leadT1ad

ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ

বহুত্ববাদ ও বৈচিত্র্যের ঐক্য থেকে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের সন্ধানে

দেয়ালের গ্রাফিতিতে ইনক্লুসিভ বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। ছবি: সংগৃহীত

ইতিহাসের চাকা যখন প্রবল বেগে ঘোরে, তখন কিছু পুরোনো শব্দ নতুন অর্থ নিয়ে আবির্ভূত হয়। ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের সেই রক্তঝরা দিনগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যাকরণই পাল্টে দিয়েছে। উত্তাল সেই দিনগুলোতে রাজপথ থেকে সচিবালয় পর্যন্ত একটি শব্দ ক্রমশ ডালপালা মেলছে—‘ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ’ বা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ’।

কেন এই শব্দটি নিয়ে এত হুলস্থুল? কেন তা আমাদের যাপিত জীবনের ড্রইংরুম থেকে শুরু করে চায়ের কাপে ঝড় তুলেছে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের ক্ষতের গভীরে এবং নতুন এক স্বপ্নের মলাটে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও ‘ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ’

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কেবল একজন একনায়কের বিদায় ছিল না; এটি ছিল একটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মানুষের সামষ্টিক অস্তিত্বের লড়াই। গত দেড় দশকে আমরা দেখেছি একটি ‘বর্জনমূলক’ বা এক্সক্লুসিভ রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে উন্নয়নের আড়ালে ছিল বিভাজনের উগ্র দেয়াল। সেই দেয়াল ধসিয়ে জন্ম নিয়েছে এক অন্তর্ভুক্তিমূলক আকাঙ্ক্ষা।

‘অন্তর্ভুক্তি’ বা ‘ইনক্লুসিভ’ শব্দটি সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক আলোচনায় এনেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘তাত্ত্বিক নেতা’ মাহফুজ আলম। তিনি ও তাঁর সহযোদ্ধারা যখন একটি ‘নতুন বন্দোবস্তের’ কথা বলেন, তখন তার কেন্দ্রে থাকে ‘বহুত্ববাদ’ বা প্লুরালিজম।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এবং তার আগে আগস্টে বিভিন্ন ফেসবুক পোস্টে মাহফুজ আলম এই নতুন বন্দোবস্তের রূপরেখাটি স্পষ্ট করেছেন। তাঁর ভাষ্যে, এটি এমন একটি রাষ্ট্র হবে, যেখানে ইসলামপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী, বামপন্থী ও জাতীয়তাবাদী—সব মতাদর্শের মানুষের সমান জায়গা থাকবে। মাহফুজ আলম বলেন, বহুত্ববাদ কেবল ধর্মীয় সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষা নয়, বরং তা এক গভীর রাজনৈতিক দর্শন—যেখানে রাষ্ট্র কোনো একক গোষ্ঠী, দল বা মতাদর্শের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হবে না।

তবে ‘ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ’ ধারণাটি যতটা ঐক্যবদ্ধ মনে হয়, বাস্তবে ততটাই বহুমাত্রিক ও বিতর্কপূর্ণ। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো এই শব্দটি ব্যবহার করছে ‘স্থিতিশীলতা’ ও ‘অর্ডার’-এর ভাষায়, যেখানে অন্তর্ভুক্তি মানে মূলত সহনশীলতা, কিন্তু ক্ষমতার পুনর্বণ্টন নয়। ইসলামপন্থী রাজনীতির একাংশ এই ধারণাকে দেখে পশ্চিমা মানবাধিকার বয়ানের সম্প্রসারণ হিসেবে, আবার অন্য অংশ এটিকে ‘ন্যায্য অংশীদারত্বের সুযোগ’ হিসেবে নিতে চায়। শহুরে মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত তরুণদের কাছে ‘ইনক্লুসিভিটি’ একটি নৈতিক আদর্শ হলেও গ্রামবাংলার অনেক মানুষের কাছে এটি এখনও বিমূর্ত ও এলিট ভাষা। ফলে ‘ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ’ কোনো সর্বসম্মত রাজনৈতিক প্রকল্প নয়; এটি ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণি, মতাদর্শ ও ক্ষমতাকাঠামোর মধ্যে দরকষাকষির একটি চলমান বয়ান।

বহুত্ববাদের ঐতিহাসিক শিকড়

মাহফুজের এই দর্শন কি নতুন কিছু? না। বাংলার ইতিহাস চিরকালই বহুত্ববাদের। আমাদের এই বদ্বীপের মাটি গঠিত হয়েছে গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্রের পলি দিয়ে, যে পলি কোনো নির্দিষ্ট এক উৎস থেকে আসেনি। আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, মঙ্গোলয়েড—নানা জাতির রক্ত মিশেছে এখানে। আমাদের ধর্মবোধে মিশে আছে সুফিবাদের মরমি স্বাদ আর বৈষ্ণব ধর্মের প্রেম। লালন ফকির থেকে শুরু করে চণ্ডীদাস—সবাই সেই ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ পঙক্তিকেই প্রতিষ্ঠা করেছেন। এটিই ছিল বাংলার আদি ইনক্লুসিভিটি।

কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামো আমাদের এই চিরায়ত বহুত্ববাদকে বারবার অস্বীকার করেছে, নাগরিকদের বিভক্ত করেছে ‘উত্তম’ আর ‘অধম’ শ্রেণিতে। মাহফুজ আলম তাঁর বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে (বিশেষ করে প্রথম আলো এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে) দেশের সব ধর্ম ও জাতিগত গোষ্ঠীর অধিকারের ওপর জোরালো অবস্থানের কথা বলেছেন। তাঁর সোজাসাপ্টা বক্তব্য, ‘বাংলাদেশ কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা দলের নয়, বরং এটি সবার।’ তিনি মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান এবং পাহাড়ের জাতিগোষ্ঠীদের সম-অংশীদারত্বের এক নতুন পাঠ হাজির করেছেন। গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর একটি সেমিনারে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, ‘আমরা এমন এক দেশ গড়তে চাই যেখানে নাগরিকদের মধ্যে কোনো প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি থাকবে না।’

‘ইনক্লুসিভ’ শব্দটি সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক আলোচনায় এনেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘তাত্ত্বিক নেতা’ মাহফুজ আলম। ছবি: সংগৃহীত
‘ইনক্লুসিভ’ শব্দটি সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক আলোচনায় এনেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘তাত্ত্বিক নেতা’ মাহফুজ আলম। ছবি: সংগৃহীত

মিথলজিতে যেমন দেখা যায়, এক অসুর যখন স্বর্গ দখল করে দেবতাদের নির্বাসনে পাঠায়, তখন দেবতারা একজোট হয়ে এক নতুন শক্তির আরাধনা করেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেই ‘অসুর’ ছিল ফ্যাসিজম বা একতন্ত্রী শাসন, যা ভিন্নমতকে পিষে মারতে চেয়েছিল। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান ছিল সেই ‘সম্মিলিত শক্তি’র জাগরণ, যেখানে টুপি পরা মাদ্রাসাছাত্র, জিনস পরা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ, কপালে টিপ পরা নারী আর প্রান্তিক আদিবাসী মানুষ একই মিছিলে শামিল হয়েছিল। এই যে বৈচিত্র্যের ঐক্য—এটিই হলো ‘ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ’।

তরুণ নেতৃত্ব, ক্ষমতার বাস্তবতা ও ইনক্লুসিভিটির সংকট

মাহফুজ আলম যখন ‘বহুত্ববাদ’ শব্দটি উচ্চারণ করেন, তখন তিনি মূলত একটি ‘এপিস্টেমিক ব্রেক’ বা জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিবর্তনের কথা বলেন। নিউইয়র্কে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানের সময় তিনি আন্তর্জাতিক মহলেও এই বার্তাটি পৌঁছে দিয়েছেন। সেখানে মাহফুজ আলম স্পষ্ট করেন যে তাঁদের লক্ষ্য হলো একটি ‘প্লুরালিস্টিক ডেমোক্রেসি’ বা বহুত্ববাদী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। জাতিসংঘের অধিবেশনে ড. ইউনূস যখন মাহফুজ আলমকে আন্দোলনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন, তখন তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্য এবং পরবর্তী সময় সিএনএন বা আল-জাজিরার সঙ্গে আলাপকালেও ‘সব মতের অংশগ্রহণ’ বা ইনক্লুসিভিটির বিষয়টিই প্রাধান্য পেয়েছে।

কিন্তু এই পর্যায়ে এসে একটি জরুরি প্রশ্ন সামনে আসে—তরুণ নেতৃত্ব কি কেবল নৈতিক প্রতীক, নাকি তারা এখন বাস্তব রাজনৈতিক অভিনেতা? গণ-অভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে তারা আর শুধু প্রতিরোধের মুখ নয়; তারা ক্ষমতার বাস্তবতায় উপস্থিত। ফলে তাদের সিদ্ধান্ত, নীরবতা ও ব্যর্থতাও রাজনৈতিক দায়ের আওতায় পড়ে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা কিংবা নারীদের ওপর সহিংসতার ঘটনায় তরুণ নেতৃত্বের ভূমিকা বা নিষ্ক্রিয়তা প্রশ্নের মুখে পড়ে। ইনক্লুসিভ রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখানো নেতৃত্ব মাঠপর্যায়ে নিজেদের অনুসারীদের আচরণ নিয়ন্ত্রণে কতটা সক্ষম হয়েছে—এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেলে বহুত্ববাদের দাবি নৈতিক উচ্চারণেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

মাহফুজ আলম তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বিভিন্ন দীর্ঘ প্রবন্ধে যে রাজনৈতিক দর্শন পরিষ্কার করেছেন, তার মূল নির্যাস হলো, ‘আমাদের লড়াইটা কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা যেখানে কেউ কাউকে বাদ দেবে না।’ এই ‘নন-এক্সক্লুশনারি পলিটিক্স’ বা বর্জনহীন রাজনীতিই মূলত ‘ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ’-এর তাত্ত্বিক রূপ। এটি অনেকটা আমাদের ইতিহাসের সেই ‘বারো ভূঁইয়া’দের মতো—যাঁরা মোগল আধিপত্যের বিরুদ্ধে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করে একধরনের শক্তিশালী ঐক্য গড়ে তুলেছিলেন।

একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের আলাপ এখন এ কারণেই জরুরি যে আমরা বুঝেছি বর্জনমূলক ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্রে’র দিকে নিয়ে যায়। যখন একটি রাষ্ট্রে কেবল এক নেতার ছবি থাকে এবং এক মতাদর্শের মানুষ সুবিধা পায়, তখন সেই রাষ্ট্র ভেতর থেকে অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়ে।

আমাদের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখি, ১৯৭১ সালের স্বপ্ন ছিল একটি ইনক্লুসিভ রাষ্ট্র গড়া। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার—এই তিনটি মূলনীতির ওপর দাঁড়িয়েছিল আমাদের মুক্তিসংগ্রাম। কিন্তু স্বাধীনতার পর আমরা সেই পথ থেকে বারবার বিচ্যুত হয়েছি। ২০২৪ সালের এই গণ-অভ্যুত্থান আমাদের সেই মূল ঠিকানায় ফেরার এক ঐতিহাসিক সুযোগ করে দিয়েছে।

ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ: সম্ভাবনা, সীমা ও অমীমাংসিত প্রশ্ন

তবে ‘ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ’ গড়া সহজ কাজ নয়। আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে আছে অসহিষ্ণুতা। আমরা মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও মনে মনে একেকজন ছোট ছোট ডিক্টেটর। ভিন্ন ধর্মের মানুষের বাড়ি পোড়ানো বা ভিন্নমতের মানুষের ওপর চড়াও হওয়া আমাদের মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে দীপু দাসের পুড়ে মারা যাওয়া, বিএনপি নেতার ঘর ভাঙচুর কিংবা নারীদের ওপর আগ্রাসী আচরণকে কেবল নৈতিক বিচ্যুতি হিসেবে দেখলে রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার গভীর সংকট আড়াল থেকে যায়। ক্ষমতার শূন্যতা, প্রশাসনিক দ্বিধা এবং দীর্ঘদিনের দমনমূলক শাসনের ফলে গড়ে ওঠা মব সংস্কৃতি এই সহিংসতার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। ‘ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ’-এর বয়ান যখন রাজপথে নেমে আসে, তখন যদি তা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও আইনের শাসনের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে তা সংখ্যাগরিষ্ঠ আবেগের প্রতিশোধী রূপও নিতে পারে। এই সহিংসতা তাই ব্যক্তির নয়; এটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা সংকটের প্রকাশ।

আমাদের এই বদ্বীপের মাটি গঠিত হয়েছে গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্রের পলি দিয়ে, যে পলি কোনো নির্দিষ্ট এক উৎস থেকে আসেনি। আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, মঙ্গোলয়েড—নানা জাতির রক্ত মিশেছে এখানে। আমাদের ধর্মবোধে মিশে আছে সুফিবাদের মরমি স্বাদ আর বৈষ্ণব ধর্মের প্রেম। লালন ফকির থেকে শুরু করে চণ্ডীদাস—সবাই সেই ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ পঙক্তিকেই প্রতিষ্ঠা করেছেন। এটিই ছিল বাংলার আদি ইনক্লুসিভিটি।

অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গড়ার পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিরাপত্তা ও সহাবস্থানের দ্বন্দ্ব। সব মতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে গিয়ে রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে ইনক্লুসিভিটি নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। সংখ্যালঘু, ভিন্নমতাবলম্বী বা নারীদের নিরাপত্তাহীনতা দেখায়—নৈতিক উচ্চারণ আর প্রশাসনিক সক্ষমতার মধ্যে এখনও বড় ফাঁক রয়ে গেছে। বহুত্ববাদ তখনই কার্যকর হয়, যখন রাষ্ট্র একই সঙ্গে মতের স্বাধীনতা ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।

ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ কেবল একটি গালভরা শব্দ নয়; এটি একটি নিরন্তর যুদ্ধ। এই যুদ্ধ নিজের ভেতরের সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে। তরুণ নেতৃত্ব যে বহুত্ববাদের মানচিত্র আমাদের সামনে মেলে ধরেছে, তার আলোকে আমরা দেখতে চাই এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে পাহাড়ের চাকমা তরুণটি নিজেকে ততটাই নিরাপদ মনে করবেন, যতটা মনে করেন ঢাকার একজন উচ্চবিত্ত মানুষ।

কিন্তু এখানেই আরেকটি কঠিন প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। মাহফুজ আলমের বহুত্ববাদী বয়ান নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক সংযোজন। কিন্তু যে কোনো রাজনৈতিক দর্শনের মতো এটিও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। বহুত্ববাদ কি ক্ষমতায় গেলে নিজেই নতুন ধরনের বর্জন তৈরি করবে না? ‘সব মতের জায়গা’ দেওয়ার সীমা কোথায়—সহিংস বা ঘৃণামূলক মতাদর্শের ক্ষেত্রেও কি তা প্রযোজ্য? এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে গেলে ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ একটি আকর্ষণীয় স্লোগানে পরিণত হবে, কিন্তু কার্যকর রাষ্ট্রদর্শনে রূপ নেবে না।

জুলাইয়ের শহীদদের রক্ত আমাদের কাছে এই ঋণ রেখে গেছে। তাঁরা মরেছেন যেন আমরা একটি ইনক্লুসিভ ভোরের দেখা পাই। সেই ভোর যদি না আসে, তবে ইতিহাসের মহাকাব্যে আমরা কেবল এক ট্র্যাজিক চরিত্র হিসেবেই রয়ে যাব।

‘ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ’ তাই আমাদের জন্য কেবল একটি আলোচনা নয়; এটি আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার জরুরি পথ। শুরুটা হয়েছে রাজপথে, শেষটা হতে হবে প্রতিটি নাগরিকের হৃদয়ে।

কিন্তু গণ-অভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে সেই বহুত্ববাদ কতটা রক্ষিত হলো? কেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী দীপু দাস পুড়ে মরল? বিএনপি নেতার ঘর পুড়ল? নারীদের ওপর আগ্রাসী আচরণ তীব্র হলো? দায় কার? তরুণ নেতৃত্বও ক্ষমতায় ছিল, তাদের অনেক অনেক অনুসারী ছিল সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে—তবু কেন এই ব্যর্থতা?

  • মারুফ ইসলাম: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
Ad 300x250

সম্পর্কিত