বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁর কর্মী-সমর্থকদের গণভোটে ‘হ্যাঁ’-র পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাতে গিয়ে দেরি করে ফেললেন কিনা, সে প্রশ্ন উঠেছে রাজনীতিসচেতন মহলে। নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর মুহূর্ত থেকেই তিনি দলের এ অবস্থান স্পষ্ট করতে পারতেন বলে মত রয়েছে।
গণভোটে সরকার যেসব প্রশ্ন ভোটারদের সামনে রেখেছে, তাতে বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত থাকার কথা অবশ্য কারও অজানা নয়। কিছু প্রশ্নে ভিন্নমত অন্যান্য রাজনৈতিক দলেরও রয়েছে। তবে দীর্ঘ সংস্কার আলোচনায় সিংহভাগ দল যেসব প্রশ্নে একমত হয়েছে, সেগুলোয় বিশেষ কোনো দলের ভিন্নমত আর বিবেচনায় নিতে চায়নি অন্তর্বর্তী সরকার। তাই ভিন্নমতসহ ৩০টি সংস্কার প্রস্তাবে ভোটারের সম্মতি চাইছে সরকার। সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত আরও ১৮টি প্রস্তাব দলগুলো তার ইশতেহার অনুযায়ী বাস্তবায়ন করবে–এটা অবশ্য বলা হয়েছে গণভোটের সর্বশেষ প্রশ্নে।
গণভোটে ‘না’ ভোট দেওয়ার অধিকারও ভোটারদের রয়েছে বৈকি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একদল লোক ‘না’ ভোট প্রদানের ঘোষণা দিয়ে এর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। তবে সংস্কার আলোচনায় অংশগ্রহণকারী জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) স্পষ্টভাবে ‘হ্যাঁ’-র পক্ষে। নিজ প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার আহ্বানের পাশাপাশি তারা ‘হ্যাঁ’-র পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। পাশাপাশি তারা অভিযোগ করছিল, বিএনপি নেতৃত্ব কেন এ বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলছে না? দেশের কোথাও কোথাও দলটির একশ্রেণির নেতা-কর্মী ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন বলেও শোনা যাচ্ছিল। উল্লিখিত ৩০ প্রস্তাবের সবগুলোয় বিএনপি পুরোপুরি সম্মত নয় বলেই তাদের এমন অবস্থান কিনা, সেই প্রশ্ন ছিল রাজনৈতিক অঙ্গনে। এ অবস্থায় দলের চেয়ারম্যান সম্ভবত মনে করেছেন, বিষয়টিতে বিএনপির অবস্থান তার কণ্ঠে স্পষ্ট করা দরকার। হালে সেটাই করলেন। তবে অবস্থান স্পষ্ট করতে গিয়ে কিছুটা দেরি করে ফেলেছেন বললে ভুল হবে না। গণভোট প্রশ্নে বিএনপি নেতৃত্বের নীরবতায় তার প্রতিপক্ষ এমন প্রচারণা জোরদারের সুযোগ পেয়েছে যে, ক্ষমতাপ্রত্যাশী দলটি সংস্কার চায় না; ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্র সংস্কারে আগ্রহ দেখাবে না কিংবা নিজেদের মতো করে কিছু সংস্কার হয়তো করবে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’-র পক্ষে সরকার নিজেও প্রচারণা চালাচ্ছে। এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় তাদের তরফ থেকে ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে, বিশেষ ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে সরকার এমনটা করতেই পারে। বিভিন্ন দেশে গণভোটে সরকারের দিক থেকে এ ধরনের প্রচারণা চালানোর উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) অবশ্য এরই মধ্যে জানিয়েছে, এ সংক্রান্ত বিধিবিধান অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীরা গণভোটে ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করতে পারলেও ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-র পক্ষে প্রচার চালাতে পারে না। এ অবস্থায় আবার গণভোট সম্পর্কিত অধ্যাদেশ সংশোধনের উদ্যোগের কথা জানা গেল। সরকারি কর্মচারীদের দিয়ে ‘হ্যাঁ’-র পক্ষে প্রচারণা চালানোর বিষয়টির বৈধতা দিতেই সরকারের এ উদ্যোগ, এটা স্পষ্ট। প্রসঙ্গটি আনতে হলো এজন্য যে, রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে গণভোটের মাধ্যমে জনসম্মতি আদায়ে অন্তর্বর্তী সরকারের দৃঢ় অবস্থান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো রকম অস্পষ্টতাই রাখছে না সরকার। তার এ ধরনের ভূমিকাও সম্ভবত বিএনপি চেয়ারম্যানকে এক রকম চাপে ফেলেছে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-র পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নিতে।
সংস্কার আলোচনা শেষে যেভাবে গণভোট হতে যাচ্ছে, সে বিষয়ে আইনজ্ঞদের মধ্যে অবশ্য বিতর্ক রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় কথা, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকার ও মাঠে থাকা প্রধান দলগুলো কিছুটা ভিন্নমত চেপে রেখে হলেও গণভোট অনুষ্ঠানে একমত হয়েছে। আইনজ্ঞদের বিতর্কের কারণে এ বাস্তবতা উপেক্ষা করা যাবে না।
এটা সবারই জানা, গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপি দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে ছিল। সেটি করা গেলে তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যেই একটা নির্বাচিত সরকার পেতাম আমরা। সে ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে কী অভিজ্ঞতা হতো, তা অবশ্য কেউ বলতে পারব না। এর বদলে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, সেটার মূল্যায়নই কেবল করা যাবে। আমরা দেখলাম– দ্রুত নির্বাচনের বদলে সংস্কার আলোচনার আয়োজন, যা দীর্ঘায়িত হলো। অন্যদের সঙ্গে বিএনপিও যোগদান করলো এতে। সংস্কার আলোচনায় দলটির অংশগ্রহণ কম জোরালো ছিল না। অনেক প্রশ্নেই তারা অন্যান্য দলের সঙ্গে একমত হয়েছেন; অনেক প্রশ্নে হননি। এ ক্ষেত্রে দলটি যে ‘লুকোছাপা’ করেনি, সেটা আমরা লক্ষ করেছি। তারেক রহমানও এটা জোর দিয়ে বলতে ভোলেননি। আমরা দেখেছি, কিছু ‘মৌলিক প্রশ্নে’ বিএনপির অবস্থান ঘিরে সংস্কার আলোচনায় জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল। সরকার পক্ষের মধ্যস্থতায় সেটা কেটে যেতেও দেখেছি। মাঠে থাকা দুই প্রধান পক্ষ বিএনপি, জামায়াত অতঃপর জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে। গণভোট আয়োজনের দিনক্ষণ নিয়ে মতপার্থক্যও পরে দূর হয়। জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সেটিই ঘটতে যাচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারি।
এ অবস্থায় সরকারসহ মাঠে থাকা প্রায় সব দলই গণভোটের পক্ষে শুধু নয়; ‘হ্যাঁ’ ভোটেরও পক্ষে। জুলাই সনদে সাক্ষর না করা এনসিপিও ‘হ্যাঁ’-র পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। পরিস্থিতি অনেকটা ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত গণভোটের মতো। তাতে সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রশ্নে জনসম্মতি নেওয়া হয়েছিল। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অনুষ্ঠিত ওই ভোটে সরকার ও বিরোধী উভয় পক্ষই ছিল সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার পক্ষে। এতে কম ভোট পড়লেও রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্তের পক্ষে জনগণ রায় দিয়েছিল। এবার অবশ্য এক ধরনের সংশয় ছিল যে, কিছুটা পরিস্থিতির চাপে পড়ে সংস্কার ও গণভোটের পক্ষে অবস্থান নেওয়া একটি পক্ষ ভেতরে ভেতরে ‘না’-র পক্ষে প্রচারণা চালায় কিনা! গণভোটে উত্থাপিত কিছু প্রস্তাবে কমবেশি ভিন্নমত থাকায় তারা এমন অবস্থান নিতে পারে বলে ধারণা ছিল। তবে দেরিতে হলেও বিএনপি চেয়ারম্যানের স্পষ্ট ঘোষণায় সেই সংশয় কেটে গেছে বলা যায়। জুলাই আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাবনত হয়ে তিনি ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। দলটির বিপুলসংখ্যক সমর্থক এতে প্রভাবিত হবেন বলেই ধারণা। তাদের মনে কিছুটা দ্বিধা-সংশয় থাকলেও এর ফলে সেটা কাটবে নিশ্চয়।
সংস্কার আলোচনা শেষে যেভাবে গণভোট হতে যাচ্ছে, সে বিষয়ে আইনজ্ঞদের মধ্যে অবশ্য বিতর্ক রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় কথা, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকার ও মাঠে থাকা প্রধান দলগুলো কিছুটা ভিন্নমত চেপে রেখে হলেও গণভোট অনুষ্ঠানে একমত হয়েছে। আইনজ্ঞদের বিতর্কের কারণে এ বাস্তবতা উপেক্ষা করা যাবে না। নির্বাচন ও গণভোট হয়ে যাওয়ার পর নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে তখন হয়তো এ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক হবে। বিতর্কের সুযোগ থাকলে সেটা তো অস্বীকার করা যাবে না। বিতর্কের উপযুক্ত স্থান হিসেবে তখন আবার সামনে থাকবে জাতীয় সংসদ। জনগণের রাজনৈতিক ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে সংসদ তখন সার্বভৌম সত্তা হিসেবে থাকবে। সংস্কার আলোচনা শেষে অন্তর্বর্তী সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো মিলে যেটাই সাব্যস্ত করুক, তার যৌক্তিকতাও নতুন করে বিচার করতে পারবে সংসদ। ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে ৩০টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবের হুবহু বাস্তবায়নে সংসদ বাধ্য কিনা, এমন প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। সে ক্ষেত্রে ভিন্নমত নিয়ে পুনরায় বিতর্ক না করে কেবল ঐকমত্যের জায়গা ধরে এগোনো যায় কিনা, সে প্রশ্ন উঠতে পারে। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হতে না পারলে আদালতের শরণাপন্ন হওয়া যাবে নিশ্চয়। সংবিধান ও এর সংস্কার সম্পর্কিত যে কোনো প্রশ্ন কিংবা জটিলতার নিষ্পত্তির জন্য তো আপিল বিভাগ রয়েছে।
গণভোটের ফল কী হবে, আমরা জানি না। তবে সব রাজনৈতিক দল ‘হ্যাঁ’-র পক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রচার চালালে ‘না’ জয়যুক্ত হওয়ার কথা নয়। এ ক্ষেত্রে কত শতাংশ ভোট পড়তেই হবে, এমন বাধ্যবাধকতাও নেই। তবে বিপুলসংখ্যক ভোটার ‘হ্যাঁ’-র পক্ষে অবস্থান নিলে আগামী সংসদে যাওয়া দলগুলোর ওপর সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের চাপ বাড়বে। ‘না’ জয়যুক্ত হলেও অবশ্য সংস্কারের প্রশ্নটি একেবারে চাপা পড়ে যাওয়ার কারণ নেই। মাঠে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর তো নিজস্ব সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। বিশেষ করে বলতে হয়, ক্ষমতাপ্রত্যাশী সবচেয়ে বড় দল বিএনপির আছে ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি। আর এটা ঘোষণা করা হয়েছিল গণঅভ্যুত্থানেরও বছরখানেক আগে। রাষ্ট্র সংস্কারের রাজনৈতিক দায় বিএনপির সবচেয়ে বেশি। আর জামায়াত, এনসিপি তো আরও জোরালোভাবে সংস্কারের আওয়াজ তুলেছে। সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পর সেটা ধরে রাখা এবং এগিয়ে নেওয়াটাও এক বড় কর্তব্য। এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা কিন্তু ভালো নয়। এত বড় গণঅভ্যুত্থানের পর ভালো অভিজ্ঞতার প্রত্যাশা অবশ্য বেড়েছে।
- হাসান মামুন : সাংবাদিক, কলাম লেখক