওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। কারও সঙ্গে কোনো ঐকমত্যে না পৌঁছে বা সংসদে কোনো আলোচনা ছাড়াই সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০’ পাস করেছে। এনটিএকে কখনোই সংসদে উত্থাপন করা হয়নি; বরং এটি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার দ্বারা গঠিত এমন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়ে গেছে, যার কোনো জবাবদিহির ব্যবস্থাই নেই।

এনটিএকে শক্তিশালী করার জন্য শিক্ষা বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির যে সুপারিশ ছিল, তা প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করে শিক্ষামন্ত্রী নিজেই জবাবদিহির প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছেন। আর তিনি এটি করেছেন শুধু এই কারণে যে, ওই কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যরা ছিলেন। এত বড় ব্যর্থতার পরও তাঁর পদত্যাগ না করার এই অনীহা জনমনে ক্ষোভের আগুন আরও উসকে দিয়েছে।

প্রতিবাদের মূল কারণ

শিক্ষার্থীদের এই বিক্ষোভ মূলত এসব পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত বিষয়েরই এক স্বাভাবিক পরিণতি: আজকের অন্ধকার শিক্ষাব্যবস্থা যা কেবল হতাশারই জন্ম দেয় এবং মোদি সরকারের সেই পরিচিত অহংকার ও জবাবদিহিমূলক বা গঠনমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতি তীব্র অনীহা। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ নির্দেশে পুলিশ সদস্যরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর যে বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছে, তা এই সরকারের আমলে মোটেও নজিরবিহীন কোনো ঘটনা নয়। ২০২০ সালে নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন ও জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) বিরোধী বিক্ষোভের সময় সশস্ত্র পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে কীভাবে তাণ্ডব চালিয়েছিল, তা আমাদের সবারই স্পষ্ট মনে আছে। ভারতের নারী কুস্তিগিরদের ওপর হওয়া সেই অগ্রহণযোগ্য বাড়াবাড়িও আমাদের স্মৃতি থেকে কখনোই মুছে যাওয়ার নয়।

মোদি সরকার কেবল ভারতের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংসই করেনি; বরং কোনো জবাবদিহির তোয়াক্কা না করা, চরম আত্ম-অহংকার এবং চূড়ান্ত সংবেদনশীলতাহীন আচরণ করাকে তারা অভ্যাসে পরিণত করেছে। ভারতের শিক্ষার্থীরা মোদি সরকারের ধাপ্পাবাজি ধরে ফেলেছেন। তাঁদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা আমাদের সবার নৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।

  • সোনিয়া গান্ধী: কংগ্রেস পার্লামেন্টারি পার্টির চেয়ারপারসন

(দ্য হিন্দুতে প্রকাশিত। ইংরেজি থেকে অনূদিত)

Ad 300x250

সম্পর্কিত