leadT1ad

ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিস্ট

‘বাংলাদেশ ২.০’-এ ‘জুলিয়াস সিজারের’ ক্যাসিয়াস

ঢাকার ধামরাইয়ে একটি মাজারে হামলা চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ছবি: সংগৃহীত

১৫৯৯ সাল। বিখ্যাত নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়র লিখলেন রোমের বিখ্যাত বীর জুলিয়াস সিজারের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নাটক ‘জুলিয়াস সিজার’। তৎকালীন রোমান রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে তুলে ধরতে মূলত রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক এই নাটকটির বিশ্বসাহিত্যে অবদান রয়েছে। ক্যাসিয়াস এই নাটকের অন্যতম খলনায়ক বা ষড়যন্ত্রকারী চরিত্র। তার ভূমিকা ছিল রোমান জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্রের নামে সিজারের বন্ধু ব্রুটাসকে ব্যবহার করা এবং একই সাথে ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে সামনে আনায়।

বাংলাদেশের বর্তমান সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা দেখে মনে হচ্ছে আমি নাটকের দৃশ্যে ঘুরপাক খাচ্ছি কেবল। দৃশ্যপটের শুরু হয়, ৫ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২-এ মব আক্রমণের পর থেকে। সদ্য গত হওয়া স্বৈরাচার শাসনের পতনের পর ‘ফ্যাসিবাদ নির্মূল’-এর নামে একের পর এক মব লিঞ্চিং ঘটনা ঘটল। মূলত ভিন্নমত দমনের জন্য।

সারা দেশে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো ৮০ থেকে ১০০টিরও বেশি সুফি মাজার ও দরবার শরিফে হামলা চালাল, ভেঙে ফেলল। প্রায় ১৫০০ ভাস্কর্য বা স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। আড়াই হাজারের বেশি ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটল। দীপু দাসের মতো হত্যাকাণ্ড, বাউল আবুল সরকারের অনুসারীদের ওপর আক্রমণ, সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, সাংবাদিকদের ওপর অযৌক্তিক ও নির্মম হামলা, কাদিয়ানিদের ‘কাফের’ ঘোষণা, বিশ্ববিদ্যালয়–কলেজ–স্কুলের শিক্ষকদের প্রকাশ্যে অপমান ও পদত্যাগে বাধ্য করা; সবই এখন আমাদের বাস্তবতা। এমনকি ‘শিরক’-এর অভিযোগে শতবর্ষী বটগাছ কেটে ফেলা হয়েছে। ১৬ ডিসেম্বরের আগের রাতে এক মুক্তিযোদ্ধার কবরে আগুন দেওয়া হয়েছে। এখানে ইত্যাদি বলে উদাহরণ টানা শেষ করলাম, তবে তালিকা শেষ হয়নি।

শেক্সপিয়রের জুলিয়াস সিজার লেখার ৩২৫ বছর পর বাংলাদেশ এখনো সেই নাটকের মঞ্চেই দাঁড়িয়ে আছে। আর ১৮ ডিসেম্বর রাতে নিজেকে ১৫৯৯ সালের গ্লোব থিয়েটারের একজন দর্শক বলে মনে হচ্ছিল।

জাতি হিসেবে বাঙালিরা সম্ভবত বেশ আবেগপ্রবণ। আর আমাদের ক্যাসিয়াসরা এই আবেগকে কাজে লাগাতেও জানে। যার প্রমাণ এই ধ্বংসস্তূপ আর মবের রাজ্য। তবে প্রযুক্তির এই যুগে ক্যাসিয়াসদের আর মানুষের সামনে দাঁড়ানোর দরকার হয় না। একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসই যথেষ্ট। আবেগী দেশপ্রেমীরা মুহূর্তেই দানব মবে পরিণত হয় এবং গণভবন থেকে শুরু করে প্রথম আলো পর্যন্ত লুট করতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে। তবে রোমানদের মতো শুধু আবেগী জনতা নয়, আমাদের আছে বাংলাদেশি ব্রুটাসও। যারা মবকে ‘মব’ বলতে পারে না। বরং যারা মবের বিরুদ্ধে কথা বলে, তাদেরই হুমকি দেয়।

যারা ‘জুলিয়াস সিজার’ পড়েননি বা দেখেননি, তাদের জন্য একটু গল্পে ফেরত যাওয়া দরকার। জুলিয়াস সিজার ছিলেন রোমের একজন জনপ্রিয় সেনাপতি। সিজারের এই জনসমর্থন ঝড় তোলে তার শত্রুদের মনে। তরুণ নেতা ক্যাসিয়াস গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের নামে সিজারের শত্রুদের মাথাগুলো এক করে। সিনেটরদের সামনে সিজারকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। ব্রুটাস, সিজারের দীর্ঘদিনের সহযোগী ও বন্ধু তার চোখের দিকে তাকিয়ে ছুরিকাঘাত করে। বিস্মিত ও আহত সিজার বলেন, ‘এত তু, ব্রুটে?’—‘তুমিও, ব্রুটাস?’ অথচ সেদিন জনতা সিনেটের সামনে জড়ো হয়েছিল সিজারকে রাজা হিসেবে বরণ করতে।

নাটকটির নাম ‘জুলিয়াস সিজার’ হলেও এটি আসলে ক্ষমতা, হত্যা ও তার পরিণতির গল্প। জুলিয়াস সিজারের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে তার মৃত্যু-পরবর্তী রাজনীতি আর রাজনীতিবিদদের ভাষার চতুরতা। সিজারের মৃত্যুর পর জনতা উন্মত্ত হয়ে ওঠে। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, হত্যা শুরু হয়। এই নাটক মূলত বার্তা দেয়, বক্তব্য, নেতৃত্ব আর মব—এই তিনটির শক্তি কতটা ভয়ংকর হতে পারে।

আজকের বাংলাদেশও সেই নাটকেরই এক আধুনিক মঞ্চায়ন। ষড়যন্ত্র, নৈরাজ্য, প্রতিশোধ, খুন আর মব লিঞ্চিং দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে আছি। দেশের পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়, তরুণ নেতা ওসমান হাদির মৃত্যুর পর। তাঁর মৃত্যুকে পুঁজি করে যে রাজনীতি শুরু হয়েছে তা কেবল একটা দৃশ্যের সঙ্গেই তুলনা করা যায়। সিজারের মৃত্যুর পরে তার লাশ সামনে রেখে যে ভাষণ ব্রুটাস আর অ্যান্টনি দিয়েছে, সিজারের উইল নিয়ে অ্যান্টনি যে চতুরতা দেখিয়েছে, ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে।

আজকের বাংলাদেশের ক্যাসিয়াসরাও তাই। একুশ শতকে তাদের ব্রুটাসের সঙ্গে সরাসরি দেখা করার প্রয়োজন নেই, তারা দূরে বসে সোশ্যাল মিডিয়ায় উসকানি দেয়। ভারতবিরোধিতার নামে মিডিয়া পোড়ায়, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ভাঙে, নিরীহ মানুষ পুড়িয়ে মারে।

বাংলাদেশি ক্যাসিয়াসরা ভারত বিরোধিতার নামে নিজের দেশের সংবাদপত্র, সাংবাদিক আর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করেছে। অ্যান্টনি জানত রোমে তৎকালীন ভূমি-সংকটের কথা, সে এটাকে পুঁজি করে সিজারের উইলের বক্তব্য সাজিয়েছে। বাংলাদেশি ক্যাসিয়াসরাও জানে এ দেশের জনগণের ভারতবিরোধী আবেগের কথা। সেটাকে পুঁজি করে তারা বেছে নিয়েছে হাদির মৃত্যুকে।

আইনশৃঙ্খলা বাংলাদেশে এখন সংকটে। এই শূন্যতায় ক্যাসিয়াসরা নৈরাজ্য ও ক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ নিচ্ছে। তবে বাংলাদেশে জুলিয়াস সিজার না থাকলেও কিন্তু ক্যাসিয়াসের অভাব নেই।

স্বৈরাচারী হাসিনা পালিয়ে গেছে, কিন্তু ফ্যাসিবাদ পালায়নি। বরং আরও হাসিনার জন্ম হচ্ছে। রবার্ট ও. প্যাক্সটন তাঁর ‘অ্যানাটমি অফ ফ্যাসিজম’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘প্রথম দৃষ্টিতে ফ্যাসিবাদ বোঝার চেয়ে সহজ আর কিছু নেই বলে মনে হয়। আমাদের সামনে উপস্থাপিত হয় কিছু সাধারণ চিত্র: এক উগ্র জাত্যাভিমানী বক্তা, উচ্ছ্বসিত জনতাকে উত্তেজিত করে ভাষণ দিচ্ছে; শৃঙ্খলাবদ্ধ সারিতে তরুণেরা; একই রঙের পোশাক পরা সশস্ত্র কর্মীরা কোনো ‘দানবায়িত’ সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সদস্যদের মারধর করছে; সমাজের পতন, অপমান কিংবা দুর্ভোগকে ঘিরে একধরনের বাতিকগ্রস্ত মনোযোগ; এবং মুক্তিদায়ী সহিংসতার মাধ্যমে অনুসৃত ঐক্য, শক্তি ও পবিত্রতার প্রতিকারমূলক উপাসনা।”

প্যাক্সটন যখন বলেন, ‘এক উগ্র জাত্যাভিমানী বক্তা উচ্ছ্বসিত জনতাকে উত্তেজিত করছে’, তখন ভারতবিরোধী মনোভাবের নামে সংবাদমাধ্যমে হামলার স্মৃতি আমার মনে ভেসে ওঠে। তিনি যখন বলেন, ‘সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে আঘাত করা হচ্ছে’, তখন আমি বাউল সমর্থকদের ওপর হামলার ঘটনা মিলাই। আর ‘দুর্ভোগকে ঘিরে বাতিকগ্রস্ত মনোযোগ’ শুনলে প্রতিধ্বনির মতো শুনতে পাই, ‘গত ১৬ বছর ধরে আমরা নির্যাতিত ছিলাম।’ এভাবেই, ফ্যাসিবাদ এখনো ডালপালা বিস্তার করে চলেছে।

তবে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা শফিকুল আলম ফ্যাসিবাদকে ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। তাঁর মতে, ফ্যাসিস্টদের কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে, ‘দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, অবৈধ দখল বা জমি দখল, মা ও বোনদের সম্মানকে বিতর্কিত করা এবং জোরপূর্বক দেশকে অস্থিতিশীল করা।’

অন্যদিকে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সহ-সভাপতি ও শিবির নেতা মোস্তাকুর রহমান এক প্রতিবাদ সমাবেশে বলেন, ‘আজকের কর্মসূচি থেকে আমরা ঘোষণা করছি যে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারসহ তথাকথিত সুশীল পত্রিকাগুলো বন্ধ করতে হবে।’ মোস্তাকুর এই হুমকি দেওয়ার কিছুক্ষণ আগেই ঢাকায় প্রথম আলোর অফিসে সহিংস হামলা হয় বলে ডেইলি স্টার রিপোর্ট করে।

এই বিষয়ে জামায়াতের আমির বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট আমলে যেভাবে প্রকাশ্যে গণমাধ্যমের ওপর হামলা হয়েছে, আমরা সেই সংস্কৃতিতে ফিরে যেতে চাই না।’ সুতরাং দলগুলো স্বীকার করছে যে সংবাদমাধ্যমে হামলা ফ্যাসিস্ট সংস্কৃতি। কিন্তু তারা এর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বরং আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়েছে যে, এর সঙ্গে ছাত্রশিবিরের কোনো সম্পর্ক নেই।

ছাত্রশিবিরের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) শাখার সেক্রেটারি মোস্তাফিজুর রহমান এক প্রতিবাদ সমাবেশে বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বামপন্থী, শাহবাগী, ছায়ানট ও উদীচীকে তছনছ করে দিতে হবে।’ সেই রাতেই ঢাকার ধানমন্ডিতে ছায়ানট ভবনে মধ্যরাতে হামলা হয়। একদিন পর ঢাকায় সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আগুন লাগে।

১০ ফেব্রুয়ারি এক ফেসবুক পোস্টে সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ মব সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানান। ১১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, ‘আমি বিতর্কিত উপদেষ্টাদের স্পষ্টভাবে বলছি, অতিরিক্ত সুশীলতা দেখাবেন না। আমাদের মব জাস্টিস বোঝানোর চেষ্টা করবেন না। আমরা ২০১৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত রাস্তায় রক্ত ঝরিয়েছি।’ এর মাধ্যমে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, আগের শাসনামলে যারা ত্যাগ স্বীকার করেছে, তারা এখন যা খুশি করতে পারে। ভুক্তভোগী হওয়া এবং ভিক্টিম কার্ড প্লে করার মধ্যকার সূক্ষ্ম সীমারেখা আজকাল ঝাপসা হয়ে গেছে।

ফ্যাসিস্টরা বর্তমানে বিচার চায় না, চায় শুধু ধ্বংস। একজন মব ডাকে, আরেকজন সেই মবকে আরও উসকে দেয়।

নাটকে ব্রুটাস ও অ্যান্টনি দুজনেই বক্তব্য দিয়ে ইতিহাসের গল্প বদলে দেয়। ব্রুটাস গণতন্ত্রের নামে খুনকে ন্যায্যতা দেয়। অ্যান্টনি বলে, ‘আমি সিজারকে কবর দিতে এসেছি, প্রশংসা করতে নয়।’ আবেগ দিয়ে সে জনতাকে নিজের পক্ষে নিয়ে আসে। অন্যথায়, ভীত, আতঙ্কিত ও বিভ্রান্ত মানুষ তার উপস্থিতি মেনে নিত না। তার বক্তব্য আর বর্তমান নেতাদের বক্তব্য প্রমাণ করে, নিরীহ অক্ষরও অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। তবে সে তার পরিকল্পনায় সফল হয়। নাটকটি মবের শক্তি, নেতার শক্তি এবং রাজনীতিবিদদের ভাষার চতুরতা; তিনটিরই উদাহরণ হাজির করেছে দর্শকের সামনে।

ব্রুটাস নেতা হিসেবে ছিলো সৎ, আদর্শবাদী, কিন্তু ইউটোপিয়ান। ক্যাসিয়াস তাকে ব্যবহার করেছে। নাটকে ক্যাসিয়াস জনগণের মুখোমুখি হওয়ার সাহসও দেখায় না। বরং আড়াল থেকেই সব নিয়ন্ত্রণ করেছে।

আজকের বাংলাদেশের ক্যাসিয়াসরাও তাই। একুশ শতকে তাদের ব্রুটাসের সঙ্গে সরাসরি দেখা করার প্রয়োজন নেই, তারা দূরে বসে সোশ্যাল মিডিয়ায় উসকানি দেয়। ভারতবিরোধিতার নামে মিডিয়া পোড়ায়, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ভাঙে, নিরীহ মানুষ পুড়িয়ে মারে।

জুলিয়াস সিজার আমাদের সামনে একটি আয়না। আমরা চাইলে তাতে নিজেদের দেখতে পারি। অথবা বুঝতে পারি, কীভাবে আমরা নিজেরাই নিজেদের ক্যাসিয়াসের হাতে ব্যবহৃত হচ্ছি। প্রশ্ন হলো, আমাদের ব্রুটাস কি এখন বুঝতে পারছে, সে ব্যবহৃত হচ্ছে? নাকি সে এখনও মবকে মনে করে, ‘বিক্ষুব্ধ ছাত্র জনতা’?

পরিশেষে, ক্যাসিয়াসের উদ্ধৃতি আউড়ে যাই, ‘মানুষ কখনো কখনো নিজের ভাগ্যের মালিক নিজেই হয়।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত